ব্রিটিশ সম্রাজ্য এক সময় সারা পৃথিবী শাসন করেছে সমুদ্রে একচ্ছত্র আধিপত্যের কারনে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে হাজার হাজার উদাহরণ আছে সমুদ্রকে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধশালী নগর বন্দর গড়ে উঠার। ইতালির ফ্লোরেন্স, ইয়েমেনের এডেন বন্দর থেকে শুরু করে ক্যারিবিও দ্বীপ নাসাও পর্যন্ত এরকম শত সহস্র উদাহরন রয়েছে। যুগের সাথে সমুদ্র পথে বাণিজ্যের গতি প্রকৃতি ধরণে এসেছে আমূল পরিবর্তন। ক্ষুদ্র দেশ সিঙ্গাপুর এখন এশিয়ার সমুদ্র বাণিজ্যের অন্যতম বড় শাসক।এখন প্রশ্ন হল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙখায় পায়রা বন্দর কতটুকু অবদান রাখতে সক্ষম?

দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশ বাংলাদেশ। আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল সমুদ্র উপকূল। তবে কেন আমরা এখনো পিছিয়ে? প্রশ্ন আসতেই পারে, আমরা কী আমাদের সমুদ্রের যথার্থ ব্যাবহার করে বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান মজবুদ করতে পেরেছি? এর উত্তর খুজবার চেষ্টা থাকবে আজকের আলোচনায়।

Image result for Port of Payra

বাংলাদেশের সমুদ্র পথে বাণিজ্য মোট $৭০ বিলিয়ন বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯০% এর বেশি। এর সবটুকু চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরেই। নামমাত্র অবদান মংলাবন্দরের। বন্দর চ্যানেলে কম গভীরতা মংলা বন্দরের পুরাতন ঐতিহ্য ধীরে ধীরে শেষ করে দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও একি অবস্থায়। বর্তমানে এই বন্দরে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডেল করা হয়। বন্দরের সব সক্ষমতা ব্যাবহার করেও ৩ মিলিয়নের বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডেল করা সম্ভব হবে না। আর চাহিদা অনুযায়ী ২০২০ সালেই আমাদের ৩ মিলিয়ন টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডেল করা লাগবে।

বাংলাদেশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি যেটা আশা করছে সেটা কখনো সম্ভব হবে না যদি কিনা আমরা এই সমস্যার কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নিতে না পারি।

আর এর সমাধানের কথা মাথায় রেখেই তিনটি প্রধান বিকল্প দেখা হয়। সোনাদিয়া, মাতারবাড়ি এবং পায়রা। সোনাদিয়া বন্দর এবং মাতারবাড়ি বন্দর এর কোনটা বেশি সুবিধাজনক সেটা আগের পোস্টেই আলোচনা করেছি। আজ পায়রা বন্দর নিয়ে আলোচনা করব।

 

পায়রা বন্দরের অবস্থান:

পটুয়াখালীর পায়রা নদীর মোহনায় রাবনাবাদ চ্যানেলে পায়রা বন্দরের অবস্থান। আর এইই চ্যানেল দিয়ে প্রবাহিত পলির কিছু অংশ যেয়ে পড়েছে সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে যেটা অত্র অঞ্চলের সব থেকে গভীর খাদ। এখন একটু বিশ্লেষণে যাব কেন বন্দরটির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

আগের পোস্টে আমি সোনাদিয়া এবং মাতারবাড়ি পোর্টের সুবিধা অসুবিধা আলোচনা করেছি। সেখানে একটি বিষয় হয়ত বুঝতে পারবেন একটা দ্বীপে বন্দর করবার থেকে মূল ভূখণ্ডের সাথে বন্দর করলে বন্দর কেন্দ্রিক অন্যান্য স্থাপনা করবার সুযোগ অনেক বেশি। সেই হিসাবে পায়রা বন্দর একটি অনন্য পদক্ষেপ।

 

Related image

 

ব্রিটিশ ফার্ম এইচ আর ওয়ালিংটন এন্ড কন্সোর্টিয়াম এর মূল্যায়ন অনুসারে বাংলাদেশে ১৪.৫ মিটার ড্রাফটের একটি সমুদ্র বন্দর করা খুব জরুরি। অবস্থান বিবেচনায় সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সমুদ্র উপকূল থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমুদ্র উপকূলের এই জেলা গুলির অবদান সামান্য বলা চলে। অর্থাৎ সমুদ্রের সম্ভাবণা হিসাবে বাংলাদেশের মোট জিডিপির অর্ধেক অন্তত এই জেলাগুলি থেকে আসার কথা থাকলেও অবকাঠামোগত অপ্রতুলতার জন্য সমুদ্রের সুবিধাকে আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। যেহেতু দক্ষিণাঞ্চলের ঠিক মাঝ বরাবর পায়রা বন্দরের অবস্থান সেক্ষেত্রে বন্দরকে ঘিরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন শক্তি সঞ্চার হবে সেটা সহজেই বোঝা যায়।

 

পায়রা বন্দরের অবকাঠামো:

পায়রা বন্দরের প্রাথমিক, মধ্যম এবং চুড়ান্ত পর্বে এটা বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ বন্দর হয়ে উঠবে। প্রকল্পটি প্রায় ৭০০০ একর জমির উপর। পায়রা বন্দরের প্রবেশ চ্যানেলে নদীর প্রশস্ততা প্রায় ৪ কিমি। আর বন্দর থেকে সমুদ্রের দিকে টানা ১৪ কিমি দীর্ঘ টার্মিনাল করা হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর টার্মিনালে মাত্র ১৫০০ কন্টেইনার রাখবার মত ব্যাবস্থা আছে। পায়রার ক্ষেত্রে টার্মিনালে প্রায় ৭৫০০০ কন্টেইনার রাখা যাবে। ১ লক্ষ বর্গ ফিটের ওয়ারহাউজের কাজ প্রাথমিক ভাবেই শেষ করা হবে। গভীরতার বিচারে পায়রা বন্দরে প্রায় ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর ব্যাবস্থা থাকবে। যেখানে চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ৯.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। আর ১২ মিটারের বেশি ড্রাফট থাকলে সেটাকে গভীর সমুদ্র বন্দর বলা যায়। উল্লেখ্য পাকিস্তানের গোয়াধর বন্দরের গভীরতাও ১৪ মিটার। ড্রেজিং করে সেটাকে ১৮ মিটার করা হবে। পায়রাকেও সেরকম গভীরতায় চাইলেই নেয়া সম্ভব হবে।

 

Related image

মূল ভূখন্ডের সাথে সংযুক্ত হবার জন্য এটাকে ঘিরে বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন করা সম্ভব হবে। বন্দরের মোট প্রকল্পলে ১৯ টি ভাগে ভাগ করে কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে প্রায় $১২-১৮ বিলিয়ন ডলারের মত বিনিয়োগ হবে। সেই সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদন হাব করা হচ্ছে। থাকছে এলএনজি টার্মিনাল।

 

পায়রা বন্দরের অর্থনৈতিক সুবিধা:

 

আমাদের রপ্তানি যেমন শুধু মাত্র গার্মেন্টস নির্ভর হওয়া য বিপদজনক। ঠিক তেমনি একটা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য শুধুমাত্র একটি বন্দর নির্ভর হওয়াও বিপদজনক। বিষয়টা এভাবে ভেবে দেখলে বুঝতে সুবিধা হবে। ধরুন বাংলাদেশ মাতারবাড়ি বন্দর করল। সেক্ষেত্রেও আমদানি রপ্তানি সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে একমুখি হতে হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে হবে বাংলাদেশের একমাত্র বৈদেশিক বাণিজ্যের পথ। আর এই ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ের উপর চাপ বাড়তেই থাকবে। যদি আমরা ৮% এর বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চাই তবে তার কতটুকু চাপ এই হাইওয়ে কত বছর পর্যন্ত নিতে পারবে সেটা প্রশ্ন। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করার পরো কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি আনা সম্ভব হবে কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। যদি কোন কারণে এই পথে কোন ঝামেলা হয় যেমন কোন বড় ধরণের সড়ক দূর্ঘটনা ঘটল। সেক্ষেত্রে ট্রাফিক জ্যাম বেড়ে যাবে। বন্দর পর্যন্ত পণ্য পৌছানোর সময় বেড়ে যাবে। হতে পারে এর জন্য আমাদের রপ্তানির ফরমায়েশ বাতিল হয়ে যেতে পারে। আমদানিকৃত পচনশীল পণ্য নষ্ট হতে পারে। অর্থাৎ আমাদের নির্ভর করতে হবে শুধু এই একটি হাইওয়ের উপর। তাই মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের সুবিধা পুরোপুরি বাংলাদেশ পাবে না।

Related image

ঠিক এই পরিস্থিতির সব থেকে বড় সমাধান এবং বিকল্প পায়রা বন্দর। পায়রা বন্দর পর্যন্ত পদ্মা সেতু হয়ে চার লেন হাইওয়ে হচ্ছে। পদ্মা রেইল লিংক সরাসরি পায়রাকে ঢাকার সাথে রেল পথে সংযুক্ত করবে। খুব অল্প সময়েই পণ্য বিকল্প পথে পায়রা বন্দর ব্যাবহার করে রপ্তানি আমদানির চাকা চলমান রাখতে সক্ষম হবে। সেই সাথে ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ের উপর চাপ কমার ফলে বন্দরের পণ্য খালাস গতিশীল হবে। পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে আমার আগের লেখায় হয়ত জেনেছেন কেন এই সময় বাচানো অর্থনীতিতে সামগ্রিক প্রভাব ফেলে।

Image result for Port of Payra

নেপাল বা ভুটান থেকে পায়রা বন্দরের দূরত্ব কম হবার কারনে এই বন্দর ব্যাবহার করে তারাও উপকৃত হবে।

সব থেকে বড় পরিবর্তন আসবে ইকোনমাইজ অব স্কেলে। পণ্যের পরিবহন সময় কমে আসলে পণ্যের পরিবহন খরচ কমে যাবে।

আর এই বন্দরকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের সাথে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যাবস্থা উন্নত হবে। আর এজন্যই সমুদ্র ব্যাবহার করে এই অঞ্চলের যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে তাতে দেশের সামগ্রিক জিডিপিতে দক্ষিণাঞ্চলের অবদান বৃদ্ধি পাবে।

Image result for Port of Payra

মূল কথা যদি আমরা ৮% এর বেশি বা দুই অঙ্কে প্রবৃদ্ধির লক্ষে এগিয়ে যেতে চাই তবে সমুদ্র উপকূলীয় দক্ষিনের জেলাগুলিকে বাদ রেখে চট্টগ্রাম বা মাতারবাড়ি দিয়ে অর্জন কঠিন হবে। বাংলাদেশের জিডিপিতে যেমন চট্টগ্রামের সিংহভাগ অবদান রয়েছে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে, ঠিক তেমন অবদান দক্ষিণের জেলাগুলি থেকেও পাওয়া যাবে। আর অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যাবস্থার অভাবে এই অঞ্চলের পর্যটনশিল্প এতদিন বিকশিত হতে পারেনি। পায়রা বন্দর এই অঞ্চলের পর্যটন বিপ্লব আনতে সক্ষম হবে। সব মিলিয়ে পায়রা বন্দর বাংলাদেশের অন্যতম একটা মাইলফলক প্রকল্প হতে পারে। এটা এমন একটা সিদ্ধান্ত যা অর্থনীতির এশিয় বাঘ হতে বাংলাদেশকে সব থেকে বেশি সাহায্য করবে।

 

লেখকঃ ওয়াসি উদ্দিন মাহিন

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: