মহাকাশ জয়ের সূচনা মাত্র ৫০ বছর অতিবাহিত হলেও মানবজাতি আজ উচ্চ মাত্রায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং উন্নয়নের বদৌলতে মঙ্গল গ্রহে পা রাখার সোনালী স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। যদিও অবশ্য আমরা আজো আমাদের সুবিশাল সোলার সিস্টেমের যে কোন প্রান্তে নভোচারীসহ সাবলীলভাবে বিচরণে শক্তিশালী স্পেসক্রাফট বা মহাকাশ যান ডিজাইন করতে পারেনি। তবে আমাদের সকলকে মানতে হবে যে, মানবজাতি আজ কিন্তু পৃথিবীর ভুখন্ডে বসে বা মহাকাশ স্টেশন বাঁ স্যাটালাইট থেকে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন অত্যাধুনিক টেলিস্কপ বা স্যাটালাইট সিস্টেম দ্বারা হাজার আলোকবর্ষ দূরে থাকা গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা, ছায়াপথ সহ অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু খুজে বের করে তা পর্যবেক্ষণের মাধম্যে এর সঠিক অবস্থান এবং গতি প্রকৃতি বা পরিবেশ সনাক্তকরণের যথেষ্ঠ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করেছে। আর এই বৈপ্লবিক প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের কল্যাণে প্রতি নিয়ত মহাবিশ্বের অনেক অজানা রহস্য ও অতি মহাজাগতিক তথ্য উপাত্ত আজ আমাদের সামনে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। তবে এটা ঠিক হাজারো আলোক বর্ষ দূরের গ্রহ নক্ষত্র বা মহাজাগতিক বস্তু দেখা ও পর্যবেক্ষণের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বা সক্ষমতা যতটা উন্নত হয়েছে, ঠিক সেই অনুপাতে অসীম মহাকাশে স্বাধীনভাবে দুই বা চারজন মহাকাশচারী নিয়ে স্পেসক্রাফটে বা মহাকাশ যানে সাবলীলভাবে উড়ে বেড়ানোর যথেষ্ঠ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আজো আমরা অর্জন করিনি। ১৯৬৯ সালে মার্কিন মহাকাশ চারী নীল আমাস্টংয়ের এ্যাপলো-১১ মিশনে এ্যাপোলো সিএসএম-১০৭ এবং এলএম-৫ মহাকাশ যানে চড়ে চন্দ্র জয়ের মাধম্যে নতুন এক মহাকাশ জয়ের ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। তবে কালের বিবর্তনে এক বিংশ শতাব্দী ২০২০ এসে মহাকাশ জয়ের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যত দ্রুত অর্জন করবে বলে উচ্ছাস প্রকাশ করা হলেও বাস্তবে আমরা সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারিনি। যদিও মানুষ এখনো পর্যন্ত চন্দ্রে পা রাখার পাশাপাশি পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ৪.০০ লক্ষ কিলোমিটার পর্যন্ত মহাকাশে দুরুত্ব অতিক্রম করে আবার ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছে।

তা স্বত্তেও বর্তমান মহাকাশ প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় আমাদের পক্ষে প্রায় শতাধিক মিলিয়ন কিলোমিটারের সুবিশাল পথ ( পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহ যখন একই সাথে সূর্যের দিকে অবস্থাব করে তখন দূরুত্ব হয় ৫৬.০০ মিলিয়ন কিলোমিটার এবং সূর্যের বিপরীত দিকে দুটি গ্রহ অবস্থান করলে পৃথিবী থেকে মঙ্গলের দুরুত্ব হয় ৪০৩.০০ মিলিয়ন কিলোমিটার) পাড়ি দিয়ে চার থেকে ছয় জন মহাকাশচারী নিয়ে সাবলীলভাবে আমাদের পার্শ্ববর্তী মঙ্গল গ্রহে অবতরণ এবং মানবজাতি নতুন কলনী স্থাপন করাটা এ মুহুর্তে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া মার্কিন মহাকাশ বিষয়ক সংস্থা (নাসা), বেশকিছু বেসরকারি মার্কিন মহাকাশ সংস্থা এবং ইউরোপীয়ান এণ্ড জাপানীজ স্পেস এজেন্সী মঙ্গল গ্রহে তাদের একাধিক সফল স্যাটালাইট মিশন সম্পন্ন করে আগামী ২০৩৩ সালে স্পেস এক্স মিশনের আওতায় মানুষ্যবাহী মহাকাশ যান প্রেরণের যে আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছে এবং সে লক্ষ অর্জনে ব্যাপকভাবে কাজ করে গেলেও এ কাজ বাস্তবায়ন আমাদের জন্য মোটেও কিন্তু সহজ হবে না বলে স্বংয় নাসা এ আশাঙ্খা প্রকাশ করেছে। আসলে সুবিশাল আকারের জ্বালানী ভর্তি ট্যাংকার নিয়ে মানুষ্যবাহী মহাকাশ যান মঙ্গলের মাটিতে ল্যাণ্ড করাটা কিন্তু অতি উচ্চ মাত্রায় বিপদজনক হতে পারে। তাছাড়া মঙ্গল গ্রহে মহাকাশচারী কোন ভাবে প্রেরণ করা সম্ভব হলেও সেখান থেকে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসার কোন সুযোগ কিন্তু থাকবে না। অর্থ্যাৎ মঙ্গল গ্রহ জয়ের অভিযান কিন্তু একমুখী। এখান থেকে ফিরে আসা কিম্বা স্পেসক্রাফট কোন দূর্ঘটনায় পতিত হলে মহাকাশচারীদের উদ্ধার বা মহাকাশযানকে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে নিয়ে আসার কোন সুযোগ আমরা হয়ত পাবো না। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মঙ্গল গ্রহে পাঠানো অন্তত্য ডজন খানেক স্পেস স্যাতালাইট এর মধ্যে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ তাদের তাদের মিশন শেষ করার আগেই ব্যর্থ হয়ে গেছে। আবার অনেকগুলো মঙ্গল অভিযান শুরু করার আগেই পৃথিবীর সাথে সকল প্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তা স্বত্তেয় কিন্তু বিজ্ঞানীরা মোটেও দমেন নি বরং নতুন নতুন স্যাটালাইট প্রেরণের মাধম্যে ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষ্যবাহী মহাকাশ যান পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আসলে মানব জাতি এ পর্যন্ত যেসব জেট ইঞ্জিন এবং রকেট ইঞ্জিন আবিস্কার করেছে, তা দিয়ে কিন্তু সাবলীলভাবে বেশ কিছু নভোচারীসহ অসীম মহাকাশে সুদীর্ঘ সময়ে মহাজাগতিক চাপ এবং অতি শীতল -৩০ থেকে -১৫০ ডিগ্রী পর্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় কোটি কোটি কিলোমিটার পর্যন্ত দুরত্বে চড়ে বেড়ানো মোটেও সম্ভব নয়। বর্তমানে মানবজাতির হাতে থাকা অত্যাধুনিক মহাকাশ যান প্রযুক্তির সাহায্যে এ ধরণের মিশন প্রেরণ করা গেলেও তা কিন্তু ব্যাপক ব্যয়বহুল এবং অত্যন্ত ঝুঁকীপূর্ণ মিশন হতে পারে। তবে আমরা আশা প্রকাশ করতে পারি, এই এক বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ২০৮০-২১০০ সালের মধ্যে হয়ত অতি উন্নত প্রযুক্তির স্পেসক্রাফট এবং সুপার এডভান্স স্পেস ইঞ্জিন মহাকাশ বিজ্ঞানিরা আবিস্কার করতে সক্ষম হবেন। যা জ্বালানী ব্যবহারে হবে তুলনামুলক সাশ্রয়ী এবং এটিকে একাধিক স্পেশ মিশনে দীর্ঘ কালীন সময়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। তাছাড়া ভবিষ্যতের এসব হাইলী মডিফাইড সুপার এডভান্স স্পেসক্রাফট আমাদের সোলার সিস্টেমে থাকা অন্যান্য গ্রহের গ্রাভিডীশনাল ফোর্সকে কাজে লাগিয়ে স্বল্প জ্বালানী ব্যবহার করেই নিজস্ব গতি কমিয়ে বা বাড়িয়ে সম্পূর্ণ সোলার সিস্টেমে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে মিশন সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মহাকাশ বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যন্ত বেশ কিছু মহাকাশচারী নিয়ে সাবলীলভাবে মহাকাশে ঘুরে বেরানোর মতো কোন হাইলী টেকনোলজি বেসড স্পেসক্রাফট এমন কী সুপার এডভান্স এণ্ড হাইলী রিভাইসড স্পেস ইঞ্জিন ডিজাইন করতে পারেনি। তাছাড়া অতি শিতল -১০০ডিগ্রী পর্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় স্পেসক্রাফটকে সচল রাখা এবং নভোচারিদের মহাজাগতিক চাপ ও উচ্চ মাত্রায় ক্ষতিকর রেডিয়েশনকে মোকাবেলা করে সুদীর্ঘ সময়ে নভোচারীদের শারীরিক ও মানুসিকভাবে সুস্থ রাখাটাও একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। তাছাড়া সার্বোক্ষণিক খাদ্য ও রসদ সরবাহের বিষয়টি তো থাকছেই। যদিও বিশ্বের বেশকিছু দেশ যেমন রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন তাদের নিজের মতো করে মহাকাশ জয়ের প্রযুক্তিগত গবেষণা ও সক্ষমতা অর্জনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে যাচ্ছে। এ প্রযুক্তিগত প্রতিযোগীতায় কিন্তু সবার চেয়ে এগিয়ে আছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সি। অবশ্য চীনের মহাকাশ সংস্থা এবং ভারতের ইসরো কিন্তু মঙ্গলে তাদের নিজস্ব স্যাটালাইট প্রেরণ এবং মহাকাশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে আমি মনে করি সভিয়েত ইউনিয়ন এখনো টিকে থাকলে হয়ত ২০২০ এসে মঙ্গল গ্রহে মানুষ্যবাহী মহাকাশ যান প্রেরণ এবং পৃথিবীতে পুনরায় ফিরে আসাটা একটি রুটিন মাফিক কাজে পরিণত হতো। এটা ভূলে গেলে চলবে না যে, মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তৎকালীন সভিয়েত ইউনিয়ন ছিল এক বাতিঘর। মুলত সভিয়েত ইউনিয়ন তাদের নিজস্ব এবং এমনকী মানব ইতিহাসে প্রথম ৪ অক্টোবর ১৯৫৭ সালে স্পুটনিক-১ পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে প্রেরণ করে মহাকাশ জয়ের এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে। আবার পরবর্তীতে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে ২০শে ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ সালে মহাকাশে নিজস্ব স্পেস স্টেশন (মীর মহাকাশ স্টেশন) স্থাপনের মাধম্যে এক অসাধ্য কাজ সম্পন্ন করে দেখিয়েছে এবং সভিয়েত ইউনিয়নের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং মহাকাশ জয়ের সাবলীল পদক্ষেপ হাজার হাজার বছর ধরে ইতিহাসের পাতায় স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে। এক্ষেত্রে অবশ্য মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ভূমিকাও কিন্তু মোটেও কম নয়।

সিরাজুর রহমান (Sherazur Rahman),

সহকারী শিক্ষক এবং লেখক, ৮২নং ছোট চৌগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ। sherazbd@gmail.com

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: