একটি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্ব একটি বিষয় হল গোয়েন্দা কার্যক্রম। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে সেই কাজটি করে থাকে। সভ্যতা যতই এগিয়ে যাচ্ছে, তত তাড়াতাড়ি পাল্টে যাচ্ছে কাজের ধরন, পরিধি ও চর্চা। গোয়েন্দা সংস্থা হচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠান যার কাজই হলো নিজ দেশের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা, গবেষণা করা ও সেগুলো নিরাপদে রাখা। এর জন্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাদের অনেক কাজ করতে হয়। পৃথিবীর প্রায় সব বড় ও মাঝারি শক্তিধর দেশেরই নিজস্ব বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে। যেমন আমেরিকার ‘সিআইএ‘, গ্রেট ব্রিটেনের ‘এমআইসিক্স‘, রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘কেজিবি‘ যা পরিবর্তিত হয়ে ‘এফএসবি‘, ইজরাইলের ‘মোসাদ‘, পাকিস্তানের ‘আইএসআই‘, চীনের ‘এমএসএস‘, ভারতের ‘‘ ইত্যাদি।

পৃথিবীর যতগুলো বাঘা গোয়েন্দা সংস্থা আছে তার মধ্যে সেরাদের সেরা ‘মোসাদ (Mossad)‘। গোপনীয়তা, দুর্ধর্ষ গোয়েন্দাবৃত্তির চর্চায় যতগুলো সেরা প্রতিষ্ঠান আছে, ‘মোসাদ’ সেই সব গোয়েন্দা সংস্থাকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সংস্থা মানা হয় ইসরায়েলের এই প্রতিষ্ঠানটিকে। প্রচণ্ড গোপনীয়তার কারণে মোসাদ সম্পর্কে বেশির ভাগ তথ্যই অজানা। এরপরও বিশ্ব মিডিয়ায় নানা সময় এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় উঠে এসেছে। অতি দক্ষ গোয়েন্দাদের সমন্বয়ে গড়া এই সংস্থার ক্ষীপ্রতা ও দুঃসাহসিকতা শত্রু মিত্র উভয়ের কাছেই রূপকথার মতো। মোসাদের এমন কিছু ভয়ংকর অপারেশন রয়েছে যেগুলো গল্পের বই বা সিনেমা কিংবা কল্পকাহিনীকেও হার মানায় । এই গ্রুপটি ‘WORLD MOST EFFICENT KILLING MACHINE’ নামেও পরিচিত। গুপ্ত হত্যায় মোসাদ এক এবং অদ্বিতীয়। মার্কিন সিআইএ এবং মোসাদের ভিতরে পার্থক্য রয়েছে যে সিআইএ গুপ্ত হত্যার চেয়ে সরাসরি হামলা বেশি চালায় । অন্যদিকে মোসাদ খুব গোপনে তাদের শিকারদের শেষ করে ।

বিশ্ব ইতিহাসের ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত হলেও ইতিহাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছেন একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার। এমনকি ইসরায়েলি রাষ্ট্র এবং মোসাদের জন্মের পটভূমিতেও রয়েছে হিটলারের প্রত্যক্ষ ভূমিকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির চ্যান্সেলর ছিলেন হিটলার। পৃথিবীর সব ইহুদি হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। হিটলারের নির্দেশে নাৎসি বাহিনী ইহুদি নিধনের উৎসব শুরু করে। তাদের হাতে প্রায় ৬০ লাখ ইহুদির মৃত্যু হয়।

নাৎসিদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদিদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতো। ফলে সারা বিশ্বের ইহুদি সম্প্রদায় নিজেদের অস্তিত্বের সংকট অনুভব করে। ওই সময় যে ইহুদিরা বেঁচে গিয়েছিলেন, নিজেদের টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তারা একটি ইহুদি রাষ্ট্র তৈরির ভাবনায় শামিল হয়। সেই ধারণা থেকে তারা ইহুদি, খ্রিস্ট ও ইসলাম ধর্মের কাছে ‘পবিত্র ভূমি’ বলে পরিচিত বৃহত্তর ফিলিস্তিনকে তারা তাদের আবাসভূমি হিসেবে বেছে নেয়। ফিলিস্তিন দখল নিয়ে বিতর্ক ওঠে। কিন্তু অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে ভুগতে থাকা ইসরায়েলিরা কিছুতেই ছাড় দিতে রাজি নয়। বলা হয়ে থাকে, হিটলারের রূঢ়তা ইসরায়েলিদের জাতি হিসেবে হিংস্র করে তোলে। অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে তাদের বিতর্কিত সব সিদ্ধান্তকেই ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম পরিণতি মানা হয়। নিজেরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দূর করতে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে শুরু থেকেই প্রস্তুত ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল। আর এই কাজে সর্বাত্মক ভূমিকা রাখে ইহুদিদের গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’। মোসাদের নীতি খুবই সহজ, নিজেদের স্বার্থরক্ষায় যেকোনো কিছু করতেই তারা প্রস্তুত।

শুরুর দিকের কথা…….

১৯৪৯ সালে মোসাদের জন্ম হলেও ১৯৯৬ পর্যন্ত কেউই জানতো না এই সংস্থারপ্রধানের কথা। ১৯৯৬ সালে যখন সাবতাই কে অপসারন করে ডেনি ইয়াতম কে নিয়োগ দেওয়া হয় এক ঘোষনার মাধ্যমে, তখন প্রথমবারের মত বিশ্ববাসী জানতে পারে এই সংস্থার প্রধানকে। ১৯৫৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে ২৮তম কম্যুনিস্ট সম্মেলনে যখন নিকিটা ক্রুশ্চেভ এক গোপন মিটিংয়ে ‘স্টালিনকে‘ অভিযুক্ত ও অস্বীকার করে নিজেই প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষনা করে, ঐ বক্তব্যের এক কপি মোসাদ সিআইএর হাতে দিয়ে দেয়। এই প্রথম সিআইএ মোসাদের কার্যক্রম উপলব্ধি করে যাতে সিআইএ অবিভূত হয়। কারণ সিআইএর মত সংস্হাটিও এই রকম একটা সেন্সেটিভ সংবাদ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছিল।
পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মোসাদকে সাহায্য করার জন্য অগনিত ভলেন্টিয়ার, এরা সবাই জন্মগত ইহুদি এবং জায়োনিস্টের সমর্থক। এরা সবসময় তৈরী থাকে শত্রুর তথ্য জানানো বা গোয়েন্দাগিরী করা সন্দেহভাজনদের উপর। ব্রিটেনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদদাতা রবার্ট ফিস্ক ২০০৭ সালের জুলাইয়ে শিকাগো ও জন এফ কেনেডি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক স্টিফেন ওয়াল্ট ও জন মেরশিমার গবেষণা প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি তথা ইসরাইলের বিপক্ষে কথা বলা অতি দুঃসাহসিক।
শক্তিশালী ইহুদি লবির কারণে মার্কিন নীতি নেতিবাচকভাবে প্রবাহিত হচ্ছে এবং ইহুদিবিরোধী মনোভাব পাকাপোক্ত হচ্ছে খোদ মার্কিন মাটিতেই। মার্কিন প্রধান প্রেস ও টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদার ব্যক্তিরা বেশ প্রভাবশালী হয়ে আছেন দীর্ঘ দিন ধরে। সেখানে মিডিয়া ইসরাইলবিরোধী তথ্য প্রদানে খুব কমই সাহসিকতা দেখায়। এ কথা কেউই অস্বীকার করে না যে, বিশালসংখ্যক ইসরাইলি লবি প্রতিক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে তাদের মতো করে প্রভাবিত করতে।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, সংঘবদ্ধ ইহুদি গোষ্ঠী মার্কিন প্রশাসনে ইসরাইলের হয়ে কাজ করছে। এ রকম একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী হলো ‘এআইপিএসি’ (দ্য আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি)। কংগ্রেস থেকে পেন্টাগন সবখানে তাদের প্রচারণা। তারা সেসব কংগ্রেসম্যানদের টার্গেট করে, যারা অতি সহজে তাদের কথায় দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মনে হয়। এই লবির কারণেই এখনো প্রাণ দেয় ফিলিস্তিনিরা একেবারে অসহায়ের মতো।
ইহুদি লবির প্রভাবের অন্যতম একটি উদাহরণ হলো হামাস সরকার। কোনোভাবেই এ সরকার সমর্থন পেল না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এই ইহুদিদের একমাত্র দখলী ভূখণ্ড ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থার নাম মোসাদ। সারা বিশ্বে এই গোয়েন্দা সংস্থার রয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলন প্রতিহত করা ও মুসলমানদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। এ গোয়েন্দা সংস্থাটি অসংখ্য গুপ্তহত্যা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। বেশীরভাগ গুপ্ত হত্যার সময়েই এই মোসাদ হামলার জায়গায় থাকে না। বেশীরভাগ সময়েই এরা চেষ্টা করে স্থানীয় মাফিয়া বা সন্ত্রাসীদের দ্বারা নিজেদের কাজ করে নিতে, যদি মাফিয়াদের দ্বারা সম্ভব না হয়, তাহলে শুধুমাত্র ওখানেই মোসাদের ডেথ স্কোয়াড কাজ করে। পশ্চিমা সাহায্য ও সহায়তাপুষ্ট ইসরাইলের এ গোয়েন্দা সংস্থা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্যই এখন চ্যালেঞ্জ।

মোসাদ…..

হিব্রু ভাষায় ‘মোসাদ’ শব্দের অর্থ ইন্সটিটিউট৷ । আনুষ্ঠানিকভাবে এই বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার নাম ‘দ্য ইন্সিটিটিউট অফ ইনটেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অপারেশনস’ । উল্লেখ্য, ইসরায়েলে আরও দু’টি গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে – অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার নাম ‘শিন বেত(Shin bett)’ এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার নাম ‘আগাফ হা-মোদি’ইন’ – সংক্ষেপে ‘আমন’ ।(Aman)

মোসাদ গঠন…….

আরব লিগের প্রত্যাখ্যানের মুখে দখল ভূমিতে ইসরাইলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় ১৯৪৮ সালের ১৪ মে। ১৯৪৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর Central Institute of Coordination নামে মোসাদের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫১ সালের মার্চে। প্রতিষ্ঠার পর থকেই মোসাদকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন রাখা হয়। ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ান মোসাদ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মনে করতেন গোয়েন্দাবৃত্তি ইসরাইলের ফার্স্ট ডিফেন্স লাইন। টার্গেট দেশ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সন্ত্রাস দমন ও অপারেশনের পর এগুলো গোপন রাখা হচ্ছে মোসাদের প্রধান কাজ। মোসাদ ইসরাইলের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা। এর কাজের রিপোর্ট ও গোয়েন্দা তথ্য সরাসরি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীকে দিতে হয়। এর নীতিমালা ও কার্যক্রম অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ, যুক্তরাজ্যের এমআই সিক্স ও কানাডার সিএসআইএস এর অনুরূপ। মোসাদের হেডকোয়ার্টার তেলআবিবে। এর কর্মচারী-কর্মকর্তারা সংখ্যায় কত তার সঠিক তথ্য নেই। তবে ধারনা করা হয়, এর কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ১ হাজার ২০০।  অবশ্য ১৯৮০ সালের শেষ দিকে এ সংখ্যা ২ হাজারের বেশি ছিল। মোসাদ সামরিক সার্ভিস নয়। মিলিটারি র‌্যাংঙ্কিং এখানে প্রয়োগ করা হয় না। যদিও এর অধিকাংশ কর্মকর্তাই ইসরাইলের ডিফেন্স ফোর্সের।

কর্মকৌশল…….

কাজের সুবিধার্থে মোসাদকে আটটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫ হতে ৬ টা ডিপার্টমেন্ট অনেকেই জানলেও বাকী দুই ডিপার্টমেন্টের কথা কেউই জানে না। উল্লেখযোগ্য বিভাগগুলো হচ্ছে ….
  • তথ্য সংগ্রহ বিভাগ,
  • রাজনৈতিক যোগাযোগ বিভাগ,
  • বিশেষ অপারেশন বিভাগ,
  • ল্যাপ বিভাগ,
  • গবেষণা বিভাগ,
  • প্রযুক্তি বিভাগ।

“তথ্য সংগ্রহ বিভাগ”  হচ্ছে মোসাদের সবচেয়ে বড় বিভাগ। গুপ্তচরবৃত্তির সময় এর কর্মীরা বিভিন্ন রূপ নেয়। একই কাজে বহুরূপী আচরণ প্রায়ই লক্ষণীয়। এ বিভাগের কাজের প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে কূটনৈতিক ও বেসরকারি কর্মকর্তা। মোসাদের মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দাদের কাটসাস বলে। সিআইএ এ পর্যায়ের গোয়েন্দাদের কেইস অফিসার বলে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ১৩ থেকে ১৪টি অপারেশন এ বিভাগ এক সাথে করতে পারে। এই বিভাগের অধীনে অনেক ডেস্ক আছে। সেখানে একজন করে ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় স্টেশনগুলোর সাথে এই বিভাগ যোগাযোগ রক্ষা করে। রাজনৈতিক যোগাযোগ বিভাগের কর্মীরা দেশের রাজনৈতিক নেতা, অন্য দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও যেসব দেশের সাথে ইসরাইলের কূটনৈতিক যোগাযোগ নেই সেসব দেশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে। প্রয়োজনে অর্থ ও নারীসহ নানাবিধ সুবিধা দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে।

এ ছাড়া অন্য দেশের কূটনৈতিক ও দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথেও এই বিভাগের কর্মীরা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখে। বিশেষ উদ্দেশ্যে বিভাগকে মোসাদ মেটসাদা (Metsada) বলে। গুপ্তহত্যা, আধা-সামরিক অপারেশন, নাশকতামূলক কাজ, রাজনৈতিক কলহ তৈরি, মনস্তাত্বিক যুদ্ধাবস্থা তৈরি বা প্রোপাগাণ্ডা চালানো এই বিভাগের কাজ। মোসাদ গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের প্রতিদিনের তথ্য এবং সাপ্তাহিক ও মাসিক পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট তৈরি করে। গোয়েন্দা তৎপরতা চালানোর সুবিধার্থে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে ১৫টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

“রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ” নামে একটি বিভাগ আছে মোসাদের। এই বিভাগের কর্মীরা দেশের রাজনৈতিক নেতা, অন্য দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও যেসব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক যোগাযোগ নেই, সেসব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। প্রয়োজনে অর্থ ও নারীসহ নানাবিধ সুবিধা দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। এ ছাড়া অন্য দেশের কূটনৈতিক ও দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও এই বিভাগের কর্মীরা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখে।

মোসাদের আছে নিজস্ব “গুপ্তহত্যা বিভাগ”। এই গ্রুপটির সক্ষমতা এমন যে এরা চাইলে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে একযোগে ১৩/১৪ টি অপারেশন চালাতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এই বিভাগের সক্রিয় স্টেশন আছে। বিভাগটি তাদের সাথে সর্বদা যোগাযোগ রক্ষা করে। সিক্রেট কিলিং এর জন্য এই বিভাগের বিকল্প আর কিছু নেই।

“ল্যাপ ডিপার্টমেন্ট” নামে আরকটি গ্রুপ কাজ করে। এরা প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সাহায্য করে। যাবতীয় যুদ্ধের পরিকল্পনাও এখান থেকেই করা হয়। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের জন্য প্রচার চালায়। শত্রুশিবিরে ভুল খবর ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে থাকে। গুপ্তহত্যা, আধা-সামরিক অপারেশন, নাশকতামূলক কাজ, রাজনৈতিক কলহ তৈরি বা প্রোপাগান্ডা চালানো এই বিভাগের কাজ।

“রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট বা গবেষণা বিভাগ”-এর গবেষকরা বিভিন্ন প্রযুক্তিগত জিনিস উদ্ভাবন নিয়ে গবেষণা করে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, ধারণা ও তত্ত্ব প্রচার, নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার এবং তার সঠিক ব্যবহার ছাড়াও গবেষণা কাজের জন্য ইসরায়েলি ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি গঠন করা এই বিভাগের দায়িত্ব। ইসরায়েলের ভেতরে ও বাইরে কাজ করে, এমন সব গোয়েন্দা সংস্থা নিয়ে এই কমিউনিটি গঠন করা হয়।

 

গোয়েন্দা কমিউনিটি….

মোসাদে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, ধারণা ও তত্ত্ব প্রচার, গবেষণা কাজের জন্য ইসরাইলি ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি গঠন করা হয়। ইসরাইলের ভেতরে ও বাইরে কাজ করে এমন সব গোয়েন্দা সংস্থা নিয়ে এই কমিউনিটি গঠন করা হয়। এর বর্তমান প্রধান সদস্য হচ্ছে, আমান, মোসাদ ও সাবাক। মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স, এয়ার ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেট, নেভাল ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্ট, ইন্টেলিজেন্স কর্পস, চারটি আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থা আমান’র অন্তর্ভুক্ত। মোসাদের কার্যক্রম হচ্ছে দেশের বাইরে। সাবাক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ইসরাইলের অভ্যন্তরে ও দখলকৃত ভূখণ্ডে গোয়েন্দা তৎপরতা চালানোর জন্য। এ ছাড়াও ইসরাইলের পুলিশ বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেন্টার ফর পলিটিক্যাল রিসার্স এই কমিউনিটির অন্তর্ভুক্ত। সোভিয়েত ব্লকে ইহুদি ধর্ম প্রচারের দায়িত্বে থাকা নেটিভ ও গোপন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত লেকেম এই কমিউনিটির অন্তর্ভুক্ত ছিল। নেটিভকে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন অন্য বিভাগ হিসেবে নেয়া হয়েছে। আর লেকেম বিভাগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অবশ্য এর কার্যক্রম বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছে।

অপহরণ ও হত্যা

ইসরাইলের সরকার ইসরাইলের নিরাপত্তা প্রশ্নে বিভিন্ন প্রচেষ্টা ও কর্মকাণ্ড মোসাদকে গোয়েন্দাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ মান দিয়েছে। দুর্ধর্ষ এই গোয়েন্দা সংস্থার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলন প্রতিহত করা ও আরব বিশ্বসহ মুসলমানদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। ইসরাইল প্রসঙ্গে বিতর্কিত বা রাজনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বাদানুবাদ তৈরি হলে এ সংস্থা তার কর্মীদের ওই ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট কাউকে অপহরণ বা হত্যা পর্যন্ত করত। মোসাদ বরাবরই যেকোনো অপারেশন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ’র ছদ্মাবরণে করত।

এই প্রবন্ধে এমন কিছু ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে যা পাঠকদের মোসাদের অপহরণ কর্মকাণ্ড, হত্যা ও বিভিন্ন ক্রাইম সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে।

মোসাদের বিভিন্ন অপারেশন……..

এই প্রবন্ধে এমন কিছু ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে যা পাঠকদের মোসাদের অপহরণ কর্মকাণ্ড, হত্যা ও বিভিন্ন ক্রাইম সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে।

মিশরে মোসাদের অভিযান(অপারেশন ডেমোক্লিস)

গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শুরুর দিকের কথা। মিশরের পক্ষ হয়ে তখন কাজ করছিলো বেশ কয়েকজন জার্মান বিজ্ঞানী। একসময় হিটলারের নাৎসি জার্মানিতে রকেট বানানোর প্রজেক্টে কাজ করা সেসব জার্মান বিজ্ঞানী মিশরেও সেই একই কাজ করছিলেন ফ্যাক্টরি ৩৩৩ নামক এক মিলিটারি সাইটে। সেই ফ্যাক্টরিতে কাজ করা অটো জক্লিক নামক এক অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানীর দেয়া তথ্যমতে, তারা তেজষ্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থবাহী রকেট তৈরি নিয়ে কাজ করছিলেন। আর এই প্রজেক্টের সাথে জড়িত জার্মান বিজ্ঞানীদের নাম-নিশানা দুনিয়া থেকে চিরতরে মুছে দিতে ১৯৬২ সালে গোপন যে অভিযানে নেমেছিলো মোসাদ, ইতিহাসে সেটিই ‘অপারেশন ডেমোক্লিস’ নামে পরিচিত।

মিশরের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট গামাল আব্দেল নাসের হুসেইন তখন ক্ষমতায় আসীন। দেশটির সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রকেট কেনা জরুরি হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু স্নায়ু যুদ্ধের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যায় বলে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা পাশ্চাত্য দেশগুলো থেকে রকেট কেনা সম্ভব হচ্ছিলো না দেশটির পক্ষে।

সামরিক প্রযুক্তিতে পার্শ্ববর্তী শত্রু ইসরায়েলের সমকক্ষ হতে তাই দেশে তৈরি রকেটের উপর নির্ভর করা ছাড়া অন্য কোনো অপশন ছিলো না মিশরের হাতে। কিন্তু তৎকালে মধ্যপ্রাচ্যে রকেট সম্পর্কে জানাশোনা লোক এবং একই সাথে দরকারি কাঁচামাল ছিলো বেশ দুষ্প্রাপ্য। এজন্য দক্ষ ব্যক্তি ও দরকারি কাঁচামালের জন্য মিশর নজর দেয় ইউরোপীয় দেশগুলোর দিকে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি তখন আইনত নিষিদ্ধ ছিলো। তবুও হাসান সাইদ কামিল নামক এক মিশরীয়-সুইস অস্ত্র সরবরাহকারীর সহায়তায় পশ্চিম জার্মানি ও সুইজারল্যান্ড থেকে জনবল ও কাঁচামাল যোগাড় করতে সক্ষম হয় মিশর। গোপন সেই প্রজেক্টে যোগ দেয়া জার্মান বিজ্ঞানীদের অনেকেই এককালে নাৎসি জার্মানির অধীনে ভি-২ রকেট নির্মাণে কাজ করেছিলো।

দরকারি জনবল আর কাঁচামাল সংগ্রহের পর আর বসে থাকে নি মিশর সরকার। গোপনে গোপনে চলতে থাকে তাদের রকেট তৈরির কাজকারবার। অবশেষে ১৯৬২ সালের জুলাই মাসে যখন তারা পরীক্ষামূলকভাবে একটি রকেট সফলতার সাথে উৎক্ষেপণে সক্ষম হয়, তখনই নড়েচড়ে বসে গোটা বিশ্ব। পরবর্তীতে রাজধানী কায়রোর সড়কে নতুন ধরনের দুটো রকেট নিয়ে করা তাদের সামরিক মহড়া চমকে দেয় বিশ্ব মোড়লদের।

মিশরের এ রকেট বানানোর পেছনে বড় অবদান ছিলো জার্মান বিজ্ঞানীদের। ফলস্বরুপ পশ্চিম জার্মানির সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক নিম্নমুখী হতে শুরু করে। ওদিকে সেই প্রজেক্টেরই এক অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী ইসরায়েল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয় অত্যন্ত গোপন কিছু তথ্য। তিনি জানান যে, রকেটগুলোতে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবহারের চিন্তা আছে মিশরের। পাশাপাশি নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড নিয়েও কাজ করে যাচ্ছে তারা। এমন খবর শুনে যেন ইসরায়েলের কর্তাব্যক্তিদের রাতের ঘুম হারাম হবার দশা হয়।

আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে আরো ভয়াবহ খবর আসে মোসাদের কাছে। জার্মান বিজ্ঞানী ওলফগ্যাং পাইলজের লেখা একটি ডকুমেন্ট কোনোভাবে সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলো তারা। সেটা পড়ে জানা যায় যে, মিশর নয়শ’র মতো রকেট বানাচ্ছে। সেসব রকেটে ব্যবহারের জন্য কেমিক্যাল, বায়োলজিক্যাল ও গ্যাসে পূর্ণ ওয়ারহেড নির্মাণের হালকা আভাসও পাওয়া গিয়েছিলো। ইসরায়েলের জনগণের সমর্থন লাভের জন্য মোসাদের তৎকালীন প্রধান ইজার হারেল তাই অনেক রঙচঙ মাখিয়ে গল্প শোনালেন তাদের, জানালেন ইসরায়েলকে ধ্বংস করার জন্য জার্মান বিজ্ঞানীরা এখন মিশরে ভয়াবহ সব অস্ত্র নির্মাণ করছে। কৌশল কাজে দিলো দিলো, জনতার সমর্থন পুরোপুরি চলে গেলো মোসাদের পক্ষে।

এরপরই মাঠে নেমে গেলো মোসাদের সদস্যরা, লক্ষ্য জার্মান বিজ্ঞানীদের একে একে শেষ করে মিশরের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির স্বপ্নকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়া। এজন্য তারা অপহরণ ও পার্সেল বোমকে বেছে নিলো। এটি বিশেষভাবে বানানো এক ধরনের বোম যা ডাক বিভাগের মাধ্যমে কারো কাছে পাঠানো হয় এবং প্রাপক যখন পার্সেলটি খোলে, তখনই বোমটি বিষ্ফোরিত হয়। লেটার বোম, মেইল বোম, প্যাকেজ বোম, নোট বোম, মেসেজ বোম, গিফট বোম, প্রেজেন্ট বোম, ডেলিভারি বোম, সারপ্রাইজ বোম, পোস্টাল বোম, পোস্ট বোম ইত্যাদি নানা নামে এটি পরিচিত।

মোসাদের সদস্যরা সেসব বিজ্ঞানীদের পরিবারের সদস্যদের কাছে যেত। হুমকি দিয়ে জানাতো যে, সেই বিজ্ঞানীরা যেন শীঘ্রই ইউরোপে ফিরে যায়, নাহলে…। ভবিষ্যৎ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী য়ীতঝাক শামিরের নেতৃত্বে ছোট একটি দল পাঠিয়েছিলো মোসাদ। তবে জনবল বৃদ্ধির তাগিদে ইসরায়েলি সিকিউরিটি এজেন্সি ‘শিন বেত’-এর সদস্যরাও এতে অংশ নিয়েছিলো। সাবেক নাৎসি গোয়েন্দা অটো স্কোরজেনি মোসাদের সাথে স্বদেশীদের বিরুদ্ধে সেই গোপন অভিযানগুলোতে অংশ নেয়।

গোপন সেসব অভিযানে জার্মান বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে মোসাদের অভিযানের কিছু উদাহরণ তুলে দিচ্ছি এখন।

  • ১৯৬২ সালের ২৭ নভেম্বর রকেট বিজ্ঞানী ওলফগ্যাং পাইলজের অফিসে একটি পার্সেল বোম পাঠানো হয়েছিলো, যার বিষ্ফোরণে আহত হয় তার সহকারী।
  • হেলিওপোলিস রকেট ফ্যাক্টরিতে পাঠানো পার্সেল বোমের বিষ্ফোরণে মারা যায় পাঁচজন মিশরীয় কর্মী।
  • মিশরে ইলেকট্রনিক্স নিয়ে কাজ করছিলেন পশ্চিম জার্মানির এক প্রফেসর। দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানির শহর লোরাখে তার উপর গুলি চালায় মোসাদের এক এজেন্ট। কিন্তু গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে গাড়িতে করে পালিয়ে যায় সেই এজেন্ট।
  • মিশরে মিলিটারি হার্ডওয়্যার সরবরাহের জন্য কাজ করছিলো মিউনিখভিত্তিক এক প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান ছিলেন ৪৯ বছর বয়সী হেইঞ্জ ক্রুগ। ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি হঠাৎ করেই একেবারে হাওয়া হয়ে যান। আমেরিকান সাংবাদিক ড্যান রাভিভ এবং ইসরায়েলি সাংবাদিক ইয়োসি মেলম্যানের মতে অটো স্কোরজেনি খুন করেছিলো ক্রুগকে।
  • হ্যান্স ক্লেইনওয়েখটার নামক আরেক রকেট বিজ্ঞানীকে ১৯৬৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে টার্গেট করেছিলো মোসাদ, যিনি এককালে ভি-২ প্রজেক্টে কাজ করেছিলেন। কিন্তু মিশনের সময় অস্ত্রে গন্ডগোল দেখা দেয়ায় বেঁচে যান হ্যান্স।

ফ্যাক্টরি ৩৩৩-এ কাজ করতেন পশ্চিম জার্মানির এক ইলেকট্রিক গাইডেন্স এক্সপার্ট, নাম তার পল-জেন্স গোয়ের্ক। পলের মেয়ে হেইডি গোয়ের্ককে হুমকি দিয়েছিলো মোসাদের দুই এজেন্ট জোসেফ বেন-গাল এবং অটো জক্লিক। তারা জানায় যে, পল যদি শীঘ্রই জার্মানি ফিরে না যায়, তাহলে তার পরিবারের কপালে শনি আছে। কিন্তু শনি আসলে লেখা ছিলো দুই এজেন্টের কপালেই। হেইডিকে জোর করা এবং বিদেশী রাষ্ট্রে অবৈধ অপারেশন চালানোর অভিযোগে তাদের দুজনকে সুইজারল্যান্ডে গ্রেফতার করা হয়।

এরপর সুইজারল্যান্ডের গোয়েন্দারা তদন্ত শুরু করলে থলের বেড়াল বেরিয়ে আসে। জানা যায় যে, ক্রুগের অপহরণ ও হ্যান্সের হত্যাচেষ্টার সাথে জড়িত ছিলো এই দুজনই। এভাবে হঠাৎ করে নিজেদের গোপন অভিযানের কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ক্ষুণ্ণ হয় ইসরায়েলের ভাবমূর্তি, তবে তারা প্রকাশ্য দিবালোকে এ সংক্রান্ত সকল অভিযোগ করেছিলো!

জার্মানির সাথে সম্পর্ক খারাপ হবে বিধায় মোসাদকে থামার নির্দেশ দেন ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন। মোসাদের তৎকালীন প্রধান ইজার হারেলকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তার উত্তরসূরি মেইর আমিত ঘোষণা দেন যে, হারেল আসলে মিশরের রকেট প্রোগ্রাম নিয়ে একটু বেশিই কল্পনা করে ফেলাতেই এমন গন্ডগোলটা বেধেছিলো! ওদিকে হারেল পদত্যাগ করায় চাকরিতে ইস্তফা দেন য়ীতঝাক শামিরসহ আরো কয়েকজন। এর তিন মাস পর পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী নিজেও।

ক্রমাগত মৃত্যুভয় আর কূটনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে অবশেষে ১৯৬৩ সালের শেষ নাগাদ বিজ্ঞানীরা সবাই নিজ নিজ দেশে ফিরে যান। ১৯৬৭ সালের দিকে এসে মিশরের রকেট প্রজেক্ট একপ্রকার স্থবিরই হয়ে যায়। পরবর্তীতে রকেটের জন্য মিশর সোভিয়েত ইউনিয়নেরই দ্বারস্থ হয়েছিলো। দেশটি থেকে তারা তখন স্কাড-বি রকেট কিনেছিলো।

মিশরে মোসাদের গোয়েন্দাগিরি

ওলফগ্যাং লজ মোসাদের সেলিব্রেটি গোয়েন্দাদের একজন। তিনি ছিলেন জার্মানী ইহুদি। ১৯৩৩ সালে মাইগ্রেট হয়ে ফিলিস্তিনে চলে আসেন। হিব্রু,আরবী ও ইংলিশে পারঙ্গম এই গোয়েন্দা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেন। যুদ্বশেষে প্রথমে সন্ত্রাসী সংগঠন হাগানাতে যোগ দেয় এবং পরবর্তীতে মোসাদে যোগ দেন। মিশরে গোয়েন্দাগিরীর জন্য তাকে সিলেক্ট করা হয়।

সে মিশরের এলিট ঘোড়ার রেইস খেলায় যোগ দেয়। সেখানে মিশরের বড় বড় কর্তাব্যক্তি, সেনাবাহিনীর সদস্যরা খেলতে আসতো। লজ কে দেখতে জার্মানদের মত লাগার কারণে আর অতি চালাক ও মিষ্টভাষী হওয়ায়, অল্পতেই সে তাদের সাথে খাতির যুগিয়ে ফেলে। সে প্রায়ই বলতো ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় সে একনায়ক হিটলারের দুর্ধর্ষ জেনারেল রোমেলের পক্ষ হতে যুদ্ধ করেছে। ওলফগ্যাং লজ সবসময় মিশরের বড় বড় কর্তাব্যক্তিদের থেকে গোপন স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করে তা রেডিও সিগনালের মাধ্যমে সে মিশর হতে ইজরাইল পাঠাতো। এভাবে অনেক হাইলি ক্লাসিফাইড তথ্য সে পাচার করে। সেভাবে মোসাদ মিশরে অপারেশন করতো। একসময় মিশর তা বুজতে পারে, গোয়েন্দা নিযুক্ত করে। কিছুদিন পরেই তথ্য পাঠানোর সময় রেডিও সিগন্যাল ট্র্যাকিং এর মাধ্যমে ধরে ফেলে তাকে। পরে ১৯৬৭ এর যুদ্ধে বন্দী হওয়া ৯ জন মিশরীয় জেনারেলের বিনিময়ে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

১৯৬৭ সালের আরব-ইজরাইল যুদ্ধ মোসাদ…..

১৯৬৭ সালের যুদ্বে মোসাদের অতি মূল্যবান যন্ত্রের সাহায্যে মিশরের গতিবিধি নজরে রাখা হত, পরে একদিন সকালে সাতটা হতে আটটার মধ্যে, যে সময় মিশরের এয়ার ফোর্সের বেশীর ভাগই নাস্তা খায় এবং শিফট চেঞ্জ হয়, ঐ সময় ইসরাইল এট্যাক করে বসে। যুদ্ধের জন্য তৈরী থাকা ৩০০ এর ও বেশী বিমান ধ্বংস হয়ে যায়। মাত্র ৬ দিন যুদ্ধ করতে পারে আরবরা, যুদ্বের পুরো কৃতিত্বই গোয়েন্দা সংস্থার। তাছাড়া ১৯৬৯ সালের ১৯ জুলাই মিসরের ছোট দ্বীপ গ্রিন আয়ারল্যান্ডে ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্স আকস্মিক হামলা চালায়। মোসাদ এই অভিযানের নাম দেয় অপারেশন বালমাস সিক্স। পরবর্তী সময়ে অনেক ইসরাইলি ইহুদি ও পর্যটকরা সিনাই হতে মিসর আসে অবকাশ যাপনের জন্য। মোসাদ নিয়মিত এসব পর্যটকের নিরাপত্তা দেখভালের জন্য গোয়েন্দা পাঠাত। ধারণা করা হয় এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে লেবানন যুদ্ধ সঙ্ঘটিত হয়।

অপারেশন র‍থ অব গড…..

১৯৭২-এর মিউনিখ গণহত্যা

খেলোয়াড়দের কৃতিত্বের জন্য নয়, ১৯৭২-এর মিউনিখ অলিম্পিক্স স্মরণীয় হয়ে থাকবে মিউনিখ গণহত্যার জন্য। খেলার বিশ্বে এ এক গভীর ক্ষত। ৫ সেপ্টেম্বর প্যালেস্তিনীয় জঙ্গি সংগঠন ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’-এর আট সদস্য অলিম্পিক ভিলেজে ঢুকে পড়ে ১১ জন ইজরায়েলি ক্রীড়াবিদ, প্রশিক্ষক ও কর্মকর্তাকে পণবন্দি করে। তাঁদের মধ্যে দু’জন প্রতিবাদ করলে তাঁদের হত্যা করা হয়। পরে বাকি ৯ জন পণবন্দিকেও মেরে ফেলা হয়।   ২১ ঘণ্টার এই ঘটনাবলি গোটা বিশ্বের কাছে দুঃস্বপ্নের স্মৃতি হয়ে থাকবে।

৪ তারিখের রাতটা ভালোই কেটেছিল ইজরায়েলি  অ্যাথলিটদের। রাতে ‘ফিডলার অন দ্য রুফ’ সিনেমা দেখা হয়েছে হইহই করে। তখন কি কেউ ভেবেছিলেন ভোরেই পালটে যাবে ছবিটা? ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’-এর আট জঙ্গি ২ মিটার উঁচু পাঁচিল ডিঙিয়ে চলে এল অলিম্পিক ভিলেজে। পশমের ব্যাগে কালাশনিকভ অ্যাসল্ট রাইফেল, গ্রেনেড আর টোকারেভ পিস্তল নিয়ে তারা ঢুকে পড়ল ৩১ কোনোলিস্ট্রাসেতে। আগে থেকেই ঘরের চাবি হাতিয়ে রেখেছিল তারা। ১ ও ৩ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের পণবন্দি করে ফেলল তারা। বাধা দিতে গিয়ে ২ জন খুন হয়ে গেল। কেউ কেউ জানলা দিয়ে পালিয়ে যেতে পারল। বাকি ৯ জন ইজরায়েলি বন্দি হল প্যালেস্তিনীয় জঙ্গিদের হাতে। জঙ্গিরা সবাই প্যালেস্তিনীয় উদ্বাস্তু শিবিরের মানুষ। কী ভাবে আক্রমণ চালানো যায় তার ঘাঁতঘোত বুঝতে কিছু দিন কাজ করে গিয়েছিল অলিম্পিক ভিলেজে।

জঙ্গিদের দাবি, ইজরায়েলের জেলে বন্দি ২৩৪ জন প্যালেস্তিনীয় ও নন-আরবকে মুক্তি দিতে হবে এবং জার্মান রেড আর্মি গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য আন্দ্রিয়াস বাডেয়ার ও উলরিকে মাইনহফকেও ছেড়ে দিতে হবে। তারা যে তাদের দাবি আদায়ে কত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তা বোঝাতে কুস্তি-কোচ মোশে ভাইনবেয়ার্গের মৃতদেহটা সামনের দরজা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল। ওই অ্যাপার্টমেন্টেই ছিলেন হংকং ও উরুগুয়ের স্কোয়াড। তাঁদের অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দিল জঙ্গিরা।

Olympic-Flashback-Mun_Horo-2

কিন্তু জঙ্গিদের দাবি মানতে নারাজ ইজরায়েল। তখনকার ইজরায়েলি সরকারের মনোভাব ছিল, কোনও ভাবে এক বার জঙ্গিদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করা হলে ছুতোয়নাতায় জঙ্গিদের আক্রমণ বাড়বে। ইজরায়েল জার্মানিতে তাদের স্পেশ্যাল ফোর্সেস-এর একটা ইউনিট পাঠাতে চাইল। কিন্তু জার্মানি চ্যান্সেলর ভিলি ব্রান্ডট তা অস্বীকার করলেন। জার্মানি বিপুল অংকের মুক্তিপণ দিতে চাইল। কিন্তু জঙ্গিরা অর্থের বিনিময়ে পণবন্দিদের ছাড়তে রাজি নয়।

বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ জার্মান বর্ডার পুলিশের ৩৮ জনকে অলিম্পিক ভিলেজে পাঠানো হল। ওঁদের পরিকল্পনা ছিল ভেন্টিলেশন শ্যাফট দিয়ে ঢুকে জঙ্গিদের মেরে ফেলা। টিভিতে এই পরিকল্পনা দেখিয়ে দেওয়ার ফলে তা ভেস্তে গেল। ইতিমধ্যে সন্ধে ৬টা নাগাদ প্যালেস্তিনীয় জঙ্গিরা নতুন দাবি তুলল, তাদের কায়রো নিয়ে যেতে হবে। কায়রো-দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে, এমন একটা ভান করল জার্মান কর্তৃপক্ষ। ন্যাটোর বিমানঘাঁটি ফ্যুয়রস্টেনফেল্ডব্রুক-এ নিয়ে যাওয়ার জন্য দু’টো বেল ইউএইচ-১ সেনা হেলিকপ্টার পাঠানো হল। জঙ্গিরা অবশ্য মিউনিখের কাছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রিয়েমে যেতে চেয়েছিল। মধ্যস্থতাকারীরা তাদের বুঝিয়েছিল, ফ্যুয়রস্টেনফেল্ডব্রুক-ই সুবিধাজনক জায়গা। দু’টো হেলিকপ্টারে পণবন্দি ও জঙ্গিদের নিয়ে যাওয়া হল। পিছন পিছন চলল তৃতীয় একটি হেলিকপ্টার জার্মান কর্তৃপক্ষস্থানীয়দের নিয়ে। আসলে ছক ছিল, বিমানঘাঁটিতে সশস্ত্র হামলা করে জঙ্গিদের কাবু করা হবে।

ফ্যুয়রস্টেনফেল্ডব্রুক বিমানঘাঁটিতে দু’ ঘণ্টা ধরে জার্মান স্নিপারদের গুলি বর্ষণ চলল। তাতে দু’ জন জঙ্গি ও এক জন জার্মান পুলিশ মারা যায়। যে হেলিকপ্টারে পণবন্দিরা ছিল তাতে গ্রেনেড ছুড়ে তিন জন পণবন্দিকে মেরে ফেলে জঙ্গিরা। বাকি পণবন্দি-সহ অন্য হেলিকপ্টারটি উড়িয়ে দেয় এক জঙ্গি। সবাই মারা যান। এই লড়াইয়ে ৫ জন জঙ্গিরও প্রাণ যায়। ৩ জন ধরা পড়ে।

মাস দুয়েক পরে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর একটি লুফত্‌হানসা বিমান ছিনতাই করে ধৃত তিন জনকে ছাড়িয়ে নেয়। জানা গিয়েছে, এদের মধ্যে দু’ জনকে ইজরায়েলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ পরে মেরে ফেলে।

munich-athletes

অলিম্পিক ভিলেজে আক্রমণের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গেমস বন্ধ হয়ে যায়। তবে পণবন্দি-নাটকের যবনিকা পড়েছে, জানতে পারার পর আইওসি-র প্রেসিডেন্ট অ্যাভেরি ব্রুন্ডেজ ঘোষণা করেন, “গেমস চলবে।” অলিম্পিক স্টেডিয়ামে একটি স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। তার পর প্রতিযোগিতা চালু হয়ে যায়।

ঘটনাটি প্রতিক্রিয়া ছিলো অতি মাত্রায় ভয়াবহ। অলিম্পিকে এই হানাদারির ঘটনার পর থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বেশি জোরদার করা হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জার্মান সরকারও তাদের সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী নীতির পরিবর্তন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জার্মানি এ ব্যাপারে একটা শান্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলেছিল। এবার তারা অনেকটা ব্রিটিশ এসএএস-এর আদলে জিএসজি ৯ নামে কাউন্টার–টেরোরিস্ট ইউনিট প্রতিষ্ঠা করে। মিউনিখ গণহত্যার জেরে ইজরায়েলও এক আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন র‍থ অব গড’।

এই অপারেশন চলাকালীন সারা ইউরোপ থেকে ওই জঙ্গিদের খুঁজে খুঁজে বার করে হত্যা করেছিল মোসাদের এজেন্টরা। আর এক একজনকে মারার কৌশলও ছিল চমকপ্রদ। যেমন কুরআন শরিফের মধ্যে রাখা হয়েছিল বোমা। যা খুলতেই বিস্ফোরণে এক জঙ্গির মৃত্যু হয়েছিল। ১৯৭২ হতে ১৯৭৩ পর্যন্ত এই গুপ্তহত্যার কাজ চলতে থাকে। এই ১০ বছর ধরে প্রায় ১২ জন জঙ্গিকে খুঁজে খুঁজে তাদের মেরেছিল মোসাদ। তাছাড়া মিউনিখ গণহত্যায় জড়িত থাকার সন্দেহে বহু প্যালেস্তিনীয়কে খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয়। পিএলওর নেতারা প্রায় দিশা হারাবার উপক্রম। ইউরোপ জুড়ে মোসাদের এই হান্টিং ডাউনে ভুলক্রমে নরওয়েতে এক নিরীহ মরোক্কোর ওয়েটারকে হত্যা করে ফেলে মোসাদ। নরওয়ের পুলিশ ৬ মোসাদ এজেন্টকে গ্রেফতার করে। এত কিছুর পরেও গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে আজও অপারেশন র‍থ অব গড’ কে ‘এপিক’ বলে মনে করা হয়।

অপারেশন এন্টাবে

মিশরের শার্ম আল শেখ থেকে রাতের আঁধারে, সকলের চোখে ধুলো দিয়ে একত্রে আকাশে উড়লো চারটি সি-১৩০ হারকিউলিস বিমান। তাদের পেছন পেছন আকাশে উড়লো আরো দুটি বোয়িং-৭০৭ বিমান, যাদের একটির মধ্যে ছিল চিকিৎসা সামগ্রী আর অপরটিতে ছিলেন অপারেশনের সেনাপতি জেনারেল ইয়েকুতেই অ্যাডাম। বিমানগুলো লোহিত সাগরের উপর দিয়ে আন্তর্জাতিক আকাশসীমার মধ্য দিয়ে উড়ে চললো। তবুও মিশরীয়, সুদানিজ কিংবা সৌদি আরবের বিমান বাহিনীর রাডারে ধরা পড়লো না। কারণ রাডারের শনাক্তকরণ এড়াতে সেগুলো উড়েছিল সমুদ্রপৃষ্ঠের মাত্র ১০০ ফুট উপর দিয়ে!

এন্টাবে অপারেশনে ব্যবহৃত একটি সি-১৩০ হারকিউলিস বিমান; source: 20thcenturyaviationmagazine.com

আন্তর্জাতিক সময়ে তখন রাত এগারোটা বাজে। একটি সি-১৩০ অবতরণ করলো উগান্ডার এন্টাবে বিমানবন্দরে। চিকিৎসা সামগ্রী বহনকারী বিমানটি জ্বালানির জন্য অবতরণ করে কেনিয়ার নাইরোবি বিমানবন্দরে। একে পাহারা দিচ্ছিলো অপর তিনটি হারকিউলিস বিমান, যেগুলোর মধ্যে ছিল কমান্ডো সৈন্যদের কয়েকটি ইউনিট। আর জেনারেল অ্যাডামের বিমানটি এন্টাবে এয়ারপোর্টের উপরে আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছিলো পুরো অপারেশন নজরদারি করতে। এদিকে কার্গো বিমানটির পেছনদিকের বিশাল দরজাটি অবতরণের আগেই খোলা হয়। কোনোরকম কালক্ষেপণ না করেই কার্গো থেকে নেমে আসে একটি সুদৃশ্য কালো মার্সিডিজ গাড়ি। গাড়িটি ঠিক উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইদি আমিনের গাড়ির মতোই! একই সময়ে এই গাড়ির সাথে যোগ দেয় আরো চারটি ল্যান্ড রোভার। গাড়িবহর ধীরে ধীরে এগোতে থাকে এন্টাবে বিমানবন্দরের পুরোনো টার্মিনালের দিকে, ঠিক যেভাবে ইদি আমিনের গাড়ি বহর এগোয় সেভাবে। তবে এই বহর প্রেসিডেন্টের গাড়িবহর ছিল না। গাড়িতে ছিল একদল ইসরায়েলি প্যারাকমান্ডো, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বড় ভাই ইয়োনাথান নেতানিয়াহু।

এন্টাবে বিমানবন্দরের পুরনো টার্মিনাল ভবন। গুলির ছাপ এখনো স্পষ্ট; source: Wikimedia.Commons

প্রেসিডেন্টের গাড়িবহর দেখলে টার্মিনালের সিকিউরিটি গার্ডরা সহজেই ছেড়ে দেবে, এটাই তো হবার কথা। কিন্তু গার্ডদের স্পষ্ট মনে আছে যে কিছুদিন আগেই ইদি আমিন একটি সাদা মার্সিডিজ ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। তাই কালো দেখেই সন্দেহ হলো। কিন্তু গাড়ি সার্চ করার আগেই সাইলেন্সার লাগানো রিভলভার থেকে গুলি করে নিঃশব্দে হত্যা করা হলো দুজন গার্ডকে। গাড়িবহর কোনো বিপত্তি ছাড়াই পুরনো টার্মিনালের দিকে এগোয়, যেখানে রয়েছে জিম্মিরা। আক্রমণের পরিকল্পনা পূর্বনির্ধারিত। কোনোরকম ভুলের অবকাশ নেই। একটু এদিক ওদিক হলেই মারা পড়তে পারে একাধিক জিম্মি। তাই কমান্ডোরা সবধরনের সতর্কতা অবলম্বন করলেন। অন্যদিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসা গাড়িবহরের কথা টেরও পায়নি হাইজ্যাকাররা। তার জানতো না যে খুব শীঘ্রই তারা মারা পড়তে যাচ্ছে।

এই মার্সিডিজ গাড়িটিই ব্যবহার করা হয়েছিল ইদি আমিনের গাড়ি হিসেবে ধোঁকা দিতে; source: Ynetnews.com

গাড়িবহর টার্মিনালের কাছে পৌঁছামাত্র প্যারাকমান্ডোরা গাড়ি থেকে দ্রুত বাইরে নেমে আসে এবং ঝড়ের বেগে টার্মিনালের মেইন হলের দিকে এগিয়ে যায় যেখানে জিম্মিরা ছিল। মেইন হলে গিয়েই তারা মাইকে ইংরেজি এবং হিব্রুতে জিম্মিদেরকে মাটিতে শুয়ে পড়ার আহ্বান জানায় এবং নিজেদের পরিচয় দিয়ে আশ্বস্ত করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এক ফরাসি যুবক ইংরেজি বা হিব্রু কোনোটিই জানতো না এবং হুট করে দাঁড়িয়ে যায়। কমান্ডোরা তাকে হাইজ্যাকার মনে করে মুহূর্তে গুলি করে হত্যা করে। এরই মাঝে অপহরণকারীদের একজন, উইলফ্রেড বোস মেইন হলে প্রবেশ করে এবং কমান্ডোদের দিকে গুলি চালায়। কমান্ডোরা পাল্টা গুলি করে বোসকে হত্যা করে। শ্বাসরুদ্ধকর গোলাগুলি চলে ত্রিশ মিনিট যাবত। মেইন হলে চারজনকে হত্যা করে পাশের কামরায় থাকা বাকি তিন সন্ত্রাসীকেও গুলি করে হত্যা করে কমান্ডোরা। গোলাগুলির প্রচণ্ড শব্দে দিশেহারা হয়ে একজন জিম্মি দৌড়ে টার্মিনালের বাইরে বেরোতে গেলে হাইজ্যাকারদের গুলিতে নিহত হয়। আহত হয় আরো এক জিম্মি। আর এরই সাথে সফলভাবে শেষ হয় অপারেশন ‘রেইড অন এন্টাবে’। ১০২ জন বন্দীকে অক্ষত শরীরে উদ্ধার করা হয়। তবে নাটকের শেষটা তখনও বাকি!

সফল অভিযান শেষে ইসরায়েল পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে উল্লাসে মেতে ওঠে সাধারণ মানুষ ও জিম্মিদের আত্মীয়-স্বজনেরা; source: Star.kiwi

ঘটনার সূত্রপাত ইতিহাসের বৃহত্তম বিমান ছিনতাই থেকে। ১৯৭৬ সালের ২৭ জুন ইসরায়েলের তেল আবিব বিমানবন্দর থেকে ২৪৬ জন যাত্রী ও ১২ জন ক্রু নিয়ে উড্ডয়ন করে ‘এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট-১৩৯’। যাত্রাপথে গ্রীসের এথেন্স বিমানবন্দর থেকে আরো ৫৮ জন যাত্রী তোলে বিমানটি। এথেন্স থেকে রওনা হয় প্যারিসের উদ্দেশে। কিন্তু এই ৫৮ জনের মাঝে দুর্ভাগ্যক্রমে চারজন সন্ত্রাসী ছিল। এদের দুজন ‘পপুলার ফ্রন্ট ফর লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন’ এর সদস্য। অন্য দুজন জার্মানির গেরিলা সংগঠন ‘রেভ্যুলশনারি সেলস’ এর গেরিলা যোদ্ধা উইলফ্রিড বোস এবং ব্রিজিত কুলমান। উড্ডয়নের মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় হাইজ্যাকাররা বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং প্যারিসের বদলে লিবিয়ার বেনগাজিতে চলে যায়। সেখানে জ্বালানি সরবরাহের পর পুনরায় আকাশে উড়ে ফ্লাইট-১৩৯ এবং ২৮ জুন উগান্ডার এন্টাবেতে গিয়ে পৌঁছে।

এন্টাবেতে উগান্ডান বাহিনী হাইজ্যাকারদের সহায়তা করে। আরো তিনজন হাইজ্যাকারের সাথে যোগ দেয়ার জন্য অপেক্ষারত ছিল সেখানে। তারা জিম্মিদের এন্টাবে বিমানবন্দরের পরিত্যক্ত টার্মিনাল ভবনে সরিয়ে নেয় এবং সেখানে প্রহরায় রাখে। ইদি আমিন তখন প্রতিদিনই একবার এসে হাইজ্যাকারদের সাথে দেখা করে যেতেন। সেদিনই সন্ধ্যায় তারা বন্দীদের মুক্তির দুটি শর্ত উপস্থাপন করে।

  • ফ্লাইট-১৩৯ বিমানের জন্য পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মুক্তিপণ।
  • ইসরায়েলের কারাগারে বন্দী ৪০ জন সহ মোট ৫৩ জন বন্দীর মুক্তি।
  • ১ জুলাইয়ের মধ্যে শর্ত পূরণ না হলে জিম্মিদের হত্যা করা শুরু হবে।

ইয়োনাথান নেতানিয়াহু; source: Indiatimes.com

এই বিমান অপহরণ এবং জিম্মির ঘটনায় বিশ্ব রাজনীতি ততদিনে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইউরোপিয়ান দেশগুলো ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও আরব দেশগুলো ছিল নিশ্চুপ। এরই মাঝে এই শর্তগুলো প্রকাশিত হলে দ্রুত দর কষাকষি শুরু করে ইসরায়েলি মন্ত্রীসভা। তবে অপহরণের ৪৮ ঘন্টা পর, ৩০ জুন ঠিক ৪৮ জন জিম্মিকে মুক্তি দেয় অপহরণকারীরা। এই ৪৮ জনের কেউই ইসরায়েলি কিংবা ইহুদি ছিল না। এদিকে পহেলা জুলাই চলে আসলেও ইসরায়েলি মন্ত্রীসভা কোনো নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারেনি। তারা তৎকালীন মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতের মাধ্যমে ইদি আমিনের সাথে কূটনৈতিক আলাপ আলোচনা করেন। তাতেও কাজ না হলে ইসরায়েল সরকার ১ জুলাই অতিরিক্ত সময়ের আবেদন করে অপহরণকারীদের নিকট। অপহরণকারীরা ইদি আমিনের অনুরোধে এই সময় ৪ জুলাই বিকাল পর্যন্ত বর্ধিত করে এবং একইসাথে আরো ১০০ অ-ইসরায়েলিকে মুক্তি প্রদান করে। এই ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনকে সেদিনই প্যারিস নিয়ে যাওয়া হয়। ডোরা ব্লচ নামক একজন ব্রিটিশ ইহুদীকে অসুস্থতার জন্য প্যারিস না পাঠিয়ে কাম্পালার এক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

১ জুলাই ইসরায়েলের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বের হয় যে মন্ত্রিসভা বন্দীদের মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। এই গুজবের সত্যতা যদিও জানা যায় না, তবে সিনেমার দুর্দান্ত সব সেনা অভিযানের মতোই এক দুঃসাহসিক উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হয় মোসাদ। হ্যাঁ, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা মন্ত্রিসভাকে আশ্বস্ত করে যে তারা জিম্মিদের মুক্ত করে নিয়ে আসতে নিখুঁত এক পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। তাদের পরিকল্পনায় ১০০ জন প্যারাকমান্ডো যোগ দেবে ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক উদ্ধার অভিযানে।

অপহৃত হওয়া সেই ফরাসি বিমানটি; source: commons.wikimedia.org

অভিযানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দুটি বিষয়, তা হচ্ছে বন্দীদের সঠিক অবস্থান এবং হাইজ্যাকারদের নির্ভুল সংখ্যা। এক্ষেত্রে মোসাদ তাদের অবিশ্বাস্য নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। তারা টার্মিনাল ভবনের নকশা উপস্থিত করে এবং হাইজ্যাকারদের সংখ্যা নিশ্চিত করে। এ দুটো নিশ্চিত হবার পর বাকি কাজটা কমান্ডোদের জন্য সহজ হয়ে যায়। চারটি সি-১৩০ কার্গো বিমান এবং দুটি বোয়িং-৭০৭ বিমান নেয়া হয়। মোট ১০০ জন কমান্ডো সদস্য এন্টাবেতে গেলেও তাদের মধ্যে ২৯ জনের একটি অ্যাসাল্ট ইউনিটই মূল অপারেশন পরিচালনা করে। এই ইউনিটের নেতৃত্বে ছিলেন ইয়োনাতান নেতানিয়াহু। উগান্ডান বাহিনীর আক্রমণ থেকে এই ইউনিটকে রক্ষা করার জন্য কর্ণেল মাতান, কর্ণেল উরি এবং মেজর শলের নেতৃত্বে আরো তিনটি ইউনিট উপস্থিত ছিল এন্টাবেতে। তাছাড়া আকাশে এন্টাবেকে প্রদক্ষিণ করতে থাকা একটি বোয়িং এ জেনারেল অ্যাডাম ছাড়াও ছিলেন বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ড্যান শরমন, যিনি এই পুরো অভিযানের সার্বিক পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন।

অপারেশন সফল হলে কমান্ডোরা দ্রুত জিম্মিদের বিমানে তুলতে থাকে। এ সময় তারা উগান্ডার বেশ কিছু মিগ বিমান ধ্বংস করে দেয়, যেন উগান্ডান বিমান বাহিনী তাদের পিছু নিতে না পারে। তবে জিম্মিদের বিমানে তোলা শেষ হবার আগেই তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে উগান্ডার সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য। শুরু হয় দ্বিতীয় দফায় গোলাগুলি। এবার আগেরবারের চেয়ে আরো কম সময় গোলাগুলি চলে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল বেশি। ৪৫ জন উগান্ডান সেনা সদস্য মারা যায়। কমান্ডোদের অ্যাসাল্ট ইউনিটের প্রধান ইয়োনাথান নেতানিয়াহু মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আহত হয় আরো পাঁচ কমান্ডো সদস্য। সবাইকে বিমানে ওঠানো শেষ হলে কমান্ডোরা এন্টাবে ছেড়ে ইসরায়েলের উদ্দেশে যাত্রা করে।

উগান্ডার একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মিগ বিমান; source: newvision.co.ug

এই অভিযানে ক্ষিপ্ত হয়ে উগান্ডান কয়েকজন সেনা সদস্য কাম্পালায় থাকা সেই ব্রিটিশ ইহুদী ডোরাহ ব্লচকে হত্যা করে। পাঁচদিন পর, ৯ জুলাই, ১৯৭৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠক বসে। সেখানে ইসরায়েলকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘনকারী বলে অভিহিত করেন উগান্ডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওরিস আবদুল্লাহ। তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডহেইমও এই ঘটনাকে একটি সদস্য রাষ্ট্রের ‘সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে ঘোষণা দেন। লিবিয়া, বেনিন, তানজানিয়া, মিশর এই অভিযানের সমালোচনা করে। ইউরোপীয় দেশগুলো অন্যদিকে এই অভিযানকে প্রয়োজনীয়তা বলে উল্লেখ করে।

অপারেশন ‘রেইড অন এন্টাবে’র যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতির তালিকা-

  • তিনজন জিম্মি মারা যায় এবং আহত হয় ১০ জন।
  • হাইজ্যাকারদের সাতজনই মারা যায়।
  • কমান্ডো বাহিনীর একজন মারা যায়, পাঁচজন আহত হয়।
  • ৪৫ জন উগান্ডান সেনা সদস্য মারা যায়, ধ্বংস হয় ৩০টি সোভিয়েত নির্মিত মিগ বিমান।

ক্ষয়ক্ষতি আর তাৎক্ষণিক বিশ্ব জনমত, সবকিছু ইসরায়েলের পক্ষেই ছিল। মাঝে হাইজ্যাকারদের সাথে মিত্রতা রাখতে গিয়ে অধিক ক্ষতির সম্মুখীন হয় উগান্ডা। তবে সবকিছু বিবেচনা করে এই অপারেশনকে পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদ্ধার অপারেশন বলে গৌরবান্বিত করা হয়। তৎকালীন প্রায় সকল শক্তিশালী দেশই এই অভিযানের প্রশংসা করে এবং বিস্ময়ও প্রকাশ করে বটে। আমেরিকান সেনাবাহিনীর কমান্ডো অপারেশন ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’ এই এন্টাবে অপারেশন দ্বারাই উদ্বুদ্ধ হয়। তবে ঈগল ক্ল ব্যর্থ হয়েছিল। তথাপি ‘রেইড অন এন্টাবে’ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক সাহসী দৃষ্টান্ত হিসেবে যুগে যুগে অনুপ্রেরণা যোগাবে।

অপারেশন অর্চার্ড

বাশার আল-আসাদ ২০০১ সালে একটি গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদে স্থায়িত্ম অর্জন করেন। তবে অনেকেই জানেনা যে, সিরিয়া সংবধানমতে একটি সংসদীয় প্রজাতন্ত্র হলেও ১৯৬৩ সাল থেকে দেশটিতে একটি জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে এবং বর্তমানে এর জনগণের সরকার পরিবর্তনের কোন ক্ষমতা নেই। দেশটি তাই কার্যত একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
ঘটনার ভুমিকাঃ
…………………………………
২০০১ সালে সিরিয়ায় বাশারের ক্ষমতায় আরোহনের পর, উত্তর কোরিয়ার কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি “ব্যাবসায়িক ট্যুর” সফর করে। ইসরায়েলী মিলিটারি গোয়েন্দা সংস্থা আমান অনুমান করে তারা পারমানবিক বোমা নিয়ে কোন চুক্তি করেছে কিন্তু মোসাদ তা নাকচ করে দেয়। ২০০৪ সালে সিআইএ উত্তর কোরিয়ার এবং সিরিয়ার মাঝে কিছু ফোন কল ট্র্যাস করে, যার উৎপত্তি ছিল সিরিয়ার উত্তর পুর্ব দিকে অবস্থিত আল-খিবার। ইসরায়েল সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-৮২০০ এই এলাকা তাদের ওয়াচ লিস্টে নিয়ে নেয়।
ঘটনার সুত্রপাতঃ
…………………………………
এপ্রিল ২২, ২০০৪, প্রতিদিনের মতই উত্তর কোরিয়ার সবার ঘুম ভেঙ্গে ছিল। সকালের একটু পরেই উত্তরাঞ্চলের Ryonchon এলাকায় হটাৎ এক ট্রেন বিস্ফোরিত হয়। ধরনী কেপে উঠে এবং সেটা এতটাই ভয়াবহ যে রিখটার স্কেলে তা ৩.৬ মাত্রার একটি ভুমিকম্প তৈরি করে আশেপাশে। গোটা একটি এলাকা ধ্বংস হয়। ১০ হাজার মানুষের বসবাসের এলাকা নষ্ট হয়। কয়েকশ মানুষ মারা যায়। দুই হাজার হতাহত হয়। নর্থ কোরিয়ার সরকারের বক্তব্য ছিল, ট্রেনে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম ছিলো, যার কারণে এই বিস্ফোরণ ঘটে!!
এই ঘটনার পর যাতে কেউ ট্রেস করতে না পারে গোটা উত্তর কোরিয়ার মোবাইল নেটওয়ার্ক ৫ বছরের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয় !
২০০১ থেকেই উত্তর কোরিয়ার উপর একটি বিশেষ গোয়েন্দাসংস্থা ৫০০০ মেইল দূর থেকেই বেশভালো মতই নজর রাখছিল।
হ্যাঁ মোসাদ।
বিস্ফোরনের পরই পুরো এলাকা সীল করে দেওয়া হয়। পুরো এলাকা তন্ন তন্ন করে ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয় এবং বিশেষ স্প্রে করা হয় যাতে উৎকট কোন গন্ধ না থাকে।
এরকিছু দিন পরই সিরিয়ান এক এয়ারক্রাফট কোরিয়ায় ল্যান্ড করে। মোসাদ নেড়েচড়ে বসে। সবাই ভেবেছিল সিরিয়া হয়ত বন্ধুত্বসুলভ ত্রান সাহায্য পাঠিয়েছে। কিন্তু ঘটনা তখনই মোসাদ আঁচ করতে পারে যখন দেখা যায় রেডিয়েশন প্রটেক্টেড ইউনিফর্ম পড়ে বিমানে বড় বড় কিছু বাক্স তোলা হচ্ছে। আসলে সেগুলো ছিল সিরিয়ান বৈজ্ঞানিকদের লাশ! সে সময় তারা এটাও দেখে সিরিয়ান সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য পিয়ং ইয়ং এ উত্তর কোরিয়ার অফিশিয়ালদের সাথে মিটিং করে।
মোসাদের চিফ ডেগানের বুঝত তেমন একটা সমস্যা হয়নি সিরিয়া উত্তর কোরিয়ার সাহায্য নিয়ে নিউক্লিয়ার বোমা বানানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রমাণ কি ?? আর এই ধরনের বোমা বানাতে রি-অ্যাক্টর এর প্রয়োজন, এর জন্য প্রয়োজন বিশাল এলাকা, সেটাই বা কোথায় ??
তখন কিন্তু সুন্নীদের নিপীড়নের জন্য বাশার তেমন একটা শত্রু ছিল না আমেরিকার কাছে। কিন্তু বাশার ভেতরে ভেতরে পারমানবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে, এ খবর খোদ সিআইএ’র কাছেও ছিলো না।
মোসাদ পুরো এটেনশান দেয় এই বিষয়টা, কারণ কোন মুসলিম দেশ পারমাণবিক বোমা বানাবে, হোক সে শিয়া বা সুন্নী তা ইসরায়েলের জন্য হুমকী স্বরূপ!
ডিসেম্বর, ২০০৬ঃ
…………………………………
মোসাদের কাছে খবর পৌঁছে এক সিরিয়ান উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা লন্ডন সফরে গিয়েছেন ভুয়া নামে, এই খবর পাবার সাথে সাথে মোসাদ দশ জন এজেন্ট পাঠায়। তিনদলে ভাগ হয়ে তারা তাকে নজরে রাখে। একদল তার হোটেল রুমেই রুম ভাড়া করে, আরেকদল তার গতিবিধির দিকে নজর রাখে। সেদিন সন্ধ্যায় সে বারে প্রবেশ করে কিছু অলস সময় কাটানোর জন্য। সেখানে তার সাথে আলাপচারিতা শুরু করে এক সুন্দরী নারী।
এই নারীর কাজ হল, লোকটি যতবেশিক্ষণ সম্ভব ব্যস্ত রাখা। ওদিকে মোসাদের নেভিয়েট টিম হানা দেয় সিরিয়ান ডিপ্লোম্যাটের হোটেলরুমে। এই টিম যেকোন ধরনের লক ভাঙ্গতে পারে। রুমে ঢুকেই তারা বুঝতে পারে জ্যাকপট তারা পেয়ে গিয়েছে, কারণ সেই সিরিয়ান বলদের মত তার ল্যাপটপ বসার রুমেই রেখেছিল। তার ল্যাপটপের সমস্ত তথ্য হাতিয়ে নেয়া হয়ে এবং একটি বিশেষ “বাগ” ইন্সটল করে দেয়া হয় তার ল্যাপটপে যাতে তার ল্যাপটপের সকল কার্যক্রম ভবিষ্যতে মনিটর করা যায়।
তাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় কিন্তু তা সিরিয়ার সন্দেহ বাড়িয়ে দিবে বলে সেই সিদ্ধান্ত বাদ দেয়া হয়। সাথে সাথে তার হার্ডওয়ারের কপি পাঠিয়ে দেয়া হয় তেল আবিবে।
সেখানে তারা সব দেখে কিন্তু হতাশ হয় কিছু না পেয়ে। হটাৎ এক ফোল্ডারে কিছু ছবি পায়। যা দেখে অনেক বড় একটি কারখানার মত মনে হয়, যা ছিল সেই নিউক্লিয়ার প্রজেক্টের। ১৩০ ফুট বাই ১৩০ ফুট লম্বা, ৭০ ফুট উচু একটি কক্ষ এবং যার ছাদ ছিল অনেক বড়! প্রথমে হেভি ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিস্ট ইক্যুপমেন্ট দেখে কিছু না বুঝলেও ডুগান পরে বুঝে এই ছবি সে ইতিপুর্বে কোথাও দেখেছিল ! হুবহু নর্থকোরিয়ার পিয়ংইয়ং এর ইয়ংবিয়ং পারমানবিক রিয়াক্টরের আদলে সিরিয়াতে নিউক্লিয়ার রিয়াক্টর তৈরির কাজ চলছে। একেবারেই সেই একই মাপ এবং কাঠামো! আরেকটা ছবি তারা পায় সেখানে ইব্রাহিম, সিরিয়ার পারমাণবিক শক্তি সংস্থার পরিচালক এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মকর্তা চিয়াং চিবুর একসাথে তোলা ছবি ছিল।
ডুগান বুঝতে পারে সে কি আবিস্কার করেছে। এরপরেই ইসরায়েল অফেক-৭ স্পাই স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠায় সিরিয়ার সেই পারমাণবিক স্থাপনা খুঁজে বের করার জন্য। খুঁজতে খুঁজতে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কেস থেকে উত্তর-পুর্বে অনেক দূরে ইরাক বর্ডারের কাছে এবং ইউফ্রেটিস নদীর পাশে মরুভুমির ভিতর আল-খিবার নামে একটি স্থান স্যাটেলাইট খুঁজে পায় । এটাই সেই স্থান যা ইতিপুর্বে ইউনিট ৮২০০ চিহ্নিত করেছিল কোরিয়ার সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করার জন্য!
স্যাটেলাইট সব খুঁজে পায় যা তারা খুঁজছিল। ঠিক একই ছবি যা সেই সিরিয়ান ডিপ্লোম্যাটের ল্যাপটপে পাওয়া গিয়েছিল! সব কিছু পাওয়া শেষ!
সাথে সাথে ঘটনা প্রধানমন্ত্রী এহুদ এলমার্ট কে জানানো হয়।
ইসরায়েলের ঠিক পাশেই এক মুসলিম দেশ পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন হবে তা ইসরায়েলের জন্য হুমকি স্বরূপ এটা তারা ভালোভাবেই জানে, তারা সিধান্ত নেয় বোমা মেরে পুরো রি-অ্যাক্টর উড়িয়ে দিবে যা ইতিপুর্বে ইরাকে করা হয়েছিল ১৯৮১ সালে। ইসরাইল ১৯৮১ সালের ৭ জুন ইরাকের ওসিরাকে তামুজ-১ রিঅ্যাক্টরে ঝটিকা হামলা চালায়। ইরাকের ওসিরাক নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টে হামলায় ৮টি এফ-১৬ ও ৬টি এফ-১৫ অংশগ্রহণ করে। দুই হাজার পাউন্ডের ১৫টি বোমা নিক্ষেপ করা হয়। ইরাকের নিউক্লিয়ার প্রজেক্ট ধ্বংস করে দেয়া হয়। সেই কাহিনী আরেকদিন বলব !
কিন্তু সমস্যা হোলও মোসাদ জানত না সেই নিউক্লিয়ার রিএক্টর অপারেশনাল কিনা। কারণ যদি অপারেশনাল হয়ে থাকলে যদি হামলা চালানো হয় তাহলে পুরো ইউফ্রেটিস নদীর সকল প্রানী এবং পুরো আরব জুড়ে এর ধ্বংসলীলা ছড়িয়ে পড়বে। কার্যত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে তখন।
জুলাই, ২০০৭ঃ
…………………………………
হটাৎ করে উত্তর সিরিয়ার মুসলিমিয়াতে এক বিস্ফোরনে উড়ে যায় ১৫ জন সিরিয়ার অফিশিয়াল কর্মকর্তা এবং ৫০ জন আহত হয়। সিরিয়া দাবি করে একটি স্কাড-সি মিসাইল উৎক্ষেপণ করতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এই ঘটনার পর পরই বুশকে সব কিছু জানায় মোসাদ এবং তাদের সব শুনে বুশ প্রশাসন স্ট্রোক করার মত অবস্থা হয়। কারণ সিআইএ পর্যন্ত এই সম্পর্কে অবগত ছিল না।
অগাস্ট, ২০০৭ঃ
…………………………………
সিরিয়ার নিয়ক্লিয়ার রিএক্টর অপারেশনাল কিনা তা জানার জন্য সেখানে ইসরায়েল সেনাবাহিনীর এলিট ফোর্স সারিয়েত মেটকেল কে পাঠানো হয়। তারা স্টেলথ হেলিকপ্টারে করে সিরিয়ান আর্মির পোশাক পরে সিরিয়ার বর্ডার ক্রস করে, সেই আল খিবারের স্থাপনার পাশ থেকে মাটি এবং পানির স্যাম্পল নিয়ে নিরাপদেই ফিরে আসে। সিরিয়ায় প্রবেশের পূর্বেই সিরিয়ার রাডার কে জ্যাম করে দেয়া হয়। খুব ঝুঁকি ছিল কারণ ধরা পড়লে যুদ্ধ ছাড়া আর কোন গতি ছিল না দুই দেশের।
এরপর তেল আবিবে মাটি এবং পানিকে ল্যাবে পরীক্ষা করে সেখানে রেডিও একটিভের কোন উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েল সব কিছু নিশ্চিত হয়ে তাদের বড় ভাই পেন্টাগনকে সব কিছুই জানায়। আমেরিকা প্রথমে অনুমুতি দেয় কিন্তু পরবর্তীতে নিজেরা সামরিক হামলায় এখন জড়াবে না বলে জানিয়ে দেয় ইসরায়েলকে। ইসরায়েল ভেবেছিল আমেরিকা ইরাক-আফগানিস্তানের মত আক্রমনে চলে যাবে।
আক্রমনের তিনদিন পুর্বে উত্তর কোরিয়ার একটি কার্গো জাহাজ সিরিয়ার টারটাশ বন্দরে এসে পৌছায়। মোসাদ খবর পায় এই জাহাজে চূড়ান্ত অপারেশনাল করার সকল যন্ত্রপাতি আছে এবং কয়েক সপ্তাহের মাঝেই সিরিয়ার নিউক্লিয়ার রিএক্টর সচল হবে।
এবার আর দেরি নয়। তবে হামলার পুর্বে ইসরায়েল তাদের জম্মদাতা গুরু ইউকের এমআই৬ কে জানায়।
৫ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭: অপারেশন অর্চার্ড
…………………………………………………………
মধ্যরাতে ১০ জন পাইলটের একটি দল ইসরাইলের Ramat David Airbase থেকে F-16 এবং F-15 বিমানে করে ৫০০ পাউন্ড ওজনের এজিএম ৬৫ বোমা নিয়ে উড়ে যায় সিরিয়াতে। ভুমধ্যেসাগরের উপর দিয়ে পশ্চিম দিক দিয়ে তুসস্কের সীমানার কাছে এসে উত্তর দিক দিয়ে তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্ত ঘেঁসে এর পর পুর্ব দিক দিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করে। মাত্র ৩০ মিটার উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে প্রায় ১৭ টন বোমা ফেলে পুরো নিউক্লিয়ার রিএক্টর ধ্বংস করে দেয় ইসরায়েলের বিমান বাহিনী। এইবার সিরিয়ার রাডার জ্যাম করার জন্য আমেরিকান এয়ার ফোর্সের “সুতার” টেকনোলজি ব্যাবহার করে তারা।
যখন হামলা করা হয় তখন প্রধানমন্ত্রী এহুদ এলবার্ট সহ মোসাদ এবং ডিফেন্সের সকল উর্ধতন কর্মকর্তারা ইসরায়েল এয়ার ফোর্সের মাটির নীচের বিশেষ বাঙ্কারের অভ্যন্তরে কমান্ড সেন্টার থেকে সব কিছু পর্যবেক্ষন করছিল। পুরো ইসরায়েলের সকল বাহিনী প্রস্তুত ছিল যুদ্ধের।
ইসরায়েলের বিমান বাহিনী হামলার পর পরই সিরিয়ান এয়ারডিফেন্স কিছু সারফেস টু এয়ার মিসাইল ছুড়ে, সাথে সাথে কমান্ড সেন্টারে নিউজ চলে যায়, দে আর এটাক! কিন্তু একটু পরই ভেসে আসে সেই কোড নেম “অ্যারিজোনা” অর্থাৎ মিশন সাকসেসফুল !
গুড়িয়ে দেয়া হয় সিরিয়ার নিউক্লিয়ার রিএক্টর আর বাশার আল আসাদের নিউক্লিয়ার বোমার স্বপ্ন।
পরিস্থিতি তখন আসাদের জন্য এতই জটিল হয় যে সে পারছিল না ব্যাপারটা নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে। কারণ সে এটা নিয়ে টানা হেঁচড়া করলেই তার পারমাণবিক বোমার কথা পুরো পৃথিবীতে ফাঁস হয়ে যাবে। তবে সে এই বিবৃতি দেয়, ইসরায়েল তাদের অসম্পুর্ন এবং খালি একটি সামরিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তবে সিএনএন নিউজ করে “হিজবুল্লাহ” গেরিলা বাহিনীকে হামলা করার জন্যই ইসরায়েল এই হামলা করেছে !!!
———————————————————-
গোপন স্ট্রাটেজিঃ
…………………………………
তবে ঘটনা এখানেই হয়ত শেষ হয়ে যেত। কিন্তু না এটা মোসাদ। তারা এবার গবেষনা শুরু করল আসাদ কিভাবে এতো গোপনে এই নিউক্লিয়ার রিয়াক্টর বানাতে পারলো সবার আগোচরে ?
এত বড় স্থাপনা, এতো বেশিন, যন্ত্রপাতি কিভাবে সম্ভব সবার অগোচরে এই কাজ করা !
উত্তর কোরিয়ার ট্রেন বিস্ফোরন না হলে তো কেউ জানতেই পারতো না। এতোদিনে হয়ত বাশার পারমানবিক বোমা বানিয়ে বসে থাকতো। এবং সেটা সে ইসরাইলের উপরই হয়ত মারতো।
এরকমই চিন্তা করতে শুরু করে মেয়ার ডেগান। কিভাবে বাশার এটা পারলো? সিআইএ, যারা কিনা উত্তর কোরিয়ার উপর এতো নজর রাখে, তারাও বিষয়টি বুঝতেই পারলো না। কিভাবে ?
এই প্রশ্নের উত্তর হল, জেনারেল মোহাম্মদ সুলেমান। তিনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট আসাদের Special Presidential Advisor for Arms Procurement and Strategic Weapons এই লোকটি সিরিয়ার ভেতরে গোটা নিউক্লিয়ার প্রোগ্রামের দায়িত্বে ছিলো। সিরিয়ার ভেতরে নিউক্লিয়ার স্থাপনা রিলেটেড যাবতীয় সব তথ্য একেবারে ম্যানুয়াল কায়দায় চালনা করতো। অর্থাৎ কোনো ধরণের ইলেক্ট্রনিক্স মাধ্যম সে ব্যবহার করতো না। একেবারে আদিম যুগের মত মানুষ দিয়ে দিয়ে হার্ডকপি ইনফরমেশ্যান চালনা করতো। একারণেই ইসরাইল কিছুই টের পায় নি।
কারণ সে জানত সিআইএ এবং মোসাদ পৃথিবীর প্রায় সকল ইলেক্ট্রিক্যাল গেজেটস এর ভিতর নাক গলিয়ে রেখেছে। [বাংলাদেশে যেমন এয়ারটেল – পরে প্রমাণ দিব]
যেকোন ধরনের তথ্য হাতে লিখে এরপর তা খামে সীল করে চিঠি পত্রের মত করে পাঠাত। জেনারেল সুলেমান ছিল আসাদের ছায়ার মত এবং আসাদের সব চেয়ে বিশ্বস্ত লোক। পুরো অপারেশনের দায়িত্ব তার উপর ছিল। মোসাদ অনুসন্ধান করে তা বের করে ফেলে।
এখন হয়ত বলতে পারেন, কিন্তু ইসরাইল তো লন্ডন থেকে সিরিয়ান ডিপ্লোম্যাটের কম্পিউটারেই রিয়াক্টর রিলেটেড তথ্য পেয়েছিলো। সেই লোক ছিলো নর্থ কোরিয়ার সাথে লিয়াজো টিমের সদস্য। তার ল্যাপটপটাই আসলে সিরিয়ার জন্য সর্বনাশ ডেকে এনেছিলো।
যাই হোক, জেনারেল সুলেমান ছিলেন শাভাবিকভাবেই কট্টর ইসরাইল বিরোধি। একারণে তিনি অনেক আগে থেকেই টার্গেট লিস্টে ছিলেন। জেনারেল সুলামানের একটা বাড়ি ছিলো সিরিয়ার সমুদ্র উপকুল ঘেঁষে। ভুমধ্যসাগরের পাশে টারটাশ বন্দরের সাথে।
সুলেমান আবারো শুরু করে পারমাণবিক বোমার কার্যক্রম। এবার আরো গোপনে। ইসরায়েল অনুমান করে একে বাচিয়ে রাখলে পাঁচ বছরের ভিতর আবারো সিরিয়া পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলবে।
কিন্তু সুলেমানকে একা পাওয়াটা অনেক কঠিন ছিল। তাই মোসাদ ছায়ার মত লেগে ছিল তার সাথে।
১লা আগস্ট, ২০০৮ঃ
…………………………………
জেনারেল সুলেমান অবকাশ যাপনের জন্য তার সেই বাড়ীতে আসলেন। সাথে কিছু মেহমান ছিল ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে খোলা বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসে ছিলেন। সামনে ভুমধ্যসাগর। সন্ধ্যায় সাগরের ভেতর থেকে ডুবুরি বেশে দুজন ব্যক্তি উঠে আসে। কেউ টেরও পায় নি। এরা মোসাদের Kidon group এর সদস্য। কিডন গ্রুপ হোলও মোসাদের কিলিং ইউনিট।
স্নাইপার রাইফেল দিয়ে গুলি করা হয় সুলামান’কে। মারা যান তিনি।
কিডনের সদস্যরা সাগরের নীচে মিনি সাবমেরিনে করে পালিয়ে যায়।
সিরিয়া সরকার সুলেমানের খুনের জন্য মোসাদকে দায়ী করলেও মোসাদ বিষয়টি অস্বীকার করে।
এই ঘটনা একেবারেই গোপন ছিল। কিন্তু উইকিলিকস এবং তার কিছুদিন পর স্নোডেনের ফাঁস করা দলিলেও উঠে আসে মোসাদের এই অপারেশনের কথা।

অপারেশন স্ফিঙ্কস

এই নারীর দিকে চোখ পড়ায় বাট্রাস ইবেন হালিমকে ক্ষমা করে দেয়াই যায়। স্বর্ণকেশী সুন্দরীকে দেখতে না পেলেই বরং অপরাধ হতো তার! পরনে তরুণীর টাইট জিন্স, লো-কাট ব্লাউজ। ঠিক ততটুকুই বের করে রাখা, যতটুকুতে একজন পুরুষের আরেকটু দেখার ভাসনা জন্মায়। এর বেশিও নয়, কমও নয়।
গত সপ্তাহ ধরে ভিলেজুইফের নিয়মিত বাসস্ট্যান্ডে নিয়মিতই দেখা যাচ্ছে তাকে। প্যারিসের একেবারে দক্ষিণ প্রান্ত ওটা। মাত্র দু’টো বাস প্রতিদিন এ স্টেশনে দাঁড়ায়।

মাত্র দু-এক জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে আশেপাশে। তাই স্বর্ণকেশীকে দেখতে না পাওয়াটা ছিল একরকম অসম্ভব! হালিম অবশ্য এত কিছু জানতো না। তার জানার কথাও নয়।
সময়টা ১৯৭৮ সালের আগস্ট মাস। দেখা যাচ্ছে, কাকতালীয়ভাবে হালিমের রুটিন আর তরুণীর রুটিন সমানুপাতিক! বাস ধরতে হালিম যখনই স্টেশনে পৌঁছায়, তখন ওই নারীকে সেখানে দেখা যাবেই। প্রতিদিন একই চিত্র। কিছুক্ষণ পরই, উজ্জ্বল গাত্রবর্ণের এক ব্যক্তি হাজির হন। চোখ তার নীলাভ। পরনে কেতাদুরস্থ পোশাক। লাল রঙের ফেরারি বিবি৫১২ টু-সিটার হাঁকিয়ে ভদ্রলোকের আবির্ভাব ঘটে। স্বর্ণকেশীকে দেখতে পেয়ে গতি সামান্য শ্লথ হয় ফেরারির। চিনতে পেরে হাসিমুখে গাড়িতে চড়ে বসেন স্বর্ণকেশী। এরপর হাওয়ার বেগে অজানায় মিলিয়ে যায় ফেরারি।
হালিম একজন ইরাকি। তার স্ত্রী সামিরা তার ওপর ভীষণ নাখোস। প্যারিসের নিরানন্দ জীবন নিয়েও বেশ বিরক্ত সামিরা। এ কারণেই কিনা প্রতিদিন আবেদনময়ী ওই সুন্দরীকে দেখার প্রভাব ভালোভাবেই পড়ে হালিমের ওপর। প্রতিদিন কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে বিশাল অলস সময় তার। ওই সময়টায় শুধু ওই স্বর্ণকেশীর কথাই ভাবে সে। হ্যাঁ, এই নারীকে নিয়ে ভাবার সময় হালিমের ছিল। পথচলায় কারও সঙ্গে কথা না বলার কড়া নির্দেশ আছে তার ওপর। এমনকি কাজ শেষে সংক্ষিপ্ত পথের বদলে ঘুরপথে বাসায় ফিরতে বলা হয়েছে। এই আসা যাওয়ার পথও নিয়মিতও পাল্টাতে হয়। কিন্তু যে পথেই সে যায়, ওই বাস স্টপেজে তাকে থামতে হবেই। কারণ, তার ভিলেজুইফের বাসা আর গেয়ার সেইন্ট লাযারে মেট্রো স্টেশনের মধ্যে একমাত্র বাসস্টপ এটি। মেট্রো স্টেশনে গিয়ে সার্সেইয়ের ট্রেন ধরে সে। তার কর্মস্থল প্যারিস শহরের উত্তর দিকে অবস্থিত একটি টপ-সিক্রেট প্রজেক্ট। সেখানে অনবরত চলছে ইরাকের জন্য পারমাণবিক চুল্লি নির্মানের কাজ।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও হালিম এসেছে বাসস্টপে। স্বর্ণকেশীও উপস্থিত। কিন্তু আজ ফেরারি আসার আগেই বাস চলে এসেছে। তরুণী বাসে উঠার আগে দূরের রাস্তার দিকে তাকালেন, ফেরারির খোঁজে। না পেয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে উঠে গেলেন বাসে। ওদিকে হালিমের বাসের কোন খবর নেই। দুই ব্লক পেছনে একটা ছোটোখাটো ‘দুর্ঘটনা’র কবলে পড়েছে সেটি। তাই আসতে দেরি হচ্ছে।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই হাজির হলো সেই ফেরারি! চালক তার সঙ্গিনীর খোঁজে চারদিকে তাকালেন। বিষয়টা বুঝতে পারলো হালিম। ফরাসি ভাষায় চিৎকার করে গাড়িচালককে সে জানিয়ে দিল, তোমার আসতে দেরি হওয়ায় সুন্দরী বাসে উঠে চলে গেছে। লোকটার চেহারা দেখে মনে হলো হালিমের প্রতি সে কৃতজ্ঞ। চোখেমুখে সাহায্যের ভাব এনে তাকে জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাবে। হালিম জবাবে বললো, মাদেলেইন স্টেশন। সেইন্ট লাযারে থেকে হাঁটার দূরত্ব। বৃটিশ ড্রাইভার জ্যাক ডোনোভান বিস্মিত হলো! আরে সে-ও তো ওদিকটায়ই যাবে। হালিমকে লিফট দেয়ার প্রস্তাব দিল ডোনোভান। হালিম ভাবলো, কেন নয়? নিজেই গিয়ে গাড়ির ভেতরে ঢুকলো।
মাছ টোপ গিলেছে, ভাবলো জ্যাক ডোনোভান উরফে র‌্যান এস.।

(সাবেক মোসাদ এজেন্ট ভিক্টোর অস্ট্রোভস্কি ও কানাডিয়ান সাংবাদিক ক্লেয়ার হোয়ের বই ‘বাই ওয়ে অব ডিসেপশন’ বিশ্বজুড়ে একটি আলোচিত বই। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলার। এই বইটির প্রকাশনা বন্ধ করতে ইসরাইল সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মামলা করে এবং সফলও হয়। তবে ৪৮ ঘন্টার মাথায় একটি আপিল আদেশে বইটি প্রকাশের বাধা দূর করা হয়। এ বইয়ে ইসরাইলের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অনেক অপারেশনের খুঁটিনাটি বর্ণনা করা হয়েছে। ভিক্টোর অস্ট্রোভস্কি বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, জন্মগতভাবে একজন কট্টর যায়নবাদী ও ইসরাইলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ হওয়া সত্ত্বেও, মোসাদে যোগদানের কিছুকাল পর তার মোহ ভাঙে। সে কারণেই বইটি লেখা। নিয়মিতভাবে বইটির অনুবাদ প্রকাশিত হবে মানবজমিনে।)

১. ১৯৮১ সালের ৭ই জুন সফলভাবে ইতি ঘটে অপারেশন স্ফিঙ্কসের। আমেরিকার তৈরি ইসরাইলি বোমারু বিমান সেদিন ইরাকের তামুজা-১৭ পারমাণবিক স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়। বাগদাদের বাইরে তুয়াইতাতে নির্মিত হচ্ছিল ওই স্থাপনা। মাত্র একটি অভিযানেই ধ্বংস হয়ে যায় ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। কিন্তু এ বিমান হামলার আগে ইরাকের ওপর তীব্র আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। এমনকি, পারমাণবিক চুল্লী নির্মানের কাজ পিছিয়ে দিতে নাশকতা ও গুপ্তহত্যা চালায় মোসাদ।

কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না! শেষ পর্যন্ত চলতেই থাকে ইরাকের চুল্লীর কাজ।
১৯৭৩ সালে দুনিয়াজুড়ে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দেয়। এর প্রাক্ক¡ালে ইরাককে একটি পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র নির্মান করে দেয়ার চুক্তি করে ফ্রান্স। ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ ছিল ইরাক। তখনকার জ্বালানি সঙ্কটের সময় বিকল্প উৎস হিসেবে পারমাণবিক শক্তির দিকে সবার আগ্রহ বাড়তে থাকে। ওই সময় ফ্রান্স ইরাকের কাছে একটি ৭০০ মেগাওয়াট বাণিজ্যিক পারমাণবিক রিঅ্যাকটর বিক্রি করতে চেয়েছিল। ইরাক সবসময় দাবি করে আসছিল, ওই গবেষণা কেন্দ্র নির্মিত হবে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। দাবি করা হতো, বাগদাদের জ্বালানি চাহিদা নিশ্চিত করার চেষ্টা হবে পারমাণবিক চুল্লি থেকে উৎপাদিত জ্বালানি দিয়ে। কিন্তু ইসরাইলের উদ্বেগ ছিল। তাদের শঙ্কা, ইরাক এর মাধ্যমে পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে, যা ব্যবহৃত হবে ইহুদী দেশটির বিরুদ্ধে।
ইরাককে দুইটি রিঅ্যাকটরের জন্য ৯৩ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিতে রাজি হয় ফরাসিরা। এ ইউরেনিয়াম যাবে দক্ষিণ ফ্রান্সের পিয়েরেলাত্তে সামরিক সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা থেকে। মোট চার দাগে ১৫০ পাউন্ড সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিক্রি করবে ফ্রান্স। এ পরিমাণ ইউরেনিয়াম চারটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য যথেষ্ট। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তার পররাষ্ট্র নীতির মূল বিষয় হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধকে তুলে ধরেন। মার্কিন কূটনীতিকরা সক্রিয়ভাবে ফ্রান্স ও ইরাকে লবিং করছিল, যাতে তারা পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মানের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।
এক পর্যায়ে ইরাকের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে খোদ ফরাসিরাও চিন্তিত হয়ে পড়ে। অব্যাহত উদ্বেগের মুখে ফ্রান্স ইউরেনিয়ামের বদলে কম সক্ষমতা স¤পন্ন ক্যারামেল সরবরাহের প্রস্তাব দেয় ইরাককে। ক্যারামেল দিয়ে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু বোমা বানানো সম্ভব নয়। এ প্রস্তাব মানতে রাজি হয়নি ইরাক! অ্যা ডিল ওয়াজ অ্যা ডিল Ñ এমন বক্তব্য ছিল অনড় সাদ্দামের। ১৯৮০ সালের জুলাইয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই লৌহমানব ইসরাইলের উদ্বেগের ব্যাঙ্গাত্মক জবাব দেন। সে বছরই তিনি বলেছিলেন, ‘ইউরোপের যায়নবাদীরা আরবদের উপহাস করতো। তারা বলতো, আরবরা অসভ্য, পশ্চাৎবর্তী জাতি। এরা শুধু মরুভূমিতে উট চরাতে জানে! অথচ, আজ সেই একই লোকেরা বলছে, ইরাক নাকি আনবিক বোমা বানিয়ে ফেলছে!’
সত্তরের দশকের শেষদিকে ইরাক পারমাণবিক বোমা অর্জনের চেষ্টা চালায়। এ তথ্য পেয়ে ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আমান সক্রিয় হয়ে উঠে। তারা তৎকালীন মোসাদ পরিচালক ও সাবেক সেনা জেনারেল তসভি জামিরের কাছে টপ সিক্রেট চিঠি পাঠায়। ইরাকের পারমাণবিক প্রকল্পের অগ্রগতির ব্যাপারে নির্ভুল তথ্য চেয়েছিল আমান। মোসাদের নিয়োগ বিভাগ (রিক্রুটিং বিভাগ) সমেটের প্রধান ডেভিড বিরানকে ডেকে পাঠান জামির। এরপর বিরান দেখা করেন তার বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে। তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় অবিলম্বে ফ্রান্সের সার্সেই পারমাণবিক চুল্লির সঙ্গে ইরাকের কোন সংযোগ আছে কিনা তা খুঁজে বের করার। দুই দিন ধরে ব্যাপকভাবে সার্সেই চুল্লির কর্মরতদের ফাইল ঘেঁটে দেখা হয়। কিন্তু কোন সংযোগ পাওয়া যায়নি। অগত্যা বিরান ডাকলেন প্যারিসে মোসাদের স্টেশন চীফ ডেভিড আরবেলকে। সাদা চুলের আরবেল বহু ভাষায় কথা বলতে পারতেন। ক্যারিয়ার মোসাদ অফিসার তিনি। তাকে অ্যাসাইনমেন্টের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হলো।
এ ধরণের সব স্টেশনের মতো, প্যারিস স্টেশনও অবস্থিত ছিল সেখানকার ইসরাইলি দূতাবাসের আন্ডারগ্রাউন্ডে। স্টেশনের প্রধান হিসেবে আরবেলের পদমর্যাদা এমনকি রাষ্ট্রদূতের চেয়েও ওপরে ছিল! কূটনৈতিক পাউচ, দূতাবাস থেকে বাইরে যাওয়া ও ভেতরে আসা সব চিঠি যাচাইবাছাই করতো মোসাদ। এছাড়া সব ধরণের সেফ হাউস, যেগুলোকে বলা হতো ‘অপারেশনাল অ্যাপার্টমেন্ট’, সেগুলোর দায়িত্বে ছিল তারা। এ ধরণের সেফ হাউজ গোটা ইউরোপে অগণিত আছে মোসাদের। যেমন, কেবলমাত্র লন্ডনস্থ মোসাদ স্টেশনের মালিকানায়ই আছে শতাধিক ফ্ল্যাট। এছাড়া ভাড়া আছে আরও ৫০টি! মোসাদের বিভিন্ন অপারেশনের জন্য এ ফ্ল্যাটগুলো ব্যবহার করা হয়।
ইউরোপের আর দশটি শহরের মতো প্যারিসেও কিছু সুবিধা পেত মোসাদ। সেখানেও বসবাস করে প্রচুর ‘সায়ানিম’। সায়ানিম হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদী স্বেচ্ছাসেবী। বিভিন্ন কাজে এদের সাহায্য নেয় মোসাদ। যে সুবিধা পৃথিবীর আর কোন গোয়েন্দা সংস্থা পায় না। এদের কারণেই দুনিয়া জুড়ে নিজেদের কর্মকা- চালাতে মোসাদের নিজস্ব অপারেটিভ বা ‘কাতসা’ কখনই ৩৫-৪০ জনের বেশি প্রয়োজন হয় না!
প্যারিসে এরকম একজন ইহুদী সায়ানিমের কোড নেম জ্যাকুয়েস মার্সেল। তিনি সার্সেই পারমাণবিক প্রকল্পে কাজ করতেন। সার্সেই পারমাণবিক চুল্লির সঙ্গে ইরাকের সংযোগ খুঁজে পাওয়াটাকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছিল মোসাদ। এ কারণেই, ওই সায়ানিমকে বলা হয়েছিল চুল্লিতে কর্মরত ইরাকিদের আসল নথিপত্র নিয়ে আসতে! স্বাভাবিক সময় হলে, হয়তো তাকে নথির ওপর চোখ ভুলিয়ে পরে মৌখিকভাবে তথ্যগুলো জানাতে বলা হতো। বড়জোর, তাকে বলা হতো বিশেষ কায়দায় কপি করে আনতে। কারণ, আসল নথিপত্র চুরি করার মধ্যে ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক। একজন অদক্ষ বা অর্ধদক্ষ সায়ানিমের জন্য এটি আরও বড় ঝুঁকি। কিন্তু, বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় আসল নথিপত্রই আনতে বলা হলো তাকে। এ সিদ্ধান্তের পেছনে কারণও ছিল। আরবদের নাম ইহুদীদের কাছে বিদঘুটে মনে হয়। এদের নাম মনে রাখা কঠিন। এছাড়া বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তারা বিভিন্ন নাম বহন করে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য আসল নথিপত্র ছাড়া উপায় ছিল না মোসাদের।
পরের সপ্তাহেই একটি সভায় যোগদান করতে প্যারিসে যাওয়ার কথা ছিল জ্যাকুয়েস মার্সেলের (সায়ানিম)। মার্সেলকে নির্দেশনা দেয়া হলো, ইরাকিদের নামের তালিকা ও সভার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাগজপত্র একসঙ্গে নিয়ে প্যারিসে আসতে। এরপর তার গাড়ির ট্রাঙ্কে সেসব রেখে আসতে হবে। আগের রাতেই মোসাদের একজন কাতসা (অপারেটিভ) মার্সেলের সঙ্গে দেখা করে আসেন। তার গাড়ির ট্রাঙ্কের একটি ডুপ্লিকেট চাবি নিয়ে আসে ওই কাতসা। তাকে দিয়ে আসা হয় নতুন নির্দেশনা। ইকোলে মিলিতেয়ারের কাছের সড়কে নির্ধারিত সময়ে আসার কথা ছিল মার্সেলের। এখানে এলেই সে দেখতে পাবে লাল একটি পিউগট ব্রান্ডের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। পেছনের জানালায় থাকবে বিশেষ চিহ্ন, যাতে দেখেই চেনা যায়। এই গাড়িটি ভাড়া করা হবে শুধুমাত্র মার্সেলের গাড়ির জন্য পার্কিং স্পট আগে থেকেই ধরে রাখতে। কারণ, প্যারিসে পার্কিং স্পট পাওয়া খুব কঠিন। মার্সেলের গাড়ি আসা মাত্রই ওই লাল পিউগট সরে যাবে। খালি যায়গায় ঢুকে যাবে মার্সেল। এরপর তিনি স্বাভাবিকভাবে সভাতে চলে যাবেন। মোসাদের একজন সদস্য এই ফাঁকে তার গাড়ির ট্রাঙ্ক খুলে নিয়ে যাবে ইরাকিদের ওই বিশেষ তালিকা!
(আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন: http://mzamin.com/article.php?mzamin=15074)
[সাবেক মোসাদ এজেন্ট ভিক্টোর অস্ট্রোভস্কি ও কানাডিয়ান সাংবাদিক ক্লেয়ার হোয়ের ‘বাই ওয়ে অব ডিসেপশন’ বিশ্বজুড়ে আলোচিত একটি বই। নিউ ইয়র্ক টাইমসের ১ নম্বর বেস্ট সেলার। যুক্তরাষ্ট্রে এই বইটির প্রকাশনা বন্ধ করতে ইসরাইল সরকার তাদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মামলা করে এবং সফলও হয়। তবে ৪৮ ঘন্টার মাথায় একটি আপিল আদেশে বইটি প্রকাশের বাধা দূর করা হয়। এ বইয়ে ইসরাইলের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের অনেক অপারেশনের খুঁটিনাটি বর্ণনা করা হয়েছে। আছে নৈতিকতা বিবর্জিত কা-কলাপের সুক্ষ্ম বিবরণ। ভিক্টোর অস্ট্রোভস্কি বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, জন্মগতভাবে একজন কট্টর যায়নবাদী ও ইসরাইলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ হওয়া সত্ত্বেও, মোসাদে যোগদানের পর ধীরে ধীরে তার সেই মোহ ভেঙে যায়। এ কারণেই বইটি লেখা। নিয়মিতভাবে বইটির অনুবাদ প্রকাশিত হবে মানবজমিনে।]

অপারেশন অপেরা

‪#সুত্রপাত‬: . জন্মের লগ্ন থেকেই ইজ্রাইলের অস্তিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি মেনে নেয় না ও বিভিন্ন ভাবে ইজ্রাইল ধ্বংস করার চেষ্টা করে কিন্তু ১৯৬৭সালে সমস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গুলি একযোগ হয়েও মিলিত প্রযাসের পরেও ইজ্রাইল শুধু নিজের অস্তিত্ব রক্ষাই করে না উপরুত্ত যুদ্ধে জয়লাভ করে আরব দেশ গুলোকে উপহার দেয় একরাশ লজ্জা। যা আরব দেশ গুলোর পক্ষে সহজে হজম করা ছিল প্রায় অসম্ভব। আরব জোটের শক্তিশালী রাষ্ট্র ইরাক বুঝতে পারে যে ইজ্রাইল কে জব্দ করার একমাত্র উপায় হলো নিজেকে পরমানুশক্তিধর রাষ্ট্র রুপে পরিনত হওয়া। তাই ১৯৭৬ সালে ইরাক ফ্রান্সের থেকে একটি শক্তিশালী নিউক্লীয়ার রিয়েক্ট কেনে ও সেটি কে তাদের রাজধানী বাগদাদ থেকে ১৭কিলোমিটার দূরে ” ওশিরাক” অঞ্চলে স্থাপন করে। যদিও ইরাক এটি কে অসামরিক ও শান্তিপূর্ণ পরমানুর ব্যবহার বলে দাবী করলেও ইজ্রাইল অভিযোগ করতে থাকে যে ইরাক গোপনে নিউক্লীয়ার বোমা বানানোর উদ্দেশ্যে প্লুটোনিয়াম উৎপাদন শুরু করেছে। কিন্তু তলে তলে ইজ্রাইলের সব ধরনের কুটনৈতিক প্রযাস ব্যথ হলে তারা ইরাকের পরমানু প্রকল্পের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রযোগের সীদ্ধান্ত নেয়। সেই অপারেশনের কোড নেম দেওয়া হয় ” অপারেশন অপেরা।” ‪#অপারেশন‬: . ১৯৮১ সালের ৭জুন এক দুপুরে ইজ্রাইল বায়ুসেনার থিজিওন এয়ারবেস থেকে ৮টি এফ-১৬এস ও ৬টি এফ-১৫এস যাদের প্রতিটিতে দুটি করে আনগ্রাইডেড মার্ক-৮৪ পাউন্ড ডিলে একশান বোম ও অতিরিক্ত জ্বালানী ট্যাঙ্ক লোড করে ইরাকের দিকে রওনা হয় এবং একটি নিদিষ্ট উচ্চতায় একই ফর্মেশনে উড়ে রেডার ফাকি দিকে প্রথমে জর্ডন ও তারপর সৌদি আরবের আকাশ সীমা অতিক্রম করে ইরাকের আকাশ সীমায় প্রবেশ করে। ইরাকে প্রবেশ করেই রেডারের হাত থেকে বাঁচার জন্য মাত্র ৩০মিটার উচ্চতায় উড়ে মরুভুমির ওপর দিয়ে গোপনে ওসিরাক নিউক্লীয়ার রিয়েক্টার কমপ্লেক্স এর নিকটে এসে পৌছায়। এবার শুরু হয় আসল অপারেশন। প্রথমেই এফ-১৬ গুলো ১১০০কিমি/ঘন্টায় গতিবেগে ভুপৃষ্ট থেকে ১১০০মিটার উচ্চতায় পৌছে যায় এবার ৮টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান তাদের মার্ক-৮৪ বোমা গুলো ৫সেকেন্ড অন্তর নিউক্লীয়ার কম্পেক্সের দিকে নিক্ষেপ করতে থাকে যার মধ্যে ২টি বোমা বাদে বাকী গুলো সঠিক জায়গায় লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়। বাকী ৬টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান কম উচ্চতায় থেকে এফ-১৬ গুলোকে সাপোর্ট দিতে থাকে। প্রাথমিক হামলার ধাক্কা কাটিয়ে ইরাকের সেনারা তাদের এন্টি এয়ার ডিফেন্স প্রয়োগ করতে শুরু করে কিন্তু পুরনো প্রযুক্তির এয়ার ডিফেন্স গুলো অতি দ্রুত রিএক্ট করতে ব্যর্থ হয় আর সেই সুয়োগে ইজ্রাইলের সবকয়টি যুদ্ধবিমান প্রায় ১২২০০মিটার উচ্চতায় পৌছে এয়ার ডিসেন্স গুলোর ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। ‪#ফলাফল‬: . ইরাকের নিউক্লীয়ার রিয়েক্টর টি ধ্বংস করে ইজ্রাইলের যুদ্ধবিমান গুলো একই ফরমেশানে কোন রকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই আবার ইজ্রাইলে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। এই হামলায় ইরাকের ১০জন সৈন্য ও ফ্রান্সের একজন ইঞ্জিনিয়ার মারা যায়। এই অপারেশন এর জন্য ইজ্রাইল আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক ভাবে সমালোচিত হলেও ইরাকের পরমানু শক্তিধর রাষ্ট্র রুপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নের সলিলসমাধি ঘটে।

মিশরীয় মুসলিম পরমাণু বিজ্ঞানী সামিরার রহস্যজনকভাবে নিহত হওয়া

৫ আগস্ট, (রেডিও তেহরান): আজ হতে ৬২ বছর আগে ১৯৫২ সালের এই দিনে মিশরীয় মুসলিম মহিলা পরমাণু বিজ্ঞানী সামিরা মুসা মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক রহস্যময় সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

এই উদীয়মান মুসলিম নারী পরমাণু-বিজ্ঞানী মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ষড়যন্ত্রে নিহত হয়েছিলেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়।

সামিরা মুসা ছিলেন বিশ্বে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা বিষয়ে সর্বপ্রথম ডক্টরেট ডিগ্রিধারী নারী। তিনি চিকিৎসা খাতে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহারকে এমন পর্যায়ে উন্নত করার জন্য কাজ করছিলেন যাতে তা সবার সাধ্যের আওতায় আসে।

সামিরা পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের বিষয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন এবং ‘শান্তির জন্য পরমাণু শক্তি’ শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক হয়েছিলেন। তিনি বলতেন: ‘আমি পরমাণু চিকিৎসাকে অ্যাসপিরিনের মতই সস্তা করব।’ সামিরা নানা হাসপাতালে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্বেচ্ছাসেবী হয়েছিলেন। সামিরাকে মিশরেরর পরমাণু বিদ্যার জনকও বলা হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু কর্মসূচি সামিরাকে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ (বৃত্তি) দিতে চেয়েছিল, কিন্তু আমেরিকা সফরে এসে তিনি এ ধরনের আরো কয়েকটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, এইসব প্রস্তাব গ্রহণের জন্য তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতে ও সেখানকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে হত।

যুক্তরাষ্ট্র সফরের শেষের দিকে বা মিশরে ফিরে আসার প্রাক্কালে সামিরাকে ক্যালিফোর্নিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে যাওয়ার সময় তাকে বহনকারী গাড়িটি হঠাৎ ৪০ ফুট উঁচু স্থান থেকে পড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই নিহত হন সামিরা। পরে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে তাকে ক্যালিফোর্নিয়া সফরের যে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তা ছিল ভুয়া। সামিরার গাড়ির ড্রাইভার গাড়ীটির পতনের আগ মুহূর্তেই ওই গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে উধাও হন। এটাও প্রমাণিত হয় যে মিশরের ইহুদি অভিনেত্রী রাকিয়া ইব্রাহিম (র‍্যাচেল আব্রাহাম) ক্যালিফোর্নিয়ায় সামিরার রহস্যময় সফরের পেছনে ভূমিকা রেখেছিলেন এবং রাকিয়া ইসরাইলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।

উল্লেখ্য মুসলিম বিশ্বের পরমাণু বিজ্ঞানীরা প্রায়ই ইসরাইল ও আমেরিকার শত্রুতার শিকার হয়েছেন। ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক সংবাদে জানা গেছে, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ২০০৩ সাল থেকে ইরাকের সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশি বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে। মোসাদ ইসলামী ইরানেরও বেশ কয়েকজন পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে গুপ্ত ঘাতক বা সন্ত্রাসীর মাধ্যমে।

উপমহাদেশে মোসাদ

মোসাদের সাথে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের কাজ শুরু হয় জিয়াউল হকের আমলে। ৯/১১ এর পর সিআইএ, এফবিআই, মোসাদ ও আইএস আই একাকার হয়ে যায় ওয়ার অন টেররে। এই গোয়েন্দা গ্রুপগুলোর শত্রু এক ও অভিন্ন হয়ে যায় তালেবান ও আল কয়েদার বিরুদ্বে। ওয়ার অন টেররে বড় বড় আল কায়েদা ও তালিবান নেতাদের পাকিস্তানের আই এস আই গ্রেফতার করেছে, সি এই এ নয়,যেমন খালিদ শেখ মোহাম্মদ,লিব্বি,মোল্লা ব্রাদার। এর জন্য সবচেয়ে বেশী খেসারত ও দিতে হয়েছে আইএসআইকে।

লাহোর থেকে ইসলামাবাদ হয়ে পেশোয়ার পর্যন্ত আইএসআইয়ের হেডকোয়ার্টার, অফিস, ওদের বহনকারী বাসের উপর অত্যন্ত ভয়ংকর হামলা চালিয়ে জানমালের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করে জঙ্গীরা। “র” এবং মোসাদ উভয়েই নিজেদের এক্সপিরিয়েন্স বিনিময় করে। ইসরাইল ফিলিস্তিনি গেরিলাদের দমাতে যেসব কৌশল অবলম্বন করে , ভারত ওদের কাছ হতে সবগুলোই শিখে নেয়।যেমন, এক কাশ্মিরী গেরিলা একটা ঘর হতে ইন্ডিয়ান সৈন্যদের লক্ষ করে গুলি চুড়লো, ঐ জন্যে ঐ ঘর সহ আশেপাশের সব ঘরগুলো বুলডেজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। যাতে গেরিলারা ফিউচার এট্যাকে তিনবার ভাবে।

১৯৫৬ সালে জোসেফ স্ট্যালিনকে অবমাননা করে নিকিতা ক্রুশ্চেভের বক্তৃতা সংগ্রহ ও ফাঁস করা.অপারেশন গ্যারিবালাডিঃ ১৯৬০ সালে পলাতক নাতসী নেতা অ্যাডলফ আইখম্যান কে আর্জেন্টিনা থেকে অপহরন করে ইসরায়েলে নিয়ে আসা।

হার্বার্ট চুক্রু হত্যাঃ

১৯৬৫ সালে মন্টেভিডিওতে লাটভিয়ান নাতসি সহোযোগী

হার্বার্ট চুক্রু কে হত্যা।

অপারেশন ডায়মন্ডঃ

১৯৬৩ সালে অপারেশন শুরু করে ১৯৬৬ সালে সে সময়ের অন্যতম সেরা সোভিয়েত জঙ্গী বিমান মিগ-২১ ইয়ারক থেকে চুরি করে তেল আভিবে অবতরন। খৃস্টান বংশদ্ভূত ইরাকী পাইলট মুনির রিদফা এই বিমান উড়িয়ে নিয়ে আসে। মিগ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার ফলে আরব দেশগুলি কখনোই মিগ ২১ দিয়ে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর যুদ্ধ করতে পারে নাই।

সিক্স ডেজ ওয়ারঃ

১৯৬৭ সালের ৬ ডেজ ওয়ারের পুর্বে আরব রাস্ট্রগুলির সমস্ত বিমান বন্দরের ম্যাপ,ডিউটি শিডিউল ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থার ছবি সংগ্রহ করা ও যুদ্ধে ব্যাবহার করে এক হামলায় সমগ্র আরব বিশ্বের বিমান বাহিনী ধংস করতে সহায়তা করা।

অপারেশন প্লামব্যাটঃ

১৯৬৮ সালের একটি ঘটনা। ইসরাইলের একটি শিপে ২০০টন ইউরেনিয়াম অক্সাইড সরবরাহ করতে একটি কার্গো বিমান যাত্রা শুরু করেছিল। জার্মনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিমানটি তাদের রাডারের বাইরে চলে যায়। পরে তুরস্কের একটি পোর্টের রাডারে এটি ধরা পড়লে ওই কার্গো বিমান থেকে বলা হয় পথ হারিয়ে তারা এদিকে চলে এসেছে এবং তাদের জ্বালানী ফুরিয়ে গেছে। গালফ থেকে জ্বালানী নিয়ে তারা আবার ফিরে যাবে। পরে তার নিরাপদে ওই ইউরেনিয়াম অক্সাইড ইসরাইলের একটি শিপে খালাস করে। এটি ছিল রেকেম ও মোসাদের একটি যৌথ অপারেশন। এটি অপারেশন প্লামব্যাট নামে পরিচিত। ইউরেনিয়াম অক্সাইড পারমানবিক বোমার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

জুহের মহসিন হত্যাঃ

সিরিয়ান বাথ পার্টির প্যালেস্টাইনি অংশের নেতা জুহের মহসিন কে হত্যা।

অপারেশন এন্টবিতে সহায়তাঃ

ইসরায়েলি কমান্ডোরা ১৯৭৬ সালে জিম্মি উদ্ধারে উগান্ডার এ্যান্টোবি বিমান বদরে অপারেশন চালায় সেখানে মোসাদ সক্রিয় সহায়তা করে।

এহিয়া এল মাসুদ হত্যাঃ

১৯৮০ সালে প্যারিসে মিশরীয় পরমানু বিজ্ঞানী এহিয়া এল মাসুদ কে হত্যা। তিনি ইরাকের পরমানু প্রকল্পের সাথে জড়িত ছিলেন।

আইখম্যান হান্ট ১৯৬০

১৯৬০ সালের কথা। আমেরিকার পেন্সিলভেনিয়ায় অবস্থিত নিউক্লিয়ার ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট বা নিউমেকে হঠাৎ করে পারমাণবিক অস্ত্র ও জিনিসপত্র চুরির ঘটনা ঘটে। অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করে চেষ্টা করা হয় কোথায় চুরি যাওয়া বা হারানো জিনিসগুলো রয়েছে সেটা খুঁজে বের করার। কিন্তু লাভ হয় না কিছুই। তখন সবচেয়ে বেশি কর্মী নেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠান ছিল এই নিউমেক। যেটি এসব নানা কারণে হঠাৎ করেই সবার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। গুজব ছড়ায় নিউমেক নিজেদের পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে রাস্তায় নানারকম ক্ষতিকারক রেডিয়েশন ছড়িয়ে দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে চুরি যাওয়া ইউরেনিয়াম আর অস্ত্রগুলো পুঁতে রাখা হয়েছে চারপাশের নানাস্থানে। মাটির নিচে। যে কোনো সময়ই বিস্ফোরিত হতে পারে সেগুলো। ভয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় জনসাধারণ। কিন্তু নিউমেকের ভেতরের সবাই এটা নিশ্চিত জানত, এসব গুজব কেবলই গুজব। এবং এ গুজবগুলো যে ছড়িয়েছে আর কেউ নয়, ইসরায়েলি ইনটেলিজেন্স এজেন্সি— মোসাদ।

 

দক্ষিণ আমেরিকায় মোসাদ

অনেক দিন থেকে নাজি ওয়ারে অভিযুক্ত এডল্ফ ইচম্যানকে খুঁজছিল মোসাদ। ১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনায় তার খোঁজ পাওয়া যায়। ওই বছরের ১১ মে মোসাদের এজেন্টদের একটি টিম তাকে গোপনে আটক করে ইসরায়েলে নিয়ে আসে। তার বিরুদ্ধে উত্তর ইউরোপে ক্যাম্প গঠন ও পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে ইহুদিদের হত্যার অভিযোগ আনা হয়। ইসরায়েলের আদালতে একটি সাজানো বিচারের মাধ্যমে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। ১৯৬৫ সালে নাজি ওয়ারে অভিযুক্ত লাটভিয়ার বৈমানিক হার্বার্টস কুকার্সকে উরুগুয়ে থেকে ফ্রান্স হয়ে ব্রাজিল যাওয়ার পথে মোসাদের এজেন্টরা হত্যা করে। ১৯৭৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও কূটনৈতিক এবং চিলির সাবেক মন্ত্রী অরল্যান্ডো লেটেলারকে ওয়াশিংটন ডিসিতে গাড়িবোমায় হত্যা করে চিলির ডিআইএনএর এজেন্টরা। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, এটি ছিল মোসাদের একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

সোভিয়েত বিরোধি যুদ্ধঃ

১৯৮২ সালে লেবাননে গেরিলাদের উদ্দেশ্যে সোভিয়েতদের পাঠানো বিপুল পরিমান অস্ত্র গোলাবারুদ বোঝাই জাহাজ ভুমধ্য সাগরে আটক করে মোসাদ সেই অস্ত্র পাকিস্তানের মাধ্যমে আফগানিস্তানে প্রেরন করে।

অপারেশন মোসেসঃ

১৯৮৪ সালে মোসাদ ও সিআইএ ইথিওপিয়ার ইহুদিদের সহায়তার জন যে অপারেশন পরিচালনা করে তার নাম দেয়া হয় অপারেশন মোসেস।

মোরদেচাই ভান্নু কে গ্রেফতারঃ

মোরদেচাই ভান্নু একজন ইসরায়েলি প্রমানু টেকনিশিয়ান যিনি ১৯৮৬ তে ইসরায়েল থেকে পালিয়ে লন্ডনে যাওয়ার পথে মোসাদ এজেন্টরা তাকে নারী টোপ যাবহার করে রোম বিমান বন্দর থেকে ধরে ইসরায়েলে

ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

জেরাল্ড বুল হত্যাঃ

১৯৯০ সালে সাদ্দামের একটি লং রেঞ্জ আর্টিলারি প্রজেক্টে

(১৬ ইঞ্চি দূর পাল্লার কামান) কাজ করার সময় কানাডিয়ান বিজ্ঞানী ও সররাস্ত্র নির্মাতা জ়েরার্ড বুলকে গুলি করে হত্যা করে মোসাদ।

এই অপারেশনে সি আই এ,ইরানি ভিভাক ও মোসাদ একসাথে

কাজ করেছে বলে জানা যায়।

আতেফ বেইসো হত্যাঃ

পি এল ও গোয়েন্দা প্রধান আতেফ বেইসা কে ১৯৯২ এ হত্যা।

ফাতিহ সিদ্দিকী হত্যাঃ

১৯৯৫ সালে ইস্লামিক জিহাদের প্রতিস্টাতা ফাতিহ সিদ্দিকিকে মাল্টায় হত্যা।

শেখ আহামেদ ইয়াসিন হত্যায় সাহায্যঃ

২০০৪ সালে হামাসের স্পিরুচ্যুলেয়ল লিডার পঙ্গু শেখ আহামেদ ইয়াসিন কে ভোরে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় মোসাদ গোয়েন্দারা স্পট করে সিগ্যানেল পাঠায় এবং অ্যাপাচি হেলিকাপ্টার থেকে মিসাইল ছুড়ে তাকে হত্যা করে।

শেখ খালিল হত্যাঃ

হামাস নেতা শেখ খালিল কে ২০০৪ সালে দামেস্কে হত্যা।

ইমাদ মুঘ্নিয়া হত্যাঃ

হিজবুল্লাহ নেতা ইমাদ মুঘ্নিয়া কে ২০০৮ এ দামাস্কে হত্যা।

মাহমুদ আল মাবহু হত্যাঃ

২০১০ সালে দুবাইয়ে হামাস নেতা মাহমুদ আল মাবহু হত্যা।

ধারাবাহিক ভাবে ইরানের পরমানু বিজ্ঞানী দের অপহরন ও হত্যা।এছাড়া বসনিয়া হার্জেগোভিনিয়ার রাজধানী সারাজেভো থেকে বিমান ও স্থলপথে ইহুদিদের ইসরাইলে স্থানান্তর করা হয় মোসোদের পরিকল্পনায়।ভারত ও পাকিস্তানের ব্যাপক ততপরতা পরিচালনা করা।

 

আফ্রিকা অঞ্চলে

১৯৮৪ সালে মোসাদ ও সিআইএ ইথিওপিয়ার ইহুদিদের সহায়তার জন্য যে অপারেশন পরিচালনা করে তার নাম দেওয়া হয় অপারেশন মোসেস। ১৯৭৬ সালে উগান্ডায় এয়ার ফ্রান্স ফাইট ১৩৯ বিমান ছিনতাই করেছিল মোসাদের এজেন্টরা। বন্দী মুক্তির জন্য তারা এই বিমান ছিনতাই করেছিল। এটি অপারেশন অ্যান্টাবি নামে পরিচিত।

 

৯/১১-এর দায়

নাইন/ইলেভেনের দায় কার— এ বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। যদিও সিআইএর এক সময়ের বিশ্বস্ত ওসামা বিন লাদেন ও তালেবানকে এ ব্যাপারে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আর এর শাস্তি হিসেবে দখল করে নেওয়া হয়েছে ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ দেশ আফগানিস্তানকে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে ২০০১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জেরুজালেম পোস্টের ইন্টারনেট সংস্করণে বলা হয়, হামলাকালীন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে ৪ হাজার ইহুদি কাজ করত। কিন্তু বিমান হামলায় মাত্র একজন নিহত হয়েছে। পরে আরও দুজনের নিহতের কথা বলা হয়। ওই দিন এত বিপুলসংখ্যক ইহুদি কীভাবে নিরাপদে ছিল তার জবাব আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি বা দেয়নি। অথচ যে সময় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা হয়েছে প্রতিদিন ওই সময়ে অনেক ইহুদি অফিসে উপস্থিত থাকত। ব্যতিক্রম শুধু হামলার দিন। সিআইএ বরাবরই এই হামলায় মোসাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে আসছে। তবে মোসাদ এই হামলার পরিকল্পনাকারী নয় এর পক্ষে গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ সিআইএ বা মোসাদ দেয়নি।

 

মিসর ও সিরিয়ায় প্রভাব

টার্গেট দেশ মিসরে ওলফগ্যাং লজের নেতৃত্বে গোয়েন্দা মিশন পাঠায় মোসাদ ১৯৫৭ সালে। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি মিসরে গামাল আবদেল নাসেরের সামরিক বাহিনী ও তার যুদ্ধোপকরণ ও কৌশল জানতে গোয়েন্দা তত্পরতায় নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৪ সালে লজের চেয়ে বড় মিশন নিয়ে মিসরে গোয়েন্দা তত্পরতা শুরু করেন মোসাদের আর এক স্পাই ইলি কৌহেন। তার সহযোগিতায় ছিল হাই প্রোফাইলের বেশ কয়েকজন স্পাই। ইলি কৌহেন ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে সিরিয়ায় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে তথ্য পাঠানোর সময় হাতেনাতে গ্রেফতার হন। মিসর ও সিরিয়ায় মোসাদ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রেডিও লিঙ্ক স্থাপন করেছিল। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে ইসরায়েলের বিপক্ষে ছিল মিসর, জর্দান ও সিরিয়া। এই যুদ্ধটি সিক্স-ডে ওয়ার নামে পরিচিত। ১৯৬৯ সালের ১৯ জুলাই মিসরের ছোট দ্বীপ গ্রিন আয়ারল্যান্ডে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স আকস্মিক হামলা চালায়। পরবর্তী সময়ে অনেক ইসরায়েলি ইহুদি ও পর্যটকরা সিনাই থেকে মিসর আসে অবকাশ যাপনের জন্য। মোসাদ নিয়মিত এসব পর্যটকের নিরাপত্তা দেখভালের জন্য গোয়েন্দা পাঠাত। ধারণা করা হয় এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে লেবানন যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

 

ইরান

ইসরায়েল ইরানকে বড় ধরনের হুমকি মনে করে। মোসাদ মনে করে, ২০০৯ সালের মধ্যে ইরান পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হবে। যদিও অনেকের ধারণা এ সালটি হবে ২০১০। সম্প্রতি মোসাদের ডিরেক্টর মীর দাগান তার এক বক্তৃতায় এ কথা স্বীকারও করেছেন। ফলে মোসাদের তত্পরতা ইরানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৭ সালের ১৫ জানুয়ারি ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানী ড. আরদেশির হোসেনপুরকে হত্যা করে মোসাদ। প্রথম দিকে তিনি গ্যাস বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। ওয়াশিংটনের প্রাইভেট গোয়েন্দা সংস্থা স্ট্রাটফোর হোসেনপুরকে মোসাদের টার্গেট ছিল বলে উল্লেখ করে। অবশ্য মোসাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

 

ইরাক

ইরাকে বরাবরই ইসরায়েলের গোয়েন্দা তত্পরতার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ইরাকে সিআইএ মোসাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। ইরাকে অনেক বড় অপারেশন চালায় মোসাদ। এর একটি হচ্ছে ১৯৬৬ সালে। মিগ-২১ জঙ্গি বিমানের পাইলট ছিলেন খিস্টান বংশোদ্ভূত মুনির রিদফা। ১৯৬৬ সালে তাকে বিমানসহ কৌশলে ইরাক থেকে ইসরায়েলে নিয়ে আসে মোসাদ। তার কাছ থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ইরাকের অসরিক নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের স্পর্শকাতর কিছু বিষয়ে গোয়েন্দা তত্পরতা চালায়।

এই অপারেশনের নাম দেওয়া হয় অপারেশন স্ফিঙ্কস। ইরাক এই গবেষণা সম্পন্ন করতে পারলে পারমাণবিক গবেষণায় অগ্রবর্তী থাকত। এ জন্য ১৯৮১ সালের ১৭ জুন এফ-১৬ এ যুদ্ধ বিমানে বিপুল গোলাবারুদসহ একটি ইউনিটকে পাঠানো হয় ইরাকের এই প্রকল্প ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য। ইরাক কিছু বুঝে ওঠার আগেই বোমা হামলা করে অসরিক নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের ব্যাপক ক্ষতি করে। ইরাক পরে আর এ প্রকল্পটি অব্যাহত রাখতে পারেনি।

ভারতে মোসাদ

যাহোক উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে বর্তমানে ভারত ছাড়াও নেপাল আর শ্রীলঙ্কায় দূতাবাস রয়েছে। ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক ১৯৫০ থেকে। ওই নেহেরু সরকার বোম্বে বর্তমানে মুম্বাইতে ইসরায়েলকে ভারতীয় ইহুদিদের সদিচ্ছায় ইসরায়েলে স্থানান্তরিত হতে সম্মতি দিয়ে অফিস খোলার অনুমোদিত দিয়েছিল। ক্রমেই ওই অফিসটি কনস্যুলেটে পরিণত হয়। পরে ইন্দিরা গান্ধির সময় থেকেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। ১৯৯২ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও ‘র’ আর মোসাদ সম্পর্ক অটুট ছিল। এ সম্পর্ক পাকিস্তানের গতিবিধির ওপরে নজর রাখা। এরপর থেকে বহু বিষয়েই ওই দুই গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাত্র বছরখানেক বা তারও কম সময়ে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং তেলআবিব সফর করে সামরিক খাতসহ অন্যান্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেছেন। খুব শিগগিরই ভারতীয় রাষ্ট্রপতির ইসরায়েল সফরের কথা রয়েছে এবং তার পরপরই এ বছরের মধ্যেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও ইসরায়েল সফরের কথা রয়েছে। তথ্যমতে ইসরায়েল ভারতীয় সামরিক বাহিনীতে উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জাম সরবরাহের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। তাছাড়া বেসামরিক খাতের প্রায় ৪.৫২ বিলিয়ন ডলারের বিনিময় হয়েছিল বিগত বছরে।ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের কিছুটা ছেদ পড়েছিল ১৯৭৮ সালে মোরারজি দেশাই সরকারের সময়, যখন মোরারজি দেশাই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশ দায়েনকে ভারতের মাটি ব্যবহার করে পকিস্তানের আণবিক অস্ত্র তৈরির কেন্দ্র কোহুটায় আক্রমণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। বোম্বের ওই বৈঠকে ইসরায়েল ভারতের বিমানঘাঁটি থেকে রিফিউলিংয়ের অনুরোধ জানিয়েছিল। বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকেনি। মোরারজি দেশাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জিয়াউল হককে কোহুটায় ভারতের নজরদারিতে রয়েছে এবং ইসরায়েলের উদ্বেগের কথাও জানিয়েছিলেন। পরে পাকিস্তান ইসরায়েলকে আশ্বস্ত করেছিল যে, পারমাণবিক অস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয় যা ব্যবহার হওয়ার নয় (ঁফধু সধযঁৎশধৎ : উধুষু ঙ ১ সধু ২০১৫ ইযধৎধঃ ঝধসাধঃ-ঐ)। এ বিষয় এখন বহুল চর্চিত। ‘মোসাদ’ তথা ইসরায়েলের এখনো আশঙ্কা যে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র আইএস অথবা আল কায়েদার হাতে পড়লে তা হবে ইসরায়েলের জন্য বিশাল হুমকি। একই ভয় ভারতেরও, এটাই মোসাদ-‘র’-এর সহযোগিতার অন্যতম বিষয়। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো দাউদ ইব্রাহীম, ভারতে ভি কোম্পানি নামে পরিচিত, এর অবস্থান।হালে ভারতের উচ্চ আদালতে মোসাদকে দিল্লিতে অফিসের জায়গা দেওয়া নিয়ে একটি মামলা রয়েছে। মামলাটি করেছেন ‘র’-এর একজন সাবেক সদস্য আরকে ইয়াদব তৎকালীন ‘র’প্রধান আনন্দ ভারমার বিরুদ্ধে। ১৯৮০ সালের দিকে রাজীব গান্ধির সময়ে গুপ্ত অভিযানে মোসাদকে অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রায় ১০০ কোটি রুপি খরচে ‘র’-এর বাহ্যিক কোম্পানির নামে ফ্যাট কেনা হয়, তাতে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করেন ইয়াদব। ২০১৩ সালে সিবিআই (ঈইও) কোর্ট অধিক তদন্তের নির্দেশ দেয়। মামলাটি চলমান। হালে মোসাদ এই অঞ্চলের জন্য দিল্লিতে বড় ধরনের রেস করেছে বলে তথ্যে প্রকাশ। (ওহফরধ ঞড়ফধু গধৎপয ১৫, ২০১৩ এবং ওহফরধ ঝধসাধফ : ১২-৬-২০১৬ ড়হষরহব)।শুধু ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গেই নয়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর সঙ্গে কিছু কার্যকর সম্পর্কের তথ্যও পাওয়া যায়। আইএসআই-মোসাদ যোগাযোগ বাড়ে আফগান যুদ্ধের সময় ঙঢ়বৎধঃরড়হ ঈুরষড়হব-এর প্রেক্ষাপটে। তথ্যে প্রকাশ যে, ওই সময়ে মোসাদ সিআইএ যুক্ত অপারেশনে পাকিস্তানের মাধ্যমে আফগান মুজাহিদদের অস্ত্র সরবরাহ করেছিল। পাকিস্তান এসব তথ্য নাকচ করেনি, তবে ওই সময়ে সামরিক বাহিনীর জন্য অস্ত্র সরবরাহের খবরটি সত্য নয় বলে বিবৃতি দিয়েছিল। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ২০০৯ সালে ভারতে ইহুদিদের স্থাপনা এবং ইসরায়েলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে চরমপন্থীদের সম্ভাব্য হামলার আগাম তথ্য ভারতীয় এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা বাহিনীকে দিয়েছিল বলে তথ্যে প্রকাশ। ওই সময় জেনারেল মোশাররফের গোয়েন্দা প্রধান ছিলেন জেনারেল সুজা পাশা। ২০০৫ সালে জেনারেল মোশাররফ প্রথম পাকিস্তানে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ওয়াশিংটনভিত্তিক ইহুদি সংগঠন ‘জিউইস কংগ্রেস-এ’ যে ভাষণ দেন সেটাকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে তীব্র বিরোধিতার কারণে মোশাররফ আর আগাতে পারেননি।

পশ্চিম ইউরোপে মোসাদ :

১৯৬০ সালে ফ্রান্সের মিরেজ ফাইভ জেড বিমানের প্রযুক্তিগত দিকের বিভিন্ন দলিল চুরি করে নেয় মোসাদ। পরে ইসরাইল ওই প্রযুক্তিকে আরো উন্নত ও যেকোনো আবহাওয়ার উপযোগী করে জে-৭৯ নামের ইলেক্ট্রিক টার্বোজেট ইঞ্জিন তৈরি করে। ফ্রান্স শিপইয়ার্ডে পাঁচটি মিসাইল বোট দিতে ফ্রান্সের সাথে চুক্তি করে ইসরাইল। কিন্তু ১৯৬৯ সালের ফ্রান্সে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার আগে ইচ্ছাকৃতভাবে মিসাইল বোট সরবরাহ করেনি মোসাদ। ১৯৬৮ সালের একটি ঘটনা। ইসরাইলের একটি শিপে ২০০টন ইউরেনিয়াম অক্সাইড সরবরাহ করতে একটি কার্গো বিমান যাত্রা শুরু করেছিল। জার্মানি কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিমানটি তাদের রাডারের বাইরে চলে যায়। পরে তুরস্কের একটি পোর্টের রাডারে এটি ধরা পড়লে ওই কার্গো বিমান থেকে বলা হয় পথ হারিয়ে তারা এ দিকে চলে এসেছে ও তাদের জ্বালানি ফুরিয়ে গেছে। গালফ থেকে জ্বালানি নিয়ে তারা আবার ফিরে যাবে। পরে তার নিরাপদে ওই ইউরেনিয়াম অক্সাইড ইসরাইলের একটি শিপে খালাস করে। এটি ছিল লেকেম ও মোসাদের একটি যৌথ অপারেশন। এটি অপারেশন প্লামব্যাট নামে পরিচিত। ইউরেনিয়াম অক্সাইড পারমাণবিক বোমার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৭২ সালে মোসাদ জার্মানির বিভিন্ন টার্গেট ব্যক্তির কাছে পত্রবোমা পাঠিয়েছিল। চিঠি খুললেই বোমা ফুটবে ও সে মারা যাবে। অধিকাংশ চিঠিই পাঠানো হয়েছি নাজি যুদ্ধে অভিযুক্ত এলোস ব্রানারের কাছে। অবশ্য মোসাদের এ প্রচেষ্টা জানাজানি হয়ে যায় এবং ব্যর্থ হয়।

পূর্ব ইউরোপ :

যুদ্ধে নিঃশেষিত বসনিয়া হার্জেগোভিনিয়ার রাজধানী সারাজেভো থেকে বিমান ও স্থলপথে ইহুদিদের ইসরাইলে স্থানান্তর করা হয় মোসোদের পরিকল্পনায়।

ইরানের বিজ্ঞানীদের ওপর মোসাদের গুপ্তহামলা

ইসরাইল ইরানকে বড় ধরনের হুমকি মনে করে। মোসাদ মনে করে ২০০৯ সালের মধ্যে ইরান পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হবে। যদিও অনেকের ধারণা এই সালটি হবে ২০১০। সম্প্রতি মোসাদের ডিরেক্টর মীর দাগান তার এক বক্তৃতায় এ কথা স্বীকারও করেছেন। ফলে মোসাদের তৎপরতা ইরানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সিআইএ এ কাজে মোসাদকে সহযোগিতাও করছে। ২০০৭ সালের ১৫ জানুয়ারি ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানী ড. আরদেশির হোসেনপুরকে হত্যা করে মোসাদ। মৃত্যুর ছয় দিন পর আল কুদস ডেইলি তার নিহতের খবর প্রচার করে। প্রথম দিকে তিনি গ্যাস বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা সে দেশের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টের কাছে এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। ওয়াশিংটনের প্রাইভেট গোয়েন্দা সংস্থা স্ট্রাটফোর হোসেনপুরকে মোসাদের টার্গেট ছিল বলে উল্লেখ করে। অবশ্য মোসাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। হোসেনপুর ছিলেন ইরানের একজন জুনিয়র সহকারী অধ্যাপক। ২০০৩ সাল থেকে ইরানে মোসাদের হয়ে কাজ করতেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী রেজা আসগারি। তিনি মোহাম্মদ খাতামি প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে ইরানের সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাকে সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসাননি।

দক্ষিণ তেহরানের অভিজাত এলাকা বনি হাশেম স্ট্রিটে মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্দুকধারী তাদের পরিধেয় চামড়ার জ্যাকেট থেকে খুব সন্তর্পণে পিস্তল বের করে ওঁত পেতে রইলো তাদের শিকারের আশায়। ৩৫ বছর বয়স্ক পদার্থবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক দারিউশ রেজায়ি নাজাদ ছিল তাদের টার্গেট। ইরানের বুশেহর পরমাণু প্রকল্পের একজন গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানী ছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটের সময় বনি হাশেম স্ট্রিটে অবস্থিত তাঁর বাসায় ফিরার মুহূর্তে দুই মোসাদ সদস্য তাকে অনুসরণ করে। চোখের পলকে পিস্তলের ট্রিগার চেপে দুই খুনি অদৃশ্য হয়ে পড়ে। ইরান হারালো অত্যন্ত মেধাবী একজন অধ্যাপককে।

প্রকৃতপক্ষে, ইরান পশ্চিমা বিশ্বকে বারবার বলে আসছিল যে, তাদের পরমাণু কর্মসূচির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। বুশেহর পরমাণু কেন্দ্র হচ্ছে রাশিয়ার সহায়তায় পরিচালিত। ২০০৫ সালে আহমাদিনেজাদ সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর ইরানের ওপর প্রায় সবধরনের অবরোধ আরোপ করা হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কিংবা খাদ্য কর্মসূচি- যেকোনো ব্যাপারে জাতিসংঘ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পায়নি ইরান। সেই ইরানে সাক্ষরতার হার প্রায় ৯৩ শতাংশ। সবাই স্বাস্থ্য সুবিধা পায়।

ডাক্তার, প্রকৌশলীসহ সব ধরনের পেশায় নিয়োজিত দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ইরান পুরো আরব বিশ্বে অদ্বিতীয়। ইরানের সেই সফলতাকে অত্যন্ত বাঁকা চোখে দেখে আরেক মুসলিম রাষ্ট্র সৌদি আরব। ইরানের নেতৃবৃন্দ ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্বই স্বীকার করতে চায় না। ইসরাইল ভাবলো-ইরান যদি সত্যিই পরমাণু শক্তির অধিকারী হয়ে উঠে, তাহলে তো তাদের জন্য মহাসর্বনাশ। তাই, ইরানকে যেকোনোভাবে দুর্বল করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে মাঠে নেমে গেল ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। ইরানের বিজ্ঞানীদের গোপনে হত্যা করা মোসাদের অন্যতম একটা এজেন্ডা হয়ে পড়ে এ কারণে।

২৯ নভেম্বর ২০১০

সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট। ইরানের পরমাণু কেন্দ্রের প্রধান ড. মাজিদ শাহরিয়ারি নিজের গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন অফিসে যাবেন বলে। ঠিক সেই মুহূর্তে হেলমেট পরা এক মোটরসাইকেল আরোহী গাড়ির বনেটে একটা ডিভাইস ছুড়ে মারে। চোখের পলকে ডিভাইসটি বিস্ফোরিত হয়। ৪৫ বছর বয়স্ক শাহরিয়ারি সাথে সাথেই মারা যান। আর তাঁর স্ত্রী গুরুতর আহত হন।

ঠিক সেই সময়ই দক্ষিণ তেহরানের আতাশি স্ট্রিটে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু বিজ্ঞানী ড. আব্বাস-দাভানির ওপর হামলে পড়ে মোটরসাইকেল আরোহী আরেক গুপ্তঘাতক। বোমা মেরে আব্বাস-দাভানিকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে তিনি প্রাণে বেঁচে যান, কিন্তু মারাত্মকভাবে আহত হন।

এই দুই বিজ্ঞানী ছিলেন ইরানের পরমাণু প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বহু বছর যাবত তারা গবেষণাকার্য চালিয়ে ইরানের পরমাণু প্রকল্পকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম ক্ষতি হয়ে গেল ইরানের। প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ তার দেশের গোয়েন্দাদের কঠোর নির্দেশনা দিলেন-মোসাদের গুপ্তহত্যা থেকে তারা যেন বিজ্ঞানীদের রক্ষা করতে পারে।

যা হোক, আহত বিজ্ঞানী আব্বাস-দাভানিকে প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ পরবর্তী সময়ে ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োগ দেন।

১২ জানুয়ারি ২০১০

সকাল ৭টা ৫০ মিনিট। তেহরানে অবস্থিত শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির কোয়ান্টাম ফিজিক্সের স্বনামধন্য অধ্যাপক মাসুদ আলী মোহাম্মাদী উত্তর তেহরানের শারিয়াত স্ট্রিটে তার নিজ বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন। গাড়ি স্টার্ট দিবেন-সেই মুহূর্তে বিকট শব্দে এক বোমা বিস্ফোরিত হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন-বিজ্ঞানী মোহাম্মদীর নিথর শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে রয়েছে। বিজ্ঞানী মোহাম্মদী শুধু একজন অধ্যাপকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইরানের অভিজাত রেভ্যুলুশনারী গার্ডের একজন সদস্য। তার মৃত্যুতে ইরানের পরমাণু প্রকল্পের চরম ক্ষতি হয়।

এরকম আরও বেশকিছু ঘটনা আছে যেখানে মোসাদের গুপ্তঘাতকরা ইরানের বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীকে প্রাণে মেরে ফেলে। কোনো ঘটনায়ই কোনো মোসাদ সদস্য ধৃত হয়নি। তবে এসব গুপ্তহত্যার ঘটনা ইরানকে আরও কৌশলী করে তুলে। তারা এরপর কোনো গবেষণালব্ধ কাজ এক জায়গায় জড়ো না করে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, গোপন ল্যাবরেটরিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়। একজনের ওপর সব দায়িত্ব না দিয়ে বিভিন্ন লোকদের মধ্যে তা বন্টন করে দেয়।

ইরানের বিজ্ঞানীদের ওপর এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যব্যাপী মোসাদের বহু অপতৎপরতার একটি ক্ষুদ্র অংশ। মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করার জন্য মোসাদ গত ৬০ বছর যাবত অবিরাম প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আশির দশকে ইরাকের একনায়ক সাদ্দাম হোসেন যখন বাগদাদের কাছে ওসিরাক অ্যাটমিক রি-অ্যাক্টর চালু করেছিলেন, তখন মোসাদ সেই প্রকল্পের প্রধান তিনজন বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছিল। তিনজন বিজ্ঞানী ওই প্রকল্পের সাথে এমনই ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন যে-সাদ্দাম হোসেন আর পরমাণু প্রকল্পের কাজই চালিয়ে নিতে পারেননি।

মোসাদের ইয়াসির আরাফাত কানেকশন:

ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের নেতা ইয়াসির আরাফাত কি মোসাদ বা সিআইএ’র হয়ে কাজ করেছেন এমন প্রশ্ন প্রচলিত আছে।

ইসরাইলকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে ইয়াসির আরাফাতকে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করেছে সিআইএ। এজন্য বৃদ্ধ বয়সে এক ইহুদি নারীকে “সুহা” কে বিয়ে দেয়া হয়েছিল ইয়াসির আরাফাতের সাথে।

বিয়ের পর তিনি ইসরাইল প্রশ্নে অনেক নমনীয় ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি হয়েছিল ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে।

শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়েছিল তাকে।

জাতীয়তাবাদী নেতা ইয়াসির আরাফাতকে নমোনীয় হতে মোসাদ সিআইএ’র সহায়তা নিয়েছে। তার মৃত্যুকে অনেকে হত্যাকান্ড বলছেন।

মোসাদের কিছু হাই প্রোফাইল গোয়েন্দাঃ

জোনাথন পোলার্ড

জোনাথন পোলার্ড আমেরিকার নৌবাহিনীতে চাকরি করতেন, মূলত সে মোসাদের হয়ে আমেরিকায় কাজ করতো। আমেরিকার মিলিটারির অনেক গোপন দলিলপত্র চুরি করে ইসরাইলে পাচার করে দিতো। ইসরাইল ঐ দলিল সোভিয়েত রাশিয়াকে দিয়ে সামরিক সরন্জামের অনেক কিছুই হাসিল করে নিত। পোলার্ড একদিন ধরা খেয়ে যায়, এবং আজীবন জন্য কারাদন্ড দেওয়া হয়। শুধু পোলার্ডের কাহিনী নয়, এই রকম অনেক আমেরিকান(ইহুদী) ইসরাইলের হয়ে গুপ্তচরের কাজ করতো আমেরিকার স্পর্শকাতর মিলিটারি রিসার্চ সেন্টারে। মনিকা লিউনেস্কি ও ক্লিনটনের ফোনে আড়িপাতার কাজও ওরাই করেছিলো।

যিপি লিবনি

আশির দশকে অনেক ইরাকি নিউক্লিয়ার সাইন্টিস্টকে ইউরোপে এরাই হত্যা করেছে। ইসরাইলের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যিপি লিবনি ছিলেন ঐ সময়কার লেডি স্পাই ফর মোসাদ।

এই সেই যিপি লিবনি, উনি টেরোরিস্ট!!!!! হামাস উৎখাতে বদ্বপরিকর, তার পিতা আইতান লিবনি ছিলেন ইহুদী টেরোরিস্ট গ্রুপ ইরগুন এর চীফ। ২০০৩ এর ইরাক যুদ্বের পর মোসাদ ইরাকের অনেক সাইন্টিস্ট ও একাডেমিয়ানকে হত্যা করেছে পুরো ইরাক জুড়েই মোসাদ জাল বিছিয়ে রেখেছে ২০০৩ এর পর। আবু গরিব কারাগারের ইন চার্জ বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা আবু গরিব কারাগারের বন্দীদের ইনটারোগেশন করতো।

কানাডার এক সাইন্টিস্ট নতুন ধরনের অগ্নোয়াস্র তৈরী করে,নাম তার সুপারগান , তার এই প্রযুক্তি কেউই সাড়া দেয় নাই প্রথমে। পরে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ঐ প্রজেক্টের দিকে নজর দেয়। যা প্রজেক্ট ব্যাবিলুন নামে পরিচিত। ঐ সুপারগানের আক্রমন ইসরাইল পর্যন্ত যাবে যা ইসরাইলের জন্য হুমকি। অতঃপর কানাডার সেই সাইন্টিস্ট গেরাল্ড বুলকে ব্রাসেলসে তার এপার্টমেন্টে পাঁচটা গুলি করে হত্যা করা হয়। কেউ সেই গুলির আওয়াজ ও শুনেনি, কেউ ধরা ও খায়নি।

১৯৮২ সালে ইসরাইল লেবাননে যুদ্ধের পর সোভিয়েত তৈরী অনেক যুদ্ধাস্ত্র নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেয়। পরে সিআইএ,মোসাদ ও পাকিস্তানের আইএসআই মিলে ঐ অস্রগুলো আফগানিস্তানে যুদ্বরত জঙ্গীদের দেয়। ভারতের “র” এর সাথে মোসাদের গোপন কাজ চললেও ওটা প্রকাশ হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর।

 

বর্তমান বিশ্বে কে কার শত্রু না মিত্র তা বুঝা বড় দায়। গত আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্বে ইরান সরকার আমেরিকাকে অনেকভাবে সাহায্য করেছে, তা সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট খাতামির মুখ হতে শুনুন। কিল খালিদঃ দ্যা ফেইলড এসেসাইনেশান অফ মোসাদ এন্ড দ্যা রাইস অফ হামাস বই হতে সংক্ষিপ্ত আকারে ঐ অপারেশানটা তুলে ধরছি।

১৯৮০ হতে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত মোসাদ দুর্দান্ত আকারে পিএলও এর নেতাদের হত্যা করে একেবারে কোমর ভেঙ্গে দেয়। পিএলও ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায় স্বাধীনতা সংগ্রাম হতে। উল্টা পথে হামাসের উত্থান হতে থাকে। খালিদ মিশাল অনেক বড় হুমকি হিসেবে দেখা দেয়। ১৯৯৭ সালে খালিদ তার গাড়ি হতে নেমেই মাত্র হামাস অফিসে ঢুকবে এ সময়েই হাতে ব্যান্ডেজ লাগানো তিন জন কানাডিয়ান টুরিস্ট তার গাড়ির পাশেই ছিলো। একজন টুরিষ্ট(মোসাদ স্পাই) হটাৎ খালিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে তার কানে কিছু একটা পুশ করতে চায়, বিষ ঢেলে দিয়েছে তার শরীরে। চুম্বকটানের মত খালিদের দেহরক্ষী টুরিস্টের উপর পুরো শরীরের চাপ দিয়ে বসিয়ে দেয়। খালিদ ছিটকে দুরে সরে যায়।

আক্রমনকারীদের একজন পালিয়ে গিয়ে ইসরাইলী এমব্যাসীতে লুকায়। বাকী দুজনকে খালিদের দেহরক্ষী আবু সইয়াফ ধাওয়া করে। নিজের এতোদিনের ট্রেনিং কাজে লাগায় সাইয়াফ। মল্লযুদ্বের মত কুস্টাকুস্তি হয় স্পাই ও সাইয়াফের মাঝে, স্পাইদের ধারালো যন্ত্রের সাহায্যে আহত হয়ে যায় সাইয়াফ, সাইয়াফের পাল্টা হেভি ঘুষিতে এক স্পাই মাটিতে পড়ে যায়। পরে সাইয়াফ হাসপাতালে এবং স্পাইদের পুলিশের কাছে পাঠানো হয়। খালিদের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে, ৪৮ ঘন্টার মধ্যে সে মারা যাবে।

হাসপাতালে ভর্তি করা হলো তাকে। জর্ডানের বাদশাহ হোসাইন এবার সরাসরি ফোন দেয় নেতানিয়াহুকে। যদি খালিদ মিশাল মারা যায়, তিন মোসাদ স্পাইকে হত্যা করা হবে, এবং ইসরাইলের সাথে শান্তি চুক্তি বাতিল হবে। এবার মোসাদের টনক নড়ে, মোসাদের চীফ নিজেই ল্যাবরেটরীতে মডিফাই করা বিষের প্রতিষোধক নিয়ে আম্মানে আসেন। খালিদ মিশাল সুস্থ হয়ে উঠেন। এই ব্যর্থ হামলার ফলাফল এমনই করুন ছিলো যে মোসাদের চীফকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

খালিদ মিশালের উপর এই হামলায় কানাডার গোয়েন্দা সংস্হা (csis) ও জড়িত আছে। এমন অনেক কুকির্তির কথা রয়েছে যা বলে শেষ করা যাবে না।

 

মোসাদের প্রধানরা (১৯৫১ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত)……………

রিউভেন শিলোয়াহ (Reuven Shiloah)

দায়িত্বকাল– ১৯৫১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ১৯৫২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর।

সম্ভ্রান্ত ইহুদি পরিবারে জন্ম নেয়া এই রিউভেন শিলোয়াহ বাল্যকালেই পারিবারিক ধর্মীয় বন্ধন ছিন্ন করেন। ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু শিলোয়াহ মোসাদ প্রতিষ্ঠার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। মোসাদ প্রতিষ্ঠার আগে তিনি
Central Institute of Coordination-এর ডিরেক্টর ছিলেন। তারও আগে তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসরাইল দূতাবাসে অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

ইসার হারেল (Isser Harel)

দায়িত্বকাল- ১৯৫২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত।

বর্তমান বেলারুশের এক ধনকুবের সন্তান ইসার হারেল। গোয়েন্দাবৃত্তির ক্ষেত্রে তাকে স্পাইমাস্টার বলা হতো। তার একটি ভিনেগারের কারখানা ছিল। এটি তাকে তার নানা দান করেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের সম্পত্তি দখল করে নিলে অনেকটা খালি হাতে তারা লাটভিয়ায় চলে আসেন। আসার পথে সোভিয়েত সৈন্যরা তাদের সুটকেস চুরি করে নেয়। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন তার মধ্যে ইহুদি চেতনা তৈরি হয়। ১৬ বছর বয়সে ইসরাইলের ইমিগ্রান্ট হন। এ সময়ে তিনি কৃষিকাজ করতেন। ১৯৫২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তাকে মোসাদের ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে তিনি মোসাদ ও সাবাকের হয়ে বিভিন্ন দেশে কাজ করেছেন। ১৯৬৩ সালে তিনি মোসাদ ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ইসরাইলের পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হন।

মির অমিত (Meir Amit)

দায়িত্বকাল– ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত।

১৯৫০ সালের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিজনেস স্কুল থেকে বিজনেস ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে তিনি ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সে মেজর জেনারেল হিসেবে যোগ দেন। তার সময়ই মোসাদের কার্যক্রম বিশ্বে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৩ সালে ইসার হারেল মোসাদ ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিলে, তাকে মোসাদের ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। মোসাদের হাই প্রোফাইলের স্পাইদের শীর্ষ সারির ইলি কৌহেনকে তিনি তৈরি করেন। সিআইএ’র সাথে গভীর সম্পর্কও তার সময় ঘটে।

ভি যামির (Zvi Zamir)

দায়িত্বকাল- ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত।

ভি যামির ছিলেন পোল্যান্ড বংশোদ্ভূত । সাত মাস বয়সে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তিনে বাবা-মায়ের সাথে তিনি চলে আসেন। ১৮ বছর বয়সে যামির সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শেষের কিছুদিন পর তাকে সাউদার্ন কমান্ডের কমান্ডার করা হয়। মোসাদের ডিরেক্টর হওয়ার আগে তিনি লন্ডনে কর্মরত ছিলেন। তার সময় মিউনিখ হত্যাকাণ্ড, ইওম কিপুর যুদ্ধ সঙ্ঘটিত হয়।

ঈঝাক হোফি (Yitzhak Hofi)

দায়িত্বকাল– ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত।

ইঝাক হোফির জন্ম তেলআবিবে। মোসাদের প্রধান হওয়ার আগে তিনি ইসরাইলের ডিফেন্স ফোর্সের জেনারেল ছিলেন। আরব-ইসরাইল যুদ্ধে তিনি একটি গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন। ১৯৭৩ সালে ঈওম কিপুর যুদ্ধে তিনি ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলের কমান্ডার ছিলেন। অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সের নর্দার্ন কমান্ডের চার্জে ছিলেন তিনি। মিলিটারি থেকে অবসর নেয়ার পর তাকে মোসাদের ডিরেক্টর করা হয়। ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে উগান্ডার ইনতিবি বিমানবন্দর থেকে ফ্রান্স এয়ারের একটি বিমান ছিনতাই হলে ইসরাইলের যাত্রীদের উদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন হোফি।

নাহুম আদমনি (Nahum Admoni)

দায়িত্বকাল- ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত।

মোসাদের ডিরেক্টর নাহুম আদমনি জন্ম জেরুজালেমে। হাগানা ইন্টেলিজেন্স ব্রান্সের অধীনে তিনি আরব-ইসরাইল যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধের পর তিনি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায় লেখাপড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখান থেকে ১৯৫৪ সালে ফিরে এসে আবার ইসরাইলি ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটিতে যোগ দেন। কিছুদিন পর তাকে ঈঝাক হোফির ডেপুটি নিয়োগ দেয়া হয়। তার সময় যুক্তরাষ্ট্রে মোসাদ গোয়েন্দা তৎপরতায় জোর দেয়। ২০০৬ সালের ইসরাইল-লেবানন দ্বন্দ্বে তিনি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

শাবতাই শাভিত (Shabtai Shavit)

দায়িত্বকাল– ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত।

১৯৬৪ সালে মোসাদে যোগ দিয়েছিলেন শাবতাই শাভিত। এর আগে ১৯৫৮ থেকে ১৯৫৯ সালে তিনি সাউদার্ন কমান্ডের মিলিটারি গভর্নর ছিলেন। ১৯৮৯ সালে তাকে মোসাদের ডিরেক্টর জেনারেল করা হয়। তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। মোসাদ থেকে অবসর নেয়ার পর হার্জলিয়ার ইন্টারডিসিপ্লিনারি সেন্টারের ইনস্টিটিউট অব কাউন্টার টেরোরিজমের চেয়াম্যান ছিলেন তিনি। এ ছাড়াও তিনি ইসরাইলের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অ্যাডভাইজার, সাব-কমিটি অব ইন্টেলিজেন্স’র অ্যাডভাইজর, কমিটি ফর ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি ও টাস্ক ফোর্স ফর ফিউচার প্রিপারডনেস অ্যাগেইনস্ট টেরোরিজমের সদস্য ছিলেন।

দানি ইয়াতুম (Danny Yatom)

দায়িত্বকাল- ১৯৯৬ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত।

রাজনীতিবিদ দানি ইয়াতুম মোসাদের ডিরেক্টর ছিলেন ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত। তিনি লেখাপড়া করেন গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিষয়ে হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সে কাজ করেন। মোসাদের ডিরেক্টর হওয়ার আগে তাকে ইসরাইলের কেন্দ্রীয় কমান্ড মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দেয়। মোসাদের প্রধান থাকাকালীন তিনি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের সিকিউরিটি অ্যাডভাইজরের দায়িত্বও পালন করেন। রাজনীতিতে যোগ দেয়ার পর ২০০৩ সালে তিনি পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হন।

ইফরাইম হেলভি (Efraim Halevy )

দায়িত্বকাল- ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত।

ইফরাইম হেলভি তিনি ছিলেন মোসাদের নবম ও ইসরাইলি ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের চতুর্থ প্রধান। যুক্তরাজ্যের এক কট্টর ইহুদি পরিবারে তার জন্ম। ১৯৪৮ সালে তিনি ইসরাইল আসেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত Central Institute of Coordination তিনি মান্থলি সার্ভে নামের একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এটি ইসরাইলের চিফ অ্যাডুকেশন অফিসার বের করতেন। ১৯৬১ সালে তিনি মোসাদে যোগ দেন।

মির দাগান (Meir Dagan)

দায়িত্বকাল- ২০০২ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত।

মোসাদের বর্তমান ডিরেক্টর হচ্ছেন মিলিটারি ব্যক্তিত্ব মির দাগান। তার জন্ম ১৯৪৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে। ১৯৫০ সালে তার পরিবার ইসরাইল আসেন ও তেলআবিবের বাত ইয়মে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে মির দাগান ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সে যোগ দেন। ইউনিভার্সিটি অব হাইফা থেকে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ব্যাচেলর ডিগ্রি নেন।

তামির পারদো (Tamir Pardo)

দায়িত্বকাল- ২০১১ সাল থেকে ২০১৬।

মোসাদের ডিরেক্টর তামির পারদো এর জন্ম জেরুজালেমে। তার বাবা ছিলো তুর্কি আর মা ছিলেন সার্বিয়ান-খ্রিষ্টান। তার বয়স যখন ১৮ তখন তিনি ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সে প্যারাট্রুপার হিসাবে যোগ দেন। ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সের অধীন অফিসার্স কোর্স সম্পূর্ণ করার পর তিনি সায়রেট ম্যাটকেলের কমুনিকেশন অফিসার হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৬ সালে অপারেশন আন্টাবিতে তিনি অংশ গ্রহন করেন। ১৯৮০ সালে তিনি মোসাদে যোগ দেন। ২০০৬ সালে লেবানিয়ান যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহন করেন। তার সময়কালে ইরান নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট এর অনেক বিজ্ঞানী মোসাদের গুপ্ত হত্যায় নিহত হয়।

ইয়াসি কোহেন (Yossi Cohen)

দায়িত্বকাল- ২০১৬ সাল থেকে বর্তমান।

ইয়াসি কোহেন জেরুজালেমে সম্ভ্রান্ত ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর বাবা তিনি একজন সপ্তম প্রজন্মের ইসরায়েলি এবং ইরাগুনের প্রবীণ ব্যক্তি ছিলেন। তার বাবা ছিলেন একজন ব্যাংকার আর মা ছিলেন একজন শিক্ষক।

৩০ বছরের অভিজ্ঞ এজেন্ট কোহেনকে মোসাদে ‘সবথেকে আস্থাশীল ব্যক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি তার কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময়ে বিভিন্ন দেশে এজেন্ট হিসাবে অনেক দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইসরাইলের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ৯ম অ্যাডভাইজার। ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মোসাদ এর সংগ্রহ বিভাগ (Tsomet) দায়িত্বে ছিলেন। সাবেক মোসাদ ডিরেক্টর তামির পারডোর এর সময়ে তিনি ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন। এই পদে তিনি “Y” হিসাবে সর্বজনীনভাবে পরিচিত ছিলেন। কোহেন মোসাদের হয়ে কাজের জন্য ২০১৬ সালে  Israel Security Prize জিতেছিলেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদক রনেন বার্গম্যানের মতে, কোহেনের মোসাদের জনপ্রিয় ডিরেক্টর হিসেবে সুখ্যাতি আছে। তিনি খুব নিখুঁতভাবে ইংরেজি, ফরাসি এবং আরবিতে কথা বলতে পারেন, এছাড়াও তিনি একজন ম্যারাথন রানার। তাছাড়াও তার কাজের জন্য তাকে ‘মডেল’ হিসাবে ডাকা হয়।

 

আজ এই পর্যন্ত। আগামীতে নতুন কিছু নিয়ে আসবো, ততক্ষণ পর্যন্ত সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: