আধুনিক বিশ্বে প্রতিটি দেশে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস থাকে যা ঐ দেশের জন্য মর্যাদাপূর্ণ আর তা দেশের সম্মান, মর্যাদা আর সক্ষমতা এর মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে। যেমনঃ সাবওয়ে, সাবমেরিন, বুলেট ট্রেন, নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতৃ মৃত্যুহার, স্বাস্থ্যসেবা, মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, সমুদ্র বন্দর ইত্যাদি। উল্লেখিত প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই, আমাদের দেশ অগ্রসর হচ্ছে এবং অদুর ভবিষ্যতে আমাদের দেশ আরও অনেক অগ্রসর হয়ে উন্নত দেশের কাতারে যাবে সেই আশা এইদেশের প্রতিটি মানুষের।

বর্তমান সময়ের সব থেকে আনন্দ ও গৌরবের বিষয় যে, বাংলাদেশ খুব শিগ্রই প্রথম স্যাটেলাইট “বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১” খুব উৎক্ষেপণ করতে যাচ্ছে, এর জন্য নিরলস ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো একটি দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট সার্ভিসে রাখার মাধ্যমে “স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী এলিট ক্লাব” সদস্য হতে পারা যে কোন দেশের জন্যই অত্যন্ত গর্ব ও সম্মানের বিষয়ও বটে।

 

 

২০১৫ সালে শুরু হওয়া বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর কাজ, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসেই সমাপ্ত হয়েছে। ফ্রান্সের থ্যালেস এলেনিয়া স্পেস কোম্পানি  ইতিমধ্যে এ স্যাটেলাইটটির টেস্টিং স্টেজ সম্পূর্ণ করেছে। টেস্টিং স্টেজে এর ফল ছিল আশানুরূপ। এখন এটি যেকোন মুহুর্তে মহাকাশে উৎক্ষেপনের জন্য তৈরী। আমরা সবাই জানি যে, ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি, রাশিয়ার উপগ্রহ কোম্পানি ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে কক্ষপথ (অরবিটাল স্লট) কেনার আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে, ২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের বা প্রায় ২১৯ কোটি টাকা ব্যয় মহাকাশের ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমায় কেনা হয়েছে এ স্লট। এখানেই উড়বে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। চুক্তি অনুসারে, প্রাথমিকভাবে ১৫ বছরের জন্য অরবিটাল স্লট কেনা হচ্ছে। তবে ১৫ বছর করে আরও দুইবার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি।

এছাড়া, ফ্রান্সের থ্যালেস এলেনিয়া স্পেসের সঙ্গে এ নিয়ে একটি চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। চুক্তি অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কাঠামো, উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনা ও ঋণের ব্যবস্থা করবে ফরাসি প্রতিষ্ঠানটি। উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মূল কাজ স্যাটেলাইট সিস্টেম কেনার জন্য খরচ হবে এক হাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’ এর ফ্যালকন-৯ রকেট এর মাধ্যমে ফ্লোরিডার ‘কেইপ কেনাভেরালের লঞ্চ প্যাড’ থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে হবে আশা করা হচ্ছে।

 

 

উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর এটি মহাকাশে প্রেরনের কথা থাকলেও, স্পেসএক্স এর সাথে কিছু জটিলতা এবং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার হারিকেন আরমায় ফ্লোরিডার লঞ্চ প্যাড ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপন সময় কিছু পিছিয়ে ২০১৮ এর মার্চ মাসে নির্ধারন করা হয়েছে। আশা করা যায়, ২০১৮ এর ২৬ শে মার্চ বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট মহাকাশে তার স্থান করে নিবে।

ইতিমধ্যে বেসরকারিভাবে বাংলাদেশের প্রথম ক্ষুদ্রাকৃতি কৃত্রিম উপগ্রহ (ন্যানো স্যাটেলাইট) ব্র্যাক অন্বেষাকে ২০১৭ সালের ৪ জুন মধ্যরাত ৩টা ৭ মিনিটে একটি কার্গো রকেটের মাধ্যমে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার সিআরএস-১১ অভিযানের মাধ্যমে স্যাটেলাইটটিকে মহাকাশের ইন্টারন্যাশনাল স্পেস সেন্টারের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। এরপর ৭ জুলাই ইন্টারন্যাশনাল স্পেস সেন্টার থেকে এর নিজস্ব কক্ষপথে ছাড়া হয়।মহাকাশ থেকে বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি, নদ-নদী, সাগর-পাহাড়, গ্রাম-নগর উত্যাদির আলোকচিত্র ধারণ করা যাবে এই ক্ষুদ্র কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৪০০ কিলোমিটার উপরে অবস্থান করে প্রতিদিন ১৬ বার সমস্ত পৃথিবীকে এবং প্রতিদিন ৪ থেকে ৬ বার বাংলাদেশকে প্রদক্ষিণ করবে।

 

 

ইতিমধ্যে আমাদের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের জন্য গাজীপুর ও বেতবুনিয়ায় ৫ একর করে জমি অধিগ্রহণ করে দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মান এবং তার মেইডেন টেস্টিং সম্পন্ন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট এর যাবতীয় কাজের জন্য আলাদা একটি কোম্পানি গঠন ও করা হয়েছে।

অনেকে মনে করেন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট শুধুমাত্র একটি কমিউনিকেশন স্যাটালাইট। যার ৪০ টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২০ টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশ ব্যবহার করবে আর বাকি ২০টি ভাড়া দেওয়া হবে।এবং শুধুমাত্র কমিউনিকেশন কাজেই ব্যবহার করা যাবে।আসলে ব্যপারটা তেমন নয়। আমাদের বংগবন্ধু স্যাটেলাইট আবহাওয়া এর পূর্বাভাস,জিওগ্রাফিক পরিবর্তন,বে অব বেংগলেও মেরিটাইম সার্ভে থেকে মহাকাশে ডিপ স্পেস রিসার্চ,কিছু ক্ষেত্রে মিলিটারি পারপাসেও ব্যবহার করা যাবে।

ফ্রান্সের থ্যালেস কোম্পানি দ্বারা নির্মিত আধুনিক এবং ডেডিকেটেড মিলিটারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট গুলোতে C ব্যান্ডের পাশাপাশি UHF, SHF, Ka, X এসব ব্যান্ড ব্যবহার করা হয়।যেখানে আমাদের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ এ ২৬ টি Ku এবং ১৪ টি  ডেডিকেটেড C ব্যান্ড ব্যবহার করা হয়েছে। যা ঝড়কালীন সময়েও পরিপুর্ন সিগনাল নিশ্চিত করবে। এর আয়ুস্কাল ধরা হয়েছে ১৫ বছর।

উল্লেখ্য, আমাদের পারমাণবিক বোমার মতো কনভেনশনাল কোন স্ট্রাটেজিক জীবন নাশকারী উইপেন বানানোর দরকার নেই, সেই সাথে ডেডিকেটেড মিলিটারি স্যাটেলাইট আপাতত দরকার নেই বলেও মনে হলেও আশার কথা হলো মহাকাশে ইতোমধ্যে ১২০ ডিগ্রি পূর্বে এবং ৬৯ ডিগ্রি পূর্বে দুটি অরবিটাল স্লট ও আমরা কিনে নিয়েছি, যার অর্থ ২০২৫-২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত মহাকাশে আমাদের আরো দুটি স্যাটেলাইট থাকবে।যার মধ্যে একটি মিলিটারি স্যাটেলাইট হলেও হতে পারে।

 

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট শান্তিকালীন সময়ে নেভিগেশন, জিপিএস, কমিউনিকেশন, যোগাযোগ, ইন্টারনেট সেবা, স্পেস রিসার্চ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস সহ নানাবিধ কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি,আমাদের বিপূল পরিমান অর্থ সাশ্রয় করবে।এছাড়া আধুনিক D2H (direct to home) সুবিধা (Real-Vu,tata sky এর মতো) অনেকাংশে সহজলভ্য করবে। যেখানে বিদেশে ফোন করা এবং আমাদের দেশের স্যাটেলাইট টিভিগুলো বিদেশি (সিংগাপুর) স্যাটেলাইট এর ট্রান্সপন্ডার মাসিক ভাড়ায় ব্যবহার করে থাকে,তখন আমরা নিজের স্যাটেলাইট এর ট্রান্সপোন্ডার এর মাধ্যমেই এসব স্যাটেলাইট চ্যানেল সম্প্রচার করতে পারব। আপদকালিন সময়ে শত্রুর যুদ্ধ বিমানের আগাম ওয়ার্নিং,দেশের অপটিকাল ফাইবার কমিউনিকেশন বিচ্ছিন্ন হলে তিন বাহিনীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, সামরিক বাহিনীর গোপনীয় স্যাটেলাইট ফোন কল (হলিউড ছবিতে নিশ্চয় স্যাটেলাইট ফোন দেখেছেন), যুদ্ধ জাহাজের গতিবিধি নজরদারি, শত্রু স্থান ম্যাপিং, ড্রোন পরিচালনা সহ নানা কাজেই ব্যবহৃত হবে বলে আশা করা যায়।

সর্বোপরি আমাদের স্যাটেলাইট দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার কিছু অংশ থেকে মায়ানমার, ভারত,পাকিস্তান এবং আফ্রিকার কিছু সংখ্যক দেশ পর্যন্ত যাতে কভারেজ করতে পারে তেমন অরবিটাল স্লট ই ব্যবহার করা হয়েছে।পুরো বিশ্ব কভার করতে অন্তত তিনটি স্যাটেলাইট দরকার। আপাতত একটি দিয়ে পথচলা হলেও এটি আমাদের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান-SPARSO, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর,  আইসিটি ডিভিশন, টেলিকমিউনিকেশন, টেলিমেডিসিন, 4G কানেকশন, E-Commerce এসব ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের যে কোন অংশে সহজ যোগাযোগব্যবস্থা রক্ষা এবং দরকারে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিজেদের স্যাটেলাইট দ্বারা শত্রু বাহিনীর গতিবিধি, অবস্থান সম্পর্কে জানতে সক্ষম হবে এমন আশা করাটাও এখন অসম্ভব নয়। আশা করি সরকার স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দেবে।

 

 

আশা করি আমাদের স্যাটেলাইট নিয়ে আমাদের নিকটতম দুই প্রতিবেশী ভারত এবং মায়ানমার এর উদ্বেগ এর কারন আপনারা বুঝতে পেরেছেন। সার্ক স্যাটেলাইটের দুটি ট্রান্সপোন্ডার আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়, যেখানে ভারত জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমাদের (বাংলাদেশের)স্যাটেলাইট কেন লাগবে? কারন ভারত ইতিমধ্যে সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য সার্ক স্যাটেলাইট ইতিমধ্যে মহাকাশে পাঠিয়েছে আর বাংলাদেশ সেই স্যাটেলাইটের দুটি ট্রান্সপন্ডার আবহাওয়া আর জলবায়ু এবং ছোটখাটো কমিউনিকেশন এর কাজে বিনামূল্যে ব্যবহার করছে। অবশ্য স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনার পর ভারত স্যাটেলাইট প্রজেক্টেও যুক্ত হতে চেয়েছিল এবং পার্টনারশিপ এর মাধ্যমে তারা স্যাটালাইট পাঠাতেও রাজি ছিল জানামতে।ভারতের অন্যের বিষয়ে নাক গলানোর অভ্যাসটা আর গেল না।এমনিই তো আর বলে না,”ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাংগে”।

আর মায়ানমার বলছে,” আমাদের(মায়ানমারের) স্যাটালাইট দরকার”। অবশ্য সেটা মায়ানমার এর ধাপ্পাবাজি ও হতে পারে। কারন স্যাটেলাইট নেবার আগে অরবিটাল স্লট কিনতে হয়। সেটার জন্য বিনিয়োগ করতে হয়। এরপর চুক্তি করার ১-২ বছর পর অরবিটাল স্লট পাওয়া যায়। আবার স্যাটেলাইট তো দোকানের জামা না যে রেডিমেড নিয়ে আসবে। বানাতেও দু-তিন বছর সময় লাগে। এমনি এমনি তো বলেনা “ফাঁকা কলসি বাজে বেশী।” মায়ানমারের ফাঁকা আওয়াজ শুনতে শুনতে কানটা ঝালাপালা হয়ে গেল।

Facebook Comments

1 Comment

Al Jaim Pappu · February 9, 2018 at 4:54 am

স্যাটেলাইট দিয়া কী করিবো আমরা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: