Transfer Of Technology বা TOT এই শব্দটির সাথে আমরা কম বেশি সকলে পরিচিত। যখনই কোন অস্ত্র কেনার বেপারে সামনে আসে তখনই অনেক আবেগী জনগন কে এই শব্দ টির যথার্থ প্রয়োগ করতে দেখা যায়।

অস্ত্র কিনার সাথে সাথে কেন প্রযুক্তি কেনা হল না। কত ভাল হতো যদি আমরা ভারতের মত সুখই-৩০এমকেআই অথবা চীনের মত জে-১১ বিমান নিজেরা টট নিয়ে বানাতে পারতাম। আচ্ছা বিমান বাদ দেই আমরা তো ট্যাংক বানাতে পারি কারো থেকে প্রযুক্তি নিয়ে।

Image result for T90 hd wallpaper

T-90 Tank of Russia
আসুন আজকে আলোচনা করছি এই টট নামক শব্দ টির প্রয়োগ এবং তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।

TOT বা Transfer of Technology কি??

যখন কোন দেশ অন্য কোন দেশ থেকে কোন পন্যের ৫০%% বা তার বেশি প্রযুক্তি কিনে নেয় তবে সেটি ৮০% প্রযুক্তি বিনিময়ের নিচে থাকে তখন তাকে Transfer of Technology বা TOT বলে। অস্ত্র প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলতে হয়। যেমন:

  1. উক্ত অস্ত্রের প্রযুক্তি কখনো কোন গন বিধ্বংসী অস্ত্র হতে পারবে না যেমন রাসায়নিক অস্ত্র, ক্লাস্টার বোমা ইত্যাদি
  2. উক্ত অস্ত্র এর দ্বারা বেসামরিক ব্যাক্তি এবং অন্যান্য পশুপাখি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ এর উপর প্রয়োগ করা বা তার দ্বারা ক্ষতি সাধন হয় এমন অস্ত্র এর প্রযুক্তি বিনিময় করা যাবে না যেমন ল্যান্ড মাইন, নেভাল মাইন ইত্যাদি।
  3. জাতিসংঘ এর আইনের প্রতি শ্রাদ্ধশীল নয় এমন দেশ কে অস্ত্র প্রযুক্তি হস্তান্তর করা যাবে না যেমন উত্তর কোরিয়া, ইরান ইত্যাদি
  4. কোন দেশের অভন্তরীন গৃহযুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে এমন দেশ কে অস্ত্র প্রযুক্তি বিক্রি করা যাবে না।
    মোটামোটি এই ৪টি হল অস্ত্র প্রযুক্তি বিনিময় এর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিয়ম।

TOT কেন নেয়া হয়?

TOT বা Transfer of Technology এর মাধ্যমে কোন অস্ত্র প্রযুক্তি নেয়ার বিশেষ কিছু কারন থাকে। এক্ষেত্রে কারন গুলো হলঃ

  • নিজের দেশে থাকা সেই অস্ত্র অভন্তরীন চাহিদা পূরন এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
  • অস্ত্র উৎপাদনের মাধ্যমে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সামরিক প্রভাব বলয় নিশ্চিত করা।
  • অস্ত্র প্রযুক্তি কেনার মাধ্যমে তা নিজ দেশে উৎপাদনের ফলে যে অভিজ্ঞতা অর্জন হয় তা ভবিষ্যৎ নিজের অস্ত্র উন্নয়ন কাজে ব্যবহার করা।
  •  উৎপাদিত অস্ত্রের কিছু অংশ প্রযুক্তি প্রদানকারী দেশের অনুমতি ক্রমে বাইরে বিক্রি করে অর্থ আয় করা
  • বিশ্বের অস্ত্র উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে নিজের স্থান নিশ্চিত করা এবং সামরিক সমর্থন আদায় করা।

আমরা কেন কোন অস্ত্রের ক্ষেত্রে TOT গ্রহন করি না?

আমাদের দেশ অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে একটি সল্প উন্নত দেশ। এই দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এখনো পর্যাপ্ত হয়। যেকোন ভারি এবং স্ট্রেটেজিক অস্ত্র এর প্রযুক্তি কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে এই অর্থনৈতিক সক্ষমতা। এই পরেই যে সমস্যাটি আসে তা হলো প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। আমাদের অভন্তরীন প্রযুক্তিখাত ধীরে ধীরে উন্নতি সাধন করছে তবে তা ভারি অস্ত্র যেমন যুদ্ধ বিমান বা ট্যাংক এর প্রযুক্তি নিয়ে নিজ দেশে উৎপাদনের জন্য এখনো যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তিগত দিক থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন না হলে সেই দেশের পক্ষে কখনোই আধুনিক মান সম্পন্ন অস্ত্র উৎপাদন সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসাবে আমাদের পাশের দেশ ভারত কে দেখতে পারেন।

Image result for CX1 missile hd photo

CX1 missile of China

ভারত কে ছোট করা নয় বরং তাদের অস্ত্র উৎপাদনে বিভিন্ন সমস্যাই এখানে অনুমেয়। ভারত এখনো অস্ত্র উৎপাদনে সম্পূর্নরূপে সক্ষম হতে পারে নি। তাদের অস্ত্র মান নিয়ে এখনো কিছু প্রশ্ন থেকে যায় তবে তাদের সব অস্ত্রের মান খারাপ তাও নয়। যৌথ উদ্দোগ্যে বানানো বিভিন্ন অস্ত্রের মান যথেষ্ট ভাল তবে তাদের অভন্তরীন প্রযুক্তি গবেষণায় বানানো অস্ত্র এখনো আন্তর্জাতিক বাজারে স্থান করতে পারে নি। এবার বুঝন ভারতের মত দেশ যাদের ৪৫ বছরের বেশি অস্ত্র উৎপাদনের রেকর্ড আছে তারা এখনো নিজের অভন্তরীন চাহিদার জন্য বাইরের অস্ত্রের উপর নির্ভর করছে এমন কি প্রযুক্তি কিনে বানানো অস্ত্রের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সেখানে আমাদের এই ধরনের স্বপ্ন দেখা কতটা যৌতিক?

TOT নেয়ার ক্ষেত্রে বিবেচ্য কিছু বিষয়?

প্রযুক্তি নিয়ে অস্ত্র বানানোর ক্ষেত্রে প্রথমই যেটা ভাবতে হয় তা হলো সেই অস্ত্র টি আমাদের কি পরিমানে দরকার। প্রযুক্তি নিয়ে অস্ত্র বানানোর প্রথম এবং প্রধান কারন হচ্ছে উৎপাদিত অস্ত্রের খরচ কমানো এবং সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা আর সেই সাথে তার অভন্তরীন চাহিদা। একটি অস্ত্র যেমন সেটা বিমান হক বা হেলিকপ্টার রাডার হক বা ট্যাংক সেটি বানানোরর ক্ষেত্রে প্রথমেই ভাবতে হবে সেটি কি পরিমানে দেশের সামরিক বাহিনী ব্যবহার করবে। যদি প্রয়োজন বেশি হয় তবে সেটির প্রযুক্তি নেয়া যেতেই পারে কিন্তু প্রয়োজন কম না থাকলে তা অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই না এবং তা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারন হতে পারে।

Image result for mig 35 hd wallpapers

Mig-29 SM of Russia

উদাহরণ হিসাবে ধরা যাক আমাদের ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৮৯ বর্গ কিমি এই দেশের আকাশ সীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৩ স্কোয়াড্রন মাল্টিরোল কমবেট এয়ার সুপিয়রিটি এয়ার ক্রাফট এবং  সাথে ৩-৪ স্কোয়াড্রন লাইট কমবেট এয়ার সুপিরিয়র বিমান যথেষ্ট এখন যেহেতু দেশের আকাশ সীমা ছোট আর আকাশ সীমার নিরাপত্তার জন্য কোন একটি দেশের বিমানের উপর নির্ভর করা কৌশলগত ভাবে ভুল তাই আমরা এই ৬-৭ স্কোয়াড্রন বিমানের চাহিদা কখনোই একটি মডেলের বিমান দিয়ে পূর্ন করবো সেক্ষেত্রে আমরা ২ টি অথবা ৩ টি আলাদা প্লাটফর্ম কে বেছে নিব। আর সেক্ষেত্রে এই ৩ টি আলাদা প্লাটফর্ম এর প্রযুক্তি কেনা বা যে কোন একটি প্লাটফর্ম এর প্রযুক্তি কিনে মাত্র -১৬ থেকে ২০ বিমান বানিয়ে প্রডাকশন বন্ধ করা অর্থনৈতিক ভাবে খুবই বাজে সিধান্ত। আর অনেকি ভাবি প্রযুক্তি নিয়ে অস্ত্র বানিয়ে তা রপ্তানি করতে পারবো যা সম্পূর্ন ভাবে TOT দেয়া হয় যখন কোন দেশ বিশাল পরিমানে অস্ত্র কেনে এবং সরবরাহ কারী দেশ নিদিষ্ট সময়ের মাঝে তা সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে না পারে অথবা বিভিন্ন কারনে আন্তর্জাতিক নিয়মের বেড়া জালে এত পরিমান অস্ত্র বিক্রি করতে না পারে তখন তার আপপ্রযুক্তি বিনিময়ে রাজি হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে নিজেদের বিনিয়োগ তুলে নেবার জন্য প্রযুক্তি বিক্রি করে থাকে। তাই সেক্ষেত্রে তারা কখনো চাইবে না তাদের প্রযুক্তি নিয়ে কেউ অস্ত্র বানিয়ে সেটা বাইরের দেশে বিক্রি করে তাদের নিজেদের বাজার নষ্ট করুক।

Mig-35S of Russia

আর অস্ত্র বিক্রি করা যতটা সহজ মনে হয় আপাতত দৃস্টি তে তা ততটাই কঠিন। কোন দেশ চাইলে অন্য দেশ কে অস্ত্র বিক্রি করতে পারে না তার সবচেয়ে ভাল প্রমান ভারত। ভারত আমাদের ২০১৩ থেকে অস্ত্র বিক্রির বেপারে আগ্রহ দেখিয়ে আসলেও লাভের লাভ কিছুই হয় নি। কারন হলো কৌশলগত বাধা সেই সাথে ভারতের অর্থনৈতিক দূর্বলতা। বাংলাদেশ তার অস্ত্রের চাহিদার অধিকাংশ চীন, রাশিয়া, ইউক্রেন, তুরস্ক, ইতালি এবং কিছু ক্ষেত্রে আমেরিকা থেকে মিটায়। এসিব দেশের মধ্যে অধিকাংশ অস্ত্রের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চীন রাশিয়া থেকে লোন এবং; কিস্তি তে অস্ত্র ক্রয় করে থাকে। চীন এবং রাশিয়া বাংলাদেশ কে প্রতি বছর অস্ত্র কেনা বাবদ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার লোন অফার করে থাকে। সেখানে ভারত মাত্র ৫০০ মিলিয়ন ক্রেডিট লাইনে অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। যেখানে চীন ১-২ বিলিয়ন পর্যন্ত সামরিক ঋন দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করে সেখানে ৫০০ মিলিয়ন ঋন নিয়ে নিজেদের পছন্দের বাইরে কেউ অস্ত্র কিনবে না

Related image

Yuan-class Submarine of China

শুধু বাংলাদেশ নয় অন্যান্য দেশ গুলো তে একই অবস্থা চীন বা রাশিয়া মিয়ানমার, পাকিস্তানসহ এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশে গুলো তে নিজের অস্ত্র বিক্রি বাবদ যে পরিমান লোন দেয়ার ক্ষমতা রাখে পাকিস্তান বা ভারত তার ধারে কাছেও যেতে পারে না। ভারত যদিও কিছু মাঝারি ঋন দিয়ে নিজেদের অস্ত্র বিক্রি করতে পারে পাকিস্তান এর ইকোনমিক অবস্থা আমাদের চেয়ে খারাপ হওয়ায় তাও সম্ভব নয়। তাই আমরা TOT ননিয়ে অস্ত্র বানিয়ে বিদেশে রপ্তানি করবো এই অলিক কল্পনা করা বোকামি। আর নিজ দেশে ক্ষুদ্র চাহিদা মেটাতে অস্ত্র প্রযুক্তি কিনবো সেই ভাবনাও অবান্তর।

তাহলে কি আমাদের কোন অস্ত্রের প্রযুক্তি কেনা উচিত নয়?

অবশ্যই উচিত। নিজেদের স্বাবলম্বী করতে অবশ্যই আমাদের অস্ত্র শিল্পের দিকে যেতে হবে। অস্ত্র কে সামরিক সক্ষমতা নয় বিনিয়োগ এবং; শিল্প হিসাবে ভাবতে হবে। পোশাক শিল্প,; জাহাজ শিল্প, আইসিটি খাত, চামড়া শিল্প, খাদ্য উৎপাদন শিল্পের ন্যায় অস্ত্র কে বাণিজ্যিক ধারায় আনতে হবে।

অস্ত্র উৎপাদনে যেহেতু আমরা পিছিয়ে এবং আমাদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেই সাথে ঝুকি রয়েছে তাই আমাদের ছোট অস্ত্র দিয়ে শুরু করতে হবে। আমাদের অস্ত্র কে নিজেদের জন্য না রেখে বাইরে দেশে রপ্তানির কথা ভাবতে হবে আর তাই ছোট অস্ত্র গুলো কে টার্গেট করতে হবে। আমরা বিভিন্ন ধরনের রাইফেল, মেশিন গান এখন উৎপাদন করছি তার পরিধি বাড়াতে হবে।। নতুন আধুনিক মেশিন গান, বিভিন্ন ইনফ্রেন্ট্রি অস্ত্র যেমন মর্টার, রকেট লঞ্চার, গ্রেনেড লঞ্চার, মাঝারি মানের আর্টিলারী গোলা, ট্রুপস পরিবহনের জন্য লাইট এবং হেভি আর্মর গাড়ি, সল্প ও মাঝারি ক্ষমতার ট্রাক ইত্যাদি উৎপাদনে যেতে হবে। আমাদের নেভি নিজেরা আত্বনির্ভরশীল হচ্ছে বর্তমানে তারা ছোট ও মাঝারি সক্ষমতার জাহাজ দেশেই বানাছে। ধীরে ধীরে তার পরিধি বৃদ্ধি পেয়ে তা কর্ভেট ফ্রিগেট এর মত জাহাজ বানানোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

বিমান বাহিনী চীন রাশিয়ার সহায়তায় এয়ার টু এয়ার মিসাইল প্লান্ট বানাচ্ছে, সেই সাথে এয়ার টু সার্ফেট বোমাও তৈরী করতে যাচ্ছে। মুলত এই ধরনের অস্ত্র প্রযুক্তি আমরা ক্রয় করতে পারি এবং নিজেরা উন্নয়ন করতে পারি যা আমাদের অর্থনীতি তথা সামরিক শক্তির জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

লেখক :- সৌরভ দত্ত

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: