মিয়ানমারের অস্ত্রসংখ্যায় বেশ সমৃদ্ধ । যারা অস্ত্রের মান ও কার্যকারীতা এসব বিষয়ে তেমন ধারনা রাখেন না তারা অস্ত্রের সংখ্যার হিসাবেই দেশের শক্তির পরিমাপ করে থাকেন। কিন্তু,অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে তেমন কিছু যায় আসে না কারন কিছু অস্ত্রের পুরনো হওয়ায় যেমন এযুগে বলতে গেলে অচল আবার কিছু অস্ত্রের নেই মেয়াদ। তাই,সামরিক শক্তি বিশ্লেষনে পুরোপুরি ভাবে জেনে নেওয়াটা দরকার। একটা উদাহরনের মাধ্যমে বুঝা যায়। উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিন প্রায় ৭০+. এত সাবমেরিন ফ্রান্স,জার্মানি এসব দেশের কাছেও নেই। সংখ্যার হিসাবে দেখলে ফ্রান্স জার্মানি এক্ষেত্রে ব্যাপক দূর্বল। কিন্তু,যদি আরেকটু জানার চেস্টা করি তবে দেখা যাবে যে,উত্তর কোরিয়ার কয়েকটি বাদে সব সাবমেরিন ই অনেক পুরনো ও প্রায় অকেজো। তাই,অন্তত সেগুলো দিয়ে ফ্রান্স আর জার্মানির সাথে তুলনা চলে না। একই হিসাবে মিয়ানমারের কেবল অস্ত্র সংখ্যা গুনলেই হবে না,অস্ত্র কিরূপ,প্রয়োগ কিভাবে হবে ইত্যাদি নিয়েও জানা উচিত।

শিশু সৈন্য :-

শিশু সৈন্য

মিয়ানমারের আয়তন বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি তাই সেনাও বেশি প্রয়োজন। কিন্তু,মিয়ানমারের চার লাখের সেনাবাহিনীতে ৭০-৮০ হাজার সেনার বয়স ই ১৮ এর নিচে অর্থাৎ শিশু কিশোর। শিশু কিশোররা যে সেনাসদস্য হিসেবে উপযুক্ত না,সেটা বুঝতে সমরবিদ হওয়া প্রয়োজনীয় না।

সি ফ্রিগেট ঘাটতি :-

কিয়ান সিত্তাহ কোস্টাল ফ্রিগেট

মিয়ানমার নৌবাহিনীর বর্তমানে ৬টির মতো ফ্রিগেট রয়েছে। কিন্তু,এগুলোর একটিও সি ফ্রিগেট নয় অর্থাৎ সি লেভেল ৪ এর বেশি সহ্য করতে পারে না। কিয়ান সিত্তাহ ক্লাস ফ্রিগেট হলো কোস্টাল ফ্রিগেট যা গভীর সমুদ্রের জন্য উপযুক্ত নয়। তাই এগুলোকে যুদ্ধে সমুদ্রে নিয়োজিত করাই সম্ভব হবে না,যুদ্ধ পরের ব্যাপার।

ডাটা লিংক এর ঘাটতি :-

মিসাইলের ফুল রেঞ্জ ব্যবহার করা যায়না

মিয়ানমারের সবচেয়ে বেশি রেঞ্জের মিসাইল বলতে গেলে KH-35 ও C-802. এগুলোর রেঞ্জ যথাক্রমে ১৩০ ও ১২০ কি.মি। কিন্তু,এগুলো কাগজে কলমের হিসাব। বাস্তবতা হলো,এগুলোর কোনটিতেই ট্যাকটিক্যাল ডাটা লিংক বা টিডিএল না থাকার ফলে,মিসাইল গুলোকে ফুল রেঞ্জে ব্যবহার করা যায় না। মিসাইল গুলো তাই সর্বোচ্চ ৪০ কি.মি রেঞ্জের ভিতরের লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হানতে পারে,এর বেশি নয়। অর্থাৎ,মিয়ানমার নৌবাহিনীর মিসাইলের সর্বোচ্চ রেঞ্জ ১৩০ কি.মি নয়,৪০ কি.মি বা বড়জোড় ৫০ কি.মি।

অ্যান্টি সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার :-

মিয়ানমারের ফ্রিগেট থেকে অ্যান্টি সাবমেরিন রকেট ফায়ারিং

বাংলাদেশের সাবমেরিন মিয়ানমারের পক্ষে ধ্বংস অসম্ভব একারনে যে,মিয়ানমারের অ্যান্টি সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার এর জন্য প্রয়োজনীয় ইক্যুয়েপমেন্ট নেই। মিয়ানমারের কোন ASW হেলিকপ্টার নেই,এমনকী তারা যে টর্পেডো ব্যবহার করে তার রেঞ্জ মাত্র ৭ কি.মি। উল্লেখ্য যে,টর্পেডো কার্যকরী ভাবে কখনোই ফুল রেঞ্জে ব্যবহার করা যায় না,তাই কার্যকরী রেঞ্জ ধরা যেতে পারে ৫-৬ কি.মি। আর ASW রকেট দিয়ে সাবমেরিন হান্ট অসম্ভব কারন এগুলোর রেঞ্জ মাত্র ১২৫ মিটার। যা সাবমেরিন ধ্বংস ( অন্তত বাংলাদেশের দুটিকে) করতে যথেষ্ঠ নয়।

পুরনো এয়ারক্রাফট :-

মিয়ানমারের বহরে এখনো এ-৫ ফানটান বিমান ও এফ-৬ বিমান সার্ভিসে রেখেছে। যার কারনে আপাত দৃস্টিতে মনে হয় যে তাদের বহরে অনেক বিমান কিন্তু,এ বিমান গুলো বহু পুরনো আমলের মডেল। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীও এফ-৬,এ-৫ বিমান আগে ব্যবহার করতো কিন্তু এগুলো বেশ পুরাতন হয়ে যাওয়ায় তা অবসরে পাঠিয়েছে অন্যদিকে এখনো মিয়ানমার বিমান বাহিনী তা সার্ভিসে রেখেছে।

গ্রাউন্ডেড বিমান :-

গ্রাউন্ডেড মানে যখন কোন কারনে যেসব বিমান এক্টিভ রাখা যায়না। যেমন মেইনটেইন কস্ট বা অন্যান্য ডিফেক্ট যার ফলে এগুলোকে গ্রাউন্ডেড করে রাখতে হয়। মিয়ানমারের মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান মোট ৩২ টি যা সেকেন্ড হ্যান্ড ছিল,তার সবগুলো কিন্তু এক্টিভ নেই। বর্তমানে মিয়ানমার বিমান বাহিনীর আনুমানিক ১২-১৩ টি মিগ-২৯ বিমান এক্টিভ রয়েছে। ২০১৪ তে সিআইএ এর নথিতে মিয়ানমারের ১২টি মিগ-১৯ এক্টিভ আছে উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি মিয়ানমার মিগ-২৯ এর নতুন ১৮ টি ইঞ্জিনের জন্য টেন্ডার ডাকে যার মানে হচ্ছে তারা অন্তত ১৮ টি মিগ-২৯ কে নতুন ইঞ্জিন লাগিয়ে এক্টিভ সার্ভিসে রাখতে চায়। অর্থাৎ,তাদের বর্তমান এক্টিভ মিগ-২৯ বিমানের সংখ্যা ১৮ অপেক্ষা কম।

পুরাতন ট্যাংক :-

মিয়ানমারের ট্যাংক বহরের সবচেয়ে আধুনিক এমবিটি-২০০০ ট্যাংক রয়েছে এক রেজিমেন্ট,বাংলাদেশের ও সমান সংখ্যক এ ট্যাংক রয়েছে। কিন্তু,মিয়ানমার এখনো টাইপ-৭২,টাইপ-৬২ এর মতো পুরনো ট্যাংক ব্যাপক হারে ব্যবহার করছে যার ফলে হিসাবের সময় মিয়ানমারের ট্যাংক সংখ্যা অনেক গননা করা হলেও মিয়ানমারের ট্যাংক বহরের ক্ষমতা অত নয়। বাংলাদেশ তাদের বহরের টাইপ-৫৯ কে টাইপ-৫৯ জি দূর্জয়ে আপগ্রেড করেছে যার ক্ষমতা টি-৭২ হতে অনেক বেশি। আর টি-৬২,টি-৫৫ এর মতো ট্যাংক গুলো যা মিয়ানমার এখনো ব্যবহার করছে তা বাংলাদেশ এই শতাব্দী শুরুর আগেই অবসরে পাঠিয়েছে।

অকেজো ব্যালেস্টিক মিসাইল :-

মিয়ানমারের ব্যালেস্টিক মিসাইল

মিয়ানমার নিয়ে সবচেয়ে বড় যে ভয়,তাহলো মিয়ানমারের ৭০০ কি.মি রেঞ্জের ব্যালেস্টিক মিসাইল আছে। কিন্তু,পুরো ব্যাপারটি জানানো হয় না। পৃথিবীতে সবকিছুই নশ্বর। একটি মিসাইল কে নির্মানের পর সর্বোচ্চ ১০-১৫ বছরের মধ্যেই ব্যবহার করা যেতে পারে,অন্যথায় তা হতে ফলাফল আশা করা যায় না। মিয়ানমারের যে ব্যালেস্টিক মিসাইল রয়েছে তা ১৯৮০ এর দশকের,যার লাইফটাইম এই শতাব্দীর আগেই শেষ অথচ এখন ২০১৮ চলে। তাই,এ মিসাইল নিক্ষেপ করার মতো ঝুকি মিয়ানমার নিজেও নিতে চাইবে না।

তাই,মিয়ানমারের সামরিক শক্তি অস্ত্র দিয়ে হিসাব করতে গেলে উপরোক্ত ভুলগুলি হতে পারে। এগুলো কিছু ট্যাকটিক্যাল দূর্বলতার বিষয়। এছাড়াও অভ্যন্তরীন বিদ্রোহ,সৈনিকদের ট্রেনিং এর খারাপ মান (যেহেতু তারা অবরোধের কারনে বাইরের দেশের সাথে মহড়ায় যেতে পারেনি) ইত্যাদি আরো বহু বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে,কিছু দিক দিয়ে মিয়ানমার শক্তিশালী,বিশেষ করে তাদের বহরে ভালো পরিমানে সার্ফেস টু এয়ার মিসাইল বা স্যাম রয়েছে। এছাড়াও জঙ্গল ওয়ারফেয়ারে বার্মিজ সেনারা ভালোই পারদর্শী বলে জানা যায়।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: