প্রথমেই বলে রাখছি, যুদ্ধ কখনোই কাম্য না। আমরা কখনোই চাই না যে যুদ্ধ বাঁধুক। আপাত দৃষ্টিতে বাংলাদেশের থেকে বার্মা সমরাস্ত্রে বেশি শক্তিশালি। যুদ্ধ কখনো বাধবেনা। কিন্তু যদি বাংলাদেশ বার্মা যুদ্ধ বাধে তবে সেই পরিস্থিতিটা কেমন হতে পারে সেটা বিশ্লেষন করা দরকার। শুরুতেই কিছু প্রশ্ন রাখছি। প্রশ্নের উত্তরগুলি আলোচনার মাধ্যমে খুজবার চেষ্টা থাকবে।

প্রথমেই যেই প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হতে পারে সেটা হল

১. যুদ্ধ যদি বাধে তবে সেটা কি নিয়ে বাধবে? অর্থাৎ কি কি বিষয় নিয়ে বাধতে পারে?

২. যুদ্ধে বার্মা এবং বাংলাদেশ কাদের সমর্থন পেতে পারে? কে কোন পক্ষ নিতে পারে?

৩. যুদ্ধটা ঠিক কি কি ভাবে বা কৌশলে হতে পারে? স্থায়িত্ব কেমন হতে পারে?

৪. যুদ্ধের ফলে কার কি কি ক্ষতি বা লাভ হতে পারে?

এছাড়া আরো কিছু ছোট প্রশ্ন এবং উত্তর নিয়ে বিশ্লেষণ করব।

বাংলাদেশ বার্মা দুটি প্রতিবেশি দেশ। প্রতিবেশি বলা হলেও সারা বিশ্বে বার্মা উত্তর কোরিয়া ঘরনার বিচ্ছিন্ন দেশ হিসাবেই পরিচিত। দীর্ঘকাল সামরিক শাষন, নিজ দেশের জনগণের উপর অত্যাচার নিপীড়ন, বিশ্ব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা, জাতিসংঘ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে তোয়াক্কা না করে চলা, সর্বপরি দেশ হিসাবে কূটনৈতিক শিষ্ঠাচার বর্জিত দেশ হিসাবে তাদের পরিচিতি দীর্ঘদিনের। সামরিক শাষনের আমলে দীর্ঘকাল আমেরিকা ইউরোপের অবরোধের কবলে ছিল দেশটি। নামমাত্র গণতন্ত্র ফিরে আসবার পর অবরোধ শিথিল এবং কিছু ক্ষেত্রে উঠিয়ে নেওয়া হয়। বাংলাদেশের থেকে কয়েকগুন বড় দেশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের জিডিপি মাত্র $৬৮ বিলিয়ন।

যেসব ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ বার্মা যুদ্ধ হতে পারে তার মধ্যে প্রধান কারণ হল বার্মা দীর্ঘকাল সামরিক শাষনে থাকার কারনে কূটনীতিক শিষ্টাচার থোড়াই কেয়ার করে। বলা যায় তারা উত্তর কোরিয়ার মতই অনিশ্চিত একটা দেশ। কখন কি করে বসবে সেটার নিশ্চয়তা দেয়া কঠিন।

বাংলাদেশ বার্মার বিরোধের মূল দুটি ইস্যু হল রোহিঙ্গা সমস্যা এবং সমুদ্র বিরোধ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বার্মার চলমান উস্কানি সীমিত যুদ্ধে রূপ নেবে না সেটার নিশ্চয়তা দেয়া কঠিন। সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আদালত এর রায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে যেহেতু এটা বার্মা, তাই পরিস্থিতি কখন কোন দিকে মোড় নেয় বলা কষ্ট। ধরুন দুই দেশের সমুদ্রসীমা রেখা বরাবর পানির নীচে বিশাল তেল গ্যাসের খনি আবিষ্কৃত হল। এরকম পরিস্থিতিতে বার্মা যে আদালতের রায় অমাণ্য করবে না সেটার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। কারন অতিতেও তারা নিজেদের দেশেও আইন কানুন উল্টিয়ে দেবার ইতিহাস রয়েছে। নিজ দেশেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে আবার কেড়ে নেবার ইতিহাস আছে।

উপরুক্ত কারণগুলি শুধু কল্পনার খাতিরে। এরকম হবার সম্ভাবণা খুব কম। এরপরো আমরা আলোচনার সুবিধার্থে এই বিষয়ে কিঞ্চিত বলেছি।

এবার আসি দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে। যদি যুদ্ধ হয় তবে সেক্ষেত্রে কোন দেশ কার সমর্থন পেতে পারে?

বার্মার সামরিক জান্তা অর্ধশতাব্দি ক্ষমতায় টিকে আছে মুলত দুটি দেশের সমর্থনের কারনে। চীন এবং রাশিয়া। এই দুটি দেশই কিন্তু উত্তর কোরিয়াকেও প্রশ্রয় দিয়ে আসতেছে। কোল্ড ওয়ারের সময় ও এসব দেশ যাতে করে মার্কিন প্রভাব মুক্ত থাকে তার জন্য একপ্রকার এক তরফা সমর্থন পেয়ে যাচ্ছে বার্মা ও উত্তর কোরিয়া।

কিন্তু মজার বিষয় এই দুইটি দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক মোটেও খারাপ নয়। চীন বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিকারক দেশ। এদেশে চীনের বিনিয়োগ বার্মা থেকেও বেশি। ইতিমধ্যে দুইটি দেশ $২৪ বিলিয়নের ঋনচুক্তি সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে চীন যুক্ত আছে। অর্থাৎ চীনের স্বার্থ বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেই বেশি বার্মার তুলনায়।

এরি ধারাবাহিতায় বাংলাদেশ চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসাবে নাম লিখিয়েছে বার্মাকে পেছনে ফেলে। আগে যদিও পরিস্থিতি এমন ছিল না। তবে বিগত কয়েক বছরে চীন বাংলাদেশ সম্পর্ক স্ট্রাটেজিক পর্যায়ে কিছুটা হলেও গিয়েছে।

অপরদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের স্বাধীনতায় সরাসরি অবদান রেখেছে। যদিও পরবর্তিতে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কে উষ্ণতার অভাব দেখা গেছে সামরিক শাষনের আমলে। তারপরো দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে সম্প্রতি সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। $১২ বিলিয়ন ডলারের রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এর প্রমাণ। সাবের হোসেন চৌধুরিকে তারা তাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাবে ভূষিত করেছে। এদেশ থেকে স্কলারশিপ দেবার সুযোগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টরে সম্পর্ক আগের থেকে অনেক গভীর হয়েছে।

প্রশ্ন আসতে পারে তবে কেন তারা বার্মাকে সমর্থন দিল রোহিঙ্গা ইস্যুতে? আমার ব্যাক্তিগত মত হচ্ছে, সমর্থন না দেওয়াটা অবাক করা ব্যাপার ছিল। কারন এই বার্মাকেই তারা অর্ধশতাব্দি যাবৎ প্রশ্রয় দিয়ে আসতেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতেও চীন রাশিয়ার বর্তমান অবস্থান নতুন কিছু না। তাদের বিদেশনীতিতে তারা এটা কয়েক যুগ ধরেই করে আসতেছে। হটাৎ তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করে ফেলবে সেটা ভাবা বোকামি। সাথে আমেরিকা যে নীতি নেয় তার বিপরীত নীতি রাশিয়ার নেবার ইতিহাস নতুন না। ১৯৭১ সালেও আমরা সেটা দেখেছি। এর সাথে যুক্ত আছে স্বার্থ। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ হবার কারনে চীন বা রাশিয়াকে কোন কাজ চাইলেই বাছ বিচার না করে দিয়ে দিতে পারে না। সরকারি নিয়মনীতি মেনে দিতে হয়। কিন্তু বার্মার ক্ষেত্রে দেশ দুটিকে এরকম কোন পরিস্থিতির ভেতর পড়তে হয় না। তাই রাখাইনে গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজ চীন পেয়ে গেছে। এই প্রকল্পে মুনাফা ভাগাভাগি নিয়ে চীন বার্মাকে ১৫% দিতে রাজি হয়েছিল। পরে অবশ্য দরকষাকষি করে সেটা ৭০-৩০ তে গিয়ে ঠেকে। পাকিস্তানের গোয়াধর বন্দরে চীন মুনাফার ৯১% নিয়ে যাবে। ঠিক এইরকম বৈষম্য বাংলাদেশ কখনো মেনে নিবে না। আবার বার্মা খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। তাই মাইনিং এর কাজ চীন অনেক সহজ ভাবে বাগিয়ে নিয়ে বেশি মুনাফা করতেও সক্ষম। হয়ত এর বিপরীতে চীন কোন অস্ত্র বিক্রি করবে তাদের কাছে। এরকম কোন সুবিধা বাংলাদেশ দিতে সক্ষম নয়।

তাই যদি যুদ্ধ বাধে তবে বলা যায় চীন বা রাশিয়া কোন পক্ষকেই পূর্ণ সমর্থন না দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করার আহবান জানাবে। এর ফাকে দুই দেশের কাছেই অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখার সম্ভাবণা খুব বেশি।পাকিস্তান নিজের কোন ভূমিকায় যাবে না। চীন যেটা করবে তারাও সেটা করবে। আর ভারত তার প্রতিবেশিদের সাথে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে চুড়ান্তভাবে ব্যার্থ। তারা চীনের প্রভাবের ভয়ে বার্মাকে হাতছাড়া করতে চাইবে না। এদিকে বাংলাদেশের পক্ষে বা বিপক্ষেও যেতে পারবে না। তাই তারা নিরপেক্ষ দর্শকের ভূমিকা নিবে। আর আহবান করবে যুদ্ধ বন্ধ হোক।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতিসংঘ, ওআইসি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে শুরু করে আমেরিকা বা কানাডার সমর্থন পাবার সম্ভাবণা বেশি থাকবে। কিন্তু তাদের সমর্থন খুব বড় কোন ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। তবে অবরোধ আরোপ হতে পারে বার্মার উপর। সব দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন যে খুব কম সেটা বলার অবকাশ নেই।

যুদ্ধটা ঠিক কি কৌশলে হতে পারে? স্থায়িত্ব কেমন হতে পারে?

প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে একটু বলে নেই, গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার এর সাম্প্রতিক র‍্যাংকিং এ বাংলাদেশ ৫৭ তম অবস্থানে। প্রতিপক্ষ বার্মার অবস্থান ৩১। অনেকেই এই সুত্র ধরে হিসেব কষে সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছেন বাংলাদেশ একদম দূর্বল। তাই বাংলাদেশের পরাজয় অবধারিত। আমি এধরনের যবনিকাপাত না করে একটু খতিয়ে দেখতে চাই।

যুদ্ধে জয় বা পরাজয় কোন পক্ষের অস্ত্র বা সেনা সংখ্যা বেশি আছে তার উপর কখনো নির্ভর করেন না। যদি সেটা করত তাহলে হয়ত আমেরিকার মত দেশ ভিয়েননামে এভাবে অপদস্ত হয়ে ফেরত যেত না। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হত না। যাই হোক প্রথম প্রশ্নের উত্তর খুজা শুরু করা যাক।

আগের পর্বে হয়ত বুঝতে পেরেছেন যদি কখনো যুদ্ধ হয় তবে সেটা হবে সীমিত ও সল্প মেয়াদি। ভৌগলিক দিক যদি বিবেচনা করা হয় তবে দেখা যায়, বাংলাদেশ বার্মা রাষ্ট্র দুটির প্রায় ১৭০ মাইল সীমান্তের ভেতর ১৩০ মাইল কাঁটাতারে ঘেরা। পুরা সীমান্তের অধিকাংশ দূর্গম পাহাড়ি অঞ্চল। প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক এই পাহাড়গুলির জন্য ভুমিতে অগ্রসর হওয়া দুপক্ষের জন্য এক প্রকার অসম্ভব। রাঙ্গামাটি, বান্দরাবান দিয়ে এই ধরনের আশঙ্কা প্রাকৃতিক কারনেই নেই বললেই চলে। যাদের এই দূর্গম অঞ্চলে ট্রেকিং এর বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে তারা নিশ্চিত ভাবেই বিষয়টা ভাল বুঝবেন। কক্সবাজারের টেকনাফ মুলত বার্মার সাথে যোগাযোগের একমাত্র পথ। তাও নাফ নদী সেখানে আরেক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে।

ভৌগলিক কারনেই স্থল পথে বড় সড় আক্রমন করা দুই পক্ষের কারো দ্বারা সম্ভব না। এক্ষেত্রে কার কত গুলা ট্যাঙ্ক বা আর্টিলারি আছে সেই হিসাব গৌণ। ব্যাপারটাকে মরা বটলনেক বলতে পারি। কোন বোতলে পানি ভরা আছে কিন্তু মুখ খুলা। যেহেতু বোতলের মুখ সরু তাই উলটা করে ধরলে একবারে সব পানি বের হতে পারে না। কারন বের হবার পথ সরু। বাংলাদেশ বার্মার বর্ডারে উভয় দেশে প্রবেশের পথ অনেকটা এরকম। তাই যত সংখ্যক ট্যাঙ্ক, কামান থাকুক সেটা এই সরু পথে উভয় দেশে প্রবেশে বোটলনেক প্রব্লেম সৃষ্টি করবে। আর দুই দেশের এন্টিট্যাঙ্ক ওয়েপন যা আছে সেটা দিয়ে এই ধরনের আগ্রাসন প্রতিহত করা কঠিন না। এজন্যই কার কয়টা ট্যাঙ্ক আছে সেই হিসাব করে লাভ নেই ব্যাবহারের সুযোগ কম থাকার কারনে।

আর এক্ষেত্রে যেটা হতে পারে সেটা হল দুই দেশ তাদের আর্টিলারি ফায়ার করবে একে অপরের উপর। বাংলাদেশের রামু সেনানিবাস টি মুলত এই উদ্দেশ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে।এতক্ষন বললাম শুধু আর্মি এর কথা। যেখানে মুলত খুব বেশি শক্তি ব্যাবহারের সুযোগ কোন পক্ষেরই নাই। তবে আর্মিকে সাপোর্ট দেবার জন্য যদি বিমানবাহিনী আসে?

এবার বিমানবাহিনী নিয়ে আলোচনা করা যাক। বার্মার বিমানবাহিনী বাংলাদেশ থেকে শক্তিশালী। অন্তত্য গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার সেটাই বলে। কিন্তু এখানেও বলতে চাই সংখ্যা বাস্তব যুদ্ধে কতটুকু প্রভাব রাখবে সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। বার্মার হাতে আছে প্রায় ৩১ টা মিগ-২৯ বিমান। যার কিছু সম্প্রতি আপগ্রেড করা হয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের আছে ৮ টি মিগ-২৯। তবে বার্মার ঠিক কতটি বিমান কম্যাট রেডি সেটা বিবেচনার বিষয়। আপগ্রেড যেগুলা করা হয়েছে এর বাইরে সব গুলির ওভারহোল করার সময় হয়ে যাবার কথা। কিন্তু সবগুলি হয়নি।

এখানে একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ওদের মিগ-২৯ গুলা থাই বর্ডারে মোতায়েন। রিফুয়েলিং ছাড়া বাংলাদেশ বর্ডারে কাছের এয়ার বেজে আনতে পারবে না। আর বাংলাদেশের বর্ডার সংলঘ্ন বেজে মিগ-২৯ না রাখার কারন এটা বাংলাদেশ আর্মির আর্টিলারি রেঞ্জের ভেতর। বিশেষজ্ঞদের ধারনা মতে তাদের শুধু আপগ্রেড করা মিগ-২৯ গুলা এক্টিভ। সব মিলিয়ে এক্টিভ মিগের সংখ্যা ১২ টার বেশি নয়। তারপরো আমরা ধরে নিলাম ওদের সব গুলাই এক্টিভ। ওদের পাইলট দের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।

বার্মার বিমানবাহী সংখ্যায় অনেক এগিয়ে থাকলেও একটা জিনিস খেয়াল করে দেখবেন পুরাতন ন্যাঞ্চ্যাং এ-৫ বিমান আছে তাদের ২১ টা। বাংলাদেশ অনেক আগেয় এই মডেলের বিমানগুলিকে জাদুঘরে পাঠিয়েছে। উৎপাদন বন্ধ এবং ইঞ্জিন সংগ্রহের সমস্যা কাটিয়ে এর কয়টি এখনো সচল সেটা একটা প্রশ্ন। ঢাকার শিশু পার্কে একটি এফ-৬ যুদ্ধবিমান শিশুদের বিনদোনের জন্য রাখা আছে। এত গুলা বছর পর এই এফ-৬ বিমান এখনো তাদের সার্ভিসে কিভাবে রাখা সম্ভব? সব কিছুর একটা মেয়াদ থাকে। এই বিমান গুলা অমর না। এর ডেট এক্সপায়ার হয়ে যাবার কথা অনেক আগেই। যদিও অধিকাংশ এফ-৬ বিমান তারা অবসরে পাঠিয়েছে। এছাড়া এফ-৭ এম বিমান আছে প্রায় ২৪ টা। এখানেও একি প্রশ্ন। বাংলাদেশ এফ-৭ এমবি বিমানগুলার অধিকাংশ অবসরে পাঠিয়েছে। এখনো কিছু আছে সার্ভিসে। সেগুলা ১-২ বছরের ভেতর অবসরে চলে যাবে। এখানেও যথেষ্ট সন্দেহ আছে কেন ওদের এই বিমান গুলি সার্ভিসে রাখা হইছে? হতে পারে বিমানের সংখ্যাটা বাড়িয়ে দেখানোর জন্য। এর বাইরে বার্মার বন্ধুপ্রতিম দেশ পাকিস্তান থেকে ১৬ টা জেএফ-১৭ অর্ডারে আছে। রাশিয়ার সাথে সুখই বিমানের চুক্তি করেছে ৬ টির জন্য।

মুলত বাংলাদেশের আকাশে একছত্র আধিপত্য করার মত শক্তিশালী বিমানবাহী বার্মার আছে সেটা বলা যাবে না। তবে বাংলাদেশের এফ-৭ বিজি১, বিজি, এমবি সিরিজের বিমান দিয়ে তাদের আক্রমন ঠেকানো সম্ভব। এফ-২২ র‍্যাপটর এর মত বিমান নাই ওদের যে এখানে এত সহজে আকাশ দখল করবে।

আকাশ প্রতিরক্ষায় বার্মাকে ঈর্ষা করা যেতেই পারে। পুরা বার্মা জুড়ে তিন স্তর বিশিষ্ট MIADS (Myanmer Integrated Air Defence System) এর মাধ্যমে তারা আকাশ প্রতিরক্ষার শক্ত জাল বুনে রেখেছে। এর অধিনে রাশিয়ার তৈরি ৩ ব্যাটেলিয়ন মধ্যম পাল্লার Buk M1 স্যাম সিস্টেম রয়েছে তাদের। সল্প পাল্লার টর এম-১ রয়েছে তাদের। এছাড়া পেচরা, বিভিন্ন AAA গান রয়েছে বার্মার। সেই সাথে MIADS সাথে যুক্ত রয়েছে ইন্টারসেপ্টর বিমানের সাপোর্ট এবং বার্মিজ নেভির এয়ার ডিফেন্স।

সব মিলিয়ে বলা চলে যদি যুদ্ধ বাধে তবে বাংলাদেশ বার্মার আকাশ কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিবে না সেটা অনুমান করা যায়। বাংলাদেশের অবস্থান হবে ডিফেন্সিভ। ওরিলিকন জিডিএফ-০০৯ এবং এফএম-৯০ এর মত স্যাম সিস্টেম চ্যালেঞ্জ করতে বার্মা বিমান পাঠাবে সেটার সম্ভাবনাও কম। তাদের সব গুলি বিমানের অবস্থা ততটা ভাল না। ভাল হলে ন্যাঞ্চ্যং এ-৫ এর মত বিমান সার্ভিসে রাখত না। বাংলাদেশ খুব শিঘ্রয় এলওয়াই-৮০ডি/ই হাতে পেতে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আরো মজবুদ হবে। এখানে বলে রাখি বার্মা সুপার পাওয়ার না যে বাংলাদেশকে পরাজিত করতে পারবে। একি কথা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এবার আসি সব থেকে ভয়ঙ্কর অংশে। বার্মার কাছে ৭০০ কিমি পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল আছে।

এর বিপরীতে বাংলাদেশ কি করবে?

এর উত্তর দেবার আগে একটা কথা আবার বলে নিচ্ছি, প্রতিটা পন্যের উৎপাদন তারিখ এবং শেষ মেয়াদ থাকে। এমনকি সেনাবাহিনী যেসব বুলেট ব্যাবহার করে সেগুলার ও। নির্দিষ্ট সময়ের আগে সেটা ব্যাবহার করে ফেলতে হয়। নাহলে ফেলে দেয়া ছাড়া উপাই নেই। মিসাইল ভেদে এই মেয়াদ ৬ মাস থেকে ১২ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এর ভেতরে সেগুলাকে মাঝে মাঝে ওভারহাউলিং ও করা লাগে প্রয়োজন অনুযায়ী। বার্মা উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে হাউসং-৬ ( স্কাড মিসাইল) মিসাইল গুলা পায় ১৯৯১-৯৪ সালের ভেতর। মিসাইল গুলা উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড কেনা। মানে উৎপাদন আরো আগে। ধরলাম নতুন মিসাইল কিনেছিল তারা। তারপরো প্রতিটা মিসাইলের বয়স এখন ২৫ বছরের বেশি। এর পর নিষেধাজ্ঞার জন্য আর চালান হাতে পায়নি তারা। তাই ওভারহাউলিং বা সার্ভিসিং কিভাবে করেছে সেটা একটা প্রশ্ন। যেভাবেই যা করুক ২৫ বছরের একটা হাইব্রিড  মিসাইলে ব্যাবহার যোগ্য না সেটা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। ওরা নিজেরাও এটাকে লঞ্চ করবে না এই ভয়ে যে হয়ত উৎক্ষেপণের সময় বিষ্ফরিত হবার সম্ভাবণা অনেক বেশি। তবে এটা তাদের শো পিস এবং গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার রাংকিং এ এগিয়ে রাখবে। তাই এটা অমর মিসাইল হিসাবে আমরা ধরে নিতে পারি। ব্লাড হাউন্ড মিসাইল ১৯৮৯ সালের। যদি বার্মার এটা থেকে থাকে তবে এটার ক্ষেত্রেও একি কথা প্রযোজ্য।

সব শেষে নেভি নিয়ে। এটা নিয়ে বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই। লেখা বড় হয়ে যাবে।

সংক্ষেপে এটুকু বলি, বার্মার নেভি কোস্টাল ডিফেন্সের জন্য। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাবমেরিন চ্যালেঞ্জ করে এটা গভীর সমুদ্রে নামবে সেটা একটু অবাস্তব। সাথে ফ্রিগেট, কর্ভেট সব দিক থেকেই ওদেরকে ওদের কোস্টেই আটকে রাখার ক্ষমতা বাংলাদেশ নেভি রাখে। এর জন্যই সাবমেরিন কে স্ট্রাটেজিক ওয়েপন বলা হয়েছে। শেষ কথা সংখ্যা হিসাবে আর গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার হিসাবে বার্মা অনেক এগিয়ে। একটি সংখ্যা প্রকৃত অবস্থা বুঝার জন্য যথেষ্ট নয়। আর যুদ্ধ জয় অস্ত্রের মাধ্যমে আসে না। আশে শৃঙ্খলা, দেশপ্রেমের মাধ্যমে। গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের আরেকটি দিক বলি। বার্মার ৪ লক্ষাধিক সেনা র‍্যাংকিং এ বাংলাদেশ থেকে অনেক এগিয়ে রেখেছে। শৃঙ্খলাহীন সল্প বেতনের অপেশাদার সেনা যুদ্ধ জয়ের সব থেকে বড় অন্তরায়। যুদ্ধের সময় তাদের অপেশাদারিত্বের জন্য বাংলাদেশ তাদের ইন্টেলিজেন্স বেশি কাজে লাগাতে পারবে। কারন বাংলাদেশি টাকায় ৮-১০ হাজার টাকা বেতন পাওয়া এক বার্মিজ সেনাকে ৫ লক্ষ টাকা দেখালেই হয়ত অনেক গুমট ফাঁস করে ফেলবে। তাদের ভেতর যে পেশাদারিত্বের অভাব আছে সেটা তাদের কর্মকান্ড দেখলেই বোঝা যায়।

অপরদিকে বাংলাদেশ জাতিসংঘ মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সর্বোচ্চ পেশাদারি বাহীনি হিসাবে স্বীকৃত। প্রশিক্ষন শৃঙ্খলায় বাংলাদেশের সুনাম সারা বিশ্বে। তাই গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার এর ৫৭ র‍্যাংকিং বাস্তবতার খুব কম অংশের প্রতিফলন বলে মনে করি।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: