মিশরের স্কুবা ডাইভিং ইন্সট্রাক্টর Ahmed Gabr কোনোপ্রকার প্রেসার নিউট্রিলাইজার স্যুট ছাড়া ১০৯০ ফিট পানির নিচে গিয়েছিলেন।এজন্য তার সময় লেগেছিল ১২মিনিট।তবে তিনি উপরে উঠে আসতে “ডিকমপ্রেশন স্টপ” হিসেবে ১৪ঘন্টা সময় ব্যয় করেছিলেন।এজন্য সব মিলিয়ে ৯টি অক্সিজেন সিলিন্ডার তিনি ব্যবহার করেছিলেন।বর্তমানে এটাই কোনো প্রকার প্রেশার নিউট্রিলাইজার স্যুট ছাড়া সর্বোচ্চ গভীরে ডাইভ দেয়ার রেকর্ড।এর আগের রেকর্ডটি ১০৪৪ ফিটের।

সনদপত্র সহ আহমেদ গাবের

স্কুবা ডাইভিং পানির নিচে ডাইভ করাকে বোঝানো হয় যেখানে স্কুবা ডাইভার Self-contained underwater breathing apparatus (scuba) ব্যবহার করেন শ্বাস নেওয়ার জন্য। ডাইভিং এর অন্য পদ্ধতিগুলো হল শ্বাস বন্ধ করে রাখা, নলের সাহায্যে স্থলভাগ থেকে অক্সিজেন নেওয়া। কিন্তু স্কুবা ডাইভিং ভিন্ন। এখানে ডাইভার নিজের সঙ্গে শ্বাস নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস এবং বিশুদ্ধ বাতাস রাখে। ফলে সে ইচ্ছা মত সাগরের নিচে ভেসে বেড়াতে পারে। এই স্বাধীনতার জন্যই স্কুবা জনপ্রিয়।

স্কুবা ডাইভিং সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়

উল্লেখ্য কোনোপ্রকার গিয়ার ছাড়া শুধু অক্সিজেন ট্যাংক নিয়ে বা ছাড়াই একবারে ২০ফিট এবং সর্বোচ্চ ১৩০ ফিট পানির নিচে যাওয়া যায়। সাধারণত ২০ফিট পর পর “ডিকমপ্রেশন স্টপ” দিতে হয়।এটা ব্যক্তির সামর্থের উপর নির্ভর করে কম-বেশি হয়।নরমাল ডাইভিং স্যুট নিয়ে ২০০-২৫০ ফিট পর্যন্ত যাওয়া যায়।এর বেশি নিচে নরমাল ডাইভিং গিয়ার নিয়ে গেলে নাইট্রোজেন নারকোসিস,অক্সিজেন টক্সিসিটি হয়।তবে এটমসফিরিক ডাইভিং স্যুট নিয়ে সর্বোচ্চ ২০০০ফিট পর্যন্ত নিচে যাওয়া যায়।এর বেশি নিচে যেতে হলে আপনাকে ডিপ আন্ডারওয়াটার ডাইভিং বেল বা ছোট সাইজের হাই প্রেশার নিতে সক্ষম সাবমেরিনের সহায়তা নিতে হবে।

ডিপ আন্ডারওয়াটার ডাইভিং স্যুট

এই সাবমার্সিবলটি পানির ১১ কিঃমিঃ গভীরে যেতে সক্ষম!

এখন আপনাদের মনে কথাটা আমি পড়তে পারছি এবং সেটা হলো “ডিকমপ্রেশন স্টপ” কি জিনিস।আমি দুটো বিষয়ের একসাথে ব্যাখ্যা দিব।যদি হাইস্কুলে বিজ্ঞান ক্লাসে ফাঁকি দিয়ে না থাকেন তবে আপনি জানেন যে বায়ুমন্ডলে আমরা যে বাতাস গ্রহণ করি সেই বাতাসের প্রায় ৭৮% ইই নাইট্রোজেন।বাকি প্রায় ২১% অক্সিজেন এবং বাকিটা হিলিয়াম,নিয়ন সহ অন্যান্য গ্যাস।এই বিপুল পরিমাণ নাইট্রোজেন আমরা গ্রহণ করি ঠিকই কিন্তু ব্যবহার করি না।আমাদের ফুসফুস শুধুমাত্র অক্সিজেনকে আলাদা করে রক্তের হিমোগ্লোবিনের সাথে মিশিয়ে দেয়।কিন্তু এই বেশি মাত্রায় নাইট্রোজেন সংযুক্তি ফুসফুসের এলভিওলাই কোষকে অক্সিজেন সংশ্লেষন করতে পরোক্ষভাবে সাহায্য করে।বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন নিয়ে অভ্যস্ত প্রাণী মানুষ যখন পানির নিচে যায় তখন যে সিলিন্ডার থেকে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয় সেটাতেও নাইট্রোজেন মিশানো হয়।একে Nitrox সিলিন্ডার বলে।সাধারণত একটি Nitrox সিলিন্ডারের ২২% থেকে ৪০% গ্যাস অক্সিজেন,বাকিটা নাইট্রোজেন হয়।এধরনের সিলিন্ডারে উপরে সাদা-কালো ব্যান্ড থাকে।মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডার শুধুই লিকুইড হাই প্রেসারাইজ অক্সিজেন বহন করে এবং এই সিলিন্ডারের রং সাদা।যদি সিলিন্ডারে অক্সিজেন ও হিলিয়াম থাকে তবে
তাকে Heliox মিক্সচার বলে।এই সিলিন্ডারের সাদা+বাদামি ব্যান্ড থাকে।আরেক প্রকার সিলিন্ডার আছে যাকে Trimix অর্থাৎ অক্সিজেন,নাইট্রোজেন,হিলিয়াম গ্যাস মিক্সচার থাকে।এই সিলিন্ডারে সাদা+বাদামি+কালো রঙের ব্যান্ড থাকে।পানির খুব গভীরে ডাইভ দিতে হলে এসব সিলিন্ডার দরকার হয়।

অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ স্কুবা ডাইভিং এর সরঞ্জাম

কালার ব্যান্ডসহ বিভিন্ন প্রকার গ্যাসের সিলিন্ডার

প্রশ্ন হচ্ছে ডিকমপ্রেশন স্টপ কি?
তার আগে জানতে হবে Narcosis ইফেক্ট কি?

পানির উপরে স্বাভাবিক তাপ ও চাপে আমরা গ্রহণ করি।কিন্তু যতই পানির নিচে যাবেন ততই আপনার শরীরের উপর পানির প্রচন্ড চাপ পড়বে।আবার আপনারা জানেন যে সিলিন্ডারে প্রচন্ড চাপ দিয়ে গ্যাসকে তরল করে ঢুকানো হয়।এই গ্যাস বের হওয়ার সময়ও প্রচন্ড চাপ দেয়।এই চাপ গ্যাস ভালব এবং রেগুলেটর দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।তারপরও আমরা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চাপের অক্সিজেন গ্রহণ করি পানির নিচে।সাধারণভাবে বলতে গেলে চাপের এই দুই বিপরীত অবস্থার কারনে সৃষ্টি হয় Narcosis ইফেক্ট।এখানে আসলে একপ্রকার আচ্ছন্নভাবের সৃষ্টি হয়,অনেকে সামান্য সময়ের জন্য সেন্সলেস হয়ে যেতে পারে।অতিরিক্ত অক্সিজেন গ্রহণ এবং তা ঠিকমতো ব্যবহার না হওয়া,কার্বন ডাই অক্সাইড ঠিকমতো নিষ্কাশন না হওয়া,কার্বন মনো-অক্সাইড গ্রহণ করে ফেলা,নাইট্রোজেন বুদবুদ তৈরি হওয়া ইত্যাদি কারণে Narcosis ইফেক্ট হয়।

পানির নিচে যাওয়ার সময় ধীরে ধীরে আপনার শরীরে চাপ বাড়তে থাকে।রসায়ন ক্লাসে ফাঁকি না দিয়ে থাকলে আপনি জানেন যে বয়েলের সূত্র অনুযায়ী চাপ বাড়লে গ্যাসের আয়তন কমে।যখন আপনি পানির নিচে যাবেন তখন চাপ বাড়বে এবং আপনার শরীরের ভিতর প্রবেশ করা গ্যাসসমূহের আয়তন কমবে।আবার যখন পানির নিচ থেকে আপনি উপরে উঠতে থাকবেন তখন ধীরে ধীরে পানির চাপ কমবে এবং গ্যাসের আয়তন বাড়বে।তখন রক্তের মধ্যে যখন নাইট্রোজেন বুদবুদ বা বাবল তৈরি হবে।এই বাবল/বুদবুদ যত বড় হবে,ততই আপনার রক্তনালীর উপর চাপ পড়বে এবং একে যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তবে আপনি কিছুক্ষনের মধ্যেই আপনার রক্তনালী ফেঁটে যাবে!!শরীরের যেকোনো স্থানের রক্তনালী ফেঁটে যেতে পারে।এতে করে পানির চাপ বেশি থাকায় এবং আপনার রক্তের চাপ তার চেয়ে কম থাকায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেহের সমস্ত রক্ত বেড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।হাঙরের পেটে যাওয়া তখন কোনো ব্যাপারই না।এছাড়া উক্ত বাবল/বুদবুদ যদি আপনার হৃদপিন্ডে বা মস্তিষ্কের/কিডনির সূক্ষ রক্তনালিতে যায় তবে কিছু বুঝে উঠার আগেই মারা যাবেন।এজন্য নিচ থেকে উপরে উঠার সময় কিছুদূর(প্রায় ২০-৩০ফিট) পরপর কমপক্ষে ৩-৫মিনিট বিশ্রাম নিতে হয়।এটাকেই ডিকমপ্রেশন স্টপ বলে।এই বিশ্রামের ফলে আপনি একই চাপযুক্ত এলাকায় কিছুক্ষণ অবস্থান করবেন,ফলে ধীরে ধীরে উৎপন্ন বাবলের আয়তন কমবে।যত নিচ থেকে উপরে উঠবেন তত বেশি সময় বিশ্রাম নিতে হয়ে।এজন্য ১০৯০ফিট নিচ থেকে উঠার সময় স্কুবা ডাইভার Ahmed Gabr কে ১৪ঘন্টা ডিকম্প্রেশন স্টপ দিতে হয়েছিলো।এই ডিকম্প্রেশন স্টপ টাইম কমানোর জন্য ভেরি ডিপ সি ডাইভিং এর ক্ষেত্রে Trimix/Heliox গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়।হিলিয়াম সবচেয়ে হালকা গ্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম।প্রায় সময় আমরা হিলিয়ামভর্তি বেলুন কিনে থাকি যা বাচ্চাদের কাছে গ্যাস বেলুন নামে পরিচিত।এছাড়া নাইট্রোজেন পিল নামে ওষুধ খেতে হয় যা বাবলের আয়তন দ্রুত কমাতে সাহায্য করে।আবার Heliox মিক্সচারের পাশ্বপ্রতিক্রিয়া ও আছে।এটি হ্যালুসিনেশন এবং টানেল ভিশনের মত Narcosis ইফেক্ট সৃস্টি করে।মূলত অক্সিজেন টক্সিসিটি ঠেকানোর জন্য নাইট্রোজেন মিক্সচার ব্যবহার করা হয়।সুতরাং বুঝতেই পারছেন পানির নিচের অনেক বিপদ যেমন হাঙর আক্রমণ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও অনেক সময় ডিকম্প্রেশন স্টপ এর কারণে পালানো সম্ভব না।

বিভিন্ন বাহিনীতে ডুবুরীদের প্রচণ্ড পানির চাপে অভ্যস্ত করার জন্য এবং ডিকম্প্রেশন স্টপসহ অন্যান্য বিষয় শিখানোর জন্য ডিকম্প্রেশন চেম্বার ব্যবহার করা হয় এবং সেখানে বাতাসের চাপ বাড়িয়ে কমিয়ে পানির নিচের অনুরূপ চাপ সৃষ্টি করা হয়।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন ডুবুরীদের কাজ কতটা কঠিন এবং পানির নিচে নিজের শরীরটাই নিজের শত্রু।তবে কিছুদিন আগে বাংলাদেশ নেভির এক ডুবুরির কাছে একটি প্রবাদ বাক্য শুনেছিলাম যে
“শরীরের নাম মহাশয়
যাহা সহাবেন তাহাই সয়”

এভাবেই পানির নিচের কঠিন পরিবেশে টিকে থাকতে শিখে মিলিটারি ডাইভার ,ফ্রগম্যান বা নেভাল কমান্ডোরা।

➡স্কুবা ডাইভিং
যে কেউ হুট করে চাইলেই কিন্তু স্কুবা ডাইভিং করতে পারবে না।সিভিলিয়ানদের জন্য স্কুবা ডাইভিং একটি অ্যাডভেঞ্চার। এই অ্যাডভেঞ্চারের অংশ হতে হলে চাই প্রশিক্ষণ। আছে আরো কিছু শর্ত। আসুন জেনে নিই কারা স্কুবায় অংশ নিতে পারবেন, কারা পারবেন না।

➡স্কুবা ডাইভিং করতে যা যা লাগবে-
১। আপনাকে অবশ্যই সাঁতার জানতে হবে।
২। প্রশিক্ষণ নিতে হবে। আপনি যতই ভাল সাঁতারু হন না কেন পানির নিচে বেশিক্ষণ ডুবে থাকা একটি ভিন্ন বিষয়, যা আপনাকে শিখতে হবে।
৩। স্কুবার ব্যাবহার শিখতে হবে। যন্ত্রটি কিভাবে কাজ করে, কিভাবে বন্ধ করা যায়, হঠাৎ বন্ধ হলে কি করতে হবে এ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা নিতে হবে।
৪। পানির নিচে যোগাযোগ রক্ষার নিয়ম জানতে হবে। ওখানে যেহেতু আপনি কথা বলতে পারবেন না তাই কিছু ইশারার ভাষা জানা প্রয়োজন হবে। সেগুলো শিখে নেবেন।

➡যে শারীরিক সমস্যা থাকলে আপনি ডাইভিং করতে পারবেন না-
১। বড় কোন অপারেশন হয়ে থাকলে
২। হৃদপিণ্ডে কোন সমস্যা থাকলে
৩। কখনো স্ট্রোক হয়ে থাকলে
৪। লাংস, কিডনি ইত্যাদিতে বড় কোন সমস্যা থাকলে
৫। ঠান্ডাজনিত কোন অসুস্থতা থাকলে
৬।হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ থাকলে

➡অবশ্য করণীয় মেডিক্যাল চেকআপ
১। কার্ডিয়াক স্ট্রেস টেস্ট
২। লাংস স্ট্রেস টেস্ট ।

➡সতর্কতা
১। যে এজেন্সির কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন সে এজেন্সি কতটা দক্ষ তা আগে ভালো করে খোজ নিন।
২। স্কুবার যন্ত্রগুলো ঠিক আছে কিনা ভাল করে জেনে নিন।
৩।আবহাওয়া সম্পর্কে সচেতন থাকুন। সমুদ্রের জোয়ার ভাটার সময় জেনে নিন।
৪। ইন্সট্রাক্টর ছাড়া অভিজ্ঞ না হলে কখনোই একা ডাইভিং এর সিদ্ধান্ত নেবেন না।

বাংলাদেশেও এখন স্কুবা প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। অপূর্ব সৌন্দর্যের আঁধার সেন্ট মার্টিনে আপনি চাইলেই এখন সাগর তলের এই অভিযান চালাতে পারবেন।


➡যোগাযোগ-
১। কোরাল ভিউ রিসোর্ট – ০১৯৮০০০৪৭৭৭
২। ঢাকা ডাইভার্স ক্লাব – ০১৭১১৬৭১১৩০
৩। ওশেনিক স্কুভা ডাইভিং সার্ভিং- ০১৭১১৮৬৭৯৯১

➡খরচ
জনপ্রতি ৩৫০০- ৪০০০ টাকা।

স্কুবা ডাইভিংয়ের বিভিন্ন প্রকার সরঞ্জাম

এবার তাহলে সেন্ট মার্টিনে গেলে অবশ্যই স্কুবা ডাইভিং করে আসবেন। পানির নিচের অতুলনীয় এই অ্যাডভেঞ্চার জীবনের মানেই বদলে দেবে আপনার চোখে। সৌন্দর্য সব সময় মনকে বড় করে, পবিত্র করে। তাই যতসম্ভব সৌন্দর্যের কাছে যান। ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন দেহে এবং মনে।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: