২০১০ সালের শেষের দিকের কথা। বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর সবচেয়ে হার্ড এবং চ্যালেন্জিং কোর্স নেভাল কমান্ডো ব্যসিক কোর্সের ২য় ব্যাচের Hell week এর প্রথম রাত।তখন রাত ১২ টা। সারাদিনের টানা ফিজিক্যাল ট্রেনিং করে সবাই ক্লান্ত শরীরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।নিশ্চুপ চারিদিক হঠাৎ করে একটা ভয়ংকর রুপ ধারন করল।চারিদিকে এম্পটি কার্টিজের ফায়ারের শব্দ আর বারুদের গন্ধে প্রকৃতি পাল্টে গেল। যে যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায় প্যারেড গ্রাউন্ডে সমবেত হলাম। রাঙ্গামাটি কাপ্তাইয়ের সেই নেভাল ট্রেনিং বেস এর প্যারেড গ্রাউন্ডে দুই ঘন্টা যাবত বিভিন্ন Evaluation এর পর কাপ্তাই লেক এ নিয়ে রাত ২টা থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত করে পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় বিভিন্ন গ্রুপ কম্পিটিশন, ওয়াটার ট্রেনিং এর পাশাপাশি দক্ষিন কোরিয়ান ভাষায় ব্যাঙ্গের গান গাওয়ানো হয়। তারপর ৮ জনের গ্রুপ করে মাথায় জেমিনি বোট তুলে দেওয়া হয় যা দক্ষিন কোরিয়ান SEAL কোর্স আর ইউএস BUDS কোর্সের IBS(Inflatable Boat Small)এর তুলনায় দ্বিগুন ওজন। সেই থেকে বোট আর মাথা থেকে নামেনি।পুরো সাত দিন সাত রাত মাথায় ছিলো। এমনকি খাবারের সময়েও বোট মাথায় নিয়ে খেতে হয়েছে।শুধু বোট নয় বোটের উপরে উঠে ইন্ট্রাক্টররা রাজসিংহাসন পেতে বসে থাকতো সেই সাথে আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও খাবার পানি সহ।বোট নিয়ে সরু রাস্তা বেয়ে কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে উঠা কিযে কস্টকর তা বাস্তবে না করলে কেউ সহজে অনুধাবন করতে পারবেনা। কেউ ঘুমালে পানিতে চুবিয়ে ভেজা শরীরে বাতাসে দাড় করিয়ে দেওয়া হয়। যে কনকনে শীতের রাতে মানুষ কম্বলের নিচে থেকেও কাঁপতে থাকে সেই শীতের সাতটা রাত ভেজা শরীরে পাহাড় আর জঙ্গলের বিভিন্ন দুর্গম পথে বিচরন করি। যে পথে দিনের আলোতে কেউ যেতে সাহস পায়না সেই পথে সাতটা রাত কেটে গেছে। এই সাত দিনের বেশির ভাগ কথাই আমার মনে নেই।অনেকেই তিন চার দিনের মাথায় নিজের নামটা সহ ভুলে যায়।
এই কমান্ডো কোর্সের প্রত্যেকটা ইন্সট্রাক্টর এক একটা ডেভিল আত্না।তাদের রক্তবর্ণ চোখ স্টুডেন্ট পাঙ্গানোর নেশায় উন্মাত থাকে।
তবে শুধু স্টুডেন্ট নয় কমান্ডো গঠনের মহান দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ইন্সট্রাক্টরদেরও সীমাহীন কষ্ট পোহাতে হয়।সাতদিন নিজে জাগিয়ে থাকার চেয়ে অন্যকে জাগিয়ে রাখা যে কত কষ্টের তা ইন্সট্রাক্টরদের ওই পজিশনে না গেলে বুঝা যায় না।
অবশেষে পাহাড়ের টিলা থেকে কর্দমাক্ত পানিতে জাম্পের মধ্যদিয়ে Hell week এর সমাপ্তি ঘটে।সেই সাতদিন আগে পড়া বুট আর ইউনিফর্ম খোলার পর পা পঁচানো গন্ধে সাধারন কোন মানুষ কাছে ভিড়তে ভয় পায়।

এরপর এক সপ্তাহ recovery week শেষে পরবর্তী ধাপে পা রাখতে হয়। এভাবেই এক একটা সীমাহীন কষ্টের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন কোর্সের মাধ্যমে কমান্ডো রুপে নিজের আত্নপ্রকাশ ঘটাতে হয় ।

লিখেছেনঃ মোঃ আরিফুজ্জামান,বাংলাদেশ নৌবাহিনী

Facebook Comments

1 Comment

Al Jaim Pappu · January 9, 2018 at 11:24 am

অথচ হেল উইকে যাওয়া কত স্বপ্নের

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: