আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার  (মেজর হায়দার নামে খ্যাত) জন্ম:১২ জানুয়ারি, ১৯৪২ – মৃত্যু: ৭ই নভেম্বর, ১৯৭৫,ছিলেন একজন বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধা, যিনি প্রথমে দুই নং সেক্টরের সহ-অধিনায়ক ও পরে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। একজন গেরিলা কমান্ডার হিসাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অভূতপূর্ব অবদান রাখার জন্য তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। বাবা আলহাজ মোহাম্মদ ইসরাইল। মা আলহাজ হাকিমুন নেসা । রিবারের দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে লে. কর্নেল হায়দার ছিলেন দ্বিতীয়।

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। হায়দার পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমী কাকুলে ট্রেনিং করেন এবং কমিশন প্রাপ্তির পর গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসার হিসাবে নিয়োজিত থাকেন। পরে তিনি চেরাটে S.S.G. (Special service group) ট্রেনিং-এ কৃতিত্বের সাথে উর্ত্তীর্ণ হন। উল্লেখ্য, চেরাটের এই ট্রেনিংটি ছিল মূলত গেরিলা ট্রেনিং। এখানে ৩৬০ জন অফিসারের মধ্যে বাঙালি ছিলেন মাত্র দুইজন। ট্রেনিং শেষ করার পর মুলতান ক্যাণ্টনমেন্টে তাঁর প্রথম পোস্টিং হয় এবং ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের একজন ক্যাপ্টেন হিসাবে ১৯৬৯ সালের শেষে অথবা ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে এ. টি.এম হায়দারকে কুমিল্লা সেনানিবাসে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে পুনরায় বদলি করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় এবং ১৫/২০ দিন পর তাঁকে আবার কুমিল্লায় নিয়োগ দেয়া হয়।

বাংলাদেশে (তত্কালীন পুর্ব পাকিস্তান) সেনাবাহিনীর ১ম কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের কর্মকর্তা হায়দার কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে পালিয়ে ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং শুরু থেকেই ২নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ এর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেলাঘরে অবস্থিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে সকল মুক্তিযোদ্ধাকে কমান্ডো, বিস্ফোরক ও গেরিলা ট্রেনিং সহ হায়দার মুক্তিযোদ্ধাদের শপথ গ্রহণ করাতেন।

সূর্যের বিপরীতে দাঁড়ানো আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দার, (মেজর হায়দার নামে খ্যাত)। ছবিটি একাত্তরের ডিসেম্বরে তুলেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের কনিষ্ঠ সন্তান এবং শহীদ শাফি ইমাম রুমীর অনুজ শ্রদ্ধেয় সাইফ ইমাম জামী।

 

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সফলতম কৌশল প্রণেতা ছিলেন তৎকালীন মেজর খালেদ মোশাররফ, তাঁর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কম্যান্ডো ক্যাপ্টেন হায়দার (মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই তিনি মেজর পদে উন্নীত হয়েছিলেন)।

তাঁদের পরিচালিত, স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টর দুই ছিল গেরিলা যোদ্ধা গড়া ও পরিচালনার সূতিকাগার। মেজর হায়দার ছিলেন গেরিলা যোদ্ধা তৈরির প্রধান কারিগর। বাংলাদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল ভূমি থেকে উঠে আসা পলিমাটি মাখা হাজার হাজার তরুন-যুবক’দের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। আজ অবিশ্বাস্য মনে হবে, কিন্তু এই মহান যোদ্ধা মাত্র কয়েক মাসে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন ৩৫ হাজার গেরিলাকে।

যাঁদের অনেকেই রাজধানী ঢাকা এবং সেক্টর দুইয়ের অধীন এলাকা ছাড়াও অবরুদ্ধ বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ত্রাস হয়ে আবির্ভূত হয়েছিল।

একাত্তরের সর্বসংহারি যুদ্ধ চলেছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সুবিশাল একটি ক্যানভাস জুড়ে। যুদ্ধটি চলেছিল দিবারাত্রির ২৪ ঘণ্টা ব্যাপী। মুক্তিযুদ্ধের ক্যানভাসে স্বাধীনতা নামে যে ছবিটি আঁকা হয়েছে একাত্তরের ৯ মাস জুড়ে, মেজর হায়দার ছিলেন সেই ছবির অন্যতম জ্যোতির্ময় শিল্পী।

সৈয়দ মাশুক আহমেদ একজন মুক্তিযোদ্ধা। মেজর হায়দারের কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই যোদ্ধা যুদ্ধ শেষেও মেজর হায়দারের বড় বোন আখতার বেগমের ঢাকার বাসায় আসা যাওয়া করতেন। মুক্তিযোদ্ধা মাশুক স্বাধীনতার পর পূবালী ব্যাঙ্কে কর্মরত ছিলেন। এক বিকেলে চা পানের সময় মেজর হায়দার হাসতে হাসতে মাশুককে বললেন,’কি মাশুক, ডিআইটি বিল্ডিং’র মতো দুয়েকটা বিল্ডিং আমাদের হতে পারতো না?’

মাশুক জবাবে বললেন, ‘কি বলেন হায়দার ভাই! আপনার হুকুমেই তো বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকার বস্তাগুলো টেনে নিয়ে স্ট্রং রুমে ঢোকালাম। আর এখন আমি পূবালী ব্যাংকে কেরানির চাকরি করি! আপনি কোন কিছু ধরলেন না, আমাদেরও কোন কিছু ধরতে দিলেন না’।

১৯৭৫ সালের রক্তস্নাত দুঃসময়ে ৭ নভেম্বর নৃশংসভাবে হত্যার পর, মেজর হায়দারকে কিশোরগঞ্জে সমাধিস্থ করা হয়। এর কয়েকদিন পর তাঁর বাড়ি থেকে আনুমানিক ৭-১০ মাইল দূরের গ্রাম থেকে এক কিশোর ছুটে এসে তাঁর সমাধির সামনে কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়ে। সেই ছেলেটির পড়াশোনার খরচ চালাতেন মেজর হায়দার। পঁচাত্তরে সেই কিশোর আইএসসি পড়তো, হায়দারের মৃত্যুর পর তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।

প্রতিটি মানুষ একেকটি ইতিহাস। প্রতিটি মানুষ একটি বাড়ির মতো, বাইরে থেকে দেখতে একরকম, ছাদের ওপর থেকে একরকম, বাড়ির ভেতর আরেকরকম। একসাথে একটি পুরো বাড়ি যেমন দেখা সম্ভব নয়, একইভাবে একটি মানুষকেও কখনো কোনদিন কারও পক্ষেই একসাথে উপলব্ধি করাও অসম্ভব প্রচেষ্টা।

কিংবদন্তী মেজর হায়দারের প্রতি হৃদয় গভীরের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করছি।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: