প্রথম পর্বঃ

খালিদ বিন ওয়ালিদ, বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেনাপতি হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। এমনকী পশ্চিমা ঐতিহাসিকরাও খালিদ বিন ওয়ালিদ এর সামরিক প্রজ্ঞা ও বীরত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশের কোন সুযোগ পান নি। তিনি এমন একজন সেনাপতি যিনি তার জীবনে কোন যুদ্ধে পরাজয় বরণ করেন নি। তার সেসব সাফল্যমণ্ডিত অপারেশন এর বর্ণনা করা হবে আমাদের এ সিরিজ এ।

আজকের প্রথম পর্ব ইতিহাস খ্যাত যুদ্ধ ব্যাটল অফ ইয়ামামা বা ইয়ামামার যুদ্ধ নিয়ে।

প্রেক্ষাপট

আরবের ইতিহাসে দুজন ভণ্ড নবীর আবির্ভাব ঘটেছিল,যাদের মধ্যে একজন এর নাম মুসায়লামা কাযযাব। সে ভন্ড নবুয়ত দাবী করে ও বিভিন্ন ভেলকির মাধ্যমে স্থানীয় লোকেদের নিজের অন্ধ ভক্ত বানিয়ে ফেলে ও অনুসারীদের ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য করে। মুসায়লামা চল্লিশ হাজার সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী তৈরি করে ফেলতে সক্ষম হয়। মুসায়লামার সৈন্যদল ছিলো অতি প্রশিক্ষিত ও তার কমান্ডারগন ও ছিল অনেক অভিজ্ঞ ও সাহসী।

তবে ইসলামের প্রথম খলীফা আবু বকর (রা:) ছিলেন আপোষহীন। তিনি মুসায়লামার বিরুদ্ধে যুদ্ধের মনস্থির করেন ও খালিদ বিন ওয়ালিদ সেই দায়িত্ব পান। তবে আবু বকর (রা:) আরো দুই সেনাপতি ইকরামাশুরাহবীলকে মুসায়লামাকে ব্যস্ত রাখার জন্য কৌশলগত স্থানে থাকার নির্দেশ দিলেও তারা দুজনেই খালিদ বিন ওয়ালিদের পূর্বের যুদ্ধের বিজয় ও জয়জয়কারে ঈর্ষান্বিত হয়ে গৌরবের লক্ষ্যে নির্দেশ অমান্য করেই মুসায়লামার বাহিনীকে আক্রমন করে ও ইকরামা (রা:) এর সেনারা ও শুহারবীল (রা:) এর সেনারা মুসায়লামার বাহিনীর কাছে দুইবার শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়ে পিছু হটে। এতে মুসায়ালামার সৈন্যদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায় ও তারা মুসায়ালামার ওপর তাদের ভরসা আরো বেড়ে যায় ও তারা আরো তেজী হয়ে উঠে।

এদিকে,শুরাহবীল এর সৈন্যদল খালিদ বিন ওয়ালীদ রা. এর সৈন্যদল এর সাথে মিলিত হলে খালীদ বিন ওয়ালীদ রা. এর মোট সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ হাজার। অন্যদিকে মুসায়লামার সৈন্যসংখ্যা ৪০ হাজার।

 মূল যুদ্ধ

৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে ইয়ামামার যুদ্ধ শুরু হয়। মুসায়লামা আর রাজধানী যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তাই দূরের আরকাবা নামক সমতল ভুমিতে সৈন্য নিয়ে ঘাটি গাড়ে। খালিদ বিন ওয়ালিদ সে সংবাদ পেয়ে আরকাবা নজরে পড়ে এরকম একটি উচু স্থানে এসে থেমে যান। সৈন্যসংখ্যা ছিলো কম,তবে মুসলিম রা ছিলো নির্ভীক। একই ভাবে মুসায়লামার সৈন্যরাও ছিলো মুসায়লামার ওপর বিশ্বাসে অটল। এর পূর্বে এত বড় বাহিনীকে মোকাবিলা করতে হয় নি মুসলিম সেনাবাহিনীর।

খালিদ বিন ওয়ালিদ চিরকালই আক্রমানত্বক নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তার যুদ্ধনীতি অনুযায়ী তিনি আগে আক্রমন করতেন ও আক্রমন এতটাই তীব্রভাবে যাতে শত্রু ডিফেন্সিভ হতে বাধ্য হয়। ইয়ামামার যুদ্ধেও তার ব্যাতিক্রম হলো না। মুসলিমরা প্রচন্ড আঘাত হানলো মুসায়লামার বাহিনীর ওপর। মুসায়ালামার বাহিনীর প্রচুর সৈন্য নিহত হলো,মুসলিমদের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক অনেক কম,তবুও কিছুতেই মুসলিম সেনাবাহিনী মুসায়ালামার বাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভাঙতে পারছিলো না। মুসায়লামার অনেক সৈন্য মারা যাচ্ছে কিন্তু কিছুতেই তাদের মধ্যে ভাঙন ধরানো যাচ্ছে না তারা মুসায়লামার ওপর এতটাই অন্ধ আর এতটাই দৃঢ় যোদ্ধা। মুসলিম রা আগাতে পারলো না,সংঘাত করতে করতে পিছিয়ে এলো। ঠিক উহুদ যুদ্ধের অনুরূপ।

মুসায়ালামার সৈন্যরাও মুসলিম দের মাল লুট করার জন্য উৎসব শুরু করে দিলো। উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের এ উইকনেস যেভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন সেনাপতি খালিদ,আজ মুসলিম হয়ে মুসলিম দের শত্রুর বিরুদ্ধ তা কাজে লাগানোর চেস্টা করলেন ও সঠিক সুযোগের অপেক্ষা করলেন। মুসলিম সৈন্যরা ভীত ছিলো না,তবে তারা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিল না মুসলিম রা সে ব্যূহ ভাঙতে পারছে না কেন!

একজন দক্ষ সেনাপতির বৈশিষ্ট্য হলো সে তার বাহিনীর দূর্বলতা দ্রুত ধরতে পারবে। খালিদ বিন ওয়ালিদ রা: ও তার বাহিনীর দূর্বলতা ধরে ফেললেন। তার বাহিনীতে বিভিন্ন গোত্রের আরবদের মিশ্রন ঘটেছে। আরবদের মধ্যে তখন ও গোত্রপ্রীতি চরমভাবে উপস্থিত,তাই একপ্রকার বিশৃঙ্খলা সৃস্টি হয়েছে মুসলিম সেনাবাহিনীতে। দ্রুতই খালিদ বিন ওয়ালিদ রা: তার বাহিনীকে গোত্র অনুযায়ী সাজিয়ে পুনরায় আক্রমনে পাঠালেন। এবার মুসায়ালামার আরো সৈন্য মারা যেতে লাগলো তবেই দ্রুতই সে গ্যাপ পূরন করে দিত অন্য সৈন্যরা। কিছুতেই মুসালায়মার সৈন্যদের মনোবলে চিড় ধরিয়ে তাদের পিছু হটানো যাচ্ছিলো না।

খালিদ বুঝে গেলেন,মুসায়ালামা নিহত হলেই তার সৈন্য রা আর ঠিক থাকতে পারবে না। কারন যুদ্ধের মেইন ফ্যাক্ট হলো মনোবল।

খালিদ রা. এগিয়ে যান সরাসরি দ্বৈত যুদ্ধে আহবান করেন। অনেকেই তার হাতে নিহত হয়,তার সামনে তখন দেহরক্ষী বেষ্টিত মুসায়ালামা। খালিদ রা: মুসায়লামাকে জানান যে তিনি কথা বলতে চান। মুসায়ালামা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই এগিয়ে যায় তবে শুনতে পায় নি এমন ভান করে যাতে মনে হয় তার ওপর ওহী নাজিল হচ্ছে। সেনাপতি খালিদ আরেকটু অপেক্ষা করেই দূরত্ব একটু কমার সাথেই সাথেই মুসায়লামার ওপর ঝাপিয়ে পড়েন। কিন্তু মুসায়লামাও ছিলো দক্ষ যোদ্ধা,সে দ্রুতই লাফ দিয়ে পিছনে নিজ দেহরক্ষীদের ভিতরে ঢুকে যায়। খালিদ তার কাঙখিত কাজটি করতে না পারলেও খালিদ রা: এর উদ্দেশ্য ঠিকই সফল হয়।

.তাদের নেতা মুসায়লামা ভয় পেয়ে পিছু হটেছেন,যার ওপর নাকি ঈশ্বরের আশির্বাদ এ দৃশ্য দেখে মুসায়ালার সৈন্যদের মনোবলে চিড় ধরে। এবার মুসলিম বাহিনীর আক্রমনে মুসায়ালামার সেনাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেঙে পড়ে। তার বাহিনী পালাতে থাকে। তবে মুসালায়ামা শীঘ্রই বাহিনীকে নিয়ন্ত্রনে নেয় কাছেই একটি প্রাচীর বেস্টিত বাগানে ঢুকে পড়ে। খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এর বাহিনীর একজন বয়স্ক যোদ্ধাকে প্রাচীরের উপর দিয়ে ছূড়ে মারা হয়,সে ভিতরে ঢুকেই প্রহরীদের হত্যা করে মেইন গেট খুলে দেয়।

সাথে সাথেই মুসলিম বাহিনী বাগানে ঢুকে পড়ে ও মুসালায়ামার সৈন্য রাও যুদ্ধে টিকতে না পেরে মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হতে থাকে। ওহায়শী,হযরত হামজা রা. এর হত্যাকারী সেই ক্রীতদাস যে পরে মুসলিম হয় সে তার বর্শা নিয়ে সঠিক সময়ে মুসায়লামাকে হত্যা করে। মুসায়লামার মৃত্যুর পর তার সৈন্য রা আরো বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। দ্রুতই মুসলিম বাহিনীর বিজয় রচিত হয়। এভাবেই খালিদ বিন ওয়ালিদ রা: এর নেতৃত্বে ইয়ামামার যুদ্ধে মুসলিম গন বিজয় লাভ করে।

মূল যুদ্ধ এখানেই শেষ,তবে খালিদ রা. এর হাতে বন্দী এক নেতা মুজাআ’ছল চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে নিজ গোত্রের লোকেদের দাস হওয়া থেকে রক্ষার চুক্তি করিয়ে নেয় খালিদ বিন ওয়ালীদ রা. হতে, সে বর্ননা যুদ্ধে বিবরনের পোস্টে অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসাঙ্গিক।

ইয়ামামা প্রদেশের রাজধানী হিজর এর স্থানেই বর্তমান সৌদির রাজধানী রিয়াদ অবস্থিত।

তথ্যসূত্রঃ

  • সোর্ড অফ আল্লাহ – মেজর জেনারেল এ আই আকরাম,
  • সাহাবায় কেরাম আমাদের প্রেরনা – WAMY ও
  • উইকিপিডিয়া।
Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: