এই উপমহাদেশের মাফিয়া কালচারের জনক বলে খ্যাত হলো মুম্বাই এর সুলতান মির্জা ওরফে হাজি মাস্তান। হাজি মাস্তান ই প্রথম সেলিব্রেটি গ্যাংস্টার ও নিজ বাহিনী গড়ে তোলে আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া বাহিনী শুরু করেন। দুর্ধর্ষ এই গ্যাংস্টার একদিকে যেমন পুলিশের খাতায় সন্ত্রাসী,অন্যদিকে কারো কাছে ছিল মসিহা। চলুন জেনে নেওয়া যাক হাজি মাস্তান সম্পর্কে।

১৯২৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ( বর্তমান তামিলনাড়ু ) তে জন্মগ্রহন করেন এই ব্যাক্তি। বাবা হায়দার মির্জা ছিলেন দরিদ্র কৃষক। সাধারনত গরীব ঘরের মানুষ বাচ্চাদের নাম রাজা-বাদশাহ-সুলতান রাখে,তাদের ধারনা বড় হয়ে ছেলে তেমন হবে এরকম ইচ্ছায়। সে ছেলেটির নাম তাই রাখা হয় সুলতান মির্জা। এ ছেলে প্রকৃতপক্ষেই হয়ে উঠেছিলো ভারতের তৎকালীন বোম্বে বা বর্তমান মুম্বাই শহরের একচ্ছত্র সুলতান। বাবার সাথে জীবিকার খোজে মুম্বাই আসেন ১৯৩৪ সালে। ছোটবেলা থেকেই ব্যাপক ডানপিটে আর গুন্ডা টাইপের ছেলে ছিলো সে। কারো না কারো সাথে মারামারি লেগেই থাকত । তবে বুদ্ধি ছিলো মারাত্নক। ছোটবেলা থেকেই বন্দরে কাজ করতে করতে স্মাগলিং এ ঝুকে পড়ে সে। ১৯৫৬ সালে অপরাধ জগতে বড়ভাবে আবির্ভাব ঘটে সুলতান মির্জার।

গুজরাটের এক স্মাগলারের সাথে পরিচয়ের পর বোম্বে সমুদ্রবন্দরে মাল আনলোড এর নামে স্মাগলিং এর কাজে জড়িয়ে পড়ে সুলতান মির্জা। কিন্তু পুলিশের কাছে ধরা খেয়ে ৯ মাস জেল খাটতে হয় তার। এরপর তার সাম্রাজ্য বৃদ্ধির গতি বাড়তেই থাকে। পুলিশের থেকে ছাড়া পেয়ে আগেই গঠন করে নেন নিজের সুরক্ষায় তার নিজের গ্যাং “মাস্তান বাহিনী”। এই উপমহাদেশে এমনকি ঢাকাতেও মাস্তান কথাটা যে বহুল ব্যবহৃত তাতে এই বাহিনীর ব্যাপক অবদান রয়েছে। কথিত আছে যে,এই সময়কালে খুব ছোট বয়সেই হজ্বে যান ফলেই তার নাম ফুটে “হাজি মাস্তান”। ধীরে ধীরে তার প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে,সমুদ্রে স্মাগলিং এর নিয়ন্ত্রক এক কথায় পুরো মুম্বাই বন্দর ও আরব সাগরের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেন সুলতান মির্জা ওরফে হাজি মাস্তান। তবে,হাজি মাস্তান অতটা ভায়োলেন্ট ছিলেন না বর্তমান গ্যাংস্টার দের মতো। হ্যা তার সাম্রাজ্যে কেউ কথা না শুনলে তাকে দুনিয়া থেকে উঠে যেতে হতো বটে কিন্তু মুম্বাই এ বিরাজমান গ্যাং গুলোর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয়নি তাকে। দয়ালু মানুষ হিসেবে বেশ খ্যাতি ছিলো হাজি মাস্তানের,ব্যাপক দান খয়রাত করতেন বিধায় বোম্বে শহরে তার জনপ্রিয়তা ছিলো তুঙ্গে। মুম্বাই এ গ্যাংস্টার দের সাথে শত্রুতার বদলে বন্ধুত্বের মাধ্যমে নিজের সাম্রাজ্য বাড়ায় তেমন কোন রক্ত না ঝড়িয়েই। বরং,যখন বাকিরা একে অপরের সাথে লড়ত তখন হাজি মাস্তান সমঝোতা করে দিতো। এভাবেই একবার হাজি মাস্তান এলাকা দখল নিয়ে খুন খারাবা রুখতে পুরো বোম্বে শহরকে ৫ জন ডনের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে নিজে পুরো সমুদ্র নিয়ে নেন। অবশ্য বলতে গেলে পুরো বোম্বেই ততদিনে তার হয়ে গেছে। এক পর্যায়ে এসব থেকে আস্তে আস্তে সরে যেতে থাকেন হাজি মাস্তান। তিনি এক্টিভলি আর লিড দিতেন না,সাম্রাজ্য এর দায়িত্ব তখন হাজি মাস্তানের দুই হাত,করিম লালা ও বর্ধরঞ্জন এর হাতে। করিম লালার আন্ডারে কাজ করতে গিয়ে অপরাধ জগতে আবির্ভাব ঘটে আরেক ডন দাউদ ইব্রাহীমের,হাজি মাস্তানের একান্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে সে। দাউদ ইব্রাহীমের উত্থানের পিছনে হাজি মাস্তানের অবদান ই সবচেয়ে বেশি বলে ধারনা করা হয়। তবে এক পর্যায়ে দাউদ ইব্রাহীম হাজি মাস্তানের মাস্তান বাহিনী ছেড়ে চলে যায়। সে আলাপ দাউদ ইব্রাহিম কে নিয়ে লেখা পর্বে আলোচনা করবো।

হাজি মাস্তান

বোম্বের মসিহা হয়ে উঠা এই সুলতান মির্জার চালচলন ও ছিলো সুলতান দের মতোই। সবসময় আগাগোড়া সাদা কাপড় আর মাথায় জিন্নাহ টুপি থাকতই তার। যদিও জিন্নাহর মতাদর্শ এর ধারেকাছেও ছিলো না সে। গাড়ি,বাড়ি থেকে শুরু করে সিগারেট এও আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলার সর্বোচ্চ চেস্টা থাকত। বলিউড ( মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি) তে নজর পড়ে হাজি মাস্তানের। অনেক বড় ফিল্ম স্টার দের সাথে নিয়মিত উঠাবসা চলে তার,এমনকি বিয়েও করেন এক বলিউড সুপারস্টার সোনাপদ্মিনি কে। তবে ধীরে ধীরে তার নিজের অনিহার কারনেই মুম্বাই এর অপরাধ জগত হতে সরে দাড়াতে থাকে সে। তবে হাজি মাস্তান তখনো একটি ব্রান্ড নেইম, মুম্বাই এর অনেক বড় বড় গ্যাং ওয়ার ( দাউদ ইব্রাহিম,জুবেইর,পাঠান দের ) থেমে গিয়েছিল হাজি মাস্তানের মধ্যস্থতায়। কারন সবার কাছেই হাজি মাস্তানের অন্যরকম গ্রহনযোগ্যতা ছিলো। হাজি মাস্তান ই ছিলো এই পুরো উপমহাদেশের প্রথম সেলিব্রেটি গ্যাংস্টার।


সত্তরের দশকের শেষ দিকে ভারতে জরুরি অবস্থা জারি হলে আবারো জেলে যেতে হয় তাকে। সেবার জেলে গিয়ে তার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। ইন্দিরা গান্ধীর বিরোধী নেতা জয়প্রকাশের আদর্শে অনুপ্রানিত হন ও জেল থেকে বের হয়ে গড়ে তুলেন নিজের রাজনৈতিক দল “দলিত মুসলিম সুরক্ষা সংস্থা”। নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ব্যাপক সফলতা পান হাজি মাস্তান,কারন বোম্বেতে তখনো হাজি মাস্তানের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা আর হাজি মাস্তানের অর্থসম্পদ ও কম ছিলো না। আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে এভাবেই নিজেকে গুটিয়ে নেন হাজি মাস্তান। ফলে ক্ষমতা ধীরে ধীরে চলে যায় কাসকার ভাই ( শাবির ও দাউদ ) এর মতো ভায়োলেন্ট গ্যাংস্টার দের হাতে। বোম্বেতে মাফিয়া জগতে হাজি মাস্তানের পরেই শুরু হয় রক্তারক্তির খেল। হাজি মাস্তান বাকি জীবন কাটান তার রাজনৈতিক দল নিয়েই।

হাজি মাস্তানের ওপর নির্মিত সিনেমা

তার লাইফ যে সিনেমার চেয়ে কোন অংশে কম নয় তা তো বলাই যায়। বরং সিনেমা হয়েছে তার জীবনের ওপর ভিত্তি করে। এখন অব্ধি ভারতে মোট দুটি সিনেমা হয়েছে হাজি মাস্তানের জীবনের ওপর,সেগুলো হলো “Dewaar” ও “Once Upon A Time In Mumbai”. ১৯৯৪ সালে প্রায় ৬৮ বছর বয়সে মারা যান বোম্বের এই সুলতান। তবে বোম্বেকে মাফিয়ার যে ধারা শুরু করে যান,তার পরিনতি আজও পুরো উপমহাদেশ ভুগছে।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: