ভারত ও চীনের মাঝে ১৯৬২ সালে সংঘটিত ভয়াবহ সীমান্ত যুদ্ধের পর উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি কোন যুদ্ধ কিম্বা সীমান্ত সংঘর্ষ না হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে একে অপরের বিরুদ্ধে কৌশলগতভাবে ছায়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পাশ্ববর্তী ছোট দেশগুলোতে নিজস্ব শক্ত অবস্থান এবং কৌশলগত প্রভাব বজায় রাখার স্বার্থে প্রায় তিন দশক ব্যাপী ভারত ও চীন ভয়ঙ্কর প্রতিযোগীতায় লিপ্ত থাকার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যে কোন স্পর্শকাতর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় এক রকম নিরবেই এবং নিজস্ব ছক মোতাবেক সামরিক প্রস্তুতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে এটা নিশ্চিত, ভারত ও চীনের একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান এবং পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে যে যাই বলুক বা মনে করুক না কেন, আপাতত দৃষ্টিতে উভয়ের মধ্যে স্বল্প পরিসরে বা ব্যাপক আকারের সরাসরি সীমান্ত সংঘর্ষ এমনকি পূণাঙ্গ যুদ্ধের আদৌ কোন সম্ভবনা আছে বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে অবশ্য চীন দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত পরিকল্পনা মাফিক পাকিস্তানকে একাধিক স্পর্শকাতর ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে সীমান্ত সংঘর্ষে লিপ্ত রেখে কৌশলগতভাবে ফায়দা হাসিল করতে ব্যস্ত। তাছাড়া উদীয়মান এশিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি চীন ও ভারত এ মুহুর্তে বাস্তবিক অর্থে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি স্বীকার করে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর মতো কোন শক্ত অবস্থানে আছে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া ভবিষ্যতে যে কোন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের কাছেই অপ্রচলিত পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো প্রাণঘাতী এবং অতি ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নেয়া যে খুবই কঠিন হয়ে উঠতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্টকহোম ভিত্তিক পীস রিসার্চ ইনিস্টিউট, জেনস রিপোর্ট বিজনেস ইন্সাইডারসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সামরিক গবেষণা সংস্থা এবং থিংক ট্যাংকের গবেষণামূলক প্রতিবেদনের তথ্য মতে, এ মুহুর্তে রেড জায়ান্ট চীনের অস্ত্র ভান্ডারে ২৮০টি এবং ভারতের অস্ত্র ভান্ডারে ১৩০টি এর কাছাকাছি নিউক্লিয়ার এন্ড থার্মোনিউক্লিয়ার ওয়ারহেড মজুত থাকতে পারে। তবে খুব সম্ভবত বাস্তবে এ ধারণার চেয়ে কমপক্ষে দ্বিগুণেরও পারমাণবিক অস্ত্র দেশ দুটি অত্যন্ত গোপনে উন্নয়ন ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে আশাঙ্খা করা হয়। তবে প্রকাশ থাকে যে, সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়নে ভারত এখনো পর্যন্ত কিন্তু অতি মাত্রায় বৈদেশিক আমদানি এবং প্রশ্চাত্যের সামরিক সাজ সরঞ্জাম সরবরাহের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকলেও চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। চীন বিগত তিন দশকে তাঁদের যুদ্ধাস্ত্র আমদানি পর্যায়ক্রমে ২০১৮ এসে ১০% এর নিচে নামিয়ে এনেছে এবং বলা চলে এখন চীনে এক রকম নীরব প্রযুক্তিগত বিপ্লব এবং সামরিক উন্নয়নের জোয়ারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় দোসররা শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। যেখানে ভারত তার বিপরীতে বিশ্বের সর্বোচ্চ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে বৈশ্বিক অস্ত্র আমদানির ১২% একাই নিজের ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। আপাতত দৃষ্টিতে চীনের সার্বিক সামরিক সক্ষমতা ও আকার ভারত অপেক্ষা চার গুন বা তার বেশি হলেও ভূ-রাজনৈতিক, ভৌগলিক অবস্থান এবং কৌশলগত কারণে চীন কোন অবস্থাতেই ভবিষ্যতে যে কোন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ভারতের বিরুদ্ধে তার সামরিক সক্ষমতার শতভাগ তো দূরের কথা এমনকি বাস্তবে চীন তার সামরিক সক্ষমতার এক তৃতীয়াংশ শক্তি পর্যন্ত ভারতের বিরুদ্ধে প্রয়োগের আদৌ কোন সুযোগ পাবে বলে মনে হয় না। প্রথমত আমাদের জানা উচিত বিগত দুই দশক ধরে চীন দক্ষিণ ও চীন সাগরের পূর্ণাঙ্গ মালিকানা দাবীকে কেন্দ্র করে এবং পূর্ব চীন সাগরের একাধিক বিতর্কিত দ্বীপমালা নিয়ে সাগর সংলগ্ন জাপানসহ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে আটটি দেশের সাথে দীর্ঘ মেয়াদে চরম বিবাদ ও মতো বিরেধে জড়িয়ে রয়েছে। তাছাড়া বরাবরের মতো বিশ্বের এক নম্বর সামরিক সুপার পাওয়ার এবং যুদ্ধপ্রিয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু এই অস্থিতিশীল সামরিক উত্তেজনার সুযোগে বিশেষ করে চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সামরিক ও কৌশলগতভাবে মোকাবেলা করার জন্য গোটা এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে ইতোমধ্যেই ব্যাপক সামরিক সমাবেশ সুসম্পন্ন করেছে। যা কিনা চীনের জন্য এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকেই যাচ্ছে। তাছাড়া এশিয়া প্যাসিফিক সংলগ্ন দেশগলোকে সাথে নিয়ে এক রকম নিয়মিতভাবে চীনের নাকের ডগার উপর দিয়ে এবং চীনের আপত্তি বা প্রতিবাদ উপেক্ষা করেই অত্র অঞ্চলে যৌথ সামরিক মহড়া ও নিবিড় গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। আবার পাশাপাশি তাইওয়ান সীমান্ত সংলগ্ন চীন মার্কিন পাল্টা পাল্টি সামরিক মহড়া ও পেশিশক্তি প্রদর্শন অব্যাহত থাকায় দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরসহ একাধিক বিতর্কিত ইস্যুতে চীনের সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর অর্থই হচ্ছে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের উত্তর কোরিয়াসহ তিন চারটি দেশ ব্যাতিত অধিকাংশ দেশ এবং পাশাপাশি কথিত বিশ্ব শান্তির মহানায়ক এবং যুদ্ধবাজ ট্রাম্প বাহিনীর ইউএস এশিয়া প্যাসিফিক নেভাল এন্ড এয়ার ফ্লীটের সরাসরি মোকাবেলা করা। আর তাই ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক চীনকে এক রকম নিশ্চিতভাবেই তার সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ সমগ্র এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলসহ প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগর সংলগ্ন স্থল ও জল নিরাপত্তা বিধানে এবং যুদ্ধ হোক বা না হোক এক রকম বাধ্য হয়েই কৌশলগত কারণেই চাইনিজ নেভাল এন্ড এয়ার ফ্লীট েবং পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক মিসাইল এন্ড স্যাম সিস্টেম সার্বোক্ষণিকভাবেই অত্র অঞ্চলে মোতায়েন রাখতে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও অনিদিষ্ট্য কাল সময় পর্যন্ত এহেন সামরিক যুদ্ধাবস্থা বজায় রাখতে হতে পারে।

আবার অস্থিতিশীল কাশ্মির উত্তেজনা এবং লাগোতার ভয়াবহ সীমান্ত সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে পাকিস্তানের যে কোন মুহুর্তে বড় আকারের যুদ্ধে রুপ যে নিবে না তা কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীরের পুলোয়ামারে ভারতীয় সেনা মৃত্যুতে দেশ দুটি অত্যন্ত জড়ালো এবং ভয়াবহ সীমান্ত সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে। যা এখনো পর্যন্ত বিরামহীনভাবে চলমান রয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। প্রথমে ভারতীয় বায়ু সেনার পাকিস্তানের বালকোটে বিমান হামলা এবং পরবর্তীতে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে পাকিস্তানের পালটা জড়ালো বিমান হামলা এবং সীমান্ত আগ্রাসনে উভয় পক্ষের ব্যাপক প্রাণহানি এবং ক্ষতি ইতোমধ্যেই ভয়াবহ আকারে পৌছে গেছে। তাই এহেন চলমান সীমান্ত সংঘর্ষ এবং পাকিস্তানের সাথে সারা বছর ব্যাপী সীমিত যুদ্ধের আশাঙ্খায় ভারতকে নিশ্চিতভাবেই তার সামরিক শক্তির একটি বড় অংশ সার্বক্ষণিকভাবেই সুবিশাল পাকিস্তান সীমান্ত জুড়ে মোতায়েন রাখতে হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ থেকে আদৌ কোন মুক্তি আছে বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে চীন কিন্তু নিজের স্বার্থেই পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি ভারতের বিরুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহের মাধম্যে এক ধরণের পক্সি ওয়ার এবং মনস্তাত্বিক চাপ প্রয়োগের কৌশল অবলম্বন করে যাচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে রেড জায়ান্ট চীনের সাথে যে কোন ধরণের সামরিক সংঘর্ষ বা যুদ্ধে লিপ্ত হলে এক রকম নিশ্চিতভাবেই পাকিস্তানের বিশাল সীমান্ত অঞ্চল ভয়াবহ রকমের অশান্ত হয়ে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যতে যে কোন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একই সাথে চীন ও পাকিস্তানকে যুগৎপত ভাবে মোকাবেলা করতে হতে পারে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সাথে পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক ও ঘনিষ্টতা বৈশ্বিক পর্যায়ে আবশ্যিকভাবে এক নতুন সামরিক মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। যা ভারতের জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক কিছু হবে বলে আশা করা যায় না। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সামরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং বিগত দুই দশকে মার্কিন অস্ত্র আমদানি ৫৯০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিকে রাশিয়া কোন অবস্থাতেই সুনজরে দেখছে বলে মনে হয় না। চলমান………… সিরাজুর রহমান

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: