ডিফেন্স সাইটগুলোতে যারা নতুন আসেন তারা ফাইটার নিয়ে পোস্টগুলোতে স্টেলথ দিয়ে ঠিক কি বুঝাচ্ছে তা বুঝতে পারেন না। আবার অনেকে যারা আছেন তারাও একপ্রকার ভ্রান্ত ধারনাই পোষন করেন স্টেলথ প্রযুক্তি সম্পর্কে। যাইহোক,সহজ ভাবে যাতে স্টেলথ প্রযুক্তি কি বুঝতে পারেন তাদের জন্য এ পোস্ট।
.
আমাদের অধিকাংশই স্টেলথ প্রযুক্তি বলতে এমন এক প্রযুক্তিকে বুঝে থাকি যার দ্বারা রাডারে এয়ারক্রাফট,জাহাজ এইসব ধরা পড়ে না বা অদৃশ্য থাকে। আসলে ব্যাপার টা এমন না। স্টেলথ হোক আর যাই হোক রাডারে ঠিকই ধরা পড়বে। স্টেলথ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিমান বা জাহাজ মোটেও অদৃশ্য হয়ে যায় না।
.
ব্যাপার টা একটা উদাহরনের মাধ্যমে বুঝিয়ে বলি। ধরুন,আপনার মাথার ওপর ১০ ফুট উচ্চতায় একটা পাখি ও একটি মাছি উড়ছে। আপনি পাখিটাকে সহজেই দেখতে পাবেন ও এর গতিবিধি ও নির্নয় করতে পারবেন। কিন্তু মাছিটির পারবেন না যদিও সেটিও একই উচ্চতায়। এর কারন হলো আপনার চোখে আপনি পাখিটিকে যত স্পষ্ট ও বড় দেখছেন যাতে আপনার সুবিধা হচ্ছে কিন্তু মাছিটার ক্ষেত্রে তা পারছেন না। এক্ষেত্রে আপনি কানে শব্দ শুনে সে মাছিটিকে ফলো করবেন কিন্তু ততক্ষনে মাছিটি চলে যাবে। এই ব্যাপার টাই ঘটে স্টেলথ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। রাডারে বিমান ও জাহাজ ধরা পড়ে ঠিকই কিন্তু ছোটভাবে ধরা পড়ে যাতে রাডার কনফিউজড হয়ে যায় এটাই কি সেই কাঙখিত বিমান নাকি অন্য সাধারন বিমান। যতক্ষনে ধরা পড়বে ততক্ষনে মিশন শেষ। এটাই স্টেলথ প্রযুক্তি।

স্টেলথ প্রযুক্তি বুঝার আগে আপনাকে আরসিএস বা রাডার ক্রস সেকশন বুঝতে হবে। রাডার ক্রস সেকশন মানে হলো একটা বস্তুকে রাডার স্ক্রিনে ঠিক কতটা বড় দেখায়। আকার ভেদে রাডার ক্রস সেকশনের ও পরিবর্তন ঘটে। স্টেলথ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই রাডার ক্রস সেকশন কে কমিয়ে ফেলা হয় যাতে রাডার স্ক্রিনে এটি অত্যন্ত ছোটভাবে ধরা পড়ে। আরো একটা বিষয় জানা দরকার তাহলো রাডারে কিভাবে বিমান বা অন্যান্য বস্তু ধরা পড়ে। রাডার সর্বদাই কিছু তাড়িৎচৌম্বিক তরঙ্গ প্রেরন করে যা বিমানের গায়ে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। আর এই প্রতিফলিত হওয়া তরঙ্গটি হতে রাডার তথ্য পায় বস্তুটি কোথায় আছে,আকার কতটুকু এইসব। ব্যাপার টা অনেক টা বাদূরের পথচলার মতো।

তো,স্টেলথ প্রযুক্তি কিভাবে কাজ করে ?

স্টেলথ প্রযুক্তি কাজ করে দুই ভাবে,হয় রাডার হতে আসা তরঙ্গটির দিক পরিবর্তন করে দিতে হবে যাতে প্রতিফলিত না হয় অথবা রাডার হতে আসা তরঙ্গটিকে শুষে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে প্রতিফলিত না হয়।

তরঙ্গটিকে শুষে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্টেলথ বিমানে বিশেষ ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়ে থাকে বিমানটির উপরে বা পেইন্টিং সিস্টেম অনেকটা। ঠিক কি ধরনের ম্যাটেরিয়াল তা গোপন রাখা হয়েছে। এগুলোকে RAM ( Radar Absorbent Material) বলে। উপরের স্তরে অনেকগুলি অতিক্ষুদ্রাকার ভাজ থাকে যার ফলে রাডার হতে আসা তরঙ্গ বারবার ধাক্কা খাওয়ার মাধ্যমে শক্তি হারিয়ে ক্ষুদ্রভাবে প্রতিফলিত হয়। ফলে বিমানটি রাডারে ছোট হিসাবে ধরা পড়ে। এক্ষেত্রে এই তরঙ্গগুলোকে তাপশক্তিতে রূপান্তর করা হয়।

এছাড়াও,স্টেলথ বিমানের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়ে থাকে যাতে রাডার থেকে তরঙ্গ আসলে তা ধাক্কা খেয়ে প্রতিফলিত না হয়ে বরং একদিকে প্রতিসরিত হয়ে যায়। এতে খুব অল্প পরিমান তরঙ্গ প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ পায় আর রাডার স্ক্রিনে বিমানটি ছোট হয়ে ধরা পড়ে।

স্টেলথ জাহাজের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে। একটি সাধারন জাহাজ যেই দূরুত্বে ধরা পড়বে একটি স্টেলথ জাহাজ ও একই দূরত্বে ধরা পড়বে। শুধু পার্থক্য টা হলো রাডার ক্রস সেকশন কমিয়ে ফেলার ফলে একটি ৫০০০ টনের স্টেলথ জাহাজ ও ক্ষেত্রবিশেষে ১০০০ টনের ক্ষুদ্র জাহাজ হিসেবে রাডার স্ক্রিনে ধরা পড়ে। ফলে রাডার এত হাজার হাজার জাহাজের মধ্যে এটিকেও কোন অন্য ছোট জাহাজ হিসেবে ভূল করে। এটিই স্টেলথ প্রযুক্তির কারিশমা।

Zulwalt Stealth Destroyer of US Navy

তবে স্টেলথ প্রযুক্তির ঝুকির দিক ও কিন্ত কম না। ধারনা করা হয় আধুনিক এল-ব্যান্ড রাডার গুলো ঠিকই স্টেলথ বিমান ধরতে পারবে।আবার,অস্ত্রশস্ত্রের জন্য বিমানে যখন ওয়েপন ডোর খোলা হয় তখন রাডার ক্রস সেকশন অনেক বেড়ে যাবে ফলে বিমানটি ধরা পড়ে যাবে। তাছাড়া স্টেলথ প্রযুক্তি অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

আশা করি স্টেলথ প্রযুক্তির ফুল কনসেপ্ট আপনাদের কাছে পরিস্কার হয়েছে।

Facebook Comments

2 Comments

৬ষ্ঠ প্রজন্মের ফাইটার জেট কেমন হবে? – Bangladesh Defence Forum · February 1, 2018 at 10:10 am

[…] ইত্যাদি। যেমন ৪র্থ প্রজন্মের ফাইটার স্টেলথ না,৪.৫ প্রজন্মের ফাইটার সেমি স্টেলথ […]

কিয়ান সিত্তাহ ক্লাস ফ্রিগেট – মায়ানমার নৌবাহিনী – Bangladesh Defence Forum · February 7, 2018 at 2:23 pm

[…] আছে তাদের। তাদের ভাষ্যমতে এটি একটি স্টেলথ […]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: