বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ভেবে থাকে ইন্ডিয়া ছাড়া বাংলাদেশ অচল। এক মাস বর্ডার বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশ না খেয়ে মরবে। ও হ্যা। ইন্ডিয়ার কিছু মানুষ ও সেটাই ভাবে। সোশাল মিডিয়ার বদৌলতে এরকম অনেক মন্তব্যের সম্মুখীন হতে হয়েছে। আসুন জেনে ভারতের উপর বাংলাদেশ নির্ভরশীল এবং বাস্তবতা।

বিশ্বে কোন দেশ সয়ংসম্পুর্ন না

বিশ্বে কোন দেশ সয়ংসম্পুর্ন না। আর এজন্যই আমদানি এবং রপ্তানী উৎপত্তি। ঘাটতি থাকলে বিদেশ থেকে আমদানি করে মেটাতে হয়। আর নিজের দেশের উপার্জনের জন্য রপ্তানি করা লাগে। আর ট্রেডে ব্যাল্যান্স রাখতে গেলে আমদানি রপ্তানি দুইটার ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। ইন্ডিয়া বা বাংলাদেশের মত থার্ড ওয়ার্ল্ড দেশের জন্য রপ্তানি খুবই গুরুত্ববহ। একারনেই বিদেশের বাজার খুজতে হন্যে হয়ে উঠেপড়ে লেগেছে বিভিন্ন দেশ।

প্রতিযোগিতার বাজারে উৎস এখন অনেক। সবাই তাদের বেস্ট প্রডাক্ট অফার করে নিজেদের রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে চাই। মুক্ত বাজার অর্থনীতি এখন বাজারকে সারা বিশ্বে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আর এই বাজারে নিজের রপ্তানি বাজার ধরে রাখায় সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ গত বছর প্রায় $৩৫ বিলিয়ন ডলার মুল্যের রপ্তানি করেছে। আমদানি করেছে প্রায় $৪১ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের।

এখানে খেয়াল করুন, বাংলাদেশের সব থেকে বড় রপ্তানি বাজার ছিল আমেরিকা। ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী আমাদের মোট রপ্তানির প্রায় ১৩.৯% এই আমেরিকার সাথে। দ্বিতীয় জার্মানি, এর পর যথাক্রমে যুক্তরাজ্য, স্পেন। একারনেই আমেরিকার বাজার আমাদের অর্থনীতির জন্য সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আয় ব্যয় এবং ব্যালান্স অফ ট্রেডের জন্যও আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ। কোন ভাবে এই বাজার হারালে আমাদেরকে চরম মূল্য দিতে হবে সন্দেহ নাই।

কিন্তু ভারত??? না ভাই, ভারত আমাদের বড় কোন রপ্তানী বাজার না। এমনকি আমাদের সব থেকে বড় রপ্তানি সহযোগি ১০ টা দেশের ভেতর ভারত নাই। ভারতে আমাদের রপ্তানি ২০১৫ তে ছিল মাত্র ৬৮ কোটি ডলার। আমেরিকা বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বন্ধ করেছে এর জন্য আমাদের রপ্তানি ক্রমস কমে যাচ্ছে ওদের বাজারে। তার মানে কী আমরা শেষ হয়ে গেছি?? না। আর ভারতের সাথে মাত্র $৬৮ কোটি টাকার রপ্তানী। ভারত যদি হাজারটা শর্ত দেয়, বর্ডার বন্ধ করে দেয় তবে ধরে নিলাম আমাদের মাত্র ৬৮ কোটি ডলারের রপ্তানি বাজার কমবে। যা খুব কম। তাই রপ্তানির ক্ষেত্রে আমরা ভারতের উপর নির্ভরশীল নই।

বাংলাদেশ ভারতের রপ্তানি শীর্ষ ১০স্থান

এবার আসা যাক আমদানির দিকে। বাংলাদেশ ভারতের থেকে প্রায় $৫.৫ বিলিয়ন আমদানি করেছে ২০১৫ অনুযায়ী। আমাদের মোট আমদানির প্রায় ১৩% ভারত থেকে আমদানি করা হয়। আর এর কারনেই বাংলাদেশ ভারতের শীর্ষ ১০ রপ্তানি বাজারের ৯ নম্বরে স্থান করে নিয়েছে। তার মানে, ভারতের বড় রপ্তানী বাজারের একটা বাংলাদেশ। যদি বর্ডার বন্ধ করে তবে তারা তাদের বড় একটা রপ্তানি বাজার হারাবে।

বাংলাদেশ ভারত থেকে মূলত কী আমদানি করে থাকে এবং কেন? বাংলাদেশ ভারত থেকে মূলত তুলা, মেশিনারিজ, পাথর, লোহার আকরিক, এসব আমদানি করে থাকে। সব থেকে বেশি কেনে কটন, সুতা ইত্যাদি।
ভারতের বিকল্প কোন দেশকি নাই বাংলাদেশের? হ্যা। মুক্ত বাজারে উৎসের অভাব নেই সেটা আগেই বলেছি। তবে ভারত থেকে এই পণ্যগুলা কেনার কারন দূরত্ব কম হবার কারনে সল্প সময়ে ডেলিভারি পাওয়া যায়। পরিবহন খরচ কমে। তার মানে আমরা ভারতের উপর নির্ভরশীল? তাদের দয়ায় টিকে আছি? না। ভাই। তুলা, সুতা কেনার অন্যতম বেশ কয়েকটা উৎস আমাদের রয়েছে। উজবেকিস্তান, তুরস্ক, পাকিস্থান থেকে আমাদের চাহিদার বিশাল অংশ মেটানো হয়। আর আমাদের তুলা, ফেব্রিকের বাজার অনেক আকর্ষণিয় তাই কিছুদিন আগে আমেরিকার বিজনেস ডেলিগেটসরা এসে বলে গেছে তারা আমাদের এই বাজারে ঢুকতে চাই। দূরত্ব আর সময়ের সমস্যা মাথায় রেখে চট্টগ্রামে আঞ্চলিক ডিপো করতে চাই। যেন পণ্য সরবরাহের জন্য বারবার আমেরিকা থেকে পন্য পাঠাতে না হয়। ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হবে। মানে এক্ষেত্রে আমরা যে খুব বেশি তাদের উপর নির্ভরশীল সেটা বলা যাবে না। আর তারা সীমান্ত অফ করে দিলে না খেয়ে মরব এটা ভাঁওতাবাজি ছাড়া কিছু না।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ৫১ কোটি ডলারের খাদ্যদ্রব্য আমদানি করেছে। অনেকেই ভাবেন ইন্ডিয়ার পিয়াজ না আসলে আমরা শেষ। ভাই, আমাদের দেশে ব্যাবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট বানায়ে দাম বাড়ায়। ইন্ডিয়ান পিয়াজ আমদানি এটা একটা অযুহাত। রমজান মাস আসলেও এরা দাম বাড়ায়। সংকটের কথা বলে। তবে এটা সত্য, দূর্যোগে পড়লে ইন্ডিয়া থেকে চাল আমদানি করা লাগে। সেটা কয়েকবছর পর পর এরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে। এর জন্য খাদ্য বিভাগ দায়ী। বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রনের জন্য যে পরিমাণ বাফার স্টক হিসাবে গুদামে থাকা দরকার এদের অবহেলায় সেটা হয়না।

ছোট অর্থনীতির এই দেশ ভারতের ৫ম বৃহৎ রেমিটেন্সের উৎস। অর্থাৎ ভারতের আয়ের বড় একটা অংশ এই বাংলাদেশ থেকেই আসে। অথচ ভারত আমাদের রেমিটেন্স আয়ের উৎসের লিস্টে ২০ এর ভেতর ও নাই।

২০০৩-০৪ এর দিকে বাংলাদেশের বাণিজ্যের বিশাল অংশ ইন্ডিয়ার উপর নির্ভর করত সেটা অস্বীকার করার কিছুই নাই। তখন ভারত ছিল সব থেকে বড় ট্রেড পার্টনার। কিন্তু সেই পরিস্থিতি অনেক আগেই পরিবর্তন হয়েছে। ২০০৯ অর্থবছরে ভারতে আমাদের রপ্তানি ও আমদানির অনুপাত ছিল ১:১১। মানে আমরা যা রপ্তানি করতাম তার প্রায় ১১ গুন বেশি আমদানি করা হত। ২০১৫ তে এসে অনুপাতটি হয়েছে ১:৭.৯ মানে আমাদের রপ্তনানীর বিপরিতে ভারত থেকে আমদানি করা লাগে ৮ গুনের কিছু কম। দিন যত যাচ্ছে ভারত আমাদের বাজার অন্যদেশের তুলনায় হারাচ্ছে। আমাদের রপ্তানীর শীর্ষ ট্রেড পার্টান আমেরিকা, আমদানির ক্ষেত্রে চীন। তাই যারা ভাবছেন ভারতের উপর আমরা নির্ভরশীল এবং এই নির্ভরশীলতা বাড়তেছে তাদের জন্য গভীর সমবেদনা।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: