গুপ্তচর কি??

নিজের দেশমাতৃকাকে রক্ষার জন্য দেশে বা দেশের বাহিরে বিভিন্ন বেশে নিজের পরিচয় লুকিয়ে যারা বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে তারাই গুপ্তচর। তাদের সবসময় চেষ্টা করে সবকিছুকে ব্যতি রেখে প্রতিপক্ষের আঘাত থেকে নিজের দেশকে রক্ষা করায় সচেষ্ট থাকে। এর ব্যতিক্রমও অনেক ধরনের গুপ্তচর আছে। গুপ্তচরবৃত্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক সময় যুদ্ধে হার-জিত নির্ভর করে।

 

শত্রু সম্পর্কে আগাম তথ্য যুদ্ধে এগিয়ে রাখে। আর এ তথ্য অতি জরুরী কারন অপরিচিত বা অজানা শত্রুর চেয়ে ভয়ংকর কিছুই নেই,কারন আপনি শত্রু সম্পর্কে না জানলে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাটা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। গুপ্তচর সে কাজ টাই করে দেয় আপনার জন্য। আবার শত্রুকে বিপাকে ফেলতেও গুপ্তচরের প্রয়োজন ব্যাপক।

চীনা সমরবিদ সানজু তার “আর্ট অফ ওয়ার” বইতে পাঁচ প্রকার গুপ্তচরের কথা উল্লেখ করেছেন।

সেগুলো নিচে যথাক্রমে দেওয়া হল

  • নেটিভ এজেন্ট (Native Agent)
  • ইনওয়ার্ড এজেন্ট(In word Agent)
  • ডাবল এজেন্ট(Double Agent)
  • এক্সপেন্ডেবলস(Expendable)
  • আন্ডারকভার এজেন্ট(Under cover Agent)

 

নেটিভ এজেন্টঃ

 

যুদ্ধক্ষেত্রের এলাকার বাসিন্দা যারা আপনাকে তথ্যাদি দিয়ে সহায়তা করবে। এরা অনেক বড় ফ্যাক্টর যেকোন যুদ্ধে। কারন ওই এলাকা সম্পর্কে আপনি অবগত না হলেও তারা ঠিকই জানে। যদি আমরা ১৯৭১ এর যুদ্ধের দিকে তাকাই তবে রাজাকার,আল বদররা ছিলো পাকিস্তানী বাহিনীর নেটিভ এজেন্ট। পাকিস্তানী বাহিনীকে পথঘাট চিনিয়ে, লোকজন ধরিয়ে দিয়ে গনহত্যা চালাতে সাহায্য করেছে এরা। আবার,এই স্থানীয় রা যদি আপনার শত্রুর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয় সেটাকেও কাজে লাগাতে হবে। যেমন,পাকিস্তানী বাহিনীর প্রতি ক্ষুব্ধ বাঙালি সাধারন জনতা মুক্তিবাহিনীকে সর্বাত্নক সহায়তা করেছিলো। টাকার লোভ দেখিয়ে বা ব্ল্যাকমেইল করে কিংবা অন্য কোন ভাবে নেটিভ এজেন্টদের নিজের পক্ষে নিয়ে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ইনওয়ার্ড এজেন্টঃ

 

এরা হলো আপনার শত্রু পক্ষের উচ্চ:পদস্থ কর্মকর্তা যারা আপনার পক্ষে কাজ করবে। এদের টাকা দিয়ে বা ঘুষ খাইয়ে কিংবা ব্ল্যাকমেইল নিজের পক্ষে নিয়ে আসতে পারলে যুদ্ধের সমীকরন অনেক সহজ হয়ে যাবে। এরকম ইন ওয়ার্ড এজেন্ট বা “দালাল” এর শত শত উদাহরন আমরা বর্তমান বিলাসী আরব দেশগুলোর দিকে তাকালেই দেখতে পারি।

 

ডাবল এজেন্টঃ

 

এরা আপনার পক্ষেও না,বিপক্ষেও না। এরা কেবল টাকার জন্য আপনার শত্রু ও আপনার অর্থাৎ দুপক্ষের কাছেই তথ্য ট্রান্সফার করে। এদের থেকে সর্বদা সাবধান থাকতে হবে। সর্বদা এদের হতে নিজের তথ্য লুকাতে হবে কিন্তু শত্রুর পুরো তথ্য নিয়ে নিতে হবে। এদের কে কার্পন্য না করে টাকা দিয়ে সন্তুষ্ট রাখতে হবে কারন তাদের ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে। এমন অনেক তথ্য যা পাওয়া হয়ত অন্য গুপ্তচরদের পক্ষে অসম্ভব তা ডাবল এজেন্টের মাধ্যমে সহজেই পাওয়া সম্ভব,কারন ডাবল এজেন্ট রা আপনার শত্রু সম্পর্কে আরো অধিক অবগত ও অভিজ্ঞ।

এক্সপেন্ডেবলসঃ

 

এরা গুপ্তচরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ক্যাটাগরি। এক্সপ্যান্ডেবল গুপ্তচর দের কাজ হলো আপনার শত্রুর কাছে ইচ্ছে করেই ধরা দেওয়া ও ভুল তথ্যের মাধ্যমে আপনার শত্রুকে বিভ্রান্ত করা। এর ফলে শত্রু আপনার দেওয়া ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত হয়ে আপনার পাতা ফাঁদে সহজে ধরা দেয়। এদের কে চরম ভাবে কৌশলী হতে হয় যারে তাদের কথা শত্রুপক্ষ বিশ্বাস করে। এভাবে শত্রুকে আপনার কোর্টে খেলতে বাধ্য করে আপনি যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারেন।

আন্ডার কভার গুপ্তচর

এরা হলো মেইন এক্টিভ গুপ্তচর। এরা সশরীরে নিজের পরিচয় লুকিয়ে শত্রুর ভিতরে লুকিয়ে থাকে ও তথ্য পাচার করে। এদের সর্বদা সতর্ক থাকতে হয় তাদের পরিচয় নিয়ে। এরা ইন্টেলিজেন্স এজেন্সীগুলোর তথ্যের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সোর্স।

 

যেমন ১৯৯৯ সালে ভারতের ইন্টেলিজেন্স এজেন্সী “র” এর ভেতর “দিওয়ান-চান্দ-মালিক” ছদ্মনাম নিয়ে একজন ডিজিএফআই এজেন্ট ঢুকে পড়ে। সে র এর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতিও পায় ও ভারতের অনেক ভাইটাল ইনফরমেশন সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। ১৯৭৫ সালে ধরা পড়ে যে ঢাকার সেনানিবাসের ইমাম আসলে একজন ভারতীয় চর। আশির দশকে পাকিস্তানী আর্মিতে “রাভিন্দর কৌশিক” নামে একজন র এজেন্ট ধরা পড়ে। এরকম অসংখ্য এজেন্ট বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। এদের কে অতি প্রশিক্ষিত ও চতুর হতে হয় যেহেতু তাদের কাজ অত্যন্ত ঝুকিপূর্ন ও সর্বদাই ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

সানজুর মতে গুপ্তচর এই পাঁচ প্রকার। হ্যাঁ কথা সত্যি। তার যুগের হিসাবে গুপ্তচর পাঁচ প্রকার হলেও বর্তমানে কিন্তু হিসাব বদলেছে। এখন কার অন্যতম প্রধান গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্র হচ্ছে সাইবার ইন্টেলিজেন্স। কারন এখন পৃথিবী চলছে প্রযুক্তির ওপর। আর এই প্রযুক্তির ডিফেক্ট গুলোকেই কাজে লাগাতে হয় শত্রুর গোপন তথ্যাদি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য। সোজা কথায় হ্যাকিং। চীনা এজেন্ট দের ব্যাপারে খুব বেশি শোনা যায় না। কিন্তু তবুও আমেরিকা সহ অন্যান্য দেশের অনেক তথ্যই তারা পেয়ে যাচ্ছে এই হ্যাকিং এর মাধ্যমে।

 

 

আপনার শত্রুরা আধুনিক প্রযুক্তির যা ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে তথ্য বিনিময় করছে সে কমুনিকেশন কোডটা খুঁজে বের করুন। অনেক কম খরচে, ঝুকিহীন ভাবে আপনি আপনার শত্রু সম্পর্কে আগাম তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাই প্রযুক্তির ওপর ই অধিক গুরুত্ব দেয়। অসংখ্য আইটি এক্সপার্ট রা এখন নানান ইন্টেলিজেন্স এজেন্সীর হয়ে কাজ করছেন। শুধু ইন্টারনেটভিত্তিক ই না। স্নায়ুযুদ্ধের সময় টেলিফোনে আড়ি পেতে শত্রুর তথ্য বের করে নেওয়া হয়েছিল অনেক বার। সোভিয়েত আর আমেরিকার মধ্যে প্রযুক্তির এ সংঘর্ষ কম হয় নি।

 

যাবতীয় তথ্যসুত্র সংগ্রহ করা হয়েছে মেজর দেলোয়ার হোসেন খান কর্তৃক অনুবাদ কৃত সানজুর “আর্ট অফ ওয়ার” বই থেকে। 

Facebook Comments

1 Comment

Al Jaim Pappu · January 5, 2018 at 2:08 am

তথ্যবহুল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: