বাংলাদেশ ভারত প্রতিরক্ষা সহায়তা বিষয়ক খসড়া চুক্তি টি সম্পন্ন হয়েছে। জনমতে উৎকন্ঠা এ নিয়ে যে কি আছে এই চুক্তি তে আর কেনই বা করা হচ্ছে এই চুক্তি। চুক্তি টি কি আমাদের জন্য লাভজনক না এর সাথে শুধু একক ভারতের স্বার্থ জড়িত ?আসুন জানি সেই সব কিছু।

এ চুক্তির ভারত সংশ্লিষ্ট দিকগুলো :-

ভারতের সাথে বাংলাদেশের করা এই সামরিক চুক্তির ব্যাপার টি প্রথম সামনে আসে বাংলাদেশ যখন তাদের প্রথম সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা গ্রহন করে। ভারত অনেক টা রাগ-ঢাক ছাড়াই সরাসরি বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনার বেপারে তাদের আপত্তি জানায়। আপত্তির কারন ছিল বাংলাদেশ এর চীনা সাবমেরিন ক্রয়। যেটি ভারতের মুল দুঃচিন্তার কারন ছিল। ভারত মহাসাগরে এমনিতেই চীনা সাবমেরিন গুলোর আনা গোনা বেশি তার মধ্যে প্রতিবেশী একটি দেশ যখন সেই চীনা সাবমেরিন কেনার আগ্রহ দেখায় তখন ভারতের প্রথম আশংকা ছিল বাংলাদেশী সাবমেরিন এর সাথে মিলে চীনা সাবমেরিন গুলো ভারত সাগর থেকে বঙ্গপোসাগরের আরো ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে যা তাদের জন্য ডিটেক্ট করা কঠিন হবে সেটি বাংলাদেশ নৌবাহিনী না চায়নিজ নৌবাহিনীর সাবমেরিন। আর তখন থেকেই ভারত বাংলাদেশের সাথে সামরিক সম্পর্ক জোড়দার করতে আগ্রহী হয়। তারা চীনা সাব এর বদলে রাশিয়া থেকে সাব কেনার জন্য প্রস্তাব করে এবং সেখানে তারা  মধ্যস্থতার চেষ্টা করে কিন্তু নানা কারনে বাংলাদেশ চীনা সাবমেরিন কেনাই উত্তম মনে করে আর তখন থেকেই মুলত বাংলাদেশ এর সমুদ্র সীমায় চীনা উপস্থিতি নিয়ে ভারতীয় নেভি চিন্তিত হয়ে পড়ে। তহন থেকেই বাংলাদেশ সামরিক তথা নৌবাহিনীর সাথে ভারতীয় নৌবাহিনী সম্পর্ক উন্নয়নে উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এর পর আসছি ২য় কারন নিয়ে।

ভারতের মেক ইন ইন্ডিয়া প্রজেক্ট

ভারতের মেইক ইন ইন্ডিয়া নীতি অনুসারে ভারত বিভিন্ন দেশের সাথে যুক্ত হয়ে অস্ত্র নির্মান এবং সেগুলো বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে। ভারতের পরিকল্পনা অনুসারে তারা দক্ষিন এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকান দেশ মিলিয়ে ২০২৫ সালের ভেতর ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এর অস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা গ্রহন করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই দেশ গুলোতে ভারতের চেয়ে চীনা অস্ত্রের চাহিদা বেশি। অস্ত্র নির্মানের অভিজ্ঞতা, ইউরোপিয়ান প্রযুক্তির কপি পেস্ট আর সেই সাথে অপেক্ষাকৃত কম মুল্যে অস্ত্র বিক্রি এবং অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ঋন দানের ক্ষেত্রে ভারত চীন থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থিত। এমন অবস্থায় ভারত দক্ষিন এশিয়ায় শ্রীলংকা ছাড়া কোন দেশের কাছেই বড় মাপের অস্ত্র বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়। আশিয়ান ভুক্ত দেশ মিয়ানমার তাদের কাছ থেকে সল্প পরিমানে অস্ত্র ক্রয় করলেও তাদের মুল অস্ত্রের যোগান এখনো চীন থেকেই আসে। এমন অবস্থায় দক্ষিন এশিয়ার মার্কেটে পাকিস্তান এর পর অন্যতম সামরিক ক্রেতা এবং ভারতের জন্য অত্যন্ত পরীক্ষিত বন্ধু বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোন পথ ছিল না তাদের অস্ত্র বিক্রির জন্য। আর সেই লক্ষ্যে ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ এর কাছে ভারতীয় নানা অস্ত্র বিক্রির চেষ্টা অব্যাহত থাকে। এর লক্ষ্যে তারা কয়েক দফায় বাংলাদেশ কে অস্ত্র বিক্রিত প্রস্তাব দেয় যা অনেক বার বাংলাদেশ সরকার নাকচ করে দেয় এবং অনেক টা ভারতের চক্ষুশুল চীন, রাশিয়া ইতালি থেকে অস্ত্র আমাদানি বৃদ্ধি করে। সর্বশেষ গত বছর ভারত কয়েক দফায় তাদের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠায় এবং শেষ পর্যন্ত তারা তাদের অস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা কে সামান্য মডিফাই করে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি সাক্ষর করার প্রস্তাব দেয় যার অধীনে ভারত বাংলাদেশ কে দুই দফায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩৮৫০ কোটি টাকা অফার করে যার অধিনে বাংলাদেশ ভারত ছাড়াও তৃতীয় কোন দেশ থেকে অস্ত্র ক্রয় করতে পারবে ভারতের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে। এই ঋন চুক্তিতে ভারতের আক্ষরিক অর্থে খুব বেশী লাভবান না হলেও বাংলাদেশ সাথে সামরিক সম্পর্ক আরো জোররদার করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে প্রথম দিকে তাদের সামরিক অস্ত্র কেনার প্রস্তাব নাকচ করলেও এই ধরনের চুক্তি নাকচ করা বাংলাদেশ এর কূটনৈতিক ভাবে কিছুটা অসস্তির কারন হয়ে দাঁড়ায় যার ফলে বাংলাদেশ ভারতের সাথে প্রাথমিক ভাবে (MOU) সাক্ষর করে। তবে উক্ত (MOU) চুক্তি গুলোর ব্যাপারে সঠিক ভাবে কিছু বলা ছিল না।

উপর থেকে এত কিছু বিশ্লেষণ করার দুইটা কারন প্রথমত কোন ভারতীয় যেন এটা না ভাবে যে বাংলাদেশ নিজ থেকে এই অর্থ নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। এই চুক্তি কেন কোন পরিস্থিতি তে করা হচ্ছে তা না জেনেই মন্তব্য করছে যে এটা বাংলাদেশের ক্ষতি। সত্যি কি তাই?? আসুন এবার সেটি নিয়ে কথা বলা যাক।

চুক্তির বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট স্বার্থসমূহ :-

উপরেই আলোচনায় বলা হয়েছে বাংলাদেশ সরকার প্রথম থেকেই ভারত থেকে অস্ত্র ক্রয়ে অনীহা জানিয়ে আসছে তাই ভারত থেকে অস্ত্র কেনার ব্যাপারে আমাদের সরকার কখনো আগ্রহী ছিল না সেটা পরিষ্কার। তাহলে প্রশ্ন হলো এই ডিল টা কেন করা হলো?

আগে ডিলের বিষয় বস্তু সম্পর্কে জানা যাক এই ডিলে কি কি আছে? সম্পূর্ন চুক্তিটি ৪ টি সমঝোতা  স্মারকে বিভক্ত প্রথমত চুক্তি অনুসারে :-

  1.  ঋন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ কে যে ৫০০ মিলিয়ন ডলার দেয়া হবে তার প্রায় ৩৫% বা ১৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ ভারতের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে ৩য় কোন দেশ থেকে অস্ত্র ক্রয়ে ব্যবহার করতে পারবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ভারতীয় ঋনের এই টাকা র একটি অংশ দিয়ে রাশিয়ান বা ইয়োরোপিয়ান অস্ত্র কিনতে পারবে। চায়না র নাম টা বাদ দিলাম কারন টা আপনারা নিজেরাই জানেন।
  2. ঋন চুক্তি আওতায় বাংলাদেশ নিজের দের চাহিদা অনুসারে যেসব অস্ত্র দরকার তার লিস্ট করে ভারত কে জমা দিবে। ভারত যদি অই সব অস্ত্র তৈরী করে থাকে আর তা যদি বাংলাদেশ কে বিক্রি করতে তাদের আপত্তি না থাকে এবং তার গুনগত মান যদি পরীক্ষিত হয় তবে বাংলাদেশ তা ক্রয় করবে এই ঋনের আওতায়।
  3. এই পয়েন্টে বলা হয়েছে বাংলাদেশ যদি মনে করে ভারতীয় অস্ত্র তাদের চাহিদা পূরনন করতে পাচ্ছে অথবা সেগুলো নিজেদের প্রয়োজন মত তৈরী করে নিতে হবে তবে সেক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশ যৌথ ভাবে সেই সব অস্ত্র প্রস্তুত করবে এবং তা চাইলে ৩য় দেশের কাছে উভয় দেশের সম্মতিতে অফার এবং বিক্রি করতে পারবে। তবে এই ক্ষেত্রে লভাংশ কিভাবে ভাগ হবে তা উল্লেখ নেই তবে এতে ভারতের মুলধন আর প্রযুক্তি থাকায় তাদের লাভের অংশ বেশি হবে তা বলাবাহুল্য।
  4. এই অংশে মুলত বাংলাদেশ আর ভারতীয় নেভির মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে কাজ করার কথা বলা হয়েছে যার অধিনে বাংলাদেশ নেভির নাবিক গন ভারতে উচ্চতর ট্রেনিং গ্রহন করতে পারবে সেই সাথে ভারতীয় নেভির অধিনে থাকা কলকাতার গার্ডেন রীচ শিপইয়ার্ড এবং বাংলাদেশ নেভির অধিনে থাকা খুলনা শীপইয়ার্ড যৌথ ভাবে নেভাল ভ্যাসেল এবং সিভিলিয়ান ভ্যাসেল তৈররী এবং ডিজাইন করবে। যেগুলো মুলত বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের জন্য বানানো হবে।

এর বাইরে সামরিক সম্পর্ক উন্নয়নে দুই দেশের সামরিক স্কুল গুলোর ছাত্র-ছাত্রীগন শিক্ষা সফর করবে যাতে ছোট থেকেই তাদের মাঝে বোঝাপড়া দৃঢ় হয়।

মুলত এই হলো ভারত বাংলাদেশ সামরিক ঋন চুক্তির মুল বিষয় বস্তু। এখানে ভারতের স্বার্থ কোথায় আর বাংলাদেশ এর স্বার্থ কোথায় তার সবই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। পরিশেষে এই চুক্তি কেন বাংলাদেশ করতে হলো এতে বাংলাদেশ কোন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে কিনা তা তুলে ধরছি।

 বাংলাদেশ কেন চুক্তি করলো?

কূটনৈতিক ভাবে বিবেচনায় বাংলাদেশের এই চুক্তি না করা হতো চরম বোকমি। মাত্র ৫০০ মিলিয়ন দিয়ে বাংলাদেশের সামরিক খাতে ভারত বিশাল প্রভাব তৈরী করতে পারবে এমন টা আকাশ কুসুম চিন্তা ছাড়া কিছুই না বরং এটি না করলে বাংলাদেশ এক ধরনের ইমেজ সংকটে পড়তো। ভারত যখন তাদের স্বার্থে চুক্তি এতটা শীথিল করতে পেরেছে সেখানে বাংলাদেশ চুক্তি না করার কোন যুক্তি ছিল না। আমাদের প্রতিবেশী মিয়ানমার যেমন ভারত, চীন, পাকিস্তান ৩ দেশ থেকেই অস্ত্র সামরিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক ব্যালেন্স করছে সেখানে আমরা একই পথে না হাটলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিস্থিতিতেতে পিছিয়ে পড়বো। ভারত যখন মিয়ানমার কে অস্ত্র বিক্রি করে সেটি নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলি তবে এখন আমাদের অস্ত্র বিক্রি সেই সাথে অন্য দেশ থেকে অস্ত্র কেনার জন্য টাকা দিতে চাচ্ছে যেচে তখন আমাদের সমস্যা টা কোথায়। কারন যা কেনা হবে সবই খুচরা অস্ত্র, কোস্টগার্ডের টহল জাহাজ,মোটরসাইকেল বা এসব।  এখন আমরা যদি এই ঋন চুক্তি সাইন না করি তবে তারা রোহিংগা ইস্যুতে তারা আমাদের বিপক্ষে ভোট দিবে। এবং সরকার এটা আশা করে যে ভারত আমাদের শত্রু মিয়ানমার কে অস্ত্র বিক্রি করবে না আমাদের কথা ভেবে। বরং ভারত যে পরিমান অস্ত্র বিক্রি করে তার দশগুণ বেশি অস্ত্র চিন মিয়ানমার কে বিক্রি করেছে। অথচ এই চিন বাংলাদেশ সামরিক সম্পর্ক অধিক মজবুত। তাদের থেকে এত অস্ত্র নেয়ার পরেও তারা যদি মিয়ানমার কে টাকার জন্য অস্ত্র দিতে পারে নিজ স্বার্থ দেখতে পারে তবে ভারত হতে

খুচরা অস্ত্র ক্রয়ে সমস্যা দেখা যায় না। তাছাড়া এর মাধ্যমে চীন একটি মেসেজ পাবে ও ভারত এর এই প্রচেস্টা বাতিলের জন্য সরকার কে সুবিধা প্রদান করতে পারে। তাদের থেকে অস্ত্র কেনার বাবদ তাদের সাথে আমাদের লবিং পাওয়ার বৃদ্ধি পাবে। ভবিষ্যৎ এ ভারত মিয়ানমার কে অস্ত্র দিতে চাইলে সেখানে আমরা আমাদের আপত্তি তুলে ধরার জোড়ালো ভিত্তি পাব।

আর ক্ষতির কথা চিন্তা করলে বাংলাদেশ এর অর্থনৈতিক পরিকাঠামো এখন যথেষ্ট শক্ত তাই সামান্য ৫০০ মিলিয়ন এর সামরিক সহোযোগিতা চুক্তি তে বাংলাদেশের কিছুই আসে যায় না।

এটি কেবলই আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি অংশ,খাটি বাংলা ভাষায় যাকে বলে মুখরক্ষা।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: