পিএনএস গাজীর শেষ পরিণতি ছিল ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরের বুকে সলিল সমাধি । সেইসঙ্গে কোণঠাসা হতে থাকা পাকিস্তানের সব আশা শেষ হয়ে যায়৷ পিএনএস গাজীর সলিল সমাধির এগারো দিন পরই ৯০ হাজারের বেশি পাকিস্তানি সেনা ঢাকায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর সামনে আত্মসমর্পণ করে৷জন্ম হয় হয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের৷

জন্ম লগ্ন থেকেই বারবার ভারতের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পাকিস্তানের শাসকরা বুঝেছিলেন নৌ শক্তিতে বলীয়ান হতে হবে৷ দেশের দক্ষিণে আরব সাগর৷যার অপর পাড়েই ভারত৷ সাহায্য করলল পাকিস্তানের কূটনৈতিক বন্ধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৷ ১৯৬৪ সালে সেদেশে তৈরি ডুবোজাহাজ ‘USS Diablo’ তুলে দেওয়া হয় পাকিস্তানের হাতে৷ স্প্যানিশ ভাষায় এর মানে ‘শয়তান’৷ এর গতি প্রতি ঘণ্টায় ৩৭.৫০কিলোমিটার বা ২০.২৫ নটিক্যাল মাইল৷ ১.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে USS Diablo-কে করাচি বন্দরে পাকাপাকি নিয়ে আসা হয়৷ নতুন নাম হয় PNS GHAZI উর্দু গাজী শব্দের বাংলা অর্থ ‘বীর’৷

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে ‘USS Diablo’ মার্কিন নৌবাহিনী তে অন্তর্ভুক্ত হয়৷ পঞ্চাশের দশকটি মার্কিন নৌ সেনার অন্যতম শক্তি হয়েই ভূগোলকের জল দাপিয়ে বেড়িয়েছে এই সাবমেরিন৷

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ৷ তার অন্যতম অধ্যায় ‘অপারেশন দ্বারকা’৷যেটা নিয়ে প্রথম পর্ব পোস্ট করা হয়েছিল
➡বিস্তারিত এই লিংকে

পরিকল্পনা মতো পিএনএস গাজী আরব সাগর তোলপাড় করে পৌঁছে গিয়েছিল গুজরাটের উপকূলে দ্বারকা নগরীর প্রান্তে৷ ৭ সেপ্টেম্বর সাবমেরিন পিএনএস গাজী সহ আরও ৭টি পাকিস্তানি যুদ্ধ জাহাজ (PNS Babur, PNS Khaibar PNS Badr,PNS Jahangir,PNS Shah Jahan,PNS Alamgir,PNS Tippu Sultan) একযোগে গোলাবর্ষণ করে দ্বারকায়৷

এডমিরাল কে.আর নিয়াজী পেরিস্কোপ ব্যবহার করছেন

যুদ্ধক্ষেত্রে পিএনএস গাজীর আক্রমণাত্মক ভূমিকাকে সম্মান জানিয়ে পাকিস্তান সরকার তাকে ১০টি পুরস্কার দেয়।১৯৭১ সালের যুদ্ধে পিএনএস গাজী বেশ ভালো ভূমিকা পালন করে।পূর্ব পাকিস্তানের ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শুরু হতেই ভারতীয় নৌ বাহিনী পুরোদস্তুর তৈরি হয়ে যায়৷ বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ আইএনএস ভিক্রান্তকে বঙ্গোপসাগরে মোতায়েন করা হয়৷ বঙ্গোপসাগরের তীরেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম বন্দর৷ বন্দরটি হাতছাড়া হতে পারে এই আশঙ্কায় চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান৷ তাঁর নির্দেশে পিএনএস গাজীকে বঙ্গোপসাগরে পাঠানো হয়৷ লক্ষ্য আইএনএস ভিক্রান্তকে ধ্বংস করা৷

আরব সাগরের তীরে করাচি থেকে ডুবোজাহাজ পিএনএস গাজী পুরো পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত পার করে পূর্ব প্রান্তে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছে যায়৷ অভিযানে অংশ নেন সাবমেরিন গাজীর কমান্ডার জাফর মহম্মদ খান৷ দলে মোট ৯২ জন পাক নৌ সেনা৷১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর৷ পাকিস্তান আক্রমণ শুরু করে৷ পশ্চিম সীমান্ত পার করে পাক বিমান বাহিনী ভারতের কয়েকটি স্থানে বোমা ফেলে৷ শুরু হয় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে তৃতীয় যুদ্ধ৷ আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর ছিল দু দেশের নৌ যুদ্ধের কেন্দ্র৷

আইএনএস ভিক্রান্ত অবস্থান করছিল বিশাখাপত্তনম বন্দরে৷ তাকে ধ্বংস করাই হল গাজীর লক্ষ্য৷ অবশেষে পাক সাবমেরিনটি বিশাখাপত্তনামের কাছে পৌঁছে যায়৷গাজী থেকে পাঠানো বিশেষ কোডযুক্ত মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করে সতর্ক হয় ভারতীয় নৌ সেনা৷দ্রুত ভিক্রান্ত-কে সরিয়ে দেওয়া হয়। গাজীকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা নেয় ভারতীয় নৌ বাহিনী৷ কৌশলে ভিক্রান্তের ছদ্মনামে একটি ভুয়া কোড মেসেজ পাঠানো হয়৷মেসেজে বলা হয় অমুক জায়গায় থাকবে আইএনএস ভিক্রান্ত।গাজীর ট্রান্সমিটারে ধরা পড়ে সেই মেসেজ৷ তবে ফাঁদ সেই মতো কাজ হয়নি৷ এরপরেই গাজীকে শেষ করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু হয়৷ নিযুক্ত করা হয় ভারতীয় নৌবাহিনীর এন্টি সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার এর জন্য সবচেয়ে আধুনিক ডেষ্ট্রয়ার ‘আইএনএস রাজপুত -কে৷

৪ ডিসেম্বর৷ আইএনএস রাজপুতের নজরে আসে বিশাখাপত্তনম বন্দরের কাছে জলে অস্বাভাবিক আলোড়ন৷ সেই দিকে সাবমেরিন বিধ্বংসী ডেপথ চার্জ ফায়ার করা হয়৷ প্রাথমিকভাবে কিছু বোঝা যায় নি৷আধঘণ্টা পর বিশাখাপত্তনম উপকুলে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়৷ ৫ই ডিসেম্বর সকালবেলায় স্থানীয় মৎস্যজীবীরা একটি জাহাজের লগবুক ও কিছু ছেঁড়া লাইফ জ্যাকেট পান৷সন্দেহ দৃঢ় হওয়ায় ভারতীয় নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী জাহাজ নিশতার-কে সেই স্থানে পাঠানো হয়৷ নৌবাহিনীর ডুবুরিরা দেখেন সাগর তলায় পাকিস্তানী সাবমেরিন গাজী পড়ে রয়েছে৷ পরে ঘোষণা করা হয় পতন হয়েছে পিএনএস গাজীর৷ মৃত্যু হয়েছে ৯২ জন পাকিস্তানি নৌ সেনার৷

কয়েকজন পাক নৌ সেনার মৃতদেহ উদ্ধার করে সৎকার করে ভারতীয় নৌ বাহিনী৷ যদিও পাকিস্তানের দাবি, আইএনএস রাজপুতের নিক্ষিপ্ত ডেপথ চার্জ বিস্ফোরণে ডুবোজাহাজ গাজীতে থাকা ১০টি mk14 টর্পেডো একসঙ্গে ফেটে গিয়েছিল৷তাতেই ধ্বংস হয় পিএনএস গাজী৷

MK14 টর্পেডো

উল্লেখ্য তৎকালীন সময়ে গাজীর সমকক্ষ কিছুই ভারতীয় নৌবাহিনীর ছিল না।গাজী ধ্বংস হওয়ায় তারা আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: