মঙ্গোল সাম্রাজ্য এবং তার সামরিক ইতিহাস

১৩শ শতকে মঙ্গোল যোদ্ধাদের বাহিনী এশিয়া ও ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। অমানবিক, নির্মমতার সাথে শত্রুদের কচুকাটা করে তারা বিশ্বের ইতিহাসে বৃহত্তম মঙ্গোল সাম্রাজ্য গড়তে সক্ষম হয়।

মঙ্গোলরা আদিতে উরাল পর্বতমালা থেকে গোবি মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্য এশিয়ার সমভূমিগুলিতে বাস করত। তারা যাযাবরের মত পশুর পাল নিয়ে ঘুরে বেড়াত এবং ইউর্ত নামের অস্থায়ী পশমী তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করত। তারা তাদের ভেড়া, ঘোড়া ও ছাগলের পালের জন্য নতুন নতুন তৃণভূমির সন্ধান করত। ষাঁড়ের গাড়িতে করে তাদের পশমী তাঁবুগুলি পরিবহন করত। ঘোড়াগুলি মঙ্গোলদের জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ ছিল। তারা সবসময় মাদী ঘোড়ার সদ্যদোয়ানো দুধ পান করত। তারা কাঠের কাঠামো থেকে ঝোলানো চামড়ার থলেতে ঘোড়ার দুধ গাঁজিয়ে কুমিস নামের একটি ঝাঁজালো পানীয় বানাত। যুদ্ধবিজয়ের পরে উৎসবে সবাই কুমিস পান করত এবং ঘোড়ার লোম থেকে বানানো তারের বীণা বাজাত।

মঙ্গোলদের নেতাদেরকে “খান” নামে ডাকা হত। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে তেমুজিন খান নামের মঙ্গোল নেতা সমস্ত মঙ্গোল গোত্রগুলি এক পতাকার নিচে নিয়ে আসেন। তাঁর নাম দেওয়া হয় চেঙ্গিস খান, অর্থাৎ “সবার প্রভু”। সারা জীবন ধরে অসংখ্য সমরাভিযানশেষে চেঙ্গিস খান শেষ পর্যন্ত পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল থেকে পশ্চিমে ইউরোপের দানিউব নদী পর্যন্ত এক সুবিশাল সাম্রাজ্য গঠন করেন, যার মধ্যে বিরাট পারস্য সাম্রাজ্যও ছিল এক অংশমাত্র। ১২১১ সালে চেঙ্গিস খান চীন আক্রমণ করেন এবং ১২১৫ সালের মধ্যে মঙ্গোলদের হাতে চীনের তৎকালীন রাজধানী বেইজিংয়ের পতন ঘটে। ১২১৭ সালে মঙ্গোলরা চীন ও কোরিয়া নিয়ন্ত্রণ করত। কারাকোরুম শহরে (বর্তমানে মঙ্গোলিয়াতে অবস্থিত) তাদের রাজধানী ছিল । ১২১৯ সালে মঙ্গোলরা পশ্চিমদিকে অগ্রসর হয়ে খোয়ারিজম সাম্রাজ্য (পারস্য ও তুরস্ক) আক্রমণ করে। ১২২৪ সালে তারা রাশিয়া, পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি আক্রমণ করে। চেঙ্গিস খান যুদ্ধক্ষেত্রে নির্মম হলেও তার সাম্রাজ্যে শান্তি বজায় রাখেন এবং শক্ত হাতে কিন্তু ন্যায়বিচারের সাথে শাসন করেন। তার সময়ে বাণিজ্যের বিকাশ ঘটে।তিনি রাশিয়ার অংশবিশেষ এবং মধ্য ইউরোপও দখল করেন।

 

১২২৭ সালে চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পরেও মঙ্গোলরা আক্রমণ অব্যাহত রাখে। ১২২৯ সালে চেঙ্গিস খানের এক পুত্রসন্তান ওগাদাই খান মঙ্গোলদের নেতা হন। চেঙ্গিস খানের আরেক সন্তান বাতু খান এবং সুবোতাই খানের নেতৃত্বে ১২৩৭ সালে মঙ্গোল বাহিনী রাশিয়া দখলের জন্য আক্রমণ করে। তাদের সেনাবাহিনীর নাম ছিল “স্বর্ণালী দঙ্গল”। ইউরোপে মঙ্গোলদের দ্রুতি ও হিংস্রতার কথা ছড়িয়ে পড়লে সেখানকার জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিটি মঙ্গোল সেনা পাঁচটি ঘোড়া নিয়ে চলাচল করত এবং প্রত্যেকে তীরন্দাজি ও বর্শা নিক্ষেপে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। ঘোড়সওয়ারী হয়ে তারা কেবল পা দিয়ে ঘোড়াদের নিয়ন্ত্রণ করত, এবং খালি দুই হাত তীর ছোঁড়া বা বর্শা নিক্ষেপের কাজে লাগাত। যুদ্ধের সময় তারা ছিল ক্ষমাহীন, নিষ্ঠুর যোদ্ধা। তারা গোটা শহরের সবাইকে সদলবলে হত্যা করে তাদের সম্পদ লুন্ঠন করে অন্য শহর আক্রমণ করতে যেত। ১২৪১ সালে মঙ্গোলদের নেতা ওগাদাই খানের মৃত্যুর সংবাদ পশ্চিমে এসে পৌঁছালে ইউরোপে অগ্রসরমান মঙ্গোলবাহিনী আবার এশিয়াতে ফেরত যায়, ফলে ইউরোপ পরিত্রাণ পায়।

তেমুজিন ধীরে ধীরে নিজের শক্তি সুসংহত করে তার অধিকৃত এলাকা সম্প্রসারিত করতে থাকেন। তার বয়স যখন ৫০ বছর হলো, তখন পূর্ব দিকে চীন, পশ্চিম দিকে ইসলামি সাম্রাজ্য, পশ্চিম দিকে রাশিয়া ও খ্রিষ্টান ইউরোপ দেশগুলো তার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তার সামনে পড়া ছোট-বড় সব শক্তিকে তিনি গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে আড্রিয়াক সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল চীন, কোরিয়া, মঙ্গোলিয়া, পারস্য (আধুনিক ইরান),ইরাক তুর্কিস্তান, আর্মেনিয়া ও বার্মা, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও রাশিয়া,ইউরোপ অংশবিশেষ।

 

চেঙ্গিস খান বিশ্বের ভয়ঙ্করতম সেনানায়ক হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। তার সাম্রাজ্য ছিল বৃহত্তম ভূ-সাম্রাজ্য। এত বছর পরও তার চেয়ে বড় সাম্রাজ্য কেউ সৃষ্টি করতে পারেনি। প্রায় ৮০০ বছর আগে তদানীন্তন পরিচিত বিশ্বের বেশির ভাগ এলাকা (প্রায় ৩০টি দেশ তিনি জয় করেছিলেন) এবং বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যাকে তিনি প্রজা বানিয়েছিলেন। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা থেকে মধ্য ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তার সাম্রাজ্য। চেঙ্গিস খানের কৃতিত্বের কাছে সিজার বা আলেক্সান্ডার দি গ্রেটের অর্জন বলা যায় কিছুই নয়। তারা তাদের পূর্বসূরিদের কাছ থেকে অনেক কিছুই পেয়েছিলেন। তারা শুধু সেগুলো আরো ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন।

কিন্তু চেঙ্গিস খান একেবারে হীন অবস্থা থেকে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিভার জোরে বিশালতম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতায় পরিণত হয়েছিলেন। তার সৈন্যসংখ্যাও খুব বেশি ছিল না। তার পরও তিনি লাখ লাখ সৈন্য ও সর্বোত্তমভাবে সজ্জিত বাহিনীকেও পরাজিত করেছেন। বর্তমান মোঙ্গলিয়ার কারাকোরাম নামক অখ্যাত শহরটি ছিল তার কেন্দ্রীয় রাজধানী। অথচ তার ভয়ে পরিচিত বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যের সম্রাটও ভয়ে কাঁপতেন। কেউ তাকে ‘বিধাতার অভিশাপ’, কেউ তাকে ‘বিশ্ব ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অবশ্য মোঙ্গলদের কাছে তিনি মহান নেতা, দেবতা।

তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তার বাহিনীর মনোবল চাঙা রাখতেন। তিনি তাদের শিক্ষা দিতেন, মোঙ্গলরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি। তাই অন্যদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। তবে তিনি লোক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতেন। গোত্রকে প্রাধান্য না দিয়ে তিনি প্রতিভার কদর করতেন। তিনি তার বাহিনীর জন্য কঠোর প্রশিক্ষণ ও কড়া শৃঙ্খলার প্রবর্তন করেছিলেন। প্রশিক্ষিত করার জন্য চৌকস লোকদের মোঙ্গলীয় গোত্রগুলোর কাছে পাঠাতেন।

নেহাতই প্রপাগান্ডার জোরে চেঙ্গিস খান তার অর্ধেক যুদ্ধ জয় করেছিলেন। গত শতাব্দীতে জার্মানি ও হিটলার চেঙ্গিস খানের কৌশলই গ্রহণ করেছিলেন। চেঙ্গিসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তার ববর্রতা। লেখাপড়াহীন এই বর্বর লোকটি যুদ্ধ জয়ের জন্য নিত্যনতুন কৌশল গ্রহণেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। চীন দখলের আগে মহাপ্রাচীরের সামনে তার সৈন্যদল সমবেত করে রাখলেন। কিন্তু আক্রমণের কোনো লক্ষণই দেখালেন না। ভাব ধরলেন, তিনি তার বাহিনীকে শুধু প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। দিনের পর দিন তিনি তার বাহিনীকে মহাপ্রাচীর পর্যন্ত মার্চ করিয়ে ফিরিয়ে নিতে থাকেন। একপর্যায়ে চীনারা মনে করতে থাকে, মোঙ্গলরা কখনো হামলা করবে না। তারা শিথিলতা দেখাতে থাকে। তার পরই একদিন চেঙ্গিস খান ঢুকে পড়লেন চীনের ভেতরে। জয় করে নিলেন দেশটি।পারসি মিনিয়েচারে তাকে দেখা যায় সিংহাসনে আসীন এক তুর্কি সুলতানের মতো, ইউরোপিয়ানদের দৃষ্টিতে তিনি ধরা পড়েন বর্বর ও হিংস্র লোক হিসেবে।

তার মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরিরা পুরো এশিয়া ও ইউরোপের এক বিরাট অংশের অধিপতি হয়। পুত্ররা যাতে নিজেদের মধ্যে হানাহানি করে সাম্রাজ্য ধ্বংস না করে, সে ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন। তার চার পুত্র ছিল জুযি, চাগতাই, ওগতাই ও টুলি। ওগতাইকে উত্তরাধিকার মনোনীত করে অন্যান্য পুত্রকে ওগতাইকে আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়ে যান। তার নির্দেশ মান্য করা হয়েছিল। আগ্রাসন অব্যাহত রাখেন তারা। ওগতাইয়ের সময়ে মোঙ্গলরা ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ জয় করে। তার নাতি কুবলাই খানের সময় মঙ্গোলদের শক্তি সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছে। তারই এক বংশধর হালাগু খান (চেঙ্গিস খানের নাতি ও টুলি খানের পুত্র) ১২৫৮ সালে বাগদাদ ধ্বংস করেন। মজার ব্যাপার হলো হালাগু ইসলামের ব্যাপক ধ্বংসসাধন করলেও তারই নাতি তাগুদার সিংহাসনে বসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মোঙ্গলরা তাকে হত্যা করে। অবশ্য এই বংশেরই আরেক সন্তান (হালাগুর প্রপৌত্র) গাজান খান (১২৯৫-১৩০৪) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তিনি অনেক গঠনমূলক কাজ করতে সক্ষম হন। এই সময়েই মোঙ্গলরা ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। অন্য দিকে কুবলাই খান (চেঙ্গিস খানের আরেক নাতি) চীনের পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ দিক থেকে বলা যায়, যাযাবর ও বিশৃঙ্খল একটি জাতিকে শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল হিসেবে প্রতিষ্ঠার গোড়াপত্তন তিনিই করেছিলেন।

তবে সার্বিকভাবে বলা যায়, চেঙ্গিস খান ও তার মোঙ্গল বাহিনী বিশ্বজুড়ে হত্যা, ধ্বংস, আর বর্বরতাই ছড়িয়েছে। বিশ্ববাসীর কাছে প্রত্যক্ষভাবে কল্যাণকর খুব বেশি কিছু দিয়ে যেতে পারেননি। অবশ্য, তার সামরিক প্রতিভা ও শেখার সামর্থ্য এখনো সবার সপ্রশংস বিস্ময় সৃষ্টি করে যাচ্ছে। প্রথম দিকে তিনি যুদ্ধে হালকা ঘোড়া ব্যবহার করতেন। কিন্তু নগর আক্রমণে তা যুৎসই নয় দেখে তার বাহিনীর জন্য অন্যান্য অস্ত্রও যোগ করেন। নগর প্রাচীর ধ্বংস করার জন্য মই, পাথর বর্ষণকারী যন্ত্র, এমনকি জ্বলন্ত তেলও ব্যবহার করতেন। তার সাংগঠনিক প্রতিভা, প্রচণ্ড শৃঙ্খলাপরায়ণ ও দ্রুতগতির বাহিনী তার জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ন্যায়বিচারের প্রতি তার বিশেষ লক্ষ্য ছিল। চোর-ডাকাত ও অন্যান্য দুষ্কৃতকারীদের দমনে তিনি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। ফলে তার সাম্রাজ্য থেকে অপরাধ বলতে গেলে উঠেই গিয়েছিল। শৃঙ্খলাভঙ্গ, কত্যর্বকর্মে অবহেলা, ভীরুতা, অবাধ্যতার জন্য তিনি মৃত্যুদণ্ডও প্রদান করতেন। কাউকে তিনি অলসভাবে বসে থাকতে দিতেন না। এমনকি যুদ্ধবিরতির সময় সৈন্যরা যাতে অলস হয়ে না পড়ে, সে জন্য তিনি সে সময়ে তাদের নিয়ে শিকার অভিযানে বেরিয়ে পড়তেন।

চেঙ্গিস খানের শারীরিক শক্তি ছিল প্রচণ্ড। দেহটি ছিল দীর্ঘ এবং শক্ত। মুখে অল্প দাড়ি ছিল। চোখ দু’টি ছিল বিড়ালের মতো। তবে কৌশলে পটু ছিলেন। ইচ্ছাশক্তি ছিল প্রবল। সাংগঠনিক শক্তিতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তবে একগুঁয়ে ছিলেন না। মা ও স্ত্রীদের কথা শুনতেন। আর এসব মিলিয়েই তিনি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন বিশালতম সাম্রাজ্য।ফলে মোঙ্গলদের অভিযান অব্যাহত থাকে।পরবর্তী আমীর টিমুর মংগল সাম্রাজ্য পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিল ।

Def Research and analysis.

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: