পর্ব-১

একটি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্ব একটি বিষয় হল গোয়েন্দা কার্যক্রম। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে সেই কাজটি করে থাকে। সভ্যতা যতই এগিয়ে যাচ্ছে, তত তাড়াতাড়ি পাল্টে যাচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাজের ধরন, পরিধি ও চর্চা। গোয়েন্দা সংস্থা হচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠান যার কাজই হলো নিজ দেশের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা, গবেষণা করা ও সেগুলো নিরাপদে রাখা। এর জন্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও গোয়েন্দাদের অনেক কাজ করতে হয়। পৃথিবীর ছোট, বড় ও মাঝারি শক্তিধর প্রায় সব দেশেরই নিজস্ব বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে। যেমন আমেরিকার ‘সিআইএ‘, গ্রেট ব্রিটেনের ‘এমআইসিক্স‘, রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘কেজিবি‘ যা পরিবর্তিত হয়ে ‘এফএসবি‘, ইজরাইলের ‘মোসাদ‘, পাকিস্তানের ‘আইএসআই‘, চীনের ‘এমএসএস‘, ভারতের ‘‘ ইত্যাদি।
 

 

পৃথিবীর যতগুলো বাঘা গোয়েন্দা সংস্থা আছে তার মধ্যে সেরাদের সেরা ‘মোসাদ (Mossad)‘। গোপনীয়তা, দুর্ধর্ষ গোয়েন্দাবৃত্তির চর্চায় যতগুলো সেরা প্রতিষ্ঠান আছে, ‘মোসাদ’ সেই সব গোয়েন্দা সংস্থাকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সংস্থা মানা হয় ইসরায়েলের এই প্রতিষ্ঠানটিকে। প্রচণ্ড গোপনীয়তার কারণে মোসাদ সম্পর্কে বেশির ভাগ তথ্যই অজানা। এরপরও বিশ্ব মিডিয়ায় নানা সময় মোসাদ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় উঠে এসেছে। অতি দক্ষ গোয়েন্দাদের সমন্বয়ে গড়া এই সংস্থার ক্ষীপ্রতা ও দুঃসাহসিকতা শত্রু মিত্র উভয়ের কাছেই রূপকথার মতো। মোসাদের এমন কিছু ভয়ংকর অপারেশন রয়েছে যেগুলো গল্পের বই কিংবা সিনেমা বা কল্পকাহিনীকেও হার মানায় । এই গ্রুপটি ‘WORLD MOST EFFICENT KILLING MACHINE’ নামেও পরিচিত। গুপ্ত হত্যায় মোসাদ এক এবং অদ্বিতীয়।

 

 

মার্কিন সিআইএ এবং মোসাদের ভিতরে মূল পার্থক্য হল, সিআইএ গুপ্ত হত্যার চেয়ে সরাসরি হামলা বেশি চালায় । অন্যদিকে মোসাদ খুব গোপনে তাদের শিকারদের শেষ করে ।

বিশ্ব ইতিহাসের ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত হলেও ইতিহাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছেন একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার। এমনকি ইসরায়েলি রাষ্ট্র এবং মোসাদের জন্মের পটভূমিতেও রয়েছে হিটলারের প্রত্যক্ষ ভূমিকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির চ্যান্সেলর ছিলেন হিটলার। পৃথিবীর সব ইহুদি হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। হিটলারের নির্দেশে নাৎসি বাহিনী ইহুদি নিধনের উৎসব শুরু করে। তাদের হাতে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদির মৃত্যু হয়।

 

 

নাৎসিদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদিদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতো। ফলে সারা বিশ্বের ইহুদি সম্প্রদায় নিজেদের অস্তিত্বের সংকট অনুভব করে। ওই সময় যে সকল ইহুদিরা বেঁচে গিয়েছিলেন, নিজেদের টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তারা একটি ইহুদি রাষ্ট্র তৈরির ভাবনায় শামিল হয়। সেই ধারণা থেকে তারা ইহুদি, খ্রিস্ট ও ইসলাম ধর্মের কাছে ‘পবিত্র ভূমি’ বলে পরিচিত বৃহত্তর ফিলিস্তিনকে তারা তাদের আবাসভূমি হিসেবে বেছে নেয়। ফিলিস্তিন দখল নিয়ে বিতর্ক ওঠে। কিন্তু অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে ভুগতে থাকা ইসরায়েলিরা কিছুতেই ছাড় দিতে রাজি নয়। বলা হয়ে থাকে, হিটলারের রূঢ়তা ইসরায়েলিদের জাতি হিসেবে হিংস্র করে তোলে। অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তাদের বিতর্কিত সব সিদ্ধান্তকেই ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম পরিণতি মানা হয়। নিজেরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দূর করতে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে শুরু থেকেই প্রস্তুত ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল। আর এই কাজে সর্বাত্মক ভূমিকা রাখে ইহুদিদের গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’। মোসাদের নীতি খুবই সহজ, নিজেদের স্বার্থরক্ষায় যেকোনো কিছু করতেই তারা প্রস্তুত।

শুরুর দিকের কথা…….

১৯৪৯ সালে মোসাদের জন্ম হলেও ১৯৯৬ পর্যন্ত কেউই জানতো না এই সংস্থারপ্রধানের কথা। ১৯৯৬ সালে যখন সাবতাই কে অপসারন করে ডেনি ইয়াতম কে নিয়োগ দেওয়া হয় এক ঘোষনার মাধ্যমে, তখন প্রথমবারের মত বিশ্ববাসী জানতে পারে এই সংস্থার প্রধানকে। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে ২৮তম কম্যুনিস্ট সম্মেলনে যখন নিকিটা ক্রুশ্চেভ এক গোপন মিটিংয়ে ‘স্টালিনকে‘ অভিযুক্ত ও অস্বীকার করে নিজেই প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষনা করে, ঐ বক্তব্যের এক কপি মোসাদ সিআইএর হাতে দিয়ে দেয়। এই প্রথম সিআইএ মোসাদের কার্যক্রম উপলব্ধি করে যাতে সিআইএ অবিভূত হয়। কারণ সিআইএর মত সংস্হাটিও এই রকম একটা সেন্সেটিভ সংবাদ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছিল।
পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মোসাদকে সাহায্য করার জন্য অগনিত ভলেন্টিয়ার, এরা সবাই জন্মগত ইহুদি এবং জায়োনিস্টের সমর্থক। এরা সবসময় তৈরী থাকে শত্রুর তথ্য জানানো বা গোয়েন্দাগিরী করা সন্দেহভাজনদের উপর। ব্রিটেনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদদাতা রবার্ট ফিস্ক ২০০৭ সালের জুলাইয়ে শিকাগো ও জন এফ কেনেডি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক স্টিফেন ওয়াল্ট ও জন মেরশিমার গবেষণা প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি তথা ইসরাইলের বিপক্ষে কথা বলা অতি দুঃসাহসিক।
শক্তিশালী ইহুদি লবির কারণে মার্কিন নীতি নেতিবাচকভাবে প্রবাহিত হচ্ছে এবং ইহুদিবিরোধী মনোভাব পাকাপোক্ত হচ্ছে খোদ মার্কিন মাটিতেই। মার্কিন প্রধান প্রেস ও টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদার ব্যক্তিরা বেশ প্রভাবশালী হয়ে আছেন দীর্ঘ দিন ধরে। সেখানে মিডিয়া ইসরাইলবিরোধী তথ্য প্রদানে খুব কমই সাহসিকতা দেখায়। এ কথা কেউই অস্বীকার করে না যে, বিশালসংখ্যক ইসরাইলি লবি প্রতিক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে তাদের মতো করে প্রভাবিত করতে।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, সংঘবদ্ধ ইহুদি গোষ্ঠী মার্কিন প্রশাসনে ইসরাইলের হয়ে কাজ করছে। এ রকম একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী হলো ‘এআইপিএসি’ (দ্য আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি)। কংগ্রেস থেকে পেন্টাগন সবখানে তাদের প্রচারণা। তারা সেসব কংগ্রেসম্যানদের টার্গেট করে, যারা অতি সহজে তাদের কথায় দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মনে হয়। এই লবির কারণেই এখনো প্রাণ দেয় ফিলিস্তিনিরা একেবারে অসহায়ের মতো।
ইহুদি লবির প্রভাবের অন্যতম একটি উদাহরণ হলো হামাস সরকার। কোনোভাবেই এ সরকার সমর্থন পেল না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এই ইহুদিদের একমাত্র দখলী ভূখণ্ড ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থার নাম মোসাদ। সারা বিশ্বে এই গোয়েন্দা সংস্থার রয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলন প্রতিহত করা ও মুসলমানদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। এ গোয়েন্দা সংস্থাটি অসংখ্য গুপ্তহত্যা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। বেশীরভাগ গুপ্ত হত্যার সময়েই এই মোসাদ হামলার জায়গায় থাকে না। বেশীরভাগ সময়েই এরা চেষ্টা করে স্থানীয় মাফিয়া বা সন্ত্রাসীদের দ্বারা নিজেদের কাজ করে নিতে, যদি মাফিয়াদের দ্বারা সম্ভব না হয়, তাহলে শুধুমাত্র ওখানেই মোসাদের ডেথ স্কোয়াড কাজ করে। পশ্চিমা সাহায্য ও সহায়তাপুষ্ট ইসরাইলের এ গোয়েন্দা সংস্থা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্যই এখন চ্যালেঞ্জ।
আজ এ পর্যন্তই পরবর্তী পর্বে মোসাদের আরও কিছু তথ্য নিয়ে হাজির হব। ততক্ষণ পর্যন্ত শুভকামনা 🙂
Facebook Comments

1 Comment

Al Jaim Pappu · January 23, 2018 at 2:25 pm

মেরাব ভাই কেমন আছেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: