সম্প্রতি ভারতের কয়েকটি শীর্ষ-স্থানীয় পত্র-পত্রিকা খবর প্রকাশ করেছে যে ভারতের রাষ্ট্রয়াত্ব কলকাতা ভিত্তিক শীপইয়ার্ড গার্ডেন রীচ শীপ বিল্ডিং এবং বাংলাদেশ এর নৌবাহিনীর মালিকানাধীন খুলনা শীপইয়ার্ডের মধ্যে যৌথভাবে বানিজ্যিক জাহাজ তৈরী , নেভাল ভ্যাসেল এর ডিজাইন এবং কারিগরি সহায়তা ভিত্তিক একটি খসড়া চুক্তি সাক্ষর হয়েছে যার অধীনে ভারতীয় GRSE বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অধীনে থাকা খুলনা শীপইয়ার্ডে সাথে নতুন জাহাজের ডিজাইন এবং যৌথ উৎপাদন করবে। এক্ষেত্রে GRSE মুলত তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ কে নেভাল ভ্যাসেল যেমন বড় প্রেট্রল বোট, কর্ভেট এবং যাত্রীবাহী জাহাজ তৈরীতে সহায়তা করবে। এই চুক্তিটি এখনো পর্যন্ত খসড়া চুক্তি হিসাবে আছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে সকল কারিগরি দিক বিবেচনায় একটি পূর্নাংগ চুক্তি সম্পাদন করা হবে দুই দেশের মধ্যে। এই চুক্তি টি ভারতীয় তরফ থেকেই প্রস্তাব করা হয়।©Defres মুলত ২০১৩ সালে বাংলাদেশ এর চীনা মুখি নীতির কারনে ভারত এই ধরনের চুক্তি করার আগ্রহ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম দুইটি সাবমেরিন যুক্ত হবার পর পরি ভারত থেকে বাংলাদেশ সরকার কে যৌথ সমরাস্ত্র উন্নয়ন এবং বিক্রির প্রস্তাব করা হয় । কয়েক দফায় ২০১৫ থেকে ভারত থেকে বাংলাদেশ এর সাথে সামরিক অংশীদার ভিত্তিক কৌশলগত চুক্তির প্রস্তাব করা হলেও বাংলাদেশ লাভজনক মনে না করায় চুক্তি করতে ভারত সরকার ব্যর্থ হয়। সবশেষ গত বছর ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর কয়েকদফা বাংলাদেশ ভ্রমনের পরও এই চুক্তি আলোর মুখ দেখে নি।

এমনত অবস্থায় ভারত সরকার মরিয়া হয়ে বাংলাদেশ কে সামরিক ঋন দেয়ার প্রস্তাব করে। কিন্তু ভারতীয় উৎপাদিত সমরাস্ত্র এর সাথে দেশীয় চাহিদার মিল না থাকা এবং ভারতীয় অস্ত্র এর মান নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকায় বাংলাদেশ সেই প্রস্তাবও দুই দফা ফিরিয়ে দেয়। সর্বশেষ ভারত সরকার তাদের ঋন প্রস্তাব কে আরো নমনীয় করতে বাধ্য হয় এবং ভারতীয় ঋনের ৩৫% শতাংশ অর্থ ব্যবহার করে ভারতের সম্মতিতে ৩য় কোন দেশ থেকে (চীন, পাকিস্তান এবং উত্তর কোরিয়া বাদে) অস্ত্র ক্রয় করতে পারবে এমন সুযোগ রাখা হয় তবে সেক্ষেত্রে সেই ঋন কি অস্ত্র ক্রয় এ ব্যবহার হবে তা ভারত সরকার কে জানাতে হবে এমন শর্তে ঋন প্রস্তাব করে। এছাড়া বাকি ৬৫% ঋনের অর্থে বাংলাদেশ ভারত থেকে অস্ত্র আমদানি অথবা যৌথ ভাবে উৎপাদনে ব্যয় করতে পারবে এমন সুযোগ রাখা হয়। যেকোন সামরিক ঋন চুক্তির কথা বিবেচনা করলে এরকম চুক্তি অত্যন্ত লাভজনক হিসাবে ধরা যায়। এবং সামরিক চুক্তির ক্ষেত্রে আজ পর্যন্ত কোন দেশ এত নমনীয় ছিল না। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য বাংলাদেশ এর ©Defres পলিটিকাল দল গুলো এই চুক্তিকে নানা ভাবে অপপ্রচার করেছে যেমন চুক্তি ৩৫% অন্যদেশ থেকে ক্রয়ের বিষয়টি কে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে প্রচার করে যে বাংলাদেশ কে ভবিষ্যৎ এ অস্ত্র কিনতে ভারতের অনুমতি লাগবে যা সম্পূর্ন ভিত্তিহীন গুজব।

এবার মুল কথায় আসি বাংলাদেশ ভারত নৌপ্রতিরক্ষা চুক্তির অংশ হিসাবে যৌথ উৎপাদনের বিষয়টি ভারত থেকে প্রস্তাব করা হয় যেখানে ভারত থেকে পরিষ্কার ভাবে বলা হয়েছে চীনের একছত্র প্রভাব কমাতে বাংলাদেশ এর সাথে সুসম্পর্ক এবং কৌশলগত সম্পর্ক শক্ত করতে ভারত থেকে এই চুক্তির বিষয়টি বার বার প্রস্তাব করা হয়। বাংলাদেশ কয়েকদফা এই চুক্তি ফিরিয়ে দেয় তাও বার বার খবরে এসেছে এবং মোটামোটি সবার জানা (ভারতীয় কিছু আবাল বাদে যারা ভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশ সাহায্য নিচ্ছে)। অথচ চুক্তির পুরো বিষয়বস্তু নিয়ে চিন্তা করলে পরিষ্কার ভাবে বুঝা যায় ভারত যেচে এসে চীনের সাথে পাল্লা দিতে এই চুক্তি করেছে শুধুমাত্র বাংলাদেশ কে নিজেদের পাশে রাখার জন্য। ভারত মহাসাগরে ক্রমবর্ধনমান চীনা নৌবাহিনীর প্রভাব ভারত কে ইতিমধ্যে যথেষ্ট চিন্তায় ফেলেছে যার কাউন্টার হিসাবে ভারত জাপান এবং দক্ষিন কোরিয় নৌবাহিনীর সাথে সম্মানিত নেভাল টাস্কফোর্স গঠন করে দক্ষিন চীন সাগরে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছে যার মুল উদ্দেশ্য চীন কে চাপে রাখা। কিন্ত এখানে উল্লেখ্য যে দক্ষিন চীন সাগরে ভারতের নিজ্বস কোন নেভাল বেস না থাকায় ভারতের পক্ষে সেখানে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা আপাত দৃস্টিতে সম্ভব নয়। অন্যদিকে চীন দক্ষিন এশিয়ায় দুই দেশ শ্রীলংকা এবং পাকিস্তান এ যথারীতি তাদের নেভাল বেস গঠন করেছে যা তাদের এই অঞ্চলে সব সময় সরবরাহ নিশ্চিত করছে। এছাড়া মিয়ানমার এর একটি দ্বীপ কেও চীন গোপনে নিজেদের ঘাটি হিসাবে ব্যবহার করে থাকে সিআইএ থেকে এমন অভিযোগ করা হয়। ইতি মধ্যে চীন এবং ভারত উভয়ই মালদ্বীপ এ নিজ্বস বেস করার বেপার ভাবছে কিন্তু অভন্তরীন রাজনৈতিক বিবেচনায় চীন এখানেও এগিয়ে আছে। ভারত মহাসাগরে চীনের এই বিস্তার যেন কোন ভাবেই বে অব বেংগল পর্যন্ত বিস্তার লাভ না করে তাই এশিয়ার ভৌগলিক ভাবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ কে ভারত কিছুতেই হাত ছাড়া করতে নারাজ। চীন ইতিমধ্যে কয়েকদফা বাংলাদেশ কে নেভাল বেস তৈরী, যুদ্ধ জাহাজ তৈরী এবং সরবরাহ, গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মানে সহায়তার প্রস্তাব করে আসছে। চীনা সহায়তায় বাংলাদেশ যুদ্দ্ব জাহাজ নির্মান করছে। তার উপর চীনা সাবমেরিন যুক্ত হওয়া ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসাবে দেখছে। তাই এমন পরিস্থিতি তে বাংলাদেশ যেন কোন ভাবেই চীনা বলয়ে না ঢুকে তাই বাংলাদেশ কে সর্বোচ্চ সুবিধা দিয়ে পাশে রাখতে চাইছে ভারত। যার প্রমান পাওয়া যায় ভারতীয় মিডিয়া গুলোর খবর গুলো পর্যালোচনা করলে। যেখানে পূর্বে ভারতীয় মিডিয়া ভারত বাংলাদেশ বিভিন্ন চুক্তি কে ভারতীয় সাহায্য হিসাবে অবহিত করতো সেখানে এখন তারা এসব চুক্তি কে ভারত বাংলাদেশ কৌশল গত চুক্তি এবং সহযোগিতা হিসাবে উল্লেখ করছে। আগামী কয়েক বছরে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কে যে আমুল পরিবর্তন আসবে তা বলাবাহুল্য।

তবে যে সকল ভারতীয় এখনো এই চুক্তিতে ভারতের দান ভেবে খুশি হচ্ছেন তাদের এই অজ্ঞানতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের অবস্থান বুঝা উচিত। ভারতে অখন্ডতা রক্ষায় বাংলাদেশ গুরুত্ব যে কতটা তা সেই দেশের সরকার দেরিতে হলেও বুঝতে সক্ষম হয়েছে।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: