কেমন ছিলো মুসলিম সেনাবাহিনী?

 

মুসলিম সেনাবাহিনী বলতে কোন মুসলিম সুলতানের ফৌজ-ই-সালতানাত নয়,কোন শাসকের রাজ্যজয়ের সেনারা নয়,ফিতনামুক্ত প্রকৃত ইসলামের সময়কাল অর্থাৎ মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা: ও খোলাফায়ে রাশেদুনের আমলের সেনাবাহিনীকেই বুঝানো হয়ে মুসলিম সেনাবাহিনী দ্বারা। এত বছর পর কিছু তথ্য সাজাতে সক্ষম হলাম বলে লেখার সাহস করে উঠলাম।গঠনতন্ত্র :-

মুসলিম সেনাবাহিনীতে কেবল মুসলিম রাই অংশগ্রহন করতে পারত। শুরুর দিকে কোন নিয়মিত সেনাবাহিনী ছিলো না,ইসলামের যেকোন ক্রান্তিকালে জোয়ান বৃদ্ধ সব মুসলিম এর যুদ্ধে যোগদান করতে হতো। প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধে এ সংখ্যা ৩১৩ জন, মক্কা বিজয়কালে এ সংখ্যা বেড়ে ১০ হাজার ও খোলাফায়ে রাশেদুনের আমলে মুসলিম সেনাবাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ১ লক্ষে পৌছায়। ধীরে ধীরে ইসলামের প্রসারের ফলে মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পরবর্তীকালের যুদ্ধগুলোতে সকল মুসলিম কে যোগদান করতে হয়নি। এছাড়াও প্রথমদিকের যুদ্ধে নারীরাও এ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছে। পরবর্তীতে সংখ্যা বাড়লে নারীরা সম্মুখ সমরে যোগদান না করলেও নার্স হিসেবে ও অন্যান্য ভাবে যুদ্ধে সহায়তা করতো। মুসলিম সেনাবাহিনী দশমিক পদ্ধতিতে বিন্যাস্ত ছিলো। অর্থাৎ ১০ জন নিয়ে ইউনিট,১০ টা ইউনিট মানে ১০০ জন নিয়ে কোম্পানী আর ১০ টা কোম্পানী অর্থাৎ ১০০০ জন নিয়ে একটি রেজিমেন্ট। ১০০০ জনের রেজিমেন্ট ই সর্ববৃহৎ সৈন্যবিন্যাস ছিলো,তবে শহর অবরোধ বা যুদ্ধে অনেক সময় কয়েক রেজিমেন্ট মিলে কোর হিসেবে একসাথেও কাজ করতে দেখা গিয়েছে। মদীনায় হযরত মুহাম্মদ সা: নিজে এ পদ্ধতিতে সৈন্যবিন্যাস চালু করেছিলেন।

পদমর্যাদা বা র‍্যাংক :-

কোন বাহিনীর সেনাপতি কে হবেন তা খলীফা নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতেন। তারপর যুদ্ধে প্রয়োজন মতে সেনাপতি/সেনাপতিরা ইউনিট,রেজিমেন্ট এর লিডার নিয়োগ করতে পারতেন। তবে মুসলিম সেনাবাহিনীতে ( খোলাফায়ে রাশেদুনের আমল অব্ধি) পদমর্যাদা স্থির ছিলো না। যে কাউকে যেকোন সময় পরিস্থিতি ও যোগ্যতা অনুযায়ী যেকোন দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ হয়ত কেউ সাধারন সৈন্য হিসেবে যোগ দিয়েছিলো,তার যদি যোগ্যতা থাকে কিংবা পরিস্থিতির কারনে হয়ত তাকে এক রেজিমেন্টের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হতে পারে। আবার হয়ত কোন রেজিমেন্টের আমীর ( নেতা) কে সাধারন সৈন্য হিসেবে যোগ দিতে হতে পারে। তাই কারো পদমর্যাদা বর্তমান কালের মতো স্থির ছিলো না।

সমরনীতিঃ

সমরনীতির ক্ষেত্রে কুরআন ও হাদীস কে অনুসরন করা হতো। মহানবী সা: কে অনুসরন করে কখনোই একদম ভোরবেলা আক্রমন হতো না। এবিং যুদ্ধবন্দীদের প্রতিও সদয় আচরন করা হতো যেহেতু তা কুরআনের নির্দেশ। আবু বকর রা: যুদ্ধে ১০ টি কাজ করতে নিষেধ করেছেন তা আমরা হয়ত অনেকেই জানি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কখনোই নারী ও শিশু,সংসারত্যাগী সন্যাসী,আত্মসমর্পণকারী সৈন্যকে হত্যা করা যাবে না। এছাড়াও ফসলাদি ও ইমারত ধ্বংস ও নিষেধ ছিলো। সেই আইন এখনো প্রযোজ্য। যদিও হয়ত কোন সেনাবাহিনীই এসব নিয়ম পুরোপুরি মানে না। কিন্তু তৎকালীন মুসলিম সেনাবাহিনী তা মেনেছিলো অক্ষরে অক্ষরে। যার ফলে তারা চরম শত্রুর ও শ্রদ্ধা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলো। যেহেতু যুদ্ধবন্দীরা আমানত হিসেবে গন্য হতো তাই মুসলিম বাহিনী অভুক্ত থেকে যুদ্ধবন্দীদের খাবার সরবরাহের ঘটনাও ঘটেছে।

আক্রমনের কারন :-

যেকোন রাজ্য দখলের বা লুটপাটের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা ইসলামী নীতি নয়। কোন রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য তিনটি কারনের যেকোন একটি পুরন করতে হতো। আত্মরক্ষার খাতিরে,শত্রুপক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করলে বা চুক্তিবদ্ধ কোন মিত্রগোষ্ঠী আক্রান্ত হলেই কাউকে আআক্রমন করা যেত। তবুও যুদ্ধের আগে যেকোন বাহিনীকে একটি শেষ চান্স দেওয়া হতো। হয় শত্রু ইসলাম গ্রহন করবে,কিংবা জিজিয়া কর প্রদান করে নিজ ধর্ম পালন করবে ও মুসলিম সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা ভোগ করবে ( জিজিয়া করের মাত্রা যাকাতের পরিমান থেকে কম ছিলো বলে জানা যায় তাই এটাকে জুলুম ভাবলে ভুল করবেন) কিংবা শেষ অপশন হিসেবে থাকত তরবারী অর্থাৎ যুদ্ধ।

পতাকা :-

এ ব্যাপার টি নিয়ে কোন পরিষ্কার তথ্য নেই। তনে এইটুকু অনুমান করা যায় মুসলিম সেনাবাহিনীর পতাকা নির্দিষ্ট ছিলো না। কারন মক্কা বিজয়কালে মুসলিম সেনাবাহিনীর পতাকা ছিলো কালো ( সম্পূর্ন কালো,কোন ডিজাইন নেই) আবার আরেক বর্ননা হতে জানা যায় খায়বার যুদ্ধে রাসুল সা: এর ঝান্ডা বা পতাকার রঙ ছিলো হলুদ। অর্থাৎ পতাকা এক্ষেত্রে কোন বড় ফ্যাক্টর ছিলো না। তবে সাদা পতাকা কখনোই ব্যবহার হতো না কারন সেযুগেও সাদা শান্তির প্রতীক ছিলো। রাস্ট্র কর্তৃক সাদা পতাকা ব্যবহৃত হতো।

অস্ত্রশস্ত্র :-

প্রধান অস্ত্র হিসেবে সর্বদাই তলোয়ার ব্যবহৃত হতো। এছাড়াও তীরন্দাজিতে আরবদের সুখ্যাতি ছিলো। তবে মুসলিম বাহিনীর অস্ত্রশত্র খুব উন্নত মানের ছিলো না। সকলের কাছে স্থানীয় ভাবে তৈরি লোহার নিম্নমানের তলোয়ার ছিলো তবে,যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে করতে রোমান ও পারসিক সৈন্যদের থেকে পাওয়া কিছু ভালো মানের তলোয়ার মুসলিম দের হস্তগত হয়। তবুও অধিকাংশের ই অস্ত্র খুব বেশি উন্নত ছিলো না। মুসলিম বাহিনীর কোন নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম ছিলো না আর সকলের নিকট বর্ম ছিলো না। রোমান ও পারসিকদের হতে জয় করে পাওয়া বর্ম কেউ কেউ পেয়েছিলো। এছাড়া বর্মের তেমন বালাই ছিলোনা। যাদের কাছে ঘোড়া ছিলো তাদের নিয়ে অশ্বারোহী বাহিনী গঠিত হত। অধিকাংশের ই বাহন ছিলো মরুভূমির জাহাজ খ্যাত “উট”.

স্পেশাল ইউনিট :-

প্রাচীন আরবের যুদ্ধনীতি অনুযায়ী,যেকোন যুদ্ধ শুরুর আগে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ হতো অর্থাৎ দুইপক্ষ হতে দুইজন এসে লড়াই করত। এরকম কয়েকবার দ্বন্দ যুদ্ধ হওয়ার পর মুল যুধ শুরু হতো। এ দ্বন্দ্ব যুদ্ধে যে জিতত তারা মানসিকভাবে এগিয়ে থাকত,আর মনোবল যেকোন যুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। তাই যাতে এ দ্বন্দ্ব যুদ্ধে জেতা যায় তাই মমুসলিম সেনাবাহিনী একটি বিশেষ ইউনিট ছিলো, যার নাম ছিলো “মুবারিজুন”। তাদের দ্বন্দ্ব যুদ্ধের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হতো। সকল দ্বন্দ্ব যুদ্ধেই তাই মুসলিম বাহিনী জিততো আর প্রতিপক্ষকে মানসিক ভাবে দূর্বল করে ফেলা সম্ভব হতো।

অন্যান্য অস্ত্র :-

মিনজানিক নামক ছোট কাঠের তৈরি অস্ত্র ছিলো যা দিয়ে ভারী পাথর বা অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপ করা হতো ( বর্তমান কামানের মতো) বলে জানা যায়। তবে কোন যুদ্ধে মিনজানিক এর ব্যবহার সম্পর্কে আমি কোন উল্লেখ পাইনি। তবে উসমান রা: এর আমলে গঠিত মুসলিম নৌবাহিনীর তৎকালীন ফ্রিগেটে মিনজানিক ছিলো। মুসলিম নৌবাহিনী নিয়ে সমরাঙ্গন গ্রুপের মডারেটর সাদিক পোস্ট রেডি করতেছে।

তৎকালীন মুসলিম বাহিনীর উল্লেখযোগ্য জেনারেল দের মধ্যে খালিদ বিন ওয়ালীদ রা: এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চরম ইসলাম বিদ্বেষী ইতিহাস বেত্তারাও স্বীকার করে নিয়েছেন খালিদ বিন ওয়ালীদ রা: ছিলেন ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ক্যাভেলরি জেনারেল

পরবর্তী আরো ঘাটাঘাটি করে বিস্তারিত জানানোর ইচ্ছা আছে।

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: