ট্যাংক ব্যাটল অফ শিরোমণি আধুনিক warfare অন্যতম সেরা ট্যাংক ব্যাটল । সবাই জানি,১৬ ই ডিসেম্বর বীর (?) পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিপুল গোলাবারুদ ও ৯১ হাজার সেনা জীবিত থাকার পরেও আত্মসমর্পণ করেছিলো। কিন্তু তাতে কি বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছিলো? সব পাকিস্তানী সেনাদের তখন ও আত্মসমর্পণ করা বাকী ছিলো,তেমনি পুরো বাংলাদেশ এর মুক্ত হওয়া ও বাকি ছিলো। সারা বাংলাদেশে তাড়া খেয়ে বেড়ালেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী যশোর সেনানিবাস এ এক দূর্ভেদ্য ঘাটি গড়ে তুলে। অনেক বার চেস্টা করেও এই যশোর সেনানিবাস কে দখল করা সম্ভব হয় নি মুক্তিবাহিনী কিংবা মিত্রবাহিনীর পক্ষে। মেজর জেনারেল হায়াত খান ছিলো এ যুদ্ধে পাকিস্তান পক্ষের নেতৃত্বে। আর যেহেতু যশোর সেনানিবাস ছিলো ভারতের বর্ডারের কাছে তাই বিশাল ট্যাংক বহর ও আর্টিলারি ডিভিশন ছিলো ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হায়াত খানের অধীনে।
.
তবে,পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে,তখন ও তাদের মনে একটি ক্ষীণ আশা ছিলো,মার্কিন নৌবহর বঙ্গোপসাগর এ অবস্থান করছে,হয়ত মার্কিন প্রভুরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে উদ্ধার করে পূর্ব পাকিস্তান মুখে তুলে খাইয়ে দিয়ে যাবে। পাকিস্তানীদের সেই স্বপ্ন যদিও পূরন হয়নি,তবুও সেই স্বপ্নের কারনেই,১৯৭১ সালের ৭ ই ডিসেম্বর যশোর সেনানিবাস এর মতো নিরাপদ দূর্গ ছেড়ে মেজর জেনারেল হায়াত তার বিশাল ট্যাংক বহর ও আর্টিলারি নিয়ে রওনা দেন খুলনার দিকে। এই আশায় যে,মংলা বন্দরে পৌছাতে পারলেই মার্কিন প্রভুর সপ্তম নৌবহর তাদের রক্ষা করবে।
.
পাকিস্তান বাহিনী ব্যাপক শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করে। তারা যশোর রোডে মিত্র বাহিনীর হামলা থেকে বাচতে অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন পুতে রাখে। এছাড়াও গিলাতলা,দৌলত পুর প্রভৃতি স্থানে ঘাটি গড়ে,এবং এ বাহিনীর প্রধান ঘাটি ছিলো খুলনার শিরোমণি তে।
.
এদিকে,মিত্রবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল দলবীর সিং,আর মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ মঞ্জুর ও সেক্টর কমান্ডার আব্দুল জলিল। পাকিস্তান বাহিনীর এ দূর্ভেদ্য ঘাটি দখল করতে মুক্তিবাহিনীর ৮ম ও ৯ম সেক্টর ও ভারতীয় বাহিনীর ৯ম পদাতিক ডিভিশনের সৈন্যদের নিয়ে গঠিত হয় যৌথকমান্ড। তবে,মিত্রবাহিনীর কিছু ব্লান্ডারের ফলে এ যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান অনেক বেড়ে যায়। টানা গোলাবর্ষনের পরেও যখন পাকিস্তানী বাহিনী হতে কোন রেসপন্স আসছিলো না,তখন মিত্রবাহিনীর মেজর মহেন্দ্র সিং এর নেতৃত্বে এক বিশাল সাজোয়া বহর খুলনার দিকে নিশ্চিন্তে আগাতে থাকে,কিন্তু যখন ই তারা পাকিস্তানী বাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জের আওতায় ঢুকে যান সাথে সাথে তাদের ওপর ব্যাপক গোলাবর্ষণ শুরু হয় ও মিত্রবাহিনী ( সাথে মুক্তিযোদ্ধারাও ছিলো অল্পসংখ্যক ) এর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় ও পিছু হটে আসে। আবার,ফুলতলা দিয়ে ঢুকতে যাওয়া মিত্রবাহিনীর সেনাদের পাকিস্তানী সেনা মনে করে ভারতীয় বিমান বাহিনী বোমা বর্ষন করে। এতে প্রচুর ভারতীয় সৈন্য মারা যায়,যদিও সে সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি তবে স্থানীয় অনেকগুলো ট্রাকে ভরে ভারতীয় সৈন্যদের লাশ নিয়ে যেতে দেখেছেন।
.
এসব ক্ষয়ক্ষতির ফলে,যৌথ কমান্ড যুদ্ধের পরীকল্পনা পরিবর্তনে মন:স্থির করে। এবার রনকৌশল ঠিক করেন মেজর এম এ মঞ্জুর ( যিনি পরবর্তী জিয়াউর রহমান কে হত্যার অপরাধে পাল্টা ক্যু তে নিহত হন) ও সাথে ছিলো সাব কমান্ডার মেজর হুদা। ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল দলবীর সিং এ যুদ্ধের পুরো নেতৃত্বের ভার মেজর এম এ মঞ্জুরের হাতে হস্তান্তর করে নিজ বাহিনী নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছিলেন।
.
পরীকল্পনা অনুযায়ী,অনেক গুলো খন্ড খন্ড ভাগে বিভক্ত হয়ে যৌথ বাহিনী পাকিস্তানী বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে ও পাকিস্তান বাহিনীর সকল ইউনিট কে খুলনার শিরোমণি তে প্রধান ঘাটিতে সরে আসতে বাধ্য করে। ফলে টার্গেট অনেকটাই ছোট হয়ে যায়। এরই মধ্যে,১৬ ই ডিসেম্বর বীর (?) পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করেছে। কিন্তু,পাকিস্তানী বাহিনীর মেজর জেনারেল হায়াত খান তা মেনে নেয়নি,সে তার মতো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। ১৬ ই ডিসেম্বর রাতে,মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা দলের ব্যাপক প্রতিরোধের কবলে পড়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ট্যাংক বহর সহ চার হাজার পাকিস্তানী সৈন্য। মেজর মঞ্জুর নিজেই অন্যান্য গেরিলাদের মতো লুঙ্গি পড়ে মাথায় গামছা বেধে বেঁধে শ্রমিকের বেশে দুই হাতে দুইটা স্টেনগান নিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর অতর্কিত আক্রমন করেন। ট্যাংক বহরের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে ট্যাংক গুলো থেকে গানম্যান দের টেনে বের করে এনে হত্যা করা হয়। যৌথ বাহিনীর ব্যাপক আক্রমন ও গোলা বর্ষনের ফলে ও মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাদের হাতে ট্যাংক বহর বিপর্যস্ত হওয়ায়,পাকিস্তানী বাহিনী অবশেষে পরদিন ১৭ ই ডিসেম্বর খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে আত্মসমর্পণ করে।
.
যে পরীকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তানী বাহিনীকে এ ট্যাংক যুদ্ধে পর্যুদস্ত করা হয়,তা আজ ভারত,পোল্যান্ড সহ বিশ্বের ৩৫ টা দেশের মিলিটারি একাডেমী গুলো সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পড়ানো হচ্ছে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের এক অন্যতম বীরত্বগাথা এই ট্যাংক ব্যাটল অফ শিরোমনি।
.
তথ্যসূত্র :- সাইফুল আলম চৌধুরি,এনটিভি,উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য।

Writer: Mahim

Facebook Comments

9 Comments

Mahim Pervez · December 5, 2017 at 1:44 pm

Best wishes for Bangladesh Defence Forum

    Tamim Khan · December 6, 2017 at 11:27 am

    are you sure???

      shams · December 6, 2017 at 11:38 am

      Why Tamin?? do you have any worries?

Al Jaim Pappu · December 5, 2017 at 1:46 pm

বাংলাদেশের গৌরবগাথা গুলো জানার সুযোগ করে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ…

বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল বীরদের

    shams · December 6, 2017 at 11:39 am

    Salute to our hero

Fardin Hossain · December 6, 2017 at 5:22 am

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্ব,মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গর্ব ??

    shams · December 6, 2017 at 11:40 am

    Be proud to be Bangladeshi

Imtiaz · December 6, 2017 at 5:00 pm

Nice Post..:-)

Hasanur Rahman · May 1, 2018 at 9:14 pm

Valo laglo jene je amra karo hote kom Na. Tobe ei judder kotha Ami jantam Na. Aita oto ta procarito Na kno. Aro kono aorokom battle ASE naki muktijudhe, thakle janaben.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: