ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন মানচিত্র

১৯৪৭ সালে ভারত ব্রিটিশ শাসন হতে মুক্ত হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তাদের অন্তর্গত সবকয়টি রাজ্য কিন্তু তাদের সাথে যোগ দিতে ইচ্ছুক ছিল না। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল হায়দ্রাবাদ। বর্তমানে হায়দ্রাবাদ নামের কোন রাস্ট্র না থাকলেও সেসময় এটি ছিল ভারত উপমহাদেশের অন্যতম একটি উন্নত ও ধনী অঞ্চল। ব্রিটিশরা যখন ভারত থেকে চলে যায় তখন হায়াদ্রাবাদের নিজস্ব টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, বিমান সংস্থা, রেলপথ, ডাকযোগাযোগ ব্যবস্থা, রেডিও স্টেশন, নিজস্ব মুদ্রা এমনকি সেনাবাহিনী পর্যন্ত ছিল। ভারত উপমহাদেশ ব্রিটিশদের অধীনে থাকার সময় স্বভাবতই এই অঞ্চল ব্রিটিশদের অধীনে ছিল কিন্তু ভারতের অন্যান্য অঞ্চলথেকে ব্যাতিক্রম হায়দ্রাবাদ নিজস্ব নিজাম দ্বারা শাসিত হতো। ভারত উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় তৎকালীন নিজাম ছিলেন ওসমান আলী খান সিদ্দীকি সপ্তম আসাফ ঝাহ্ এবং তার পরিবার সেই সম্রাট আবু আল-ফাতেহ্ নাসির উদদীন মুহাম্মদ শাহ্ এর সময় থেকে হায়দ্রাবাদের নিজামের দ্বায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। মুঘলদের আনুগত্যে থাকলেও বাংলার নবাবের মতো সেসময়ের নিজামরাও স্বাধীন ছিল এবং ব্রিটিশদের কাছে দিল্লির পতনের পর তৎকালীন নিজাম স্বভাবতই ব্রিটিশদের আধিপত্য স্বীকার করে নেন।
.
ব্রিটিশরা যখন ভারত উপমহাদেশকে দুটি ভাগ করে এখান থেকে চলে যায় তখন তিনি দুটির একটি রাষ্ট্রেও যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ব্রিটিশদের অনুরোধ করেন যেন হায়দ্রাবাদকে একটি স্বাধীন মুসলিম কমনওয়েলথ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লুইস ফ্রান্সিস অ্যালবার্ট ভিক্টর নিকোলাস মাউন্টব্যাটেন তার অনুরোধ নাকচ করে তাকে যেকোন একটি দেশের সাথে, বিশেষত পাকিস্তানের সাথে যোগ দেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু নিজাম ভালোই জানতেন পাকিস্তান ইসলামের দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হলেও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মনে অন্য কিছু আছে ফলে বাংলাদেশ যে ভূলটি করেছিল তা তিনি করতে চাননি। আবার মুসলিম হয়ে হিন্দু ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ভারতেও যোগ দেয়া পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না। ফলে ব্রিটিশরা হায়দ্রাবাদকে স্বাধীন রাষ্ট্র না ঘোষণা করলেও তিনি নিজস্ব সেনাবাহিনী গঠন করে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে থাকেন।

হায়দ্রাবাদের পতাকা

 

কিন্তু তৎকালীন ভারতের সরকার স্বভাবতই এটি ভালো চোখে দেখেনি। এর দুটি কারণ ছিল যার প্রথমটি ছিল যে, অন্য কোন রাজ্য যদি হায়দ্রাবাদের দেখাদেখি স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসে তাহলে তাদের অখন্ড ভারতেও স্বপ্ন (যা আজও স্বপ্নই রয়ে গেছে) কখন বাস্তবায়িত তো হবেই না এমনকি ভারত নামের কোন দেশই হয়তো থাকবে না। আর দ্বিতীয়টি ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশের একেবারে কেন্দ্রে একটি মুসলিম দেশের অস্তিত্ব কখনই ঐদেশ মেনে নিতে পারে না। তৎকালীন ভারতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বাধীন জোট হায়দ্রাবাদকে কখনই স্বাধীন হতে দেয়া যাবে না এই বিষয়ে একমত হলেও সেটি কি উপায়ে বাস্তবায়ন করা হবে তা নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত ছিল। প্রধানমন্ত্রী জাওহারলাল নেহরুর ইচ্ছা ছিল শান্তিপূর্ণ ভাবে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই জাবেরভাই প্যাটেল ছিলেন চরমপন্থী এবং তার ইচ্ছা ছিল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে হায়দ্রাবাদ দখল করা।
.
জওহরলাল নেহেরু যেহেতু প্রধানমন্ত্রী ছিল তাই তার মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নিজামের সাথে একটি ‘স্ট্যান্ড স্টিল‘ চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি মোতাবেক হায়দ্রাবাদ এক বছরের মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে কোন মিলিটারি অ্যাকশন নিবে না ও সেনাবাহিনী বৃদ্ধি করবে না এবং পাকিস্তানের সাথেও যুক্ত হবে না। নেহেরুর কথা মেনে নিলেও প্যাটেলও কিন্তু ছেড়ে দেয়ার পাত্র ছিল না এবং প্যাটেলের সমর্থকের সংখ্যাও কম ছিল না। তারা তাদের মনবাসনা পূর্ণ করার জন্য হায়দ্রাবাদের বিরূদ্ধে অভিযোগ আনে হায়দ্রাবাদ তাদের প্যারামিলিটারির পরিমাণ বৃদ্ধি করছে এবং সেনাবাহিনীর বদলে প্যারামিলিটারিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করছে। এছাড়াও সমাজতন্ত্রের অনুসারীদের সাথে মুসলিমদের হওয়া দাঙ্গাকে তারা হিন্দু মুসলিক দাঙ্গা হিসেবে চালিয়ে দেয় যেখানে তারা বলে মুসলিমরা হিন্দুদের নির্যাতন করছে যা হিন্দুপ্রধান ভারতে বারুদে আগুন দেয়ার মতো কাজ করে। এই ঘটনার পরে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু তার মনোভাব থেকে সরে এসে হায়াদ্রাবাদে সামরিক আগ্রাসন চালানোর নির্দেশ দেয়। ‘স্ট্যান্ড স্টিল’ চুক্তির ফলে হায়াদ্রাবাদ তাদের মিলিটারিকে সেরকম ভাবে উন্নত করেনি বা করতে পারেনি ফলে সেসময় তাদের মাত্র ২৪ হাজার নিয়মিত সৈনিক ছিল যাদের মধ্যে মাত্র ৬০০০ ছিল সশস্ত্র এবং এই অস্ত্রের বেশ বড় একটি অংশ ছিল মাজল লোডার রাইফেল। এই ছোট্ট বাহিনীকে ভারতীয় সেনাবাহিনী মেজর জেনারেল জয়ন্ত নাথ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রায় ৩৫ হাজার সু-প্রশিক্ষিত সেনা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ট্যাংক, আর্টিলারি ও এয়ার সাপোর্টের আন্ডারে ১৩ ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ সালে আক্রমন করে ও এর ফলাফল কি হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়।নিজামের বাহিনী মাত্র ৫ দিনে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কাছে হেরে যায়। কিন্তু এই পাঁচদিনে ও এরপরে কি হয়েছিল তা প্রায় ৬৫ বছর সাধারণ জনগণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

আগেই বলেছি নিজাম ছিলেন একজন মুসলমান এবং হায়দ্রাবাদের হওয়ার কথা ছিল একটি মুসলিম রাষ্ট্র। তাই স্বভাবতই সেখানকার সামরিক বাহিনীতে মুসলিমিদের সংখ্যাই বেশি ছিল। কিন্তু হায়দ্রাবাদ হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল বলে সেনাবাহিনীতে হিন্দুদের সংখ্যাও কম ছিল না। সেনাবাহিনীতে মাত্র ৫৫ শতাংশ মুসলিম ছিল আর বাকি অংশ ছিল হিন্দু বা কিছু খৃষ্টান। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পরাজিত হওয়ার পরে সেনাবাহিনী মুসলিমদের নিরস্ত্র করলেও প্রায় সময়ই হিন্দুদের নিরস্ত্র করা হতো না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এই আক্রমণ করা হয়েছিল মূলত হিন্দুদের উপর অত্যাচারের কথা বলে আর ভারতীয় সেনাবাহিনী এখানে এই বিষয়টিকেই কাজে লাগিয়ে মুসলমান নিধনে নামে। তারা এসব ঘটনা বলে সশস্ত্র হিন্দুদের তাদের বদলা নিতে উৎসাহিত করে। আর বদলা নেয়ার অন্যতম মাধ্যম ছিল তাদের হত্যাকরে সম্পদ লুটপাট আর ধর্ষণ। আর এই কর্মকান্ডে মাঝে মাঝে সৈন্যরাও সরাসরি অংশগ্রহন করত। সৈন্যরা প্রথমে এলাকার সকল পুরুষদের একত্রে গ্রেফতার করে একজায়গায় এনে হত্যা করত তারপর তাদের বাড়িতে গিয়ে মহিলাদের গণ ধর্ষণ করত এবং তাদেরও হত্যা করা হতো।

হায়দ্রাবাদ রাস্ট্রের মানচিত্র

আপনাদের কারও ধারণা আছে পাঁচদিনের যুদ্ধে এভাবে কত মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে? পাঁচ হাজার? দশ হাজার? সেসময়ের অফিশিয়াল রিপোর্ট অনুযায়ী চল্লিশ হাজার আর আনঅফিশিয়াল রিপোর্ট অনুযায়ী কমপক্ষে ২ লাখ। আমাদের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ আর তাদের পাঁচদিনের যুদ্ধে ২ লাখ, সংখ্যাটি শুধু কল্পনা করে দেখুন। এইসব মৃতের মধ্যে প্রায় সবাই ছিল মুসলিম যার ফলে নেহেরু সিদ্ধান্ত নেন এই খবর জনসম্মুখে প্রকাশ না করার। কারণ সেসময় এমনিতেই হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক ভালো ছিল না আর এই খবর প্রকাশিত হলে তাদের মধ্যে দাঙ্গা নিশ্চিত ছিল যা খুব সহজেই গৃহযুদ্ধে পরিণত হতো। এছাড়াও যুদ্ধের সময় হায়দ্রাবাদ সেনাবাহিনীর প্রায় সব অফিসারকে বন্দী করা হয়েছিল। এই গণহত্যার ফলে নেহেরু তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিতে চাইলে প্যাটেল ( যিনি ছিলেন ব্যাপকভাবে উগ্র ও রক্তপিপাসু ) তিনি সব হিন্দু অফিসারদের মুক্ত করে দিয়ে মুসলমান অফিসারদের বিচারের জন্য ট্রাইবুনাল তৈরী করে। কিন্তু ১৯৫০ সালে তার মৃত্যুর পর নেহেরুর আগ্রহ না থাকায় তাদের অবশ্য ছেড়ে দেয়া হয়েছিল
.
এই সকল ঘটনার বেশিরভাগই প্রায় ৬৫ বছর ধরে গোপন রাখা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৩ সালে এক ব্রিটিশ সাংবাদিকের হাতে তৎকালীর তদন্ত কমিটির রিপোর্টের একটি কপি পড়লে তা বিবিসিতে প্রচার করা হয় এবং তার পরেই বিশ্ববাসী ভারতের হায়দ্রাবাদ এর এই গণহত্যা সম্পর্কে জানতে পারে…..

Facebook Comments

5 Comments

Al Jaim Pappu · December 6, 2017 at 2:59 pm

ভারত টুকরোটুকরো হয়ে ইতিহাসের নির্মম প্রতিশোধ নিবে। সেই অপেক্ষায় আছি

palash · December 6, 2017 at 4:00 pm

হায়রে মানুষ
মাটি দিয়ে কি হবে

Istaik · January 22, 2018 at 2:20 pm

Bangladesh ar oo thik same obsta hoytoo jodi pakistan ar sate add na hoito

    Al Jaim Pappu · January 23, 2018 at 2:36 pm

    লুল

fahim · February 13, 2018 at 6:11 pm

কতোবড়ো বজ্জাত এই ভারতীয় হিন্দুরা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: