মারিয়ানা ট্রেঞ্চ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ গুয়াম থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। বিশ্বের সবচেয়ে গভীরতম খাদ হচ্ছে এই মারিয়ানা ট্রেঞ্চ যা ১০,৯৯৪মিটার গভীর!
মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরতা গ্রান্ড ক্যানিয়নের গভীরতা থেকে প্রায় ১২০ গুন বেশি। এছাড়া এভারেস্ট পর্বত শৃংগের উচ্চতা থেকেও এর গভীরতা ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার বেশি।
মানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাহাড় মাউন্ট এভারেস্ট(৮,৮৪৮মিটার) কেটে এনে এখানে আস্ত বসিয়ে দিলেও এই গর্ত পূরণ হবে না!!

এবার আসি আসল কথায়।
Trieste নামের একটা রিসার্চ সাবমেরিন এর ১০,৯৯১ মিটার নীচে যাওয়ার রেকর্ড আছে।
২০জানুয়ারি,১৯৬০ সালে এটি মারিয়ানা ট্রেঞ্চে ডাইভ দেয়।এতে ছিলেন এর ডিজাইনার Auguste Piccard এর ছেলে Jacques Piccard এবং ইউএস নেভির লেফটেন্যান্ট Don Walsh।এটি মূলত bathyscaphe টাইপের একটি সাবমার্সিবল।মানে ফ্রি ডাইভিং এবং সেলফ প্রোপেলার্ড ক্যাপসুল।সাবমার্সিবল মানে ধরে নিন সাবমেরিন এর ছোট ভাই।

মিলিটারি সাবমেরিন এর মধ্যে রাশিয়ার K728 Komsomolets ১,০০০ মিটার নিচে যাওয়ার রেকর্ড আছে।এটির ডিজাইন ডেপথ ১২৫০ মিটার।ক্রাশ ডেপথ ১৫০০মিটার।
মানে দেড় কিলোমিটার!
১৯৮৯ সালে এটি দুর্ঘটনায় ডুবে যায়।
এছাড়া রাশিয়ার একুলা ক্লাস ৬০০ মিটার নিচে যেতে পারে।বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গভীরে যাওয়ার ক্ষমতা আছে মার্কিন সি-উলফ ক্লাস (৭৫০) মিটার!!

চিন্তা করুন…৭৫০ মিটার কিন্তু কম কথা নয়।তবে এর টেস্ট ডাইভ ডেপথ হলো ৪৯০ মিটার।মানে এই গভীরতায় এটি নরমাল অবস্থায় চলতে সক্ষম।ক্রাশ ডেপথ ৭৫০ মিটার।

এবার আসি কিছু সংজ্ঞায়…
ডিজাইন ডেপথ মানে সাবমেরিনের ডিজাইন এর উপরে বেজ করে করে যে ডেপথ এর সীমা নির্ধারণ করা হয়।এটি হচ্ছে সেফ ডাইভ লিমিট।এই গভীরতায় সাবমেরিনের কোনো ক্ষতি হবে না ইনশাআল্লাহ।অন্যদিকে টেস্ট ডেপথ হচ্ছে অপারেশন টাইমে যে সর্বোচ্চ গভীরতায় সাবমেরিন যেতে সক্ষম।এতে সাবমেরিনের বডির উপর হাজার হাজার লিটার পানির চাপ পড়ে কিন্তু সাবমেরিন তা ঠিকই সহ্য করতে পারে।সাধারণত টেস্ট ট্রায়াল এর সময় টেস্ট ডেপথ এর সর্বোচ্চ মান নির্ণয় করা হয়।

এবার আসি ক্রাশ ডাইভ এর বেলায়।
মনে করুন টর্পেডোর তাড়া খেয়ে অথবা কোন কারনে সাবমেরিনের সিস্টেম ফেইলিউর হয়ে টেস্ট ডেপথ এর চেয়েও অনেক বেশি নিচে ডাইভ দিল।অর্থাৎ ডেঞ্জার জোনে চলে গেছে।এমন অবস্থায় সাবমেরিন এর মেটাল বডি যে সর্বোচ্চ গভীরে যেতে সক্ষম টা হলো ক্রাশ ডাইভ বা কলাপস ডাইভ।এর বেশি আর এক ইঞ্চিও যেতে পারবে না।গেলে প্রচন্ড পানির চাপে সাবমেরিন চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে যাবে!

Trieste সাবমেরিন(আসলে সাবমার্সিবল) যখন মারিয়ানা ট্রেঞ্চের একদম প্রায় শেষ প্রান্তে গিয়েছিল তখন এটি কেমন পানির চাপ সহ্য করেছিল জানেন??
আপনার হাতের এক আঙ্গুলের উপর যদি একটি পূর্ণবয়স্ক আফ্রিকান হাতি দাঁড়ায় তবে আপনি যে চাপ অনুভব করবেন,triste এর বডি কে তেমন ইই চাপ সহ্য করতে হয়েছিল।আর এটিকে প্রচন্ড চাপ সহ্য করার মতই বানানো হয়েছিল।

একটা কথা বলতে ভুলে গেছি।২০১২ সালে বিখ্যাত চিত্রপরিচালক জেমস ক্যামেরন একেকভাবে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরে দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন।
ক্যামেরন তাঁর বিশেষভাবে তৈরি ১২টন সাবমার্সিবলে করে মারিয়ানা ট্রেঞ্চে পৌঁছান। তিনি সেখানে প্রায় তিন ঘণ্টা কাটান।

১৯৬০ সালে যে দুজন গিয়েছিলেন তারা মাত্র ২০ মিনিট সেখানে ছিলেন।ক্যামেরন সেখান থেকে তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন এবং সেগুলোর ছবি তোলেন ও ভিডিও করেন।অনেক গভীর হওয়ার কারণে মারিয়ানা ট্রেঞ্চে সব সময় ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে এবং এখানকার তাপমাত্রা হিমাঙ্কের মাত্র কয়েক ডিগ্রি ওপরে।মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে পানির চাপ আট টন, যা সমুদ্রের উপরিভাগের পানির স্বাভাবিক চাপের চেয়েও এক হাজার গুণ বেশি। সমুদ্রে গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির চাপও বাড়তে থাকে।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: