ব্লাক সেপ্টেম্বর ; অর্থাৎ ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাস,ফিলিস্তিনী জাতির ইতিহাসে এক ভয়াবহ মাস ছিলো। কারন সেবার তারা ইসরাইলের হাতে নয়,বরং তারা প্রান দিয়েছিলো “মুসলিম” জর্ডান আর্মির হাতে। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের দাবী অনুযায়ী সে বর্বরোচিত হামলায় প্রান হারায় দশ হতে পচিশ হাজার ফিলিস্তিনি। এ ম্যাসাকারে সহায়তা করেছিলো আরেক মুসলিম রাস্ট্র পাকিস্তান এর জিয়াউল হক,যিনি আবার পরবর্তীতে পাকিস্তান এর প্রেসিডেন্ট ও হয়েছিলেন।
.
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইল জর্ডান এর নিকট হতে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর দখল করে নেয়। ফলে ফিলিস্তিনিরা বাধ্য হয় জর্ডানে আশ্রয় নিতে ও জর্ডানের কিং হুসেইন ও তাদের যথাযথ আশ্রয় দান করেন। ফিলিস্তিনিরা জর্ডানের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠে। ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামে এক নতুন গতি আসে জর্ডানের সহায়তায়। জর্ডানের আম্মান হয়ে উঠে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৬৮ সাকে ফিলিস্তিনি পিএলও কে ধ্বংসের জন্য ইসরাইল পুনরায় জর্ডানে হামলা চালায়,তবে জর্ডান সেনাবাহিনী ও ফিলিস্তিনি গেরিলারা মিলে তা প্রতিহত করতেও সক্ষম হয়। উভয় পক্ষই তাদের বিজয় দাবী করে। তবে ইজরাইল পুরোপুরি সফল হয়নি,কারন ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত হাত ফসকে বেড়িয়ে যায়।

ব্যাটল অফ কারামেহ – ফিলিস্তিন ও জর্ডানের যৌথ সফল প্রতিরোধ

এই যুদ্ধের পর জর্ডানে ফিলিস্তিনি গেরিলাদের শক্তিমত্তা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে ও ফিলিস্তিনিরা এ শক্তির কিছুটা অপব্যবহার ও শুরু করে। যেমন, অধিবাসীদের থেকে ‘জিহাদ ট্যাক্স’ গ্রহন (ফিলিস্তিনি আন্দোলন এর জন্য) সহ আরো অন্যান্য। দ্রুতই ব্যাপার গুলোর কারনে কিং হুসেইন ও ফিলিস্তিনি গেরিলা যারা ফেদায়ী নামেই অধিক পরিচিত ছিলো তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। সিরিয়া ও লেবানন হতে ফিলিস্তিনিরা জর্ডানে এসে ঘাটি গাড়তে থাকে,ও দ্রুতই রিফুইজি ক্যাম্পগুলো হতে জর্ডান তার কর্তৃত্ব হারায়। রিফুইজি ক্যাম্পগুলো একপ্রকার স্বাধীন হয়ে উঠে। মূল ঝামেলা ছিলো ফিলিস্তিনি বাহিনীগুলোর মধ্যে কোন ঐক্য ছিলো না,তাই জর্ডানের সাথে পিএলও এর চুক্তির থাকলেও পিএলও অন্য গ্রুপ গুলোকে নিয়ন্ত্রনে ব্যার্থ ছিলো। ফিলিস্তিনিদের দুটি গ্রুপ সরাসরি জর্ডানের রাজতন্ত্রের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে। এক পর্যায়ে এ দুটি গ্রুপ PELP ও DELP বেপরোয়া হয়ে উঠে। ফিলিস্তিনি গ্রুপগুলো জর্ডানে সমাজতন্ত্রী বিপ্লবের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। তারা স্লোগান দিতে থাকে যে ‘জর্ডানের রাস্তা ধরেই তেল আবিব আসবে’। তবে ফিলিস্তিনি গ্রুপগুলো এটাও দাবী করে যে জর্ডান আর্মির অনেক এজেন্ট ফিলিস্তিনিদের সাথে মিশে গিয়ে কিডন্যাপিং সহ অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিস্থিতি খারাপের দিকে নিতে বাধ্য করে। এছাড়াও কিং হুসেইন আমেরিকার অনুগত ছিলো।

কিং হুসেইন ও ইয়াসির আরাফাত

কিং হুসেইন এর ভিত নড়বড়ে হতে শুরু করে। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন কারন যদি একশন না নেন তাহলে তার সাম্রাজ্য হাতছাড়া হয়ে যাবে কারন তার সেনাবাহিনী তার প্রতি আনুগত্য দেখাবে না যদি আক্রমন না হয়। অন্যদিকে আক্রমন করলে তিনি বিশ্ব মুসলিমের কাছে ঘৃনার পাত্রে পরিনত হবেন। মিসর সহ অনেক দেশ মধ্যস্থতার চেস্টা করলেও শেষ অব্ধি লাভ হয় না। অন্যদিকে সিরিয়া ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সরাসরি যোগ দেয়। কিং হুসেইন শেষ অব্ধি চূড়ান্ত আক্রমনের ও জর্ডান হতে ফিলিস্তিনিদের তাড়ানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ভয় ছিলো ইসরাইল নিয়ে। তিনি আমেরিকার মারফতে ইসরাইলের সাথে যোগাযোগ করেন। ইসরাইল আশ্বস্ত করে যে ফিলিস্তিনি মারার কারনে যদি জর্ডান বর্ডার হতে সৈন্য সরিয়ে নেয় তবুও ইসরাইল কোন সুযোগ নিবে না। ইসরাইল আর কি? মুসলিম নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করছে,এতে ইসরাইলের কি আপত্তি থাকতে পারে?
.
১৯৭০ এর পুরোটা জুড়েই ফিলিস্তিনি গেরিলারা ও জর্ডান  আর্মির মাঝে খন্ডযুদ্ধ হতে থাকে। ফিলিস্তিনিরা এক্ষেত্রে চরম বাড়াবাড়ি করে,এমনকী কিং হুসেইন কে হত্যার জন্য তারা বোমা ফিট করে রাখে যাতে কিং হুসেইন বেচে গেলেও তার স্ত্রী মারা যান। ফলে ফিলিস্তিনিদের এক আমলের বন্ধু কিং হুসেইন তাদের পুরোপুরি বিরুদ্ধে চলে যান। ইসরাইলে ফেদায়ীরা রকেট ছুড়লে ইসরাইল তাদের ওপর আর্টিলারী ফায়ারিং শুরু করে। আমেরিকান প্রেশারে জর্ডান হতে কিং হুসেইন ইসরাইলে বার্তা পাঠান যে,”জর্ডান ইসরাইল কে রকেট এর হামলা মুক্ত রাখতে যথাসম্ভব চেস্টা করছে। ইসরাইলে ফেদায়ীদের ছোড়া রকেটের জন্য জর্ডান সমব্যাথিত ফেদায়ীদের কাউকে রকেট আক্রমনের প্রতিরোধে ‘শুট এট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশ আছে জর্ডান আর্মির প্রতি”।  কিং হুসেইন এর এই বার্তায় ইসরাইল সন্তুষ্ট হয়।


ইয়াসির আরাফাত ও কিং হুসেইন এর মাঝে সন্ধি হলেও তা ভেঙ্গে যায়। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ তারিখের পর শুরু হয় মুল আক্রমন। জর্ডান এয়ারফোর্সের তীব্র আক্রমনের পাশাপাশি আম্মানের বাড়ি বাড়ি হতে ফিলিস্তিনি হত্যা ও তাড়িয়ে দেওয়া চলতে থাকে। ফিলিস্তিনিরা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও তেমন সুবিধা করে উঠতে পারে নি। এসময়,জর্ডান আর্মিকে ট্রেনিং দিত পাকিস্তান আর্মি। আর সে মিশনের হেড ছিলো পাকিস্তান আর্মির ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল হক। তিনি জর্ডান আর্মির সেকেন্ড ডিভিশনের দায়িত্ব গ্রহন করেন ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলায় অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করে। শহুরে যুদ্ধ বা আরবান ওয়ারফেয়ারে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেন অর্থাৎ বাড়ি বাড়ি হতে ফিলিস্তিনি তাড়ানো ও গনহত্যাতে সক্রিয় অংশগ্রহন করেন। এদিকে সিরিয়া এ যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে অংশগ্রহন করে। সিরিয়া এ যুদ্ধে ১২০ টি ট্যাংক হারায় ও  যুদ্ধে জর্ডানের সাথে পেরে উঠে না। জর্ডানের প্রতি সমর্থনের প্রমান স্বরূপ ইসরাইল এর বিমানবাহিনীর বিমান উড়ে যায় সিরিয়ান এয়ার বেসের উপর দিয়ে। অনেক ফিলিস্তিনির মৃত্যুর পর ফিলিস্তিনিরা ধীরে ধীরে লেবাননের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়। ইয়াসির আরাফাত এর দাবী অনুযায়ী এতে ২৫ হাজার ফিলিস্তিনি মারা যায়। সরকারী হিসাব মতে আড়াই হতে তিন হাজার। এ ব্যাপারে ইজরাইলী ফরেন মিনিস্টার বলেছিলেন, “জর্ডান এতসংখ্যক ফিলিস্তিনি হত্যা করেছে যা হয়ত ইজরাইল কোনদিন ও পারত না ( এতদিন এর নির্যাতন মিলিয়েও সংখ্যা সমান হতো না )
.

এদিকে কিং হুসেইন ও প্রেশারে ছিলেন দ্রুত এ যুদ্ধ শেষ করার জন্য। অবশেষে মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের মধ্যস্ততায় ২৭ ই সেপ্টেম্বর ১৯৭০ ইয়াসির আরাফাত ও কিং হুসেইন সন্ধি করেন। তবে এ ঘটনার জের ধরেই সৃস্টি হয় চরমপন্থি ফিলিস্তিনি গেরিলা দল ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর অর্গানাইজেশন” এর,যারা জর্ডানের প্রধানমন্ত্রী হত্যা ও মিউনিখ অলিম্পিকে ইসরাইলী এথলেট দের হত্যা করেছিলো। ১৯৭৩ পর্যন্ত সংগঠনটি ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালায়। এ ঘটনায় দোষ ফিলিস্তিনের থাকুক বা জর্ডানের,মুসলিম জাতির ইতিহাসে এটি একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়।
.
জর্ডান সরকার পাকিস্তানী ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল হক কে তার ফিলিস্তিনি নিধনে পারদর্শিতার জন্য তাকে পুরস্কৃত করে। মুসলিম মুসলিম এ রক্তক্ষয়ী অন্ত:কহলের ঠিক ৬ মাস পর আরব হতে বহু দূরে,তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তানে পাকিস্তানী আর্মি বাংলাদেশীদের ওপর শুরু করে আরেকটি গনহত্যা। যাতে মারা যায় লক্ষ লক্ষ মানুষ,যার অধিকাংশই ছিল মুসলিম…..

Facebook Comments

1 Comment

Al Jaim Pappu · January 2, 2018 at 12:54 am

হায়রে প্যালেস্টিনি। যুগে যুগে অত্যাচারিত হয়েই যাচ্ছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: