প্রথম পর্বে বলেছিলাম মন জিতে নেওয়ার মাধ্যমে মুম্বাই এ রাজত্ব করা হাজি মাস্তানের ব্যাপারে। এ পর্বে থাকছে হাজী মাস্তানের পর মুম্বাই এর নিয়ন্ত্রনকারী হয়ে উঠা দাউদ ইব্রাহীম যাকে এই উপমহাদেশের, কিংবা সমগ্র এশিয়ার সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ও ক্ষমতাধর গ্যাংস্টার বললেও হয়ত ভুল হবে না।

হাজি মাস্তানের পর এই উপমহাদেশে সেলিব্রেটি ও পাওয়ারফুল গ্যাংস্টার দের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো কাসকার ভাইদের নাম। অবশ্য এই দুই কাসকার ভাই ( শাবির ইব্রাহীম কাসকার ও দাউদ ইব্রাহীম কাসকার ) এর বাবা ছিলেন একজন পুলিশ কনস্টেবল। তবুও অজানা কারনে ছোটবেলা থেকেই অপরাধজনক কাজে লিপ্ত হতে থাকে সে। দাউদ ইব্রাহীম বড় হতে থাকে,তার অপরাধের পরিধিও বাড়তে থাকে। বোম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ড এ দাউদ ইব্রাহীম এর প্রবেশ ঘটে তার ভাই শাবির ইব্রাহীমের মাধ্যমে। মুম্বাইতে তখন হাজি মাস্তানের রাজত্ব। হাজি মাস্তানের ডান হাত খ্যাত করিম লালার অধীনে স্মাগলিং এর কাজ শুরু করে। হাজি মাস্তানের খুবই ক্লোজ হয়ে উঠে দাউদ ইব্রাহীম। ওই সময়ে ডোংরি এলাকায় পাওয়ারফুল ছিলো বসু দাদার গ্যাং। কিন্তু বসু দাদা দাউদ এর বাবাকে অপমান করলে দাউদ আর শাবির মিলে বসু দাদা আর দলবল কে লোহার রড আর সোডার বোতল দিয়ে পিটিয়ে এলাকা ছাড়া করে নিজেদের নিয়ন্ত্রন কায়েম করেন। এবার নিজেদের জন্য আলাদা গ্যাং বানায় তারা,নাম দেয় “ডি-কোম্পানী”। হাজি মাস্তান তখন নিস্ক্রিয়, সরে গিয়েছেন আন্ডারওয়ার্ল্ড হতে। ক্ষমতা তখন পুরোপুরি করিম লালার হাতে।

সেই হতে শুরু। দাউদ ইব্রাহীমের যাত্রা হাজি মাস্তানের মত সমঝোতার ছিলো না,বরং শুরুতেই বেশ কয়েকটি গ্যাং ওয়ারে জড়িয়ে গিয়ে ব্যাপক খুনোখুনি করে তারা। তরুন শাবির আর দাউদ বৃদ্ধ করিম লালার হাতে ক্ষমতা মানতে পারে না। সেই থেকে শুরু হয় করিম লালার পাঠানদের গ্যাং আর কাসকার ভাইদের ডি কোম্পানী গ্রুপের যুদ্ধ। ব্যাপক খুনাখুনী হয়,পরিস্থিতি খারাপ বুঝে এগিয়ে আসেন হাজি মাস্তান। দুই পক্ষই তাদের গুরুর সিদ্ধান্ত মেনে নেয়,যদিও মন থেকে সায় ছিল না আবার হাজি মাস্তানের বিরোধীতা করার মুখ ও ছিল না। হাজি মাস্তান কুরআন শরীফ ছুইয়ে দাউদ-শাবির ও পাঠান গ্যাং এর মধ্যে সমঝোতা করিয়ে দেন তারা খুনোখুনি করবে না। এরপর থেমে গিয়েছিলো যুদ্ধ। কিন্তু ঝামেলা বাঝায় পাঠান গ্যাংয়ের আমিরজাদা নামের এক গ্যাং স্টার।

মুম্বাইতে তখন উঠতি এক গুন্ডার নাম মান্য সুরভে ( মানিয়া সুরভে) আর তার সহযোগী মুনির। তাদের তখন চিন্তাভাবনা কিভাবে দ্রুত আন্ডারওয়ার্ল্ড এ বড় হওয়া যায়। তাদের ই কাজে লাগায় আমিরজাদা। মান্য সুরভে বিপুল টাকার অফারে রাজী হয় ও এমন কাজের সিদ্ধান্ত যা নিয়ে চিন্তা করতেও সাহস হতোনা মুম্বাই বাসীর। নির্দিস্ট এক রাতে কাসকার ভাইদের হত্যার কন্ট্রাক্ট নেয় তারা। এক রাতে শাবির যখন তার বান্ধবীর সাথে রাতে ঘরে ফিরছিল মান্য সুরভে আর মুনির তার গাড়ি আটকিয়ে গুলিতে ঝাঝরা করে দেয় শাবিরের দেহ। মারা যায় মুম্বাই এর মুম্বাই এর টপ গ্যাংস্টার শাবির কাসকার। গ্যাং ওয়ার শেষ হয়ে গিয়েছিল,তেমন প্রটেকশন ও ছিল না তার সাথে। শাবির কে হত্যার পরই মান্য সুরভে রওনা হয় দাউদ ইব্রাহীমের বাসায়,উদ্দেশ্য দাউদ ইব্রাহীম কে হত্যা। কিন্তু বাসার এক কর্মচারী মান্য সুরভে দের অস্ত্র হাতে আসতে দেখে ফেলে ও বাসার দরজা লাগিয়ে দেয়,ফলে ঢুকতে পারে না তারা। একটুর জন্য প্রানে বেচে যায় দাউদ ইব্রাহীম।

ভাইয়ের এ মৃত্যুর বদলা নেওয়ার জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠে দাউদ ইব্রাহীম। শুরু হয় তার কিলিং মিশন। ডি কোম্পানীর মাধ্যমে হত্যা করা হয় ৫০+ পাঠান গ্যাং মেম্বার দের। শাবির হত্যা মামলার শুনানী চলাকালে আমিরজাদাকে কোর্টের মধ্যেই হত্যা করা হয়। মান্য সুরভে তখন পলাতক। কিন্তু পুলিশ কে ঘুষ খাইয়ে দাউদ ইব্রাহীম আদায় করে নেয় মুম্বাই এর প্রথম এনকাউন্টারের পারমিশন। মুম্বাই পুলিশ ক্রসফায়ারে হত্যা করে মান্য সুরভে কে। সেটিই ছিল মুম্বাই এর প্রথম ক্রসফায়ার।

এরপর কেবলই দাউদের জয়যাত্রা। যদিও তার সহযোগী রাজন তাকে ছেড়ে গিয়ে নতুন গ্যাং বানিয়ে ঝামেলা করে তবুও দাউদের প্রভাব ই ছিল সবচেয়ে বেশি মুম্বাই য়ে। দাউদ ইব্রাহীম চলে যায় দুবাইয়ে,আর মুম্বাইয়ের দায়িত্ব দিয়ে যায় ছোটা শাকিল এর হাতে। পরবর্তীতে মুম্বাই সামলায় দাউদের বোন হাসিনা পারকার ও তারপরে ইকবাল ইব্রাহীম কাসকার। অর্থাৎ ডাইরেক্টলি কন্ট্রোল না করে ইনডাইরেক্টলি কন্ট্রোল করেন দাউদ ইব্রাহীম। ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী দাউদ ইব্রাহীমের মোট সম্পদের পরিমান ৬.১ বিলিওন ডলার। বিভিন্ন দেশে অসংখ্য হাতে বিনিয়োগ আছে দাউদ ইব্রাহীমের।

বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পর পুরো ভারতে দাঙ্গা ছড়িয়ে পরে ও অনেক মানুষ মারা যায়। সেটার প্রতিশোধ হিসেবে দাউদ ইব্রাহীম তার গ্যাং দিয়ে ১৯৯৩ সালে মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জ এ সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে পুরো ভারতের ভিত নাড়িয়ে দেন একপ্রকার। দাউদ ইব্রাহীম কে তার আগে আরব আমিরাতের শারজাহ স্টেডিয়ামে নিয়মিত দেখা যেত। কিন্তু,বিশ্বের তিন নাম্বার ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল হওয়ার পরেও আজ অব্ধি তাকে ধরা তো দূর সে কোথায় আছে তারই কোন খবর পাওয়া যায় না। ভারত সরকার দাউদ ইব্রাহীম কে ধরিয়ে দিতে পারলে ২৫ মিলিওন ডলার পুরস্কার ঘোষনা করেছে। এত ইন্টেজিলেন্স এজেন্সী নিয়েও আজও তার কুল কিনারা করা যায় না।

দাউদ ইব্রাহীম কিরকম ধুরন্ধর ও দুর্ধর্ষ,তার একটা উদাহরন দেওয়া যেতে পারে। দাউদ ইব্রাহীম তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানী ক্রিকেটার জাভেদ মিয়াদাদের ছেলের সাথে। সেই বিয়েতে বিশ্বের বাঘা বাঘা গোয়েন্দা এজেন্সীগুলোর তীব্র নজরদারী ছিলো,সবাই জানত দাউদ আসবে। দাউদ ইব্রাহীম ঠিকই এসে মেয়ে আর মেয়ের জামাইকে আংটি পরিয়ে দিয়ে যায়,এতগুলো এজেন্সীর নাকের ডগা দিয়ে।

২০১৫ সালের একটি ভারতীয় পত্রিকার বরাত অনুযায়ী,দাউদ ইব্রাহীমের বর্তমান আস্তানা খুব সম্ভব পাকিস্তানের করাচি। ভারত সরকার ঘোষনা দিয়েছে “কমান্ডো অপারেশন” চালিয়ে ( বিন লাদেনের মতো ) দাউদ ইব্রাহীম কে হত্যা করা হবে। যদিও আজ অব্ধি দ্যা বস দাউদ ইব্রাহীম এর কিচ্ছু করা যায়নি। কারন হিসেবে বলা যায় দাউদ ইব্রাহীমের টাকার কাছে বিক্রি হওয়া নেতা,কর্মকর্তা একেবারে কম না।

আগের পর্ব এখানে পড়ুন।

Facebook Comments
Categories: Mafia Don

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: