সময়টা ১৯৮৩ সালের ২৩ জুলাই। শ্রীলংকার জাফনাসহ সারা দেশেই থমথমে একটা পরিবেশ বিরাজ করছে৷ টিইউএলএফ তাদের নিজস্ব সংসদীয় আসন ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ২১ জুলাই , ১৯৮৩ তে। যদিও সেদিনের আবহাওয়া ছিল শান্ত, মান্নারে রাজনৈতিক কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া।

গুরুনগর আর্মি ক্যাম্পে তামিল টাইগারদের বা এলটিটিই (লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলাম) এর এক নেতাকে অ্যামবুশ করার ছক কষছিল বি. জেনারেল ব্যালথেজার এর নেতৃত্ব পরিচালিত একটি দল। তামিল টাইগার্সের নেতা সেল্লাকিলি তখন তামিল ইলামের স্বাধীনতাকামী নেতাদের মধ্যে অন্যতম।

এলটিটিই বা লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলামের পতাকা

তৎকালীন সময়ে তামিল টাইগার্সরা দেশজুড়ে জঙ্গি কার্যক্রমে লিপ্ত । এই সেল্লাকিলিকেই অ্যামবুশের পরিকল্পনা করছিল শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনী এর একটি কমান্ডো টিম ফোর ফোর চার্লি, যারা অবস্থান করছিল কোন্দাভিলে। ঠিক একই সময়েই সেল্লাকিলি প্রস্তুতি নিচ্ছিল শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনীর উপরে উল্টো আক্রমণের; তাদের এক নেতার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য । বেশ কদিন ধরে তারা শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর নজর রাখছিল।

শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনীর লাইট ইনফ্যান্ট্রির ফার্স্ট ব্যাটালিয়নের সি কোম্পানির টহল দলকে সাথে নিয়ে ফোর ফোর ব্রাভো গুরুনগর থেকে বের হয় ২২০০ ঘন্টায় । শ্রীলঙ্কা লাইট ইনফ্যান্ট্রির অবস্থান ছিল মাডাগালে, গুরুনগর থেকে ২০ মাইল দুরে । ২১৪৭ ঘন্টায় ফোর ফোর ব্রাভো এসে পৌঁছায় গুরুনগর। ব্রিগেডিয়ার ব্যালথেজারের অর্ডার অনুযায়ী ফোর ফোর ব্রাভোকে মাডাগালে ২৩৫৯ ঘন্টার আগে পৌঁছাতে হবে।

শ্রীলঙ্কান লাইট ইনফ্যান্ট্রির ইনসিগ্নিয়া

ফোর ফোর ব্রাভো এর কমান্ডে ছিলেন সে:লে: এ.পি.এন.সি দে ভাস গুনাউয়ারদিন৷ এই ডিটাচমেন্টে তার কমান্ডে ছিল আরো ১৪ জন সৈনিক। টহল দলের আরো আদেশ ছিল দরকারে তাদের নির্ধারিত টহল রুট কমিয়ে, মাডাগাল ক্যাম্পে ফেরত আসবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে । সে:লে: গুনাউয়ারদিন তার নির্দেশ পেয়েছিলেন মেজর: দে সিলভার কাছ থেকে৷ মেজর সিলভা নির্দেশ দেওয়ার সময় ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে টহল যে করেই হউক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফেরত আসতে হবে ৷ ফোর ফোর ব্রাভো, গুরুনগর থেকে বের হয় ২২০৬ ঘন্টায়।

বেস এর সাথে ফোর ফোর ব্রাভোর প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর অন্তর রেডিও যোগাযোগ চলছিল। এলটিটিই এর পঁচিশ জন সদস্য সেদিন রাতে এমব্যুশ পরিচালনা করেছিল, যাদের মধ্যে ছিল এলটিটিই এর অন্যতম নেতা; ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ, কিট্টু, আইয়ার, ভিক্টর, পুলেন্দ্রন, সেল্লাকিলি, সান্থসাম ও আপিয়াহ। তারা পালালি-জাফনা রোড এর তিন্নেভেলি এলাকায় অবস্থান নেয়। এই এলাকায় টেলিকমিউনিকেশন সরঞ্জাম স্থাপনের কাজ চলছিল যার কারণে রাস্তা ভাঙ্গা ছিল। সেখানে তারা চারটি মাইন স্থাপন করে এবং সিমেন্ট ফ্যাক্টরি থেকে চুরি করা একটি প্লান্জারও স্থাপন করা হয়। দুইটি মেশিন গান নেস্ট বসানো হয়, একটি এক্সপ্লোডারের পাশে এবং আরেকটি রাস্তার অপর পাশে । পুরো দল কে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয় এবং রাস্তার দুই পাশে তারা অবস্থান নেয়। 

ভারতের তামিল নাড়ুর সিরুমালাই ক্যাম্পে, “র” থেকে ট্রেনিংরত অবস্থায় এলটিটিই এর নেতা
বাম থেকে ডানে: লিঙ্গাম, প্রভাকরণের দেহরক্ষী, বাট্টাকোলোয়া এরিয়ার কমান্ডার অরুণা, এলটিটিই এর প্রতিষ্ঠাতা নেতা প্রভাকরণ, ত্রিনকোমালি এরিয়ার কমান্ডার পুলেন্দ্রন, মান্নার এরিয়ার কমান্ডার ভিক্টর এবং তাদের চিফ ওব ইনটেলিজেন্স পট্টু আম্মান।

২৩২৮ এ ফোর ফোর ব্রাভো রিপোর্ট করে টহল উরুমপিরাই অতিক্রম করেছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। টহলবাহিনীর প্রথম জীপে ছিল সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট ভাস গুনাউয়ারদিন, প্রাইভেট এন.এ.এস মানুতাঙ্গে ড্রাইভারের আসনে, কর্পরাল জি ডি পেরেরা, প্রাইভেট এস এস আমারাসিংহে, প্রাইভেট এস পি জি রাজাটিল্লাকে, প্রাইভেট কে পি কারুনারাতনে জীপ এর পেছনে ছিল।

পেট্রোলের বাকি সদস্যরা ছিল সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট গুনাউয়ারদিনের জীপের পেছনে থাকা টাটা বেন্জ হাফ ট্রাকে, যার সামনে বসা ছিল সার্জেন্ট এস.আই থেলাকারাতনে এবং চালকের আসনে কোর্পরাল জি.আর পেরেরা; এবং তাদের দুজনের মঝে বসা ছিল প্রাইভেট এ.জে.আর ফারনেন্ডো। উরুমপিরাই পার করার পাঁচ মিনিট পরে টহল তিন্নেভেলির পাশাপাশি আসার পর গতি কমাতে থাকে রাস্তা খারাপ হওয়ার কারণে। পেট্রোল যখন তিন্নেভেলির ভাঙ্গা রাস্তাতে নামে ঠিক তখনই এক্সপ্লোডার মাইন গুলো বিস্ফোরিত হয়, সাথে শুরু হয় মেশিন গানের গুলিবর্ষণ, টহল জীপ ও ট্রাকের ওপরে । মেশিন গানের গুলিতে জীপে অবস্থানরত অনেকেই আহত হয়, লেফটেন্যান্ট গুনাউয়ারদিন ও গুলি বিদ্ধ হয়, তারপরেও জীপ থেকে লাফিয়ে বের হয়ে গ্রেনেড ছোরতে যায়, কিন্তু গ্রেনেড ছোরার আগেই মেশিন গানের গুলি এসে লাগে তার পুরো শরীরে।

 

জীপে অবস্থানরত বাকিরা পাল্টা আক্রমণ করার জন্য অবস্থান নেয়। প্রথমত হ্যান্ড গ্রেনেড দিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা তাদের অনুকূলে আনার চেষ্টা চালায়, কোর্পরাল পেরেরা তার এসএলআর দিয়ে গুলি করতে করতে এগিয়ে যায়। তার লাশ পরে পাওয়া যায় জীপ থেকে কিছুটা দূরে। বিস্ফোরণের সাথে সাথেই ট্রাকটি বন্ধ হয়ে যায় এবং এলটিটিই দুই দিক থেকে আক্রমন শুরু করে। কর্পোরাল পেরেরা চালকের আসন থাকাতে প্রথম গুলিতেই মারা যায়,প্রাইভেট রবার্ট, সুনিল গাড়ির পিছনে থাকায় তারা কেউ গুলিবিদ্ধ হয়নি,শুধু প্রাইভেট মানপিতিয়া আহত হয়। সার্জেন্ট থেলাকারাতনে এবং প্রাইভেট ফার্নান্দো, যারা উভয় আহত হয়েছিল, তারা গাড়ি থেকে নেমে গুলি চালানো শুরু করে, তবে ফার্নান্দোকে শীঘ্রই হত্যা করা হয়।

এলটিটিই এর হাতে তৈরি গ্রেনেড বিস্ফোরণে সার্জেন্ট থেলাকারাতনের এক হাত কব্জি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কয়েক গজ দুরে ছিটকে পরে। এরই মাঝে কর্পোরাল পেরেরা এবং সুমীথপাল গুলি চালিয়ে যেতে থাকে এবং পরবর্তীতে তার গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে সক্ষম হয়। তার মৃত্যুর আগেই প্রাইভেট মানপিতিয়া, কর্পোরাল সুমাথিপালাকে তার গ্রেনেড দিতে পেরেছিল, সুমাথিপালা শত্রুদের চাপে রাখার জন্য তার এসএলআর দিয়ে সমানে গুলি চালিয়ে যেতে থাকে এবং এই সময়ের মধ্যেই ম্যাগাজিনও পাল্টে নেয়। এক পর্যায়ে তারা গাড়ির কাছ থেকে বেরিয়ে আসে এবং দুই দিক থেকে শত্রুর উপরে গুলি চালিয়ে যেতে থাকে, দুই দিকেই শত্রুকে চাপে রাখতে সফল হয়।

২৩৪০ ঘন্টার দিকে ব্রিগেডিয়ার ব্যালথেজার কে বার্তা পাঠানো হয় যে, টহল দলের সাথে রেডিও যোগাযোগ করা যাচ্ছেনা এবং এক কর্তব্যরত সেন্ট্রি দুরে গোলাগুলি এবং বিস্ফোরণ শব্দ শুনেছে। পলাালী, মাদাগাল, থন্ডামমান ও ভেলভেটিটুরাইয়ের আর্মি ক্যাম্প গুলোকে সতর্ক করা হয় এবং ফোর ফোর চার্লি, যাদের প্রাথমিক মিশন ছিল এমব্যুশ পরিচালনার ,এই পরিস্থিতিতে এমব্যুশের পরিকল্পনা স্থগিত করে ব্রিগেডিয়ার ব্যালথেজার আদেশ পাঠান। তার বদলে ফোর ফোর চার্লিকে আদেশ দেয়া হয় ফোর ফোর ব্রাভোর জন্য সার্চ এন্ড রেসকিউ মিশন পরিচালনার।

ফোর ফোর চার্লি ০০০৯ এমব্যুশে ধ্বংস হওয়া গাড়ীগুলি খুঁজে পায় এবং তা হেডকোয়ার্টারে বার্তা পাঠায়। একই সময়ে কর্পোরাল আর.এ.ইউ পেরেরা কোন্দাভিল সিটিবি ডিপো থেকে ফোন করে এবং জানায় যে সে গুলি শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে, পরে শেখান থেকে পিছু হটে পায়ে গুলি লাগার পরে।

ব্রিগেডিয়ার ব্যালথেজার নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে সার্জেন্ট থেলাকারাতনেকে উদ্ধার করেন, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই সার্জেন্ট থেলাকারাতনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে।

এই ঘটনা থেকেই সূত্রপাত হয় শ্রীলঙ্কার গৃহ যুদ্ধের। সে যুদ্ধ শেষ হয় প্রায় পঁচিশ বছর, ছয় মাস, তিন সপ্তাহ পরে।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: