মিসাইল বা শুদ্ধ বাংলায় ক্ষেপণাস্ত্র হচ্ছে মূলত স্ব-প্রণোদিত বা সেলফ প্রপেলড সিস্টেম।মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র মূলত চারটি অংশ নিয়ে গঠিত হয়।এগুলো হলো টার্গেটিং অথবা গাইডেন্স, ফ্লাইট সিস্টেম, ইঞ্জিন এবং ওয়েরহেড। মিসাইল বিভিন্ন প্রকার হয় এবং এগুলো বিভিন্ন যায়গা থেকে নিক্ষেপ করা যায়।মিসাইল সাধারনত ভূমি থেকে ভূমি,ভূমি থেকে আকাশ, আকাশ থেকে আকাশ, আকাশ থেকে ভূমি তে নিক্ষেপ করা যায়।এছাড়াও রেঞ্জ বা পাল্লার ভিত্তিতে মিসাইলকে শ্রেণিবিভাগ করা যায়।এছাড়াও মিসাইল পারমাণবিক বোমাও বহন করতে পারে।মিসাইল প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে একটা দেশকে ধ্বংস করা সম্ভব।প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে এমন মিসাইলও আবিষ্কৃত হয়েছে যা রাডার ফাকি দিতেও সক্ষম।

মিসাইল ধারণাটি এসেছিল মূলত কামানের গোলা নিক্ষেপ করাকে কেন্দ্র করে।কামানের গোলা আর রকেটের মধ্যে তফাত হল, কামানের গোলা যে বেগে ছুঁড়ে দেয়া হয়, বাতাসের বাধার কারণে তার গতি ক্রমেই কমতে থাকে, অন্যদিকে, রকেটে জ্বালানি থাকায় তার গতি জ্বালানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রায় সমবেগে চলতে থাকে।

মিসাইল প্রযুক্তিতে পশ্চীমারা অনেক দূর এগিয়ে গেলেও যুদ্ধে সর্বপ্রথম রকেট বা মিসাইল প্রযুক্তির ব্যবহার হয় এই ভারতীয় উপমহাদেশে। এই প্রযুক্তি ইংরেজদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন মহীশূরের অধিকর্তা উপুমহাদেশের অন্যতম সেরা বীর টিপু সুলতান।তবে এর আগে কোরীয়রা ও মোঙ্গলরাও ১৫ শতকে মিসাইল ব্যবহার করেছিল বলে জানা যায় কিন্তু এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

১৭৯৯ সালে টিপু সুলতানের সঙ্গে ব্রিটিশদের সর্বশেষ যুদ্ধ হয়। তুরুখানালি নামক স্থানে সংঘটিত এ যুদ্ধে টিপুর বাহিনী দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরাজিত হয় এবং নিহত হন টিপু সুলতান। ফলে টিপু সুলতানের ব্যবহৃত প্রায় সাতশ এর অধিক রকেট ও নয়শ এর অধিক রকেটের উপকরণ ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। ব্রিটিশ সেনাপতি উইলিয়াম কংগ্রিভ এই উপকরণগুলো ইংল্যান্ডে নিয়ে যান। ব্রিটিশরা এগুলোকে পরীক্ষা ও গবেষণা করে এর কারিগর জানে এবং এর নকল করে কংগ্রিভ রকেট তৈরি করে টিপুর বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছিল। আর আজকের আধুনিক মিসাইল তারই ধারাবাহিকতায় তৈরি। তবে আধুনিক মিসাইল আবিষ্কারক জার্মানরা। ভি-১ (ক্রুজ) ও ভি-২ (ব্যালিস্টিক) নামে এই মিসাইলগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির চূড়ান্ত পরাজয়ের পর বিভিন্ন জার্মান প্রযুক্তির সাথে সাথে মিসাইল প্রযুক্তিও হাতিয়ে নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা।

মিসাইলের ভিতরে মূলত ওয়ারহেড থাকে যা লক্ষবস্তুকে ধ্বংস করে। বর্তমানকালের উন্নত মিসাইলগুলোতে কম্পিউটার গাইডেড সিস্টেম থাকে যার মাধ্যমে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত করা যায়।মিসাইলের ওয়ারহেডে থাকে হাই এক্সপ্লোসিভ বা উচ্চ বিস্ফোরক এবং জ্বালানি হিসাবে থাকে সলিড বা লিকুইড লো এক্সপ্লোসিভ জেট ফুয়েল যাকে প্রোপোল্যান্ট বলে।মিসাইলের গাইড বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত নিশ্চিত করতেও বিভিন্ন ধরণের গাইডেন্স সিস্টেম ব্যবহার করা হয়,যেমনঃজিপিএস গাইডেন্স,লেজার গাইডেন্স,টিভি গাইডেন্স,ইনফ্রারেড ইত্যাদি।

পাল্লা বা রেঞ্জের ভিত্তিতে মিসাইল মূলত তিন ধরনের। এগুলো হলোঃ স্বল্প,মাঝারি ও দূরপাল্লার মিসাইল।

তবে বব্যবহারের দিক থেকে মিসাইলকে আরো তিন ধরণের মিসাইলে ভাগ করা যায়।এগুলো হলোঃ

১.প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য মিসাইল(Conventional guided missiles)।যেমনঃ

♦Air-to-air missile(AAM) বা আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপ যোগ্য মিসাইল

♦Air-to-surface missile(ASM) বা আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণ যোগ্য মিসাইল

♦Surface-to-air missile(SAM) বা ভুমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য

♦Surface-to-surface missile(SSM) বা ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য

♦Anti-ballistic missile(ABM) বা ব্যালাস্টিক প্রতিরোধক মিসাইল

♦Anti-ship missile(ASM) বা জাহাজ বিধ্বংসী মিসাইল

♦Anti-submarine missile(ASM) বা ডুবোজাহাজ বিধ্বংসী মিসাইল)

♦Anti-tank guided missile(ATGM) বা ট্যাংক বিধ্বংসী মিসাইল

♦Land-attack missile বা ভূমিতে আক্রমণযোগ্য মিসাইল

২.Cruise missiles(ক্রুজ মিসাইল)ঃ কোনো মিসাইল যদি গাইডেড হয়, সারফেস অথবা ল্যান্ড টার্গেটে হামলা চালায়, এর গতিপথ সবসময় বায়ুমণ্ডলের ভিতরে থাকে, গতিপথের বেশির ভাগ সময় একই গতিতে চলতে থাকে তাকে ক্রজ মিসাইল বলে।

ক্রুজ মিসাইল ২ প্রকার।এগুলো হলোঃ

♦ল্যান্ড এ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল।

♦এন্টি শিপ ক্রুজ মিসাইল।

♦ল্যান্ড এটাক ক্রুজ মিসাইলঃ যে ক্রুজ মিসাইলগুলো ভূমিতে থাকা টার্গেটকে আঘাত করে বা ভূমিতে এর বিস্ফোরন ঘটায় সেগুলোকে ল্যান্ড এটাক ক্রুজ মিসাইল বলে।টার্গেট চলন্ত অবস্থায় থাকলেও হামলা করতে পারবে।ল্যান্ড এ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল যে কোন প্লাটফর্ম থেকে নিক্ষেপ করা যায়।যেমনঃবিমান,সাবমেরিন,জাহাজএবং ভূমি হতে নিক্ষেপ করা যায়।

♦এন্টি শিপ ক্রুজ মিসাইলঃ যে ক্রুজ মিসাইলগুলো জাহাজ ধ্বংসের জন্য এবং উপকূলীয় ভূমিতে আক্রমন করতে ব্যবহৃত হয় সেগুলোকে এন্টি শিপ ক্রুজ মিসাইল বলে।এন্টি শিপ মিসাইল যে কোন প্লাটফর্ম থেকে নিক্ষেপ করা যায়।যেমনঃবিমান,সাবমেরিন,জাহাজ এবং ভূমি।তবে ক্রুজ মিসাইল বলতে মূলত ল্যান্ড এটাক ক্রুজ মিসাইলকেই বুঝায়।

৩.Ballistic missiles(আন্তঃমহাদেশীয় মিসাইল)ঃব্যালিস্টিক মিসাইল হল সেই সব ক্ষেপণাস্ত্র, যারা শুধু ছুঁড়ে দেওয়ার সময়ের ধাক্কাতেই গোটা পথ চলে না। বন্দুকের গুলি বা কামানের গোলা ছোটে কেবল ছুঁড়ে দেওয়ার ধাক্কাতে। ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রথম ধাক্কায় উঁচুতে ওঠে আকাশপানে। তার পর দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয় পৃথিবীর আবহমণ্ডল থেকে বেশি উচ্চতায়। তখন ওই ক্ষেপণাস্ত্র চলে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে। এ ভাবে অনেকটা দূরত্ব অতিক্রম করার পর তা নেমে আসে পৃথিবীর দিকে। প্রথমে বায়ুমণ্ডল ভেদ করে কোনাকুনি ঊর্ধ্বগতি, তার পর মাধ্যাকর্ষণ-নির্ভর দীর্ঘ পথ, অবশেষে ফের বায়ুমণ্ডল ভেদ করে ভূপৃষ্ঠে লক্ষ্যস্থানে অবতরণ মোট পথের এই তিন ভাগ থাকে ব্যালিস্টিক মিসাইল-এর।

পাল্লা বা রেঞ্জের ভিত্তিতে ব্যালিস্টিক মিসাইললের বেশ কিছু প্রকারভেদ আছে।এগুলো হলোঃ

♦Short-range ballistic missile(স্বল্প পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় মিসাইল)

♦Medium-range ballistic missile(মাঝারি পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় মিসাইল)

♦Intermediate-range ballistic missile(সেমি-দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় মিসাইল)

♦Intercontinental ballistic missile(আন্ত:মহাদেশীয় মিসাইল)

♦Submarine-launched ballistic missile(ডুবোজাহাজ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য আন্তঃমহাদেশীয় মিসাইল)

♦Air-launched ballistic missile(আকাশ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য)

এছাড়াও গতির ভিত্তিতেও মিসাইলের বিভিন্ন প্রকারভেদ আছে, যেমনঃ

১.Hypersonic(হাইপারসনিক)ঃ শব্দের চেয়ে কমপক্ষে ৫ গুণ গতিসম্পন্ন মিসাইলকে হাইপারসনিক মিসাইল বলে।

২.Supersonic(সুপারসনিক)ঃ শব্দের চেয়ে দ্রুতগতির মিসাইলকে সুপারসনিক মিসাইল বলে।

৩.Subsonic(সাবসনিক)ঃ শব্দের চেয়ে কম গতিত মিসাইলকে সাবসনিক মিসাইল বলে।

৪.Long-range subsonic(দূর পাল্লার সাবসনিক)ঃ- এ মিসাইলগুলোর পাল্লা ১০০০ কিলোমিটারের বেশি এবং গতি শব্দের গতি থেকে কম।

৫.Medium-range subsonic(মাঝারি পাল্লার সাবসনিক)ঃ এই মিসাইলগুলোর পাল্লা ১০০০ কিলোমিটারের কম এবং গতি শব্দের গতি থেকে কম।

৬.Short-range subsonic(স্বল্প পাল্লার সাবসনিক)ঃ এই মিসাইলগুলোর পাল্লা ৩০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি এবং এবং গতি শব্দের গতি থেকে কম।

Facebook Comments

1 Comment

Al Jaim Pappu · December 23, 2017 at 6:11 pm

ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: