অনেকেই আছেন যারা বলে থাকেন ভারত ছাড়া বাংলাদেশ অচল। তাদের জন্য পূর্বের পোস্টে ব্যাখ্যা করেছি আমরা ভারতের উপর নির্ভরশীল নাকি তারা।বাংলাদেশের উন্নতিতে ভারত সহযোগী না প্রতিদ্ধন্দী এই প্রশ্নও এসে যায় ভারত কিছু কর্মকাণ্ডে। আসুন জেনে নেয়া যাক ভারত এর বাংলাদেশ এঁর উন্নয়ন সম্পর্ক।

বাংলাদেশ নেপাল না। আমাদের সাথে সমুদ্রের সংযোগ আছে। যারা বলে তিনদিক ভারত দিয়ে ঘেরা আমাদের, তাই ভারত ছাড়া গতি নেই বাংলাদেশের। তাদের জানা উচিত ভারতের সাথে আমাদের যে বাণিজ্য স্থল পথে সেটা সামান্যই। ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ভারতে ৬৭২.৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি হয়েছে। অন্যদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি করা হয়েছে ৬.১৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য। এর ভেতর প্রায় $৩ বিলিয়ন শুধু কটন, সুতা, সুতা বা কাপড় রঙ করার কাচামাল। এগুলার বিকল্প অনেক উৎস আছে। ইন্ডিয়া বন্ধ করে দিলেই বাংলাদেশের সুবিধা। যাহোক এই সংক্রান্ত ব্যাখ্যা আগেও করেছি।

কথা হল, বাংলাদেশের উন্নতির জন্য আদেও কি ইন্ডিয়ার প্রয়োজন। মানে ইন্ডিয়ার সাথে সুসম্পর্ক প্রয়োজন?

বিগত এক দশক ধরে ইন্ডিয়ার সাথে সুসম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু কি পাইছি? কতটুকু লাভ হল আমাদের?

কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। বাংলাদেশ ইন্ডিয়াকে ট্রানজিট দিয়েছিল প্রধান তিনটি শর্তে।

এক- বাংলাদেশকে নেপালে ট্রানজিট দিতে হবে যার ভেতর নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনার বিষয়, নেপাল কে মংলা বন্দর ব্যাবহার করার সুযোগের মত বিষয় রয়েছে।

দুই- তিস্তার জলের ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি।

তিন- বাংলাদেশের উপর দিয়ে যে ভারি যন্ত্রপাতি নিয়ে যেয়ে ত্রিপুরা আসামে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ করা হবে সেখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এর একটি অংশ বাংলাদেশকে দিতে হবে৷

প্রধান এই তিনটা শর্তের ভেতর বাংলাদেশকে নেপালে ট্রানজিট আজো দেয়নি। যদি ট্রানজিট দিত তবে নেপালের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অনেক বৃদ্ধি পেত। যার ফলে বলা যেত যে বাংলাদেশ উন্নতি করেছে।

তিস্তার জল ঘোলা করে ফেলেছে। আজো শুধু প্রতিটা সভায় তারা বলে যে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেছে তিস্তা সমস্যার সমাধানের। কিন্তু ট্রানজিট তো অনেক বছর হল ভারত কে দিয়েছে বাংলাদেশ। বন্ধুত্বের স্বাক্ষর রেখেছে বাংলাদেশ। কিন্তু তারা আজো এই সমস্যার সমাধান করেনি কেন?

ট্রানজিটের শর্ত গুলির ভেতর একটি শর্ত ভারত পূরণ করেছে। সেটা হল বিদ্যুৎ রপ্তানি। মানে বাংলাদেশ সেদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ আমদানি করবে। যেটা এখন ৬০০ মেগাওয়াট। বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বিশ্বাস করুন আর নাই করুন ওপারের কিছু মানুষকে দেখেছি বলতে বাংলাদেশ নাকি ভারতের দেয়া বিদ্যুৎ এর উপর চলে। ভারত ফ্রি ফ্রি দেয়।

তাদের মানসিকতা দেখলে মনে হয় ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বড় ভুল ছিল। ছোটলোকদের মানসিকতা যত বড়ই হোক চেঞ্জ হয়না।

আমি আজকের আলোচনায় সীমান্ত হত্যা এবং পোল ভল্টিং নামে যেসব বলা হয় সেসব ইস্যুতে যাব না।

কথা হল, আমরাতো বন্ধুর মতই আচরণ করেছি। কিন্তু আমাদের উন্নতিতে সহযোগী হতে পেরেছে কি ভারত? না। যদি নেপালে এক্সেস দিত, তিস্তার জল দিত তাহলে বুঝতাম যে তারা আমাদের উন্নতিতে কাজে আসছে।

ভাল সম্পর্কের আরো কিছু নমুনা বলি।

বাংলাদেশের সাথে চীনের যখন $২৪ বিলিয়নের চুক্তি হয় তখন ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করে। সতর্ক নজর রাখে। কিন্তু চুক্তি আটকাতে পারেনি। বাংলাদেশ যখন সাবমেরিন কিনল তখন তারা উদ্বেগ জানায়। কূটনৈতিক ভাবে অনেক চেষ্টা করেছে সাবমেরিন যেন আমরা না পায়। বাংলাদেশ প্রথম সাবমেরিন কেনার প্রস্তাব পায় ২০০৪ সালে। বিণা সিক্রি ইন্ডিয়ার সাবেক রাষ্ট্রদূত একটি টক শোতে বলেছিল সেই সময় ভারতের কূটনৈতিক চাপে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেনার জন্য আর এগোয়নি। ইউটিউবে পাবেন ভিডিও।

আমরা যখন স্যাটেলাইট পাঠাতে গেলাম, ভারত এসে শুরু করল ঝামেলা। প্রথমে বলল তোমরা স্যাটেলাইট দিয়া কি করবা? আমাদেরটা ব্যাবহার কর। আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। উপায় না পেয়ে বাংলাদেশকে অফার করল যে স্যাটেলাইট যখন তোমাদের লাগবেই তখন আমরাই ফ্রিতে সার্ক স্যাটেলাইট পাঠাচ্ছি। তোমরা ফ্রিতে ব্যাবহার কইর। আমরা স্বাগত জানিয়ে বললাম আমরা সার্ক স্যাটেলাইটের সাথে আছি তবে আমাদের স্যাটেলাইট প্রোগ্রাম বন্ধ হবে না। এরপর তারা বলল আচ্ছা পাঠাবা ভাল কথা তাহলে আমাদেরকে কাজ দাও। আমরাই পাঠিয়ে দেই। আমরা তাতেও সাড়া দেইনি। কথা হল আমাদের উন্নতির সহযোগী হওয়া তো দুরের কথা উলটা আমদের উন্নতির বাধা হিসাবেই তারা বার বার দাড়িয়েছে।

এই বছরের শুরুতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব দিল্লি সফরে ছিলেন। তখন সংবাদ সম্মেলনে ইন্ডিয়ান সাংবাদিক রা সফরের বিভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন না করে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেয় বাংলাদেশ কেন বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এ যুক্ত হচ্ছে। সচিব তখন উত্তর করেছিলেন আমাদের দেশের উন্নতির জন্যই আমরা চীনের বি আর আই এ যুক্ত হব। এতে তাদের চিন্তিত হবার কিছু নেই। চীনের সাথে আমাদের বাণিজ্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের অবকাঠামো প্রকল্পের অধিকাংশ চীন কে দেয়া। এখানেই ভারতেএ সমস্যা। কূটনীতিক ভাবে চাপ সৃষ্টি করে। চীন বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্য সহযোগী। এদেশে তাদের অবকাঠামো বিনিয়োগ হলে ভারতের সমস্যা কোথায়? তারা স্ট্রিং পার্ল আরো কি কি যেন থিওরি নিয়ে চলে আসে।

সব শেষে শেয়ারবাজারের কাহিনী আপনারা জানেন। এদেশে এসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এর শেয়ার কেনার জন্য কত কি কান্ড করল। কিন্তু বাংলাদেশ চীন কেই দিয়েছে কাজ। যেটাতে নাখোশ হয়েছে তারা।

ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক ভাল ভাবে ঘেটে দেখুন। তাদের সাথে সুসম্পর্ক আর কু সম্পর্ক বলে কোন কথা নেই। তারা নানা কাজে আমাদের উন্নতির পরোক্ষ প্রতিদন্ধির মত আচরণ করেছে। চীনের সাথে চুক্তিতে তাদের সমস্যা থাকলে তারা আসুক চুক্তি করুক। অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করুক চীনের মত৷ কিন্তু সেটাও তারা পারে না। $১ বিলিয়নের দুইটা চুক্তি করেছে অথচ টাকা ছাড় করেনি। এরপর চীন কে দেখানোর জন্য $১০ বিলিয়নের চুক্তি করেও একটি টাকাও ছাড় করেনি। আর ভারতের চুক্তি গুলার অধিকাংশ ছিল ভারতের সাথে যোগাযোগ ব্যাবস্থা উন্নতির জন্য এবং ট্রানজিট রুট উন্নত করার জন্য। অন্যদিকে চীন আমাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করেছে। জাপান ও করেছে।

ভাল বন্ধুত্ব অনেক বড় জিনিস। এর জন্য দরকার ভাল মানসিকতা। এই ভাল মানসিকতা যাদের ভেতর নেই তাদের সাথে ভাল বা খারাপ সম্পর্ক কোন টাতেই কিছু যায় আসেনা।

Facebook Comments

1 Comment

আয়ন · April 25, 2019 at 9:51 pm

ভালো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: