আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মায়ানমার, বরাবর ই সামরিক শাসনের আওতায় থাকায় বিভিন্ন সময় দেশটি তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র গুলোকে মাথাব্যথায় ভুগিয়েছে। অন্য রাষ্ট্র গুলোর সাথে কোন বড় সংঘাতে না জড়ালেও বাংলাদেশ এর সাথে বেশ কয়েকবার জড়িয়েছে এবং প্রায় যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করেছে। মূলত বাংলাদেশ এর সাথে ২০০০ সালের সংঘাতের পর থেকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে মায়ানমার অধিক গুরুত্ব দেয়া শুরু করে বর্তমান অবস্থায় এসে পৌছেছে। সামরিক জান্তা ক্ষমতায় থাকায় মিয়ানমার সামরিক খাতে জনগন এর অসুবিধার তোয়াক্কা না করেই খরচ করতে পেরেছে যার ফলে অস্ত্রশস্ত্রের সংখ্যায় কিছু দিক দিয়ে ব্যাপক উন্নতি লাভ করেছে,বিশেষ করে বিমানবাহিনীর দিকে। আজ এ আর্টিকেল এ মায়ানমার ও বাংলাদেশের সামরিক শক্তির একটি তুলনামূলক ধারনা দেওয়ার চেস্টা করবো।

সেনাবাহিনী :-

সৈন্যসংখ্যা :-

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

বাংলাদেশ এর মোট সামরিক সদস্য সরকারী হিসেবে ২ লক্ষ ৬ হাজার ও মিয়ানমারের প্রায় ৪ লক্ষ। বলে রাখা ভালো যে সরকারী হিসেবে সৈন্যসংখ্যা সবসময়েই কম করে হিসাব করা হয়। তাই ধরে নেওয়া যায় যে বাংলাদেশের সৈন্যসংখ্যা আড়াই লক্ষাধিক ও মিয়ানমারের চারলক্ষের ও বেশি। অর্থাৎ, মিয়ানমারের সৈন্যসংখ্যা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। এর কারন হিসেবে বলা যায় দুইদেশের আয়তন ও বিদ্রোহী গ্রুপের সংখ্যা। মিয়ানমার এর আয়তন অনেক বেশি হওয়ায় তা সামাল দিতে বৃহৎ সেনাবাহিনী প্রয়োজন ও মিয়ানমারে ছোট বড় ৩০ টির মতো বিদ্রোহী গ্রুপ রয়েছে যাদের সাথে প্রতিনিয়ত মায়ানমার আর্মির সংঘর্ষ ঘটছে। তাই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা বেশি। তবে,একটি ছোট্ট কিন্তু আছে।মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যার ২০% এর ও বেশি সংখ্যক সেনা হচ্ছে শিশু। হিউম্যান রাইটসের তথ্যমতে,বার্মিজ সেনাবাহিনীতে ৭০০০০ কিংবা তার ও বেশি শিশু সেনা রয়েছে,যা সারাবিশ্বে সর্বোচ্চ। এদের অধিকাংশ কেই জোর করে রিক্রুট করা হয়েছে।

শিশু সৈন্য

ট্যাংক :-

বাংলাদেশের ট্যাংকবহরের এমবিটি-২০০০

কোন দেশের কত ট্যাংক আছে তার এক্সাক্ট জানা না গেলেও বিভিন্ন সূত্রমতে যদ্দূর জানা যায় বাংলাদেশের বহরে ৬৮০ এর মতো ও মিয়ানমারের বহরে প্রায় ৫৮০ টির মতো ট্যাংক আছে। দুই দেশের ট্যাংক বহরের ই অধিকাংশ ট্যাংক পুরনো যুগের। দুইদেশের আধুনিক ট্যাংক বলতে রয়েছে চীনের তৈরি এমবিটি-২০০০,সেটি বাংলাদেশের রয়েছে এক রেজিমেন্ট ও মায়ানমারের রয়েছে প্রায় তিনগুন। তাই এক্ষেত্রে মিয়ানমার এগিয়ে থাকলেও যেহেতু বাংলাদেশের টি-৫৯ কে ব্যাপক মডিফাই করে টি-৫৯ দূর্জয় এ রূপান্তর করে আধুনিক করা হয়েছে তাই সেগুলোকেও আধুনিক ধরা যেতে পারে। তবে,বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত এ পাহাড়ি এলাকা থাকায় এই অঞ্চলে ট্যাংক কোন কাজেই আসবে না বলা যায়।

অন্যান্য সাজোয়া যান :-

BTR-80 APC

অন্যান্য সাজোয়া যানের অন্তর্ভূক্ত হলো আর্মড পারসোনেল ক্যারিয়ার,ইনিফ্যান্ট্রি ফাইটিং ভেহিকাল ইত্যাদি। মিয়ানমারের আইএফভি ও এপিসি মিলিয়ে মোট ১৩০০ সাজোয়া যান আছে। সাজোয়া যানের দিক দিয়ে বাংলাদেশ বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। রাশিয়ার পর বিটিআর-৩০ এপিসি এর সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী দেশ হলো বাংলাদেশ। শুধু বিটিআর-৮০ আমাদের বহরে ১২০০ এর মতো আছে আর সব এপিসি মিলিয়ে এ সংখ্যা ১৫০০ ছাড়িয়ে যাবে।

টাওয়েড আর্টিলারী :-

Type 96 Towed Artillery

টাওয়েড আর্টিলারী হলো এমন আর্টিলারী যা চাকা লাগিয়ে সহজে পরিবহন করা যাতে পারে। বাংলাদেশের আর মিয়ানমারের টাওয়েড আর্টিলারী প্রায় সমান সংখ্যক রয়েছে বর্তমানে। বাংলাদেশ সম্প্রতি সিঙ্গাপুর হতে আধুনিক পেগাসাস ও চীন হতে টাইপ-৯৬ আর্টিলারি অর্ডার করেছে। দুপক্ষের ই আর্টলারীর পরিমান আটশত এর কাছাকাছি বা সামান্য কমবেশি হতে পারে। সেল্ফ প্রপেলড গান এর দিক দিয়ে বাংলাদেশ শোচনীয় ভাবে পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের বহরে মাত্র ১৮ টি নোরা বি-৫২ এসপিজি গান আছে যেখানে মিয়ানমারের এসপিজি গান শতাধিক। মাল্টিপল রকেট লঞ্চারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সমানে সমানে আছে বলা যায়।

মিয়ানমারের MLRS

সারকথা :- যদি অস্ত্রশস্ত্রের হিসাব আনা হয় তবে দুইদেশ কে সমানে সমান বলা যেতে পারে। তবে মিয়ানমার অবরোধে থাকায় বাইরের বাহিনীর সাথে মহড়ার সুযোগ পায়নি দীর্ঘদিন আর এই বিশালসংখ্যক শিশু সৈন্য থাকায় কৌশলগত ও সৈন্যদের ফাইটিং ক্যাপাবিলিটির দিকে দিয়ে পিছিয়ে পড়তে পারে।

নৌবাহিনী :-

মোট নৌযান :-

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মোট নৌযান ১১৫+ ও মিয়ানমারের প্রায় ১৪০+ বাংলাদেশের চেয়ে মিয়ানমারের সমুদ্র বেশি হওয়াতেই এই হেরফের ঘটেছে। মোট নৌযান বলতে ছোটবড় সকল জাহাজ এর অন্তর্ভূক্ত।

ফ্রিগেট :-

মিয়ানমারের কিয়ান সিত্তাহ ফ্রিগেট

বাংলাদেশের বহরে ফ্রিগেট রয়েছে ৬ টি ও মিয়ানমারের ও ৬ টি। তবে মিয়ানমারের ফ্রিগেট গুলি উন্নত না হওয়ায় সমরবিদ রা একে কর্ভেট ক্যাটাগরিতে ফেলতেই পছন্দ করেন। বাংলাদেশের ফ্রিগেটের মিসাইলের রেঞ্জ যেখানে ২২০ কি.মি সেখানে মিয়ানমারের মিসাইলের রেঞ্জ ১০০ কি.মি। আরো পড়ুন :- বাংলাদেশের বিএনএস বঙ্গবন্ধু বনাম মিয়ানমারের কিয়ান সিত্তাহ ফ্রিগেট

কর্ভেট :-

স্বাধীনতা ক্লাস কর্ভেট

এক্ষেত্রেও বাংলাদেশ মিয়ানমার সমান সমান অর্থাৎ দুপক্ষের ই ৪ টি করে কর্ভেট আছে। তবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ক্লাস কর্ভেট এর ফায়ার পাওয়ার উন্নত হওয়ায় একে অনেকে লাইট ফ্রিগেট ও বলে থাকেন। বাংলাদেশের কর্ভেটের মিসাইল রেঞ্জ ১৮০ কি.মি তাই এক্ষেত্রেও মিয়ানমার পিছিয়ে।

সাবমেরিন :-

বাংলাদেশের বহরে রয়েছে দুটি টাইপ-০৩৫ মিং ক্লাস সাবমেরিন অন্যদিকে মায়ানমারের বহরে কোন সাবমেরিন নেই। এমনকী,বাংলাদেশের সাবমেরিন ধ্বংসের মতো কোন অস্ত্র মিয়ানমারের হাতে নেই। আরো পড়ুন :- কেন মিয়ানমার বাংলাদেশের সাবমেরিন ধ্বংস করতে পারবে না।

বাংলাদেশের সাবমেরিন

এছাড়াও এলপিসি,ওপিভি বা এরকম এরকম ছোট যুদ্ধজাহাজ দুদেশেরই আছে তবে তা যুদ্ধে তেমন বড় কোন ফ্যাক্টর নয়।

সারকথা :- নৌবাহিনীর দিক দিয়ে মিয়ানমার বাংলাদেশের থেকে শোচনীয়ভাবে পিছিয়ে আছে।

বিমানবাহিনী :-

ফাইটার জেট :-

মিগ-২৯

দুইদেশের বহরের ই ফাইটার জেট এর বহরে একই ধরনের বিমান রয়েছে,রাশিয়ার মিগ-২৯ ও চীনের তৈরি চেংদু এফ-৭ বিমান। দুদেশেরই প্রধান ফাইটার জেট মিগ-২৯। মিগ-২৯ এর সংখ্যার হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাপক পিছিয়ে আছে কারন বাংলাদেশের বহরে মাত্র আটটি মিগ-২৯ বিমান আছে অন্যদিকে মায়ানমারের মিগ-২৯ রয়েছে ৩২টি।

মিয়ানমারের এফ-৭ এম

বাংলাদেশ এফ-৭ এর তিনটি ভ্যারিয়েন্ট ব্যবহার করে থাকে। এফ-৭ এমবি,এফ-৭ বিজি ও এফ-৭ বিজিআই। এফ-৭ বিজিআই হচ্ছে এফ-৭ এর সবচেয়ে উন্নত ভার্সন ও এফ-৭ এমবি হচ্ছে সবচেয়ে পুরাতন যা রিপ্লেস করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বহরে এফ-৭ রয়েছে মোট ৪০ টি অন্যদিকে মিয়ানমারের এফ-৭ এম ( বাংলাদেশের এফ-৭ এমবি এর সমতুল্য ) রয়েছে ১৬ টি। এছাড়াও তাদের বহরে ২১ টি এ-৫ ফানটান বিমান রয়েছে। উল্লেখ্য যে বাংলাদেশের বহরেও এ-৫ বিমান ছিলো কিন্তু এই মডেল অনেক পুরনো হওয়ায় সেগুলোকে অবসরে পাঠানো হয়েছে।

এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম :-

মায়ানমারের Volga-2 Sam

আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় শোচনীয় ভাবে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গান বাদে মিসাইলের মধ্যে আছে কেবল চীনের তৈরি শর্ট রেঞ্জ এফএম-৯০ স্যাম,যার রেঞ্জ মাত্র ১৫ কি.মি। বাংলাদেশের কোন মিডিয়াম রেঞ্জ বা লং রেঞ্জ স্যাম নেই। অন্যদিকে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিক দিয়ে মিয়ানমার বেশ সমৃদ্ধ। তাদের বহরে আছে চীনের মিডিয়াম রেঞ্জ স্যাম HQ-12 যার রেঞ্জ ৫০ কি.মি। আরো আছে রাশিয়ান এস-১২৫ যার রেঞ্জ ৩৫ কি.মি। আরো আছে রাশিয়ান টাঙ্গুস্কা মোবাইল এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ও ভলগা-২ স্যাম।

হেলিকপ্টার ও ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফট:-

Mil Mi-171sh of Bangladesh Air Force

হেলিকপ্টার দুই ধরনের,ট্রান্সপোর্ট ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার। বাংলাদেশের কোন ডেডিকেটেড অ্যাটাক হেলিকপ্টার নেই,অন্যদিকে মিয়ানমারের বহরে ৯ টি এম আই -৩৫ অ্যাটাক হেলিকপ্টার রয়েছে। তবে ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফট এর দিক দিয়ে মিয়ানমার পিছিয়ে আছে কারন বাংলাদেশ এর বহরে এম আই ১৭ ছাড়াও এম আই ১৭১ আছে যা দিকে লাইট অ্যাটাক ও করা যাবে রকেট পড বসিয়ে ও একই সাথে সৈন্য পরিবহন করা যাবে। আর ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফট হিসেবে লিজেন্ডারি সি-১৩০ ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলো খুব বেশি প্রভাব ফেলে না।

মন্তব্য :- বিমানবাহিনীর সামর্থ্যের দিক দিয়ে শোচনীয়ভাবে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

অর্থনৈতিক সামর্থ্য :-

এই অর্থবছরে মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা খাতে তাদের বরাদ্দ হচ্ছে ২.৫ বিলিওন ডলার ও বাংলাদেশের বরাদ্দ হচ্ছে ৩.২ বিলিওন ডলার। বাংলাদেশের জিডিপি যেখানে ২৭৩ বিলিওন ডলার ( সর্বশেষ পরীসংখ্যান অনুযায়ী ) সেখানে মিয়ানমারের জিডিপি মাত্র ৭৪ বিলিওন ডলার। তাই বলা যায় যে যুদ্ধে তৃতীয় সাহায্যকারী পক্ষের আগমন না ঘটলে অর্থনৈতিকভাবে অধিক শক্তিশালী হওয়ায় বাংলাদেশ বেশিদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে ও যুদ্ধের বব্যয় বহনের সামর্থ্য রাখে যা যেকোন যুদ্ধেই বিজয়ের জন্য একটি প্লাস পয়েন্ট। বাকীটা যুদ্ধের ময়দানেই দেখা যাবে একে অপরের মুখোমুখি হলে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: