২৫ জুলাইয়ের নির্বাচনে বিজয়ী পাকিস্তানের পরবর্তী সরকারের আইএমএফের মাধ্যমে বেইলআউট প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দেশটির লেনদেন ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) সংকটের কারণে পাঁচ বছরের মাথায় দ্বিতীয়বারের মতো আইএমএফের বেইলআউটের মুখোমুখি হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটি।পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা চলসে পুর দশক ধরে। খবর এএফপি।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফুরিয়ে আসছে, ফলে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবেলায় দেশীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন করতে হচ্ছে। ২৫ জুলাইয়ের নির্বাচনে বিজয়ীদের সামনে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ‘সময় খুব সীমিত’ থাকবে বলে ২ জুলাই জানিয়েছিল ফিচ রেটিং সংস্থা।

সব মিলিয়ে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো ‘ভয়ঙ্কর’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও পাকিস্তান সরকারের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা আশফাক হাসান।বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পাকিস্তান কীভাবে তার লেনদেন ভারসাম্য সুরক্ষা করবে, কীভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঠিকঠাক করবে এবং চলমান রাজস্ব পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাবে।’

ইসলামী উগ্রবাদের আঘাতে বছরের পর বছরে নাজুক অবস্থার মধ্যে থাকা ২০ কোটি মানুষের এ দেশটি নড়বড়ে অর্থনীতিকে পথে ফেরাতে হিমশিম খাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে চলা জ্বালানি সংকট দেশটির শিল্প খাতকে পঙ্গু করে রেখেছে।নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পাকিস্তানের প্রতি বাজারের আস্থা ফিরে এসেছিল। গত বছরের অক্টোবরে আইএমএফ জানিয়েছিল, ২০১৩ সালের বেইলআউট কর্মসূচির ফলে দেশটি সংকট থেকে বেরিয়ে এসেছিল।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সরকার জ্বালানি সংকট দূর করতে চেয়েছিল, কৌশলগত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল এবং ভঙ্গুর অবকাঠামো উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছিল।পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশ ও আরব সাগরের সংযোগ স্থাপনকারী চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) নামে একটি মাল্টি বিলিয়ন ডলার অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে চীনও অনেক সহায়তা করেছিল।

কিন্তু যে মাত্রায় প্রবৃদ্ধি আশা করা হচ্ছিল, তেমনটা অর্জিত হয়নি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ; যা ২০০৫ সালের পর সবচেয়ে দ্রুততম কিন্তু তা সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ কম। সরকারি ঋণের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে জিডিপির প্রায় ৭০ শতাংশে।এর সঙ্গে ঘাটতি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ পাকিস্তান সিপিইসি প্রকল্পে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয়ে প্রচুর ব্যয় করেছে। এর সঙ্গে তেলের দাম বৃদ্ধি ভোগান্তি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

বস্ত্র শিল্পের মতো অল্প কিছু রফতানি পণ্যবাজার কম দামি চীনা পণ্যের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স এ বিশাল ফারাক ঘোচানোর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত মনে হচ্ছে না।বাজার অস্থিতিশীলতার এই শঙ্কার মধ্যে চলতি হিসাবে ঘাটতি মোকাবেলায় দ্রুত হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে হাত বসানোর ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুসারে, গত ১৭ এপ্রিল দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেখানে ছিল ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার, সেখানে ২২ জুন তা দাঁড়িয়েছে ৯৬০ কোটি ডলারে।

গত মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থমন্ত্রী শামসাদ আখতার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবেলায় রিজার্ভেই হাত দিতে হচ্ছে।’‘এ বিষয়কে সরকারের জন্য চরম উদ্বেগের’ জানিয়েছেন শামসাদ আখতার।

এর আগে পাকিস্তানি রুপির মান ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ অবমূল্যায়ন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ডিসেম্বরের পর এ নিয়ে টানা তিনবার অবমূল্যায়নের শিকার হলো স্থানীয় মুদ্রাটি।বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সালমান শাহ এএফপিকে বলেন, এ পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদকে হয় বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করতে হবে কিংবা আইএমএফের সঙ্গে পুনরায় বেইলআউট নিয়ে সমঝোতা করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা পরবর্তী সরকারের জন্য অনেক কঠিন হবে। অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত সব খাতে সরকারকে বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: