অপারেশন জ্যাকপট হলো মূলত তৎকালীন অনেকগুলো অপারেশন এর সম্মিলিত কোড নেম,তবে এটি দ্বারা প্রধানত ১৫ই আগস্ট মধ্য রাত তথা ১৬ই আগস্ট দ্বিতীয় প্রহরের অপারেশনটিকে বুঝায়,যা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভিত কাপিয়ে দিয়েছিল। অপারেশনটি বর্ণনা শুরু করতে হলে একটু পিছনের দিকে তাকাতে হবে। ১৯৭১ সালের মার্চের শুরুর দিকে পাকিস্তানী সাবমেরিন “PNS Mangro” এর ট্রেনিং এর জন্য ৪১ জনের একটি ট্রেইনির দল ফ্রান্স যায়। এরমধ্যে ১৩ জন ছিল বাঙালি। যখন তারা রেডিওতে ২৫ই মার্চ গণহত্যার খবর পায় তখন তারা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে যুদ্ধ করতে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাদের মধ্যে শুধু ৮ জন পালিয়ে এদেশে আসতে সক্ষম হন।  মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বাংলাদেশকে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করা হয়, যার মধ্যে ১০ম সেক্টরটি ছিল নৌ কমাণ্ডোদের অধীন। এই সেক্টরের দায়িত্ব তাদের উপরই ন্যস্ত ছিল। এবং এই সেক্টরের কমান্ডোদের দ্বারাই সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম দুর্ধর্ষ অপারেশন,অপারেশন জ্যাকপট। ১৬ই আগস্ট প্রথম প্রহরে নৌ কমান্ডোরা একত্রে চট্টগ্রাম,মংলা বন্দর ও চাঁদপুর ও নারায়নগন্জের নদী বন্দরে হামলা চালায়।এই হামলার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী হতবাক হয়ে যায় ও সারাবিশ্বের কাছে তৎকালীন এশিয়ার সেরা “ফাইটিং ফোর্স”বলে বিবেচিত পাক আর্মির নাক কাটা যায়। উপরে উল্লিখিত সেই ৮জন সাবমেরিনার সহ আরো ৩০০ র মতো যোদ্ধা সংগ্রহ করে ভারতের ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীতে পাঠানো হয় ট্রেনিং এর জন্য।তাদের ক্যাম্পের নাম দেওয়া হয় সি2-পি। এ ট্রেনিং ছিল খুবই গোপনীয় ভাবে সম্পন্ন করা এমনকি সেক্টর কমান্ডাররা ছাড়া এটি কেউ জানতেন না।  সেই আটজন সাবমেরিনার সেসব যোদ্ধাদের প্রশিক্ষন দিতে থাকেন । এছাড়াও কিছু ভারতীয় নেভাল অফিসারও প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তাদেরকে স্থল ও নৌ উভয় ধরনের যুদ্ধে পারদর্শী করে তোলা হয়। তাদেরকে স্পস্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে এটা একটা সুইসাইডাল অপারেশন,অর্থাৎ প্রয়োজনে নিজ প্রান উৎসর্গ করতে হতে পারে।তাদেরকে এই মর্মে একটি কাগজে সই করতে হয় যাতে লেখা ছিল যে তারা স্চ্ছোয় দেশরক্ষায় যুদ্ধ করছে,এবং তাদের যুদ্ধে মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী নয় । এভাবে তিন মাসের ট্রেনিং এর পর আগস্টের শুরুর দিকে তাদের ট্রেনিং শেষ হয়।তাদেরকে অপারেশনের প্রস্তুত হতে বলা হয়। মোট ১৬০ জন কমান্ডোকে অপারেশনের জন্য বাছাই করা হলেও শেষ পর্যন্ত এই অপারেশনে অংশ নেন ১৪৮ জন কমাণ্ডো।অপারেশনের স্থানগুলো হলো চট্টগ্রাম,মংল,চাদপুর ও নারায়ণগঞ্জের বন্দর।তাদেরকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র দেওয়া হয়।
অস্ত্রের নমুনা : একটি করে লিমপেট মাইন,ছুরি,একজোড়া সাঁতারের ফিন আর প্রতি তিনজনের জন্য একটি করে স্টেনগান ও কিছু শুকনো খাবার।  অপারেশনের দিন ধার্য করা হয় ১৫ই আগস্ট। কমান্ডোরা নিজ নিজ অবস্থান নেন ও চরম আঘাতের জন্য প্রস্তূত হন। এই অপারেশনে দুটি বাংলা গানকে সংকেত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এগুলো হল : পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া “আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান”যার মানে হল ২৪ ঘন্টার মধ্যে অপারেশন করতে হবে। আরেকটি গান হলো সন্ধ্যা মুখার্জির গাওয়া গান “আমার পুতুল যাবে শ্বশুরবাড়ি” এর মানে হল অপারেশনের জন্য বেড়িয়ে পড়। এগান দুটি আকাশবানী হতে প্রচারিত হয় এবং এর ফ্রিকোয়েন্সি এবং গান দুটির রহস্য শুধুমাত্র কমান্ডোরাই জানতেন।

এই মাইন দিয়ে জাহাজগুলি ধ্বংস করা হয়।

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে পৌছাতে নৌকমান্ডোর দল তিনটি ভাগ হয়ে এগুতে থাকে ও ১৪ই আগস্ট প্রথম সংকেত পায়।তৃতীয় দলের খোজ পাওয়া যাচ্ছিল না,তাই চট্টগ্রামের অপারেশনটিতে মাত্র ৩১ জন কমাণ্ডো অংশ নেন।তারা ২য় সংকেত পাওয়ার পর কর্নফুলী নদীতে সাতরিয়ে দক্ষতার সাথে পাকিস্তানী গার্ডদের নজর এড়িয়ে বন্দরের জাহাজগুলোতে মাইন লাগিয়ে দ্রুত চলে আসে।
রাত ১ টা ৪০ মিনিটে প্রথম বিস্ফারন ঘটে ও পরে আরো কয়েকবার।চট্টগ্রাম বন্দরে সেদিন প্রায় ১০ টি জাহাজ ও নৌযান ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল এমভি আব্বাস, এমভি হরমুজ ও ওরিয়েন্ট বাজ নং 6 । এসব জাহাজে বিপুল পরিমাণে সমরাস্ত্র ছিল।জাহাজডুবির ফলে বন্দরে ঢোকার রাস্তা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।এই ঘটনার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী হতবাক হয়ে যায়।
মংলা : মংলা বন্দরে অপারেশনটি আরো বৃহৎ পরিসরে হয়,কারন ৬০ জন নৌকমান্ডো সহ আরো ২০০ জন সি অ্যান্ড সি কমান্ডো ছিল।তারা রেডিওতে সংকেত পাওয়ার পর অপারেশনের সাফল্যের জন্য দোয়া/মুনাজাত করেন ও ১৫ টি নৌকায় করে মংলার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু একজনের ভুলের কারনে পৌছাতে অনেক দেরি হয় তাদের।তারা প্রায় ৬৬ টি উপদলে বিভক্ত হয়। কিন্তু সময়ের অভাবে শুধুমাত্র ২৪ জন নৌ কমাণ্ডো এই অপারেশনে অংশ নিতে পেরেছিল। তারা সেদিন ৬টি বিদেশী জাহাজ ডুবিয়ে দেয়।
তাছাড়া ছোটবড় প্রায় ৫০ টি নৌযান (জাহাজ নয়) ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা ডুবে যায়।এতে প্রায় ৩০০০০ গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম পানিতে ডুবে যায়।এর মধ্যে ৭০০০ টন অস্ত্র বহনকারী এসএস লাইটিং নামক সোমালীয় জাহাজও ছিল। 
চাঁদপুর : চাদপুরের অপারেশনে ১৮ জন নৌ কমাণ্ডো অংশ নেন। তারা ৬টি উপদলে বিভক্ত হয়ে অনেকগুলি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। এরমধ্যে অস্ত্রও রসদবাহী জাহাজ ও ছিল। 

নারায়নগন্জ : নারায়ণগঞ্জ এর অপারেশনে মোট ২০ জন অংশ নেন। তারা প্রায় ৪টি জাহাজ ও অনেকগুলি ছোটবড় সাধারন নৌযান ধ্বংস করেন।শহরের মাঝে হওয়ায় এই অপারেশনটি ছিল আরো কঠিন। . এইভাবে কমান্ডোরা সারাবিশ্বে সাড়া ফেলে দেয়। এছাড়াও আরো অনেকবার নৌ কমাণ্ডোরা পাকিস্তানী আর্মির উপর হামলা করে ও জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। এ ছাড়াও কিছৃ পাকিস্তানী নৌযানও কমাণ্ডো দের হস্তগত হয়। . এটাই ছিল দুর্ধর্ষ এক অপারেশনের বর্ণনা,যাতে প্রায় ২৬টি জাহাজ ও অনেক নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।ভিত কেপে উঠে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: