আশা করি আমার পোস্টের শিরোনাম দেখেই আপনার চোখ মাথায় উঠে গেছে
কেননা সাবমেরিন আবার কিভাবে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার হয়?

উত্তর লুকিয়ে আছে জাপানিদের কাছে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেন জাপানিদের ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিভার আরো উন্মেষ ঘটিয়েছিল।এজন্য তারা বানাতে পেরেছিল এমন এক সাবমেরিন তা তৎকালীন সময় তো বটেই,আজই এমন সাবমেরিন দেখা যায় না।এয়ারক্রাফট বহন করতে সক্ষম এমন সাবমেরিন বানিয়েছিল জাপানিরা যা দিয়ে শত্রুর মেইনল্যান্ডের আরো গভীরে গিয়ে হামলা করে নিরাপদে ফিরে আসা সম্ভব।বর্তমানে অবশ্য ক্রুজ মিসাইল সাবমেরিন থাকায় এসব দরকার নেই কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এগুলো ছিল খুবই দরকারি।কেননা ইন্টারসেপ্টর বিমানকে ও এন্টিএয়ারক্রাফট গানকে এড়িয়ে দূরপাল্লার বোমারু বিমান দিয়ে আক্রমন করে সফল হওয়া অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর ছিল।

১৯৪২ সালে জাপান তৈরি করে I-400 ক্লাস সাবমেরিন।এটি সাধারণ সাবমেরিন থেকে অনেক আলাদা কারণ এটি আস্ত তিনটি প্লেন বহন করতে পারতো।এরকম ৩টি সাবমেরিন জাপানিরা সার্ভিসে এনেছিলো।যদিও তাদের প্লান ছিলো মোট ১৮টি তৈরী করার।কিন্তু তার আগেই আত্মসমর্পণ করে জাপান।

দুর্ধর্ষ জাপানি এডমিরাল ইয়ামাতো এর মাথা থেকে বের হওয়া আইডিয়া দিয়ে বানানো এই সাবমেরিনগুলো বিমান দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের পাড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে হামলা চালানোর পর মার্কিন জেনারেলদের চোখ আপনার মতই চান্দিতে উঠে গিয়েছিল।কেননা ইতালি-জার্মানির পক্ষে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানো সম্ভব ছিল না।আবার ঐ অঞ্চলে মার্কিন নেভির ক্রমাগত টহল ছিল।যার ফলে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার থেকে বিমান গিয়ে হামলা চালিয়েছে এমনটাও সম্ভব নয়।বেশ কয়েকবার হামলার পর দেখা গেল প্লেনগুলো গভীর সাগরে ফিরে যাচ্ছে,অথচ সাগরে কোন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার নেই!!
এমন ভৌতিক হামলার শিকার হয়ে রিকনসিস প্লেনের সাহায্যে I-400 ক্লাস সাবমেরিন শনাক্ত করে মার্কিনিরা একদম বেকুব বনে যান।কেননা তাদের ধারনাই ছিল না সাবমেরিন থেকে এয়ারক্রাফট ক্যাটাপুল্ট দিয়ে লঞ্চ করা সম্ভব।সি-বিমানগুলো হামলা শেষে পানিতে ল্যান্ড করতো এবং তাদেরকে ক্রেন দিয়ে হ্যাঙ্গারে ঢুকানো হত।

সাবমেরিন থেকে এয়ারক্রাফট লঞ্চ করা হচ্ছে

এয়ারক্রাফট হ্যাঙ্গার

১২২ মিটার দৈর্ঘ্যের ৬৫৬০ টনের এই সাবমেরিনগুলো কমিশনপ্রাপ্ত হয় ১৯৪৪-৪৫ সালে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একদম শেষ দিকে।এই সাবমেরিনগুলোসহ আরো বেশ কিছু মিনি সাবমেরিন(২ জন বহনে সক্ষম) সহ টর্পেডো সাবমেরিন (সাবমেরিন নিজেই একটা আস্ত টর্পেডো!) প্রজেক্ট জাপানিদের অসম্পূর্ণ ছিল।এগুলো সময়মত সার্ভিসে আসলে যে মিত্রবাহিনীর নাকের পানি-চোখের জল এক করে দিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

➡স্পেসিফিকেশন:
সাবমেরিনটির ছিল ২২৫০ হর্সপাওয়ারের ৪টি ডিজেল ইন্জিন এবং ২১০০ হর্সপাওয়ারের ২টি ইলেক্ট্রিক মোটর।আধুনিক ডিজেল-ইলেক্ট্রিক সাবমেরিনের উৎকর্ষ জাপানিদের হাত ধরেই হয়েছিল।সাবমেরিনটি সারফেস অবস্থায় প্রায় ৩৪কি.মি/ঘন্টা এবং সাবমার্জড অবস্থায় (পানির নিচে) ১২ কি.মি/ঘন্টা গতি নিয়ে সাগরের বুকে দাবরে বেড়াতো।এটি চালাতে ১৪৪ জন ক্রু লাগতো এবং এটি প্রায় ১০০মিটার গভীরে ডাইভ দিতে সক্ষম ছিলো।
প্রতি ইউনিট প্রতি মূল্য ছিল ২৮,৮৬১,০০০ তৎকালীন জাপানি ইয়েন অনুযায়ী (১৯৪২)

➡অস্ত্রশস্ত্র:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাবমেরিনগুলোতে সারফেস ওয়েপন বা নেভাল গান থাকতো।মূলত সারফেস অবস্থায় আক্রমনের জন্য এসব অস্ত্র ব্যবহার হত।আই-৪০০ ক্লাস সাবমেরিনে ১টি ৪০এমএম এর ন্যাভাল গান ১টি ২৫এমএম এর টাইপ-৯৬ অটোক্যানন,৩টি ২৫এমএম এর অটোক্যানন(৩ ব্যারেল এর),৮টি ৫৩৩এমএম টর্পেডো টিউব ছিল।
এছাড়াও এটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসাবে ৩টি Aichi M6A সী-প্লেন বহন করতে পারতো
এবং বড় একটি হ্যাঙ্গার ও ছিলো।

সাবমেরিনের এন্টি এয়ারক্রাফট গান

➡একটি লুটপাটের গল্প:
১১জুলাই,১৯৪৫ সালে তিনটি সাবমেরিনের মধ্যে দুটি সাবমেরিন জাপানের মাইযুরু বন্দর থেকে জ্বালানী ও প্লেন নিয়ে ট্রুক বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।তাদের পেনেন্ট নাম্বার ছিলো I-13 এবং I-14 কিন্তু এদের মধ্যে I-13 আর কখনো বন্দরে পৌছায় নি,কারণ যাত্রা পথেই আমেরিকান ডেস্ট্রয়ার এর শিকারে পরিণত হয়।স্ট্যাবিলাইজারবিহীন এবং ডানা ভাজ করা অবস্থায় এটি ক্যাটাপুল্ট দিয়ে প্লেন লঞ্চ করে।যার ফলে এটি ডেস্ট্রয়ারকে এট্যাক করার আগেই ক্রাশ হয়।তড়িঘড়ি করে একটি টর্পেডো ফায়ার করা হয়।কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেটি ছিল ডিসআর্ম অবস্থায়।ক্রমাগত ডেপথ চার্জের বিস্ফোরণ সহ্য করতে না পেরে
জাপানি সাবমেরিন সারেন্ডার করে।

জাপানের চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের পর অন্যান্য অনেক জাপানি মিলিটারি এসেট এর মত বাকি দুটি আই-৪০০ ক্লাস সাবমেরিন যুক্তরাষ্ট্র দখল করে নেয়।এই সাবমেরিন গুলি তৎকালীন সময়ে আমেরিকার সবথেকে বড় সাবমেরিন ইউএসএস ব্লু এর থেকেও ৭ মিটার লম্বা ছিলো।স্বাভাবিকভাবেই এই সাবমেরিন নিয়ে মার্কিনিরা গবেষণা শুরু করে।কিন্তু পরে তারা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এমন একটি কোডেড মেসেজ পায় যে সেখানে ইঙ্গিত ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ও এই সাবমেরিনের খোঁজ পেতে খ্যাপা কুকুরের ন্যায় পাগল হয়ে গেছে।কিন্তু সাবমেরিনগুলো নিয়ে গবেষণা করতে আরো সময় প্রয়োজন।অন্যদিকে এই জাপানি প্রযুক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে চলে গেলে সর্বনাশ!
তাই সাবমেরিনগুলো সোভিয়েত নজরদারি এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নেয়া সম্ভব নয় বিধায় মার্কিনিরা ফুকু আইল্যান্ড থেকে ৩৫ কি.মি দূরে গিয়ে এই ক্লাসের ৩টি সাবমেরিনসহ মোট ২৪ টি দখলকৃত জাপানি সাবমেরিন C-2 এক্সপ্লোসিভ দিয়ে উড়িয়ে দেয়!!
অর্থাৎ “নিজে যখন খেতে পারবো না তখন অন্যকেও খেতে দিব না” এমনটাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতি।

কিন্তু তারপরও I-400,I-401সহ আই সিরিজের আরো কিছু সাবমেরিন যেমন I-201,I-203(এগুলো এয়ারক্রাফট বহন করতে পারে না) কোনো রকম বেচে যায়।মার্কিনিরা পরে বাকি ৪টি সাবমেরিনকে পার্ল হারবারে পাঠায় এবং টর্পেডো মেরে ধ্বংস করে দেয় হয়।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: