সময়ের পরিবর্তন ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে সব কিছুরই পরিবর্তন সাধিত হয় এবং অস্ত্রের ক্ষেত্রেও কথাটি যথার্থ। একসময়ে ম্যাচলক, ফ্লিন্টলক বা বোল্ট অ্যাকশন রাইফেল সমূহকে আধুনিক বিবেচনা করা হলেও সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এরাও একে একে বাতিল হয়ে গিয়েছে। বর্তমান সময়ে আধুনিক অস্ত্র বলতে যেসব অস্ত্রের কথা সর্বপ্রথম মাথায় আসে সেগুলো হচ্ছে বুলপাপ কনফিগারেশনের রাইফেলগুলো। বর্তমানে বেশির ভাগ দেশ সাধারণ কনফিগারেশনের রাইফেল ব্যবহার করলেও বেশ কিছু দেশ প্রায় অনেকদিন যাবৎ এধরণের রাইফেল ব্যবহার করে আসছে এবং এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যুক্তরাজ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের পরপরই ব্রিটেন বুলপাপ ডিজাইনের রাইফেল তৈরীর উপর গবেষণা শুরু করে এবং সেসময় তারা কার্যকরী রাইফেল তৈরীতে সক্ষম হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে তা আর সার্ভিসে আসেনি। কিন্তু সেসময়ে সার্ভিসে না আসলেও এধরণের রাইফেল তৈরীর চিন্তাভাবনা কিন্তু ব্রিটিশদের মাথা থেকে একেবারে মুছে যায় নি। সত্তরের দশকে ফ্রান্স এধরণের রাইফেল সার্ভিসে আনার জন্য চিন্তা ভাবনা শুরু করলে ব্রিটিশরাও আবার এধরণের রাইফেল সার্ভিসে আনার জন্য নতুন উদ্যমে কাজ শুরুকরে যার ফলশ্রুতি সার্ভিসে আসে এল৮৫এ১ রাইফেল।

এল৮৫এ১ হাতে প্রশিক্ষণরত ব্রিটিশ সৈনিক

 

এল৮৫এ১ রাইফেলগুলো আধুনিকতা ও রাইফেল ডিজাইনে নতুনত্বের প্রতিনিধিত্ব করলেও এরা কিন্তু বিশেষ একটি কারণে পরিচিতি লাভ করেছে। হাস্যকর হলেও সত্যি এদের বিশেষ পরিচিতির পেছনে প্রধান কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে এদের কুখ্যাতি। এই এল৮৫এ১ রাইফেলগুলো মূলত তৈরী করা হয়েছিল ব্রিটিশদের তৈরী ৪.৮৫×৪৯ মি.মি. কাট্রিজের জন্য কিন্তু ১৯৭৭* সালে ন্যাটো জোটভুক্ত দেশ সমূহ ৫.৫৬×৪৫ মি.মি. কার্ট্রিজ স্ট্যান্ডার্ডাইজ করার পরে এই রাইফেলগুলোকে ৫.৫৬ মি.মি. কার্ট্রিজ ব্যবহারের জন্য কনভার্ট করা হয়। তবে কনভার্ট করা বলতে যা বোঝায় এক্ষেত্রে কিন্তু সম্পূর্ণ রূপে তা করা হয়নি। এই রাইফেলগুলোর শুধুমাত্র ব্যারেল চেঞ্জ করা হয় কিন্তু গ্যাস পোর্টের অবস্থান ও আকৃতি অপরিবর্তিত রাখা হয়। ৪.৮৫ মি.মি. কার্ট্রিজ আকারে ছোট হওয়ায় এতে গান পাউডার পরিমাণে কম থাকত কিন্তু ৫.৫৬ আকারে বড় হওয়ায় এতে গান পাউডার পরিমাণে বেশি থাকে এবং বেশি পাউডার পোড়ানোর ফলে বেশি তাপ উৎপন্ন হয় ফলে এই রাইফেলগুলো খুব তাড়াতাড়ি গরম হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। আবার এদের ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশ কম শক্তিশালী বুলেটের জন্য তৈরী হওয়ায় ৫.৫৬ মি.মি. বুলেট ব্যবহার করায় খুব সহজেই সেসব ভেঙে যেত। আর মড়ার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে এই রাইফেলগুলোতে ব্যবহৃত বিভিন্ন অংশের ফিটিংস ছিল মোটামুটি নিম্নমানের এবং শক্তিশালী বুলেটের অধিক রিকয়েলের ফলে তা খুব সহজেই খুলে যেত এবং প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত রাইফেলগুলোর হ্যান্ডগার্ড কিংবা গ্রিপ খুলে যাওয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার ছিল। আবার এই রাইফেলগুলোকে ভালোভাবে চালাতে হলে এর অভ্যন্তরের বিভিন্ন যন্ত্রাংশে লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করা ছিল অত্যাবশ্যক কিন্তু লুব্রিকেন্ট সহজেই ধুলাময়লা আকৃষ্ট করে ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে এরা খুব সহজেই জ্যাম হয়ে যেত। আর যুদ্ধক্ষেত্রে এদের খুলে পরিষ্কার করে আবার জোড়া লাগানোও একটি জটিল ও কষ্টসাধ্য কাজ। এছাড়াও এই সব রাইফেলের সাথে যেসব ম্যাগাজিন দেয়া হত সেগুলোও মূলত হালকা ৪.৮৫ মি.মি. বুলেটের জন্য তৈরী করা হয়েছিল ফলে ম্যাগাজিনের স্প্রিং ছিল তুলনামূলক দূর্বল ফলে সহজেই ফিডে সমস্যা হত। আর এই রাইফেলগুলোর সিলেক্টর একেবারে পেছনের দিকে হওয়ায় ফুল অটো কিংবা সেমি অটোতে পরিবর্তন করা অন্যান্য রাইফেলের তুলনায় মোটামুটি যন্ত্রণাদায়ক একটি কাজ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এছাড়াও এদের ম্যাগাজিন রিলিজ সুইচের ডিজাইন এমন ছিল যে খুব সহজেই কাপড়ের সাথে লেগে ম্যাগাজিন খুলে যেত যা অনেক সময় একটি বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। উপসাগরীয় যুদ্ধের পরে ব্রিটিশ অফিশিয়াল রিপোর্ট অনুযায়ী এই রাইফেলটিতে এধরণের ৫০টিরও অধিক সমস্যার কথা বর্ণনা করা হয়েছিল যাদের কারণে উপসাগরীয় যুদ্ধে ব্যবহৃত রাইফেল সমূহের মধ্যে সৈন্যদের কাছে এটি সবচেয়ে অপছন্দের রাইফেল হিসেবে বিবেচিত হত। ফলে প্রায় নতুন থাকা সত্যেও ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এদের প্রতিস্থাপন করার চিন্তা ভাবনা শুরু করে কিন্তু অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে এদের প্রতিস্থাপনের চিন্তা বাদ দিয়ে তারা এসব সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা গ্রহন করে এবং জার্মান কম্পানি হেকলার অ্যান্ড কচের স্মরণাপন্ন হয়। বলা হয়ে থাকে হেকলার অ্যান্ড কচ আক্ষরিক অর্থেই এই রাইফেলগুলোর শুধুমাত্র খোলস রেখে বাকি সবই পরিবর্তন করে ফেলে এবং ফলশ্রুতি সার্ভিসে আসে এল৮৫এ২ রাইফেল সমূহ। এই এল৮৫এ২ রাইফেলগুলোতে মোটামুটি অনেক সমস্যা সমাধান করা হলেও সাধারণ সৈন্যদের মাঝে এদের সম্পর্কে পূর্বের অনেক ধারণাই প্রচলিত আছে যা এই রাইফেলগুলোকে বর্তমানে সার্ভিসে থাকা রাইফেলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিরাগভাজন করে তুলেছে…..

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: