আধুনিক যুগের যুদ্ধে এয়ারফোর্স সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।আর এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তথা আক্রমন করতে গিয়ে যুদ্ধবিমানগুলো কখনো কখনো নিজেরাই পাল্টা আক্রমনের শিকার হয়।এই আক্রমনের মধ্যে মধ্যে মিসাইল হামলাই সবচেয়ে ভয়ংকর।যুদ্ধবিমান ভূমি থেকে ফায়ার করা নানা ধরনের সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল(স্যাম) বা অন্য যুদ্ধবিমান থেকে ফায়ার করা এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল হামলার শিকার হতে পারে।তাই নিজেকে রক্ষার জন্য ইনকামিং মিসাইল ওয়ার্নিং রাডার,জ্যামারসহ কয়েক ধরনের ডিফেন্সিভ গিয়ার বা কাউন্টারমেজার থাকে বর্তমান সময়ের যুদ্ধবিমানগুলোতে।

আপনারা হয়তো যুদ্ধবিমান নিয়ে বিভিন্ন ভিডিওতে যুদ্ধবিমান কর্তৃক নিক্ষেপিত আতশবাজি টাইপের কিছু দেখেছেন।আজকে সেগুলো নিয়েই আলোচনা করবো।

➡ফ্লেয়ার:
শুরুটা ফ্লেয়ার দিয়েই করলাম।কেননা কমবেশি সবাই ফ্লেয়ার চিনেন।আপনারা জানেন যে যুদ্ধবিমানের ইন্জিন প্রচন্ড উত্তাপ সৃষ্টি করে।এই হিট সিগনেচার মানেই ইনফ্রারেড ওয়েভ।তাই যেসব মিসাইল ইনফ্রারেড গাইডেড অর্থাৎ তাপের পিছনে বা ইঞ্জিনের নির্গত ইনফ্রারেড ওয়েভকে ফলো করে ছুটে তাদেরকে ধোঁকা দেয়ার জন্য এসব ম্যাগনেশিয়াম পিলেটের তৈরি ফ্লেয়ার টাইপের কাউন্টারমেজার ব্যবহার করা হয়।বিমান তার গতি খানিকটা কমিয়ে দিয়ে(যাতে ইন্জিন তুলনামূলক কম গরম হয়) ডানে-বায়ে ফ্লিপফ্লপ ম্যানুভার করতে করতে ফ্লেয়ার লঞ্চ করে।এই ফ্লেয়ার গুলো মুহূর্তেই প্রায় ২হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা সৃস্টি ও ইনফ্রারেড ওয়েভ নিঃসরণ করে ফলস হিট সিগনেচার তৈরি করে যা বিমানের ইঞ্জিনের জেট নজেলের তাপমাত্রা থেকে অনেক বেশি।

এছাড়া একসাথে একাধিক ফ্লেয়ার ছোড়া হয় বলে একাধিক হিট সিগনেচার তৈরি হয়।ফলে কোনটা বিমান আর কোনটা ফ্লেয়ার সেটা বুঝতে পারেনা মিসাইল।ফলে হিট সিকিং মিসাইলের সেন্সর ফ্লেয়ারকে বিমান ভেবে হামলা করে।এভাবেই বেঁচে যান পাইলট।

কিন্তু সব মিসাইল তো আর ইনফ্রারেড গাইডেড নয়।রাডার গাইডেড মিসাইল থেকে বাঁচতে আরেক ধরণের কাউন্টারমেজার ব্যবহার করা হয়।একে চ্যাফ (chaff) বলে।

➡চ্যাফ:


চ্যাফ জিনিসটা আসলে কিভাবে কাজ করে সেটা বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে রাডার কিভাবে কাজ করে এবং রাডার গাইডেড মিসাইল কিভাবে কাজ করে।

RADAR এর পূর্ণরূপ হলো Radio Detection and Ranging।যুদ্ধবিমানের রাডার হোক বা ভূমিতে থাকা রাডার হোক।সব রাডারই প্রতিনিয়ত চারদিকে রেডিও ওয়েভ ছুড়ে দেয় এবং কোনো বস্তুতে ওয়েভ/তরঙ্গটি ধাক্কা খেয়ে পুনরায় রাডারে ফেরত আসে।এভাবে একটি বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করে রাডার।রাডার হোমিং মিসাইল আবার দুই ধরনের।এক্টিভ রাডার হোমিংগুলো নিজস্ব রাডার মডিউল বা যে বিমান/স্যাম থেকে মিসাইল ফায়ার করা হয়েছে তার রাডার ইনফরমেশন ব্যবহার করে টার্গেটের দিকে ধেয়ে যায়।এই ব্যাপারটা অনেকটা অন্ধ মানুষ কর্তৃক অন্যের শব্দ শুনে এগিয়ে যাওয়ার মত।প্যাসিভ রাডার হোমিং মিসাইল টার্গেটকৃত যুদ্ধবিমান থেকে নিঃসৃত রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে শত্রু বিমানের দিকে ছুটে যায়।এই ব্যাপারটি অনেকটা আলো দেখে জোনাকি পোকা শনাক্তের মত।

এবার বলবো চ্যাফ কিভাবে মিসাইলকে ফাঁকি দেয়।এটি মূলত এলুমিনিয়াম/কপার কোটেড গ্লাস/প্লাস্টিক ফাইবার যা বিস্ফোরিত হয়ে ধোঁয়ার কুন্ডলি বা ধাতব মেঘের সৃস্টি করে।এভাবে অসংখ্য ফলস রাডার সিগনেচার তৈরি হয়।মিসাইলের ছুড়ে দেয়া রাডার ওয়েভ এসব ধাতব কণার কৃত্রিম মেঘে রিফ্লেক্ট করে এবং সেটাকেই টার্গেট ভেবে হিট করে।এভাবেই মিসাইলের হাত থেকে পাইলট নিজেকে রক্ষা করে।তবে এটাও এক্টিভ রাডার হোমিং বিভিআর মিসাইল এর হাত থেকে বাঁচার শতভাগ কার্যকর উপায় নয়।নিশ্চিত কিলিং এর হাত থেকে বাঁচার জন্য আদৌ কিছু আছে কি?

➡ডিকয়:


ছবিতে আপনারা এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন এর উইং ফাইলনে একটা পাইপ সদৃশ বস্তু দেখতে পাচ্ছেন এগুলো আসলে “টাওয়েড রাডার ডিকয়” বা সংক্ষেপে TRD ।
১ম ছবিতে যেটা দেখছেন সেটার নাম AN/ALE-50।২য় ছবিতে AN/ALE-55
টাওয়েড রাডার ডিকয় মূলত এন্টি মিসাইল ইলেকট্রনিক কাউন্টারমেজার ডিকয় সিস্টেম।এটা ডেভেলপ করেছে Raytheon।

ইউএস এয়ারফোর্স এর পাইলটরা একে ডাকে “Little Buddy”।তাদের জন্য এই জিনিস পরম নির্ভরতার প্রতীক।রাডার গাইডেড সারফেস-টু-এয়ার এবং এয়ার-টু-এয়ার থেকে এই জিনিস আপনাকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম।

ALE-50 প্রথমবারের মতো ১৯৯৫ সালে F/A-18E/F Super Hornet ও B-1B lancer এ ইনস্টল করা হয়।বহুবার লাইভ মিসাইল ফায়ার করে এর পরীক্ষা নেয়া হয়েছে।এখন পর্যন্ত এটি ব্যর্থ হয় নি।বলা বাহুল্য যে এই ছোট একটা জিনিস প্রত্যেক টার দাম 22000 ডলার, যা মিলিয়ন ডলারের স্যাম এর হাত থেকে এয়ারক্রাফট কে রক্ষা করতে পারে।

এবার আসি টাওয়েড রাডার ডিকয় কিভাবে কাজ করে। AN/ALE-55 এর কাজ করার সিস্টেমটা বলছি।একটি TRD এয়ারক্রাফট এর জন্য মূলত তিন স্তরের ডিফেন্স লেয়ার তৈরি করে।
১-এনিমি রাডারকে ট্র্যাক করতে বাধা সৃষ্টি করে।মূল এয়ারক্রাফট এর মাদার সিগন্যাল নকল করে এবং বারবার সিগন্যাল উল্টাপাল্টা করে।অর্থাৎ রাডার অপারেটর একবার তার ট্র্যাককৃত অবজেক্টকে এয়ারক্রাফট মনে করবে,আবার পরক্ষণেই পাখি মনে করবে।

২-মনে করুন রাডার অপারেটর কয়েকদফা বেকুব হওয়ার পর অতিকষ্টে অবজেক্টকে লক করে ফেললো।রাডার লক হলেই এয়ারক্রাফট এর আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম পাইলট কে সিগন্যাল দিতে শুরু করে যে আপনাকে লক করে হয়েছে, যেকোনো মুহূর্তে মিসাইল আসবে কিন্তু টাওয়েড রাডার ডিকয় রাডার লক কে ভেঙে দিতে সক্ষম!
কিন্তু কিভাবে?

ডিকয় দিয়ে মিসাইলকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে

আবারো মূল এয়ারক্রাফট এর মাদার সিগন্যাল নকল করে রাডারে ধরা দেয়।রাডার অপারেটর হয় সেটাকে আরেকটা এয়ারক্রাফট হিসেবে ডিটেক্ট করবে,নাহয় আগের রাডার লককে ভুল হিসেবে ধরে নিয়ে কারেকশন করবে।

৩-ধরুন এস-৪০০ এর নাছোড়বান্দা টাইপের রাডার যাকে আপনি বেকুব বানাতে পারবেন না।সেক্ষেত্রে কি করবেন?
সেক্ষেত্রে রাডার লক এবং আপনার দিকে মিসাইল ফায়ার করা হলো।
এবার কি করবেন…?

সমস্যা নেই!
টাওয়েড রাডার ডিকয় হতে ১০০ মিটার লম্বা একটি ফাইবার অপটিক ক্যাবল বেড়িয়ে আসে এবং এতে লাগানো পড (যার নিজস্ব পাওয়ার লাইন থাকে) মূল এয়ারক্রাফট এর সিগন্যাল নকল করে মিসাইলকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে।এখন মিসাইল মারার পর আপনি যদি কমপক্ষে ম্যাক ওয়ান গতিতে থাকেন তবে যেই মুহূর্তে মিসাইল ডিকয় তে হিট করবে,সেই মুহূর্তে আপনি বিস্ফোরণস্থলের থেকে ১০০+১৭৬=২৭৬ মিটার দূরে সরে যাবেন।এখানে ১০০ মিটার আপনার ডিকয় ক্যাবলের দৈর্ঘ্য বাকি ১৭৬ মিটার ম্যাক ওয়ান গতি থাকার কারনে আপনি অর্জিত অগ্রগামীতা

বিমানের পিছনে থাকা ডিকয় যা মিসাইলকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করে

এই অসাধারণ জিনিস টি বি-১,এফ-১৬,এফ-১৮ই/এফ এবং ইউরোফাইটার টাইফুন এ TRD লাগানোর ব্যবস্থা আছে।একটি যুদ্ধবিমানে সর্বোচ্চ দুটি(দুই উইংটিপে) টাওয়েড রাডার ডিকয় লাগানো।

কিন্তু যদি আপনাকে তিনটি মিসাইল ফায়ার করা হয়?

তাহলে ‘বিদায় পিতিবি’ বলে চোখ বন্ধ করে বসে থাকুন অথবা আগেভাগেই ইজেক্ট দিয়ে বেড়িয়ে যান

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: