বেশ কিছুদিন ধরে ভার্চুয়াল জগৎ ছেয়ে গেছে একটি লেখায়। সেখানে বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে ভেনিজুয়েলা এখন দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে। তাদের জিডিপির ৮০% আসে তেল থেকে। জিডিপির অত্যাধিক তেলের উপর নির্ভরশীলতা তাদের কাল হয়েছে। একি অবস্থা হতে চলেছে বাংলাদেশের ও। আসলেই কি তাই? সত্যি কি বাংলাদেশ শেষ হয়ে যাবে? বাংলাদেশের অর্থনীতি পেক্ষাপটে ডাচ ডিজস কতটা যুক্তিযুক্ত??

এই টপিকে লেখার ইচ্ছে ছিলনা। কিন্তু বার বার এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনেকেই ইনবক্সে জানতে চেয়েছেন আসলে বিষয়টা কি? এজন্য অল্প পরিসরে কিছু বিশ্লেষণ তুলে ধরলাম। বিচার বিবেচনা আপনাদের।

প্রথমে ভেনিজুয়েলার ক্রাইসিস কিভাবে শুরু হল সেটা নিয়ে অল্প আলোচনা করা যাক। ভেনিজুয়েলা ওপেকের সদস্য একটি দেশ। বিশ্বের সব থেকে বেশি তেলের রিজার্ভ আছে এমন দেশের ভেতর ভেনিজুয়েলা অন্যতম। ভেনিজুয়েলার মোট রপ্তানি আয়ের ৯৫% আসে তেল রপ্তানি করে। তেলের টাকা কাচা টাকা। তেলের মত প্রাকৃতিক সম্পদ রপ্তানিতে কোন শ্রম দেয়া লাগে না। সহজ টাকার উৎস থাকার কারনে ভেনিজুয়েলা তাদের অন্য ইন্ডাস্ট্রি দাড় করানোর চেষ্টাও করেনি। অনেকটা আরবদের মত অলস প্রকৃতির হয়ে গেছে তারা।

ভেনিজুয়েলা তাদের তেল রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত অর্থ থেকে খাদ্য সহ বিভিন্ন দ্রব্য আমদানি করে নিশ্চিন্তে চলত। সমস্যা বাধে ২০১৪ সালে। তেলের দাম $১০০ ডলারের উপর ছিল কিন্তু হঠাৎ দর পড়তে পড়তে তলানিতে ভলে যায়। $১০০ এর বেশি ব্যারেল প্রতি তেল $৩০ এর কাছাকাছি নেমে আসে। এতেই বাধে বিপত্তি। তাদের রপ্তানি কমে যায়। রপ্তানি আয় দিয়ে আমদানির চাহিদা মেটাতে ব্যার্থ হয়। দেখা দেয় তিব্র ডলার সঙ্কট। ফলে তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করার মত অর্থ তাদের কাছে ছিল না। এর প্রভাব পড়ে ভেনিজুয়েলার মুদ্রা বলিভারের উপর। মানুষের হাতে অর্থ আছে কিন্তু পণ্য নেই। এর ফলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। দাম বৃদ্ধি পাবার পর সরকার একটা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। অনেকটা জিম্বাবুয়ের মত টাকা ছাপাতে থাকে। আর শ্রমিকের মজুরি ৩৪ গুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। কিন্তু যেহেতু পণ্য নেই তাই বাজারে অতিরিক্ত টাকার প্রবাহ মূল্যস্ফীতির বিস্ফোরণ ঘটায়। শেষ পর্যন্ত তাদের মুদ্রাস্ফীতি ১০,০০,০০০% এ গিয়ে দাঁড়ায়।

অনেকেই এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের সাথে মেলাচ্ছেন যেটা একে বারেই ঠিক নয়। বাংলাদেশের মানুষ পায়ের উপর পা তুলে খাই না। যথেষ্ট পরিশ্রম করে খেটে খাওয়া মানুষ এই বাংলাদেশিরা ১৯৭১ সালে সব কিছু শূন্য থেকেই শুরু করেছিল। আমাদের তেলের মত কোন প্রাকৃতিক সম্পদ নেই যে আমরা বসে বসে আলসেমি করব আর তেল বেচা টাকা দিয়ে বিদেশ থেকে পণ্য কিনে ক্ষুধা নিবারণ করব। আমাদের কৃষক মাঠেই খাটেন। বিশ্বের ধান উৎপাদনে ৪র্থ এমনি এমনি নয়। এদেশের মানুষ প্রাকৃতিক এবং মানব সৃষ্ট নানান দূর্যোগ মোকাবেলায় অভস্থ। দেশের মানুষ বাড়ির উঠানে অল্প জায়গা পেলে সেখানেও লাউ বা সিম অথবা অন্য কোন গাছ লাগিয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলেছে। এদেশের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য আমদানির উপর নির্ভর করা লাগে না।

অপরিশোধ তেল কোন ইন্ডাস্ট্রির ভেতর পড়েনা যেটার উপর নির্ভর করা যায়। এটা হল জুয়া খেলা। সম্পদ বেচা। তেলের দাম কখন কেমন থাকবে এর কোন গ্যারান্টি নেই। $১১০ ডলার ব্যারেলের তেল $৩০ ডলারে নামা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তাই তেলের উপর যদি অর্থনীতির ৮০% এর অধিক নির্ভর করে তাহলে বুঝতে হবে সেই দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আসলেই দূর্বল।

গার্মেন্টস সেক্টর তেলের মত না। যদি কখনো তেলের বিকল্প জ্বালানি আবিষ্কার হয় তাহলে মধ্য প্রাচ্য সহ বহু দেশ নিঃস্ব হয়ে পড়লে সেটা অসম্ভব হবে না। কিন্ত গার্মেন্টস এর কি বিকল্প আবিস্কার হবে বা আছে? না। মানুষকে কাপড় পরতেই হবে। আর বাংলাদেশ এর বেশিরভাগ গার্মেন্টস নিত্যপ্রয়োজনীয় শার্ট গেঞ্জি। দামি বা বিলাসবহুল প্রোডাক্ট নয়। এই কাপড় সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দা চললেও চাহিদা থাকে। কারন গোল গলা গেঞ্জি যার দাম মাত্র ১০০ টাকা সেটা মানুষ কিনবেই।

গার্মেন্টস শিল্পের ধরনের সাথে তেলের কোন মিল নেই। এটা খেটে খাওয়া শিল্প। আলসেমির শিল্প নয়। আর গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে যদি এমন হয় যে বৈশ্বিক মন্দা চলছে তখন বিলাসবহুল গার্মেন্টস আইটেমের বাজার মন্দা যেতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের কম মূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পোষাকের বাজারে খুব সীমিত প্রভাব পড়বে। এর বড় উদাহরণ ২০০৮-০৯ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে যখন মন্দা চলেছিল তখন এর প্রভাবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের সব থেকে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও আমাদের উপর তেমন কোন প্রভাব পড়েনি। বরং আমাদের রপ্তানিতে ওই সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

আর বাংলাদেশ শুধু গার্মেন্টস এর উপর নির্ভর করছে না। আইটি সেক্টর দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। চামড়া শিল্প আছে, জাহাজ নির্মাণ আছে, ঔষধ আছে, আর হার্ডওয়্যার এর প্রোডাকশন ধীরে ধীরে বাংলাদেশে শিফট করতেছে। আমরা গার্মেন্টস থেকে টাকা আসে বলে বসে নেই। আমাদের অনেক খাত বর্তমানে ভাল করছে।

এসব খাত থেকে রপ্তানি করা লাগবে এমন নয়। যদি আমদানির বিকল্প হিসাবে এই খাত গুলা কাজে লাগে তবেও সেটা অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুদ করবে। তাই তেল আর গার্মেন্টস এক জিনিস না।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: