সাল ১৯৬২। কিউবাতে মিডিয়াম রেঞ্জ ব্যালেস্টিক মিসাইলের ঘাটি স্থাপন করে তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন। এখানে কিউবার সাথে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক এর সামান্য বর্ননা দেওয়া প্রয়োজন। কিউবা সোভিয়েত হতে অনেক দূরের দেশ,আমেরিকার প্রায় নাকের ডগায় অবস্থিত। তৎকালীন বিশ্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের আদর্শ সমাজতন্ত্র ছড়িয়ে দিতে উন্মুখ,অন্যদিকে আমেরিকা চায় তাদের তথাকথিত গনতন্ত্র। কিন্তু,আমেরিকার এত কাছে অবস্থিত হয়ে একটা রাস্ট্র তাদের দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম করেছিল,আর সে দেশটিই হলো কিউবা। যার ফলে কিউবা ছিলো তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এর নয়নের মনি আর আমেরিকার দু-চোক্ষের বিষ। তার ওপরে যখন সোভিয়ের কিউবাতে আমেরিকার এত কাছে মিসাইল ঘাটি গাড়ে তখন পরিস্থিতি ব্যাপক উত্তপ্ত হয়ে উঠে। যেকোন মুহুর্তে সোভিয়েত আর আমেরিকা যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। উভয় পক্ষই পারমানবিক ক্ষমতাধর,আর এই দুই পরাশক্তির যুদ্ধ মানে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সুনিশ্চিত।
.
উত্তেজনার এরূপ চরম পর্যায়ে,২৭ ই অক্টোবর ১৯৬২ সালে কিউবার জলসীমার কাছাকাছি টহল দিচ্ছিলো একটি সোভিয়েত সাবমেরিন রিপোর্টিং নেম “B-59″। তার ক্যাপ্টেন ভ্যালেন্টাইন সাভিতস্কি ও সেকেন্ড ইন কমান্ড ভাসিলি আর্খিপোভ। সাবমেরিন টি মোট ১০ টি টর্পেডো বহন করছিলো।
.
একই সময়ে সেখানে ছিলো আমেরিকান বিশাল নৌবহর যাদের কোড নেম “টাস্ক ফোর্স আলফা”। বহরটির নেতৃত্বে ছিলো আমেরিকান এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার “USS Randolph”। আর এই এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার টিকে এস্কোর্ট দিচ্ছিলো ইউএস নেভীর মোট ১১ টি ডেস্ট্রয়ার।
.
দূর্ভাগ্যবশত,সোভিয়েত সাবমেরিন টি ধরা পড়া যায় মার্কিন নৌবহরের কাছে। কিন্তু,এটা যে সোভিয়েত সাবমেরিন তা জানা ছিলো না মার্কিন পক্ষের। তো নতুন আইন অনুযায়ী,তারা মোট ৫ বার ওয়ার্নিং শট দেয়। মানে তারা ৫ বার সোভিয়েত সাবমেরিন টির ওপর ৫ বার কনকুসেসিভ গ্রেনেড ( পানিতে প্রচন্ড শক ওয়েভ সৃস্টির মাধ্যমে সাবমেরিন কে ধাক্কা দেওয়ার মতো বোমা) চার্জ করে। কিন্তু,সোভিয়েত রা জানত যে তিনবার চার্জ করা হয়। তাই তারা পাচবার আক্রমন কে তাদের ওপর আক্রমন হিসেবে ধারনা করে। বাধ্য হয়ে ক্যাপ্টেনের নির্দেশ অনুযায়ী সাবমেরিন টি পানির আরো অনেক নিচে চলে যায়। ফলে হেডকোয়ার্টারের সাথে সাবমেরিন টির সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে প্রায় ৭ দিন অতিবাহিত হয়।
.
এবার আসি ঘটনার মুল টুইস্ট এ। সাবমেরিন এ ১০ টি টর্পেডো তো ছিল,কিন্তু তার মধ্যে একটি ছিলো ১০ কিলোটন নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড যুক্ত। সে সাবমেরিন এ একজন পলিটিকাল অফিসার ও ছিলো। হেডকোয়ার্টার হতে নির্দেশ ছিলো,যদি হেডকোয়ার্টারের সাথে যোগাযোগ সম্ভব না হয়,তবে নিজের বিচার বিবেচনা নিয়ে যাতে নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডের প্রয়োগ করা হয়। আর এ নিউক্লিয়ার ওয়েপন চার্জ করার জন্য ক্যাপ্টেন,সেকেন্ড ইন কমান্ড ও পলিটক্যাল অফিসারের সম্মতি প্রয়োজন হবে।
.পরিস্থিতিটা আরেক বার ভেবে দেখুন। কিউবা নিয়ে দুই দেশ এর উত্তেজনা চরমে,আর দিন রাত ইউএস নেভীর ডেস্ট্রয়ার থেকে সাবমেরিনের ওপর অ্যাটাক হচ্ছে,হেডকোয়ার্টারের সাথে যোগাযোগ বন্ধ। পানির নিচে আর থাকাও সম্ভব না সাবমেরিনের,রসদ সবই শেষ। সবাইই পানির শত মিটার নিচে এটাই ধারনা করে নিবে যে এরই মধ্যে নিউক্লিয়ার ওয়ার শুরু হয়ে গিয়েছে। তো,সাবমেরিনের ক্যাপ্টেন নিউক্লিয়ার অ্যাটাকের কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কারন অ্যাটাক এর একপর্যায়ে সাবমেরিন টি ডুববেই,সবাই মারা যাবে। তাই ক্যাপ্টেন ভাবলো সাবমেরিন ধ্বংস হলেও যদি একটি বিশাল নৌবহরকে ধ্বংস করা বিশাল ব্যাপার।

                    ভাসিলি আর্খিপোভ 

কিন্তু,শেষ মুহুর্তে বেকে বসলেন সেকেন্ড ইন কমান্ড ভাসিলি। তিনি কিছুতেই হেডকোয়ার্টারের অর্ডার ছাড়া নিউক্লিয়ার চার্জ করবেন না। বরং তিনি সাবমেরিন টিকে উপরে নিয়ে যাওয়ার অর্ডার দিলেন। সাবমেরিন টি উপরে উঠলো,ও আমেরিকান নেভীর বাধা উপেক্ষা করে হেডকোয়ার্টারে ফিরে গেলো। তারা জানলোও না আরেকটু হলেই নৌবহরটির কি অবস্থা হতো।
.
যদি ওই বহর ধ্বংস হতো,তাহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কনফার্ম। পাচ হাজারের ও বেশি নিউক্লিয়ার বোম্ব নিয়ে দুই পরাশক্তি একে অপরের ওপর ঝাপিয়ে পড়তো। যা একসাথে ব্লাস্টের মাধ্যমে ১১ টি পৃথিবী ধ্বংস হতে বাধ্য !
.
মানবজাতি একটি বড় বিপদ হতে রক্ষা পেয়ে গিয়েছিলো সেকেন্ড ইন কমান্ড ভাসিলি আর্খিপোভের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের ফলে ?

Facebook Comments

1 Comment

Al Jaim Pappu · December 11, 2017 at 6:36 pm

:'(

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: