Photo Credit : H M Sohel

টিভিতে একটু পর পর বিজ্ঞাপন দিচ্ছে “কে হবে মেন্স ফেয়ার এন্ড লাভলির মাসুদ রানা?” ভাই মাসুদ রানা নির্বাচিত হলে কি তাকে ফেয়ার এন্ড লাভলি ব্যাবহার করতে হবে? নাকি যারা ব্যাবহার করে তাদের মধ্যে কাউকে নির্বাচিত করা হবে? কেউ ব্যাপারটা একটু ক্লিয়ার করবেন? মাসুদ রানার সাথে “ফেয়ার এন্ড লাভলী” ব্রান্ডটা একদম মেনে নেয়া যায় না। একটা স্বপ্নের চরিত্র ফেয়ার এন্ড লাভলী মেখে সামনে হাজির হবে, এটা অসম্ভব! ( মেন্স ফেয়ার এন্ড লাভলী মাখা বলতে এখানে কোন চকলেট হিরোকে বুঝানো হচ্ছে)

মাসুদ রানাকে অবশ্যই একজন প্রকৃত কমান্ডো হইতে হবে তা নয় । অন্ততঃ একজন সামরিক সদস্য বা একজন অ্যাডভেঞ্চারার বা মার্শাল আর্টিস্ট বা সাইক্লিস্ট বা সুইমার বা ক্লাইম্বার ইত্যাদী, তা না হলে তার বডি লাঙ্গুয়েজ ও রুক্ষতা ফুটেই ঊঠবেনা।

মাসুদ রানা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন মেজর। PC: Major Taiz Anowar

কারন পূর্বে আমরা নোবেলের মত মাখন রানা ও সোহেল রানার মতো ভুড়িয়াল রানাদের কে মাসুদ রানা হিসেবে পেয়েছি। মাসুদ রানার পরিচয়ে বলা হয় একজন সামরিক গোয়েন্দা (সিভিল না), দক্ষ উইপন হান্ডলার, একজন ডুবুরী, একজন প্যারাট্রুপার, একজন গ্লাইডার, একজন জানবাজ এজেন্ট, দক্ষ কারাটে ফাইটার, একজন পাইলট, একজন ট্রাক, ট্রেন, স্পীডবোট চালক, একজন পরবত আরোহী, একজন পেশীবহুল মোহনীয় বাক্তিত্ত্ব । মাসুদ রানার উচ্চতা পাঁচ ফুট এগারো ইন্চি, তার চেহারার কোন স্পস্ট বর্ননা কোন বইতে না পাওয়া গেলেও তার চেহারা আকর্ষনীয় তা বলা আছে। কোন একটি বইতে এক ফ্রেন্চ এয়ার হোস্টেস মাসুদ রানাকে বলেছিল “তুমি দেখতে আমার দেশের এল্যান ডিলোনের মত।” তার পর থেকে আমি এল্যান ডিলোনের একটা বাংগালি ভার্সান মাসুদ রানা হিসাবে কল্পনা করছিলাম। এখন যদি ফেয়ার এন্ড লাভলী মেখে কেউ সামনে হাজির হয়ে বলে আমি মাসুদ রানা! এটা কিভাবে মেনে নিব?

এলান ডেলন। PC : Pinterest

আমি ছোটবেলা থেকেই মাসুদ রানা আসক্ত ছিলাম। অনেক আগের একটি ঘটনা, শুনলাম মাসুদ রানার পিশাচ দীপ নিয়ে প্যাকেজ নাটক হচ্ছে নায়ক নোবেল। প্রথমে খুশী হলেও পরে মনে হল মাসুদ রানার মত একটি চরিত্র কি নোবেলের মত চকলেট হিরো টাইপ মডেল কি ফুটিয়ে তুলতে পারবে? পরিচালক আতিকুল হক চৌধুরীকি চরিত্রের গভীরতা ফুটানোর জন্য বিশ্বাসযাগ্য সেট তৈরী করবে নাকি হার্ডবোর্ডের উপর পেইন্ট করা সেট দিয়েই চালিয়ে দিবে? যা ভেবেছিলাম তাই হোল হার্ডবোর্ডের সেটের ভিতর নোবেল সিরিয়াস ফেস বানিয়ে ঘোরাঘুরি করল আর সোহানা চৌধুরী হিসাবে বিপাশা হায়াতের একই অবস্হা। খুব মন খারাপ হল আমার প্রিয় মাসুদ রানার এই করুন রুপ দেখে।

মাসুদ রানা এক দূর্ধর্ষ কমান্ডো

আর সহ্য করতে না পেরে সে সময়কার জনপ্রিয় ম্যাগাজিন “আনন্দ বিচিত্রায়” চিঠি লিখে ফেললাম এই নাটকের দূর্বল সেট, চিত্রনাট্য আর চরম দূর্বল কাস্টিং এর বিরুদ্ধে আমার মতামত জানিয়ে। আমার যতদূর মনে পরে আমি লিখেছিলাম যে মাসুদ রানার অরিজিনাল কাহিনী নিয়ে যতগুলো মুভি হয়েছে তাদের নায়কদের চেহারায় সাধারন নায়কচিত সৌন্দর্য থেকে কাহিনীর প্রয়োজনে কঠোরতার পরিমান বেশী ছিল কিন্তু নোবেল এখানে পুরোপুরি মিসকাস্ট হয়েছে। যাহোক আনন্দ বিচিত্রা আমার চিঠি ছাপিয়েছিল, তখন আমার পোস্টিং ছিল খাগড়ছরিতে। আমি তখন জংগীটিলা সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে। মাসিক হেলিকপ্টারের রেশন সর্টির সাথে আনন্দ বিচিত্রাটি হাতে পেয়ে খুশী হলাম। খুশীটা স্হায়ী হলনা আমার এক সিনিয়ার বলল,

-“ডিয়ার তুমিকি এমআই (মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স) ডাইরেক্টরেটের পারমিশন নিছিলা এই চিঠি পাঠানোর আগে?
-না স্যার।
-নাও হোপ দ্যাট দে মিস ইট ।পত্রিকাওয়ালারা  দেখি তোমার র‍্যাাংকও ছাপায়ে দিছে।

যাহোক এমআই ডাইরেক্টরেট হয় মিস করেছিল বা একজন লে: এর সল্প জ্ঞানের কথা চিন্তা করে ইগনোর করে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ আবার আসি মাসুদ রানা প্রসংগে। বাংলাদেশে প্রথম মাসুদ রানা নিয়ে ছবি বানিয়েছিলেন 1974 সালে পরিচালক মাসুদ পারভেজ এবং নিজেই সোহেল রানা নাম নিয়ে মাসুদ রানা চরিত্রে আবির্ভূত হন। এটাছিল বিস্মরন বইয়ের নাট্যরূপ। কাজী আনোয়ার হোসেন পরবর্তীতে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন আমি এই ছবিতে মাসুদরানার 20% পেয়েছি। আমি ছবিটি ইউটিউবে দেখেছি,আমি বলব 5%।

যাহোক কাজী আনোয়ার হোসেন এই চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৭৪ সালে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা হিসেবে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। এই চলচ্চিত্রে মাসুদ রানা হিসাবে সোহেল রানার বিপরীতে ছিলেন অলিভিয়া ও কবরী এছাড়া ছিলেন গোলাম মোস্তফা, খলিল, ফতেহ লোহানী এবং রাজ্জাক ছিলেন একটি অতিথি শিল্পী।তবে হার্ডবোর্ডের সেট ছবিটাকে বেশিদূর আগাতে দেয়নি।

ন্যাকা এক্সপ্রেশন ওয়ালা কাউকেই মানাবে না মাসুদ রানা কিংবা সোহানা চরিত্রে

আমার মনেপড়ে আমি স্কুলে পড়ার সময় দুই থেকে তিনমাস ইত্তেফাক পত্রিকায় এমন মাসুদ রানা নিয়ে চলচিত্র বানানোর জন্য মাসুদ রানার খোঁজে বিজ্ঞাপন দিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবে রুপ নেয়নি।
এবার কি হবে? শুনলাম কাজী আনোয়ার হোসেন স্বয়ং তার তিনটি মাসুদ রানার গল্প চলচিত্রায়ন করার জন্য অনুমোদন দিয়েছেন। তাই আশা করে থাকি নির্বাচকগন মাসুদ রানা নির্বাচনে তার উচ্চতা গায়ের রং বয়স এগুলো বিবেচনায় প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রাখবেন। সর্বাপরি ছবির মান আন্তর্জাতিক মানের হবে বলে এর প্রযোজক সংস্হা নিশ্চয়তা দিয়েছেন, তাই আশায় বুক বাঁধলাম।

লেখক : Md Mustafizur Rahman & H M Sohel

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: