বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট কে বিশ্বের অন্যতম সেরা ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেরা হয়ে উঠার পিছনে সুদীর্ঘ ইতিহাস জড়িত। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ১৯৬৫,১৯৭১ ও পরবর্তীতে চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী দমনেও তাদের দক্ষতা দেখিয়েছে। ১৯৬৫ সালে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যত সাহসিকতা পদক ও পুরস্কার আছে তার সবই জিতে নেয় তাদের দক্ষতার কারনে। কেন ? কারন পাকিস্তানের প্রান রক্ষা করেছিল সেদিন এই ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট,লাহোর শহরটিকে বাচিয়েছিল নিশ্চিত পতন থেকে…


পাকিস্তানে বাঙালীরা ছিল চরম অবহেলিত। বাঙালীদের বলা হতো নিরীহ তথা ভীতু জাতি। “বাঙ্গালী বাবু” রা যুদ্ধ করতে জানে না,এই বাদামী রঙের বেটে লোকগুলো সামরিক বাহিনীর উপযোগী না ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই জনসংখ্যার অর্ধেক হয়েও সেনাবাহিনীতে বাঙ্গালী সৈনিক দের সংখ্যা ছিলো স্বল্প,আর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ছিল পাকিস্তানী ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট গুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট রেজিমেন্ট। বাঙালীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা ও ভীতু ভাবার এ মনোভাব পাকিস্তানীদের ত্যাগ করতে হয় ১৯৬৫ সালের পাক ভারত যুদ্ধের পর।

পূর্বকথা :-

১৯৬২ এর যুদ্ধে চীনের কাছে ধরা খাওয়ার পর ভারত তাদের সামরিক খাতে উন্নয়ন ঘটাতে থাকে।এতে আইয়ুব খান কিছুটা চিন্তিত হন। তিনি মনে করলেন যে,যুদ্ধের পর ভারত দুর্বল হয়ে গেছে,কাশ্মীর বুঝে নেওয়ার এখনই সময়।এজন্য তিনি শ্রীনগর অভিমুখে সেনাবাহিনী পাঠাতে শুরু করলেন।স্থানীয় যুদ্ধবাজ উপজাতিগুলোর সহায়তায় খুব দ্রুতই তারা শ্রীনগরের কাছাকাছি পৌছে গেল।
.
কিন্তু ঘটনাটা ঘটল অন্যরকম,৬ই সেপ্টেম্বর ভারত করাচি আক্রমন করে বসল। আইয়ুব খান তখন সম্পূর্ন হতবাক।তিনি ভাবতেই পারেননি যে শ্রীনগরের ঝামেলাকে ভারত আন্তর্জাতিক সীমান্তে নিয়ে আসবে। পুরো পাকিস্তান সেনাবাহিনী তখন শ্রীনগর অভিমুখ। সবার আগে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট,এরপর বেলুচ ও সবচেয়ে পিছনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। কিন্তু খেল পাল্টে গেল। যেহেতু লাহোর রক্ষা করতে হবে,তাই সবচেয়ে পিছনের ফোর্সই অগ্রগামী ফোর্স হিসেবে প্রকট হল। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর উপরেই লাহোর রক্ষার গুরুদায়িত্ব পড়ল।
.
১৯৬৫ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর যখন ভারতীয় বাহিনী কাসুর ও লাহোর সেক্টরের দিকে অগ্রসর হলো,তখন ইন্ডিয়ান আর্মির চিফ অফ স্টাফ জয়ন্তনাথ চৌধুরী ঘোষনা দিলেন যে তিনি পরের দিন সকালের চা লাহোরে খাবেন
.
বেদিয়ান সেক্টরের দায়িত্ব ছিল ১১ তম ডিভিশনের ডিভিশন কমান্ডার মেজর জেনারেল হামিদের উপর। তিনি বিআরবি ক্যানেল এলাকায় ভারতীয় বাহিনীকে প্রতিরোধের জন্য ব্যবস্থা রাখলেও। কিন্তু এই সেক্টরটা দূর্বল হয়ে পড়ে কারন ২১ বিগ্রেড ও একটি বেলুচ রেজিমেন্ট শ্রীনগরের দিকে অগ্রসর হয়েছিল ঠিক যুদ্ধের আগের দিন, ৫ ই সেপ্টেম্বর


৬ই সেপ্টেম্বর রাত ৩.৪৫ এ ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টারে খবর আসল যে কিছু রেঞ্জারস পোস্টের কাছে ইন্ডিয়ান মুভমেন্ট লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা পরিষ্কার ছিল যে রেঞ্জারস পজিশনগুলো আর নিরাপদ নয়।
.
দ্রুতই আর্টলারী ক্যাপ্টেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এ খবর পাঠালেন শত শত ইন্ডিয়ান ট্যাংক ও এক ব্রিগেড ভারতীয় বাহিনী ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ওপর হামলা করার জন্য অগ্রসর হচ্ছে। রেজিমেন্টের প্রধান লে.কর্নেল ATK হক দ্রুত সব অফিসার কে ডাকলেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা অ্যান্টি ট্যাংক ওয়েপন,মর্টার,মেশিন গান ইত্যাদি অস্ত্র নিয়ে শেলপ্রুফ বাঙ্কার এ অবস্থান নেয়। ইন্ডিয়ান বিশাল সৈন্যদল ও সাজোয়া বহরের সামনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর এ শক্তি অতি নগন্য।


সকাল ৯ টার দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২৫ ক্যাভিলারি, ৫ গার্ড রেজিমেন্ট ও ৯ জন্মু ও কাশ্মীর রেজিমেন্টের সেনারা ১ম ইস্ট বেঙ্গলের আলফা কোম্পানির ওপর আক্রমন করলে ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান ( পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লে.জেনারেল ) এর নেতৃত্বে আলফা কোম্পানী ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আলফা কোম্পানীর সামান্য শক্তির সাথে পেরে উঠে না ভারতীয় সেনারা। আর্টিলারীর একদম পুরোপুরি কার্যকর ও সঠিক ব্যবহার এর ফলে ইন্ডিয়ান আর্মির অবস্থা নাজেহাল হয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষনের মধ্যেই ভারতের কয়েকশত সেনা আর ১৯ টি ট্যাংক ধ্বংস হয়ে যায়। উল্লেখ্য যে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আলফা কোম্পানী সর্বাধিক সংখ্যক মেডেল পেয়েছিলো।


তীব্র প্রতিরোধের মুখে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে পিছু হটলো ভারতীয় বাহিনী। তারা হতবাক হয়ে গেলো কিভাবে ইস্ট পাকিস্তানের এ বাঙ্গালী সেনারা এ প্রতিরোধ গড়ে তুলছে যাদের এতদিন নিরীহ ও ভীতু মনে করা হতো। যাইহোক,প্রায় ঘন্টাখানিক পর ভারতীয় বাহিনী পুনরায় আক্রমন চালায়। এবার আর্টিলারী,পদাতিক সব দল একসাথে এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পুরো ১ন ব্যাটালিয়ন ( যাদের ডাকনাম সিনিওর টাইগার্স ) টির ওপর আক্রমন চালায়। ভয়াবহ এক মরনপণ যুদ্ধ শুরু হয়। ভারতের পদাতিক বাহিনী এগিয়ে এসে বাঙ্কারের দখল নেওয়ার চেস্টা করতে থাকায় বাঙ্কারে লাইট ও হেভী মেশিন গান নিয়ে মূহূর্মুহু গুলির মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা। একপর্যায়ে ভারতীয় সেনারা খুব কাছাকাছি এসে পড়লে দুপক্ষের সেনাদের মধ্যে হাতাহাতি লেগে গেলো। তাতেও ইস্ট বেঙ্গলের সৈন্যরা তাদের যোগ্যতা প্রমান করে। এমনকি,হাতাহাতির এক পর্যায়ে আলফা কোম্পানীর সৈন্যরা ভারতের একটি পিটি-৭৬ লাইট ব্যাটল ট্যাংক দখল করে নেয়,যা এখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর টাইগার্স মিউজিয়াম এ সংরক্ষিত রয়েছে।

এই সেই পিটি-৭৬ ট্যাংক যা ছিনিয়ে নেয় ইবিআর

যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গলের সৈন্যরা কিভাবে স্বল্প শক্তি নিয়ে ভারতীয় বাহিনীর অবস্থা নাজেহাল করে দিচ্ছিলো তার জন্য হাবিলদার তাজুল ইসলাম এর উদাহরন দেওয়া যেতে পারে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার তাজুল ইসলাম যুদ্ধ চলাকালীন হঠাৎ দেখতে পান যে ভারতীয় একটি ট্যাংক খুবই নিকটে চলে এসেছে,এটিকে আটকানো আর কোনভাবেই সম্ভব না। তিনি একটি অ্যান্টি ট্যাংক মাইন বুকে বাধলেন ও ট্যাংকের নিচে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জন্য হুমকি হয়ে উঠা ট্যাংকটি এভাবে ধ্বংস হয়ে যায় হাবিলদার তাজুল ইসলামের আত্মত্যাগের ফলে।

যুদ্ধে অংশগ্রহন করা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসাররা

এভাবেই চলতে থাকে তুমুল যুদ্ধ,ধীরে ধীরে পিছু হটে ভারতীয় বাহিনী। কিছু সূত্র অনুযায়ী এ যুদ্ধে ৩০০ ও কিছু সুত্রানুযায়ী ৬০০ টির মতো ভারতীয় ট্যাংক ধ্বংস হয়। ভারতীয় বাহিনীর আক্রমন যে শুধু প্রতিহত করা হয় তাই নয়,বরং পাক-ভারত যুদ্ধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ভারতের খেমকারান অঞ্চল দখল করে নেয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা। যুদ্ধ শেষের পর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কে খেমকারান সেক্টর হতে সরিয়ে আনা হয় ও পাকিস্তানের পাঞ্জাব রেজিমেন্ট কে সে স্থলাভিষিক্ত করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাই কমান্ড। পাঞ্জাব রেজিমেন্ট খেমকারানে ভারতীয় বাহিনীর আক্রমনে পরাজিত হয় ও খেমকারান পাকিস্তানের হাতছাড়া হয়ে যায়।

খেমকারানে পাকিস্তানী সেনারা ইবিআর এর কল্যানে

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর এই বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের ফলে পতনের দ্বারপ্রান্ত থেকে লাহোর শহরটি রক্ষা পায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বীরত্বের জন্য যত পদক রয়েছে তার প্রায় সবকয়টিই জিতে নেয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনারা। বাঙ্গালী যুদ্ধ পারে না,ভীতু কাপুরুষ এ মনোভাব চিরকালের জন্য বিসর্জন দিতে হয় পাকিস্তানীদের। কিন্তু পাকিস্তানী বেঈমানগুলি সেই অবদান ভুলে গিয়ে ১৯৭১ এ সেই ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট এর বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলার জনগনের ওপর ঝাপিয়ে ও ঘৃণ্য গণহত্যা চালায়। আরো একবার বাঙালীর বীরত্বের প্রমান পায় তারা ১৯৭১ এ। সে ইতিহাস কমবেশি আমাদের সবাইর ই জানা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বর্তমান ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: