“বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত” এই বিষয়কে সামনে রেখে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে আরও শক্তিশালী, আধুনিক, গতিশীল ও যুগ উপযোগী করার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। তার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে নতুন নতুন বিমানঘাঁটি নির্মাণ, বিভিন্ন ধরনের আধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ও আধুনিক যুদ্ধবিমান ক্রয় ইত্যাদি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

৩১ তারিখ, ২০১৭, রবিবার, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোরে অবস্থিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনী একাডেমীতে বিমানবাহিনীর ৭৪তম বাফা কোর্স ও ডিরেক্ট এন্ট্রি কমিশন রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সনদ ও ফ্লাইং ব্যাজ বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরিশাল ও সিলেটে প্রক্রিয়াধীন নতুন দুটি বিমানবাহিনী ঘাঁটি নির্মাণের কথা জানান। শিগগিরই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে আধুনিক যুদ্ধবিমান, পরিবহন বিমান, অত্যাধুনিক বেসিক ট্রেনিং হেলিকপ্টার, জেট ট্রেনার, সিমুলেটর, আন-ম্যানড এরিয়াল ভেহিকল সিস্টেম (ইউএভি), স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ পাল্লার এয়ার ডিফেন্স রাডার এবং মধ্যমপাল্লার সারফেস টু এয়ার মিসাইল সিস্টেম বিমান বাহিনীতে যুক্ত করার কথা বলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিমানবাহিনী অফিসার, বৈমানিক, সৈনিকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেন।

মধ্যমপাল্লার সারফেস টু এয়ার মিসাইল সিস্টেম

বাংলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে চায়নার নির্মিত মধ্যম পাল্লার Ly-80 sam যুক্ত হচ্ছে। এটি মূলত চায়নার HQ-16 স্যাম এর এক্সপোর্ট ভার্সন। ২০১৮ সালের মার্চের শেষ নাগাদ বিমানবাহিনীতে যোগ দিবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আসুন এ সম্পর্কে জেনে নেই।

 

Ly-80 sam

  • ২০১১ সালে সার্ভিসে আসে।
  • এটি Russian Buk-M1 এবং Ural/Buk-2M স্যাম এর উপর ভিত্তি করে বানানো হয়।
  • এটি মধ্যম পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য স্যাম।
  • রাডারের সর্বোচ্চ রেঞ্জঃ ১৪০ কিঃ মিঃ।  এবং পাল্লা ২০ কিঃ মিঃ।
  • এর রাডার সর্বোচ্চ ১৪৪টি লক্ষ্যবস্তুকে ডিটেক্ট করতে পারে। একসাথে ৪৮টি লক্ষ্যবস্তুকে একসাথে ট্র্যাক করতে পারে।
  • সর্বোচ্চ মিসাইল রেঞ্জঃ ৪০ কিলোমিটার অর্থাৎ ৪০ কিঃ মিঃ দূরের যেকোন লক্ষ্যবস্তুকে ধ্বংস করতে করতে পারে।
  • এটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলিগুলো ৩.৫ কিমি থেকে ১৮ কিমি মধ্যে উড়ে যাওয়া যেকোন বিমান, ড্রোন মিসাইলকে ভূপাতিত করতে পারে।
  • মিসাইল নিক্ষেপকের ভরঃ  ৬৯০ কেজি।
  • এর একটি কন্টেইনারে ৬টি মিসাইল থাকে। এবং একই সময়ে ২টি মিসাইল নিক্ষেপ করা যায়।
  • মিসাইলের গতিঃ ৩ ম্যাক
  • মিসাইলের ভরঃ ৭০ কেজি
  • ওয়ারহেড টাইপঃ HE-FRAG
  • হিট একুরেসি
    • বিমান বা অন্যান্য ভেইকেলের ক্ষেত্রেঃ ৮৫%
    • মিসাইলের ক্ষেত্রেঃ ৬০%

এক ব্যাটারি HQ-16 বা Ly-80 sam এ চারটি লাঞ্চার ভেইকেল, একটি কমান্ড পোস্ট, ২টি রাডার ভেইকেল, মিসাইল ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড রিলোডিং ভেইকেল, পাওয়ার সাপ্লাই ভেইকেল থাকে। মিসাইলগুলি ৬*৬ হাই মবিলিটি চেসিসের উপর সাজানো থাকে।

 

আন-ম্যানড কমব্যাট এরিয়াল ভেহিকল (ইউভিএ) সিস্টেম

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে সক্ষমতা বাড়াতে যে সব আন-ম্যানড কমব্যাট এরিয়াল ভেহিকল (ইউভিএ) সিস্টেমের জন্য টেন্ডার ছাড়া হয়েছে। সেই অনুসারে তুরস্কের TAI Anka Drone, চাইনিজ CH-4B, CH-5Wing Loong II UCAV অন্যতম। এদের মধ্যে যেকোনো একটি সিস্টেম বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রথম আন-ম্যানড কমব্যাট এরিয়াল ভেহিকল সিস্টেম হিসাবে সার্ভিসে আসবে। চলুন এগুলো সম্পর্কে জেনে নেই।

CH-5

  • দেশঃ চীন
  • প্রতিষ্ঠানঃ China Aerospace Science and Technology Corporation (CASC)
  • এই ড্রোনটি মার্কিন MQ-9 Reaper অ্যাটাক ড্রোনের থেকেও অনেক বেশি কার্যকর।
  • এটি একটি শক্তিশালী সার্ভেলেন্স এবং অ্যাটাক ড্রোন। যা দিনে-রাতে, যে কোন আবহাওয়ায়, যেকোনো পরিস্থিতিতে শত্রুর এলাকায় প্রবেশ করে গোপনে নজরদারি, পর্যবেক্ষণ করতে পারে। লক্ষ্যবস্তুকে সনাক্ত করে তাকে ধ্বংস করা, গোপনে ড্রোন অপারেশন, সিগনাল ইন্টেলিজেন্স অপারেশন ও গোপন মিশন পরিচালনায় কার্যকরী। এই ড্রোনটি অটোমেটিক টেক অফ এবং ল্যান্ডিং করতে পারে।
  • এটি একটানা ৬০ ঘণ্টা উড়তে পারে। ভবিষ্যতে ১২০ ঘণ্টা উড়তে পারে সে জন্য বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে যাচ্ছেন।
  • এর রেঞ্জঃ ২০,০০০ কিঃ মিঃ
  • সর্বোচ্চ পাল্লা ৯ কিঃ মিঃ
  • এতে ৩৩০ এইচপি হেভি ফুয়েল ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে।
  • এর ওজন ১,২৪৫ থেকে ১,৩০০ কেজি।
  • এটি ১০০০ কেজির উপর ওয়ারহেড নিতে পারে।

CH-5 ১৬ টি এয়ার টু গ্রাউন্ড মিসাইল বহন করতে পারে, যেখানে Lan Jian 7 (Blue Arrow 7) লেজার গাইডেড এয়ার টু গ্রাউন্ড মিসাইল, TG-100 লেজার/আইএনএস/জিপিএস গাইডেড বম্ব, AR-1/HJ-10 এন্টি ট্যাংক মিসাইল অন্যতম

CH-4B

  • দেশঃ চীন
  • প্রতিষ্ঠানঃ China Aerospace Science and Technology Corporation (CASC)
  • এই ড্রোনটি দেখতে মার্কিন MQ-9 Reaper অ্যাটাক ড্রোনের মত।
  • এটি একটি সার্ভেলেন্স এবং অ্যাটাক ড্রোন। দিনে-রাতে, যে কোন আবহাওয়ায়, যেকোনো পরিস্থিতিতে শত্রুর এলাকায় প্রবেশ করে গোপনে নজরদারি, পর্যবেক্ষণ করতে পারে। লক্ষ্যবস্তুকে সনাক্ত করে তাকে ধ্বংস করা ও গোপন মিশন পরিচালনায় কার্যকরী।
  • এর দুটি ভার্সন আছে।
    • CH-4A, এটি একটি সার্ভেলেন্স Drone. এটি কেবল নজরদারি করার কাজে ব্যবহার করা হয়।
    • CH-4B, সার্ভেলেন্স এবং অ্যাটাক ড্রোন।
  • এটি একটানা ৩০ ঘণ্টা উড়তে পারে।
  • এর ওজন ১২৪৫ থেকে ১৩০০ কেজি।
  • এটি ২৫০ থেকে ৩৪৫ কেজি ওজনের ওয়ারহেড নিতে পারে।

TAI Anka Drone

  • দেশঃ তুরস্ক
  • প্রতিষ্ঠানঃ Turkish Aerospace Industries(TAI)
  • এটি মুলত সার্ভেলেন্স এবং অ্যাটাক ড্রোন। এটি দিনে-রাতে, যে কোন আবহাওয়ায়, এমনকি যেকোনো পরিস্থিতিতে শত্রুর এলাকায় প্রবেশ করে গোপনে নজরদারি, পর্যবেক্ষণ করতে পারে। তাছাড়া যে কোনো লক্ষ্যবস্তুকে সনাক্ত করে তাকে ধ্বংস করা, সিগনাল ইন্টেলিজেন্স অপারেশন ও গোপন মিশন পরিচালনায় যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা রাখতে TAI Anka Drone ভালোভাবে সিদ্ধহস্ত।
  • TAI Anka Drone এর-
    • দৈর্ঘ্য ২৬.২ ফুট
    • উচ্চতা ১১.১ ফুট।
  • এটি সর্বোচ্চ ১৬০০ কেজি ওজন নিতে পারে।
  • এটি সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ফুট উপরে উঠতে পারে এবং একটানা ২৪ ঘন্টা উড়তে সক্ষম।
  • ড্রোনটির সর্বোচ্চ গতি ২১৭ কিঃ মিঃ।
  • এটি একটানা সর্বোচ্চ ৪৮৯৬ কিঃ মিঃ পথ পাড়ি দিতে পারে।
  • এতে 1 × Thielert Centurion ২.০ টার্বোচার্জড চার সিলিন্ডারের ইঞ্জিন (১৫৫ এইচপি) ব্যবহার করা হয়েছে।
  • TAI Anka ড্রোনটির বর্তমানে তিনটি ভ্যারিয়ান্ট আছে।
    • ANKA A
    • ANKA B
    • ANKA S
    • এছাড়া ANKA +A নামে আরেকটি নতুন ও শক্তিশালী UCAV নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে আগের ভার্সনগুলো ব্যবহার করার ইঞ্জিন থেকে শক্তিশালি টার্বো ইঞ্জিন কিংবা গ্যাস টার্বাইন ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে। ANKA +A UCAV টি রকেটসান কোম্পানির সিরিট মিশাইল বহন করতে পারবে। ধারনা করা হচ্ছে যে, এর ওজন হবে ৪ হাজার কেজির ও বেশি।

ব্যবহারকারী দেশঃ তুরস্ক ও মিশর।

এটি বিভিন্ন ধরনের মিসাইল, গাইডেড, আনগাইডেড বোমা ইত্যাদি পরিবহন করতে পারে।

CAIG Wing Loong drone

  • দেশঃ চীন
  • প্রতিষ্ঠানঃ চেংদু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন।
  • এই ড্রোনটি মার্কিন প্রেডিটর অ্যাটাক ড্রোনের চাইনিজ কপি।
  • এটি একটি সার্ভেলেন্স এবং অ্যাটাক ড্রোন। দিনে-রাতে, যে কোন আবহাওয়ায়, যেকোনো পরিস্থিতিতে শত্রুর এলাকায় প্রবেশ করে গোপনে নজরদারি, পর্যবেক্ষণ করতে পারে। লক্ষ্যবস্তুকে সনাক্ত করে তাকে ধ্বংস করা ও গোপন মিশন পরিচালনায় কার্যকরী।
  • এটি একটানা ২০ ঘণ্টা উড়তে পারে।
  • CAIG Wing Loong drone 
    • এটি লম্বাঃ ২৯ ফুট ৮ ইঞ্চি
    • উচ্চতাঃ ৯ ফুট ১ ইঞ্চি
  • ওজনঃ ১১০০ কেজি
  • সার্ভিস সিলিংঃ ৫০০০ মিঃ
  • সর্বোচ্চ গতিঃ ২৮০ কিঃ মিঃ
  • রেঞ্জঃ ৪০০০ কিঃ মিঃ
  • এটি ১৫০ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন সিরিজের মিসাইল বহন করতে পারে
  • এর ছয়টি ভেরিয়েন্ট আছে।
    • Pterosaur I
    • Pterodacty II
    • Sky Saker (এক্সপোর্ট ভার্সন)
    • WJ-1
    • GJ-1
    • Wing Loong II, এটি সর্বোচ্চ ১২টি এয়ার টু সারফেস মিসাইল বহন করতে পারে।

ব্যবহারকারী দেশঃ চায়না, মিশর, সৌদিআরব, আরব আমিরাত, নাইজেরিয়া। তবে মিশরের বিমানবাহিনী সবচেয়ে বেশি Wing Loong II ড্রোন  ব্যবহার করে থাকে।

আশা করা যায়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে এসব সিস্টেম যোগ হলে বিমানবাহিনী অনেক শক্তিশালি হবে।

তথ্যসুত্রঃ

  1. HQ-16 
  2. TAI Anka 
  3. CAIG Wing Loong
  4. CH-4  
  5. China’s New Killer Drone Ready for Mass Production
Facebook Comments

1 Comment

Al Jaim Pappu · January 2, 2018 at 1:02 am

অকের ভিতর অনেক তথ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: