উপরের ছবিটি রাশিয়ার একটা দুর্ভাগা অস্কার ক্লাস নিউক্লিয়ার সাবমেরিন ‘কুরস্ক’ যেটা ২০০০ সালের ১২ ই আগস্টে ১১৮ জন অফিসার আর ক্রু সহ ব্যারেন্টস সী তে ডুবে যায়।

.
কুরস্ক সাবমেরিন দুর্ঘটনা পৃথিবীর সাবমেরিনের ইতিহাসের একটি অন্যতম দুর্ঘটনা। কোল্ড ওয়ার শেষের পর রাশিয়ার প্রথম নৌ মহড়ার শুরুতেই ঘটে এই দুর্ঘটনা। এই দুর্ঘটনার ফলে রাশিয়ান নেভির ওয়ান অফ দ্যা বেস্ট অস্কার ক্লাস সাবমেরিন কুরস্ক ধ্বংস হয়ে যায়।

সাবমেরিন কুরস্ক

এটা ছিল একটা ১৯৯৪ সালে চালু করা রাশিয়ার তৈরী নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিন।মূল ঘটনায় যাওয়ার আগে চলুন এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কিছু জেনে নিই:
■সাবমেরিনটি লম্বায়: ১৫৪ মিটার বা ৫০৫ ফুট।
■ওজন: সাকুল্যে ১৮০০০ টন।
■শক্তির উৎস: নিউক্লিয়ার রিএকটর;
■হর্স পাওয়ার: ৫০০০০ হর্স পাওয়ার;
■প্রপেলার: ২ টা ৭ ব্লেডের প্রপেলার।💪💪
■সারফেস স্পীড: ঘন্টায় ১৬ নট।
■ডুবন্ত অবস্হায় স্পীড: ঘন্টায় ২৮ নট;
■মিসাইল: প্রত্যেকটাতে নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড সহ মোট ২৪ টা মিসাইল ছিল, যাদের রেন্জ ৫৫০ কিলোমিটার;
(তবে ঐ নিউক্লিয়ার ওয়ারহেডের ক্ষমতা বা কত কিলোটন টিএনটির সমান জানা যায়নি)
■টর্পেডো টিউব: মোট ৬টা;
■পুরো শরীরে প্রায় ৮ ইন্চি পুরু ইস্পাতের আবরণ শরীরের বাইরে ৮ ইন্চি পুরু রাবারের আবরণ ছিল যা দিয়ে রাডারকে ফাকি দেয়া যেত আর নিঃশব্দে চলতে পারত।
খাবারের অভাব না হলে এটা সারা বছর পানির নীচে ঘুরতে পারে।

এই ফাকে ডিজেল ইন্জিন চালিত সাবমেরিনের পাশে নিউক্লিয়ার সাবমেরিনের সুবিধাটা একটু বলি।
ডিজেল চালিত সাবমেরিনের ইন্জিন চালু থাকবার জন্য জ্বালানীর সাথে বাতাস বা অক্সিজেন লাগে।এত অক্সিজেন পানির নীচে পাওয়া কঠিন বা প্রায় অসম্ভব ছিল যার জন্য তাকে প্রায়ই পানির উপরে উঠে অক্সিজেন বা বাতাস সংগ্রহ করতে হয়। নিউক্লিয়ার রিএকটরের বেলায় জ্বালানী হল পদার্থের আনবিক বিক্রিয়া, অক্সিজেনের দরকার নেই। সুতরাং নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিন পানির নীচে চলতে পারে প্রায় যতদিন খুশি।

২০০০ সালের ১২ আগস্ট এই অসকার ক্লাশ নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিন ‘কুর্সক’ এক রহস্যজনক বিষ্ফোরণজনীত কারনে ১১৮ জন সাবমেরিন অফিসার এবং ক্রু, মিসাইল এবং টর্পেডো সহ এন্টার্কটিকা এবং নরওয়ের মাঝামাঝি ব্যারেন্টস সীতে প্রায় ১০০ মিটার নীচে ডুবে যায়।

পানির নিচে সাবমেরিন কুরস্ক

➡মূল ঘটনা:
২০০০ সালের ১২ আগস্ট। সেসময় রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ব্যারেন্ট সি তে এক নৌ মহড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯১ এ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর এটাই ছিল রাশিয়ান নেভীর সবচেয়ে বড় এক্সারসাইজ। ব্যারেন্ট সি তে এক্সারসাইজ চলতে থাকে। মোটামুটি সাড়ে এগারোটার দিকে আশেপাশে থাকা অন্যান্য শিপগুলো সোনারে ম্যাসিভ এক্সপ্লোশনের আওয়াজ পায়।কিন্তু যেহেতু এটা একটা মিলিটারি এক্সারসাইজ, এক্সপ্লোশন তো হবেই। আর সেসময় তারাও ফায়ারিং এ ব্যস্ত ছিলো। তাই কেউই ব্যাপারটাতে গুরুত্ব দেয়নি। রেডিও সাইলেন্স বজায় থাকায় কেউ কারো সাথে এটা নিয়ে আলোচনাও করেনি। আর করারই বা কি আছে, আশে পাশে হরদম শিপগুলো মিসাইল কামান ফাটাচ্ছে, রীতিমতো যুদ্ধাবস্থা।

মোটামুটি ছয় ঘন্টার পরে, এক্সারসাইজের রেডিও সাইলেন্স ব্রেক হলে , সবাই বুঝতে পারে যে রাশিয়ান নেভির গর্ব কুরস্ক কে পাওয়া যাচ্ছে না। একটি সাবমেরিনের মূল ট্যাকটিক্স ই হলো স্টেলথ, তাই এক্সারসাইজ কমান্ডার আরো অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। দুর্ঘটনার বার ঘন্টা পর, রাশিয়ান ন্যাভাল হেডকোয়ার্টারে খবর যায় যে তাদের একটা সাবমেরিন মিসিং। জরুরি যুদ্ধাবস্থায় ফুললি স্টেলথ থাকতে এই এক্সারসাইজের সময় কুরস্কে অ্যাকুইস্টিক সিগন্যাল বয়া ছিল না। ফলে লোকেট করতে করতে পার হয়ে যাও আরো চার ঘন্টা। দুর্ঘটনার প্রায় ১৬ ঘন্টা পর রাশিয়ান সার্চ অ্যার্ড রেসকিউ টিম কুরস্ক কে খুঁজে পায়।

উদ্ধার করা সাবমেরিন কুরস্ক

➡দুর্ঘটনার কারণ:
১২ ই আগস্ট ২০০০ সাল, সকালে একটা Naval Exercise বা নৌযুদ্ধের মহড়ার অংশ হিসাবে কুরস্ক দ্বারা যুদ্ধজাহাজ ‘পিতর ভেলিকী’ এর দিকে দুখানা ডামি টর্পেডো নিক্ষেপ করার কথা ছিল।
.
সকাল ১১:২৯ -একটা ‘৬৫-৭৬ কীট টর্পেডো’ কুরস্ক এর ৪ নং টর্পেডো টিউবে ভরা হল। ঐ টর্পেডোটা ছিল পুরোনো। ওটার জ্বালানী তথা উচ্চমানের হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড লীক করে বাইরে চলে আসে ফলে সৃস্টি হয় বাষ্প আর অক্সিজেন। এর ফলে সৃস্টি হয় প্রচন্ড চাপ যার ফলে টর্পেডোর ফুয়েল ট্যাংকে ঘটে বিষ্ফোরণ।টর্পেডোর দেড় টন হাই পারক্সাইড (অক্সিডাইজার) আর আধা টন জ্বালানী মিলে একটা ভাল বিষ্ফোরণ ঘটায়। ওটার ধাক্কা সম্মুখের কম্পার্টমেন্টে সরাসরি লাগে। ফলে সেখানকার ৭ জন ক্রু সাথে সাথে মারা যায়।
এরপর বিষ্ফোরণের ধাক্কা দ্বিতীয় ও তৃতীয় কম্পার্টমেন্টে লাগে। সেগুলো ছিল কমান্ড পোস্ট, মারা যায় বা গুরুতর আহত হয় কমান্ড পোস্টের ৩৬ জন অফিসার ও ক্রু।ঘটনার আড়াই মিনিট পরে আরেকটা বড় বিষ্ফোরণ ঘটে। রিখটার স্কেলে সেটার মান ছিল ৪.২, যা ৭ টি টর্পেডো বিস্ফোরিত হলে সম্ভব ছিল!!

বিস্ফোরণের পর উত্পন্ন নয়েজ গ্রাফ

৬ নং কম্পার্টমেন্টে ২৩ জন অফিসার আর ক্রু ছিল তারা ক্যাপ্টেন-লেঃ দিমিত্রি কলেশনিকভ এর নির্দেশে ৯ নং কম্পার্টমেন্টে জড়ো হলেন।তারা চেক করে দেখেন বেরুবার রাস্তা সব বন্ধ। বাঁচার একমাত্র উপায় উদ্ধারকারী জাহাজ। অক্সিজেনও দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল, নতুন করে বানাবার যন্ত্রও নেই।
অক্সিজেন তৈরী করার যন্ত্রটাও নস্ট হয়ে গিয়েছিল।ক্রুদের কেউ কেউ ৮-১০ ঘন্টা পর্যন্ত বেঁচে ছিল বলে শোনা যায় বা পরে ডায়েরি পড়ে সেরকমটাই জানা যায়। যদিও মান বাঁচাবার জন্য রাশানরা তখন বলেছিল ক্রুরা সবাই সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়।

➡উদ্ধার অভিযান:
দুর্ঘটনার খবর শুনে বৃটেন এবং নরওয়ে উদ্ধারের সাহায্যের প্রস্তাব দেয়।
কিন্তু নাক উঁচু রাশিয়া বিভিন্ন কারণে(যেমন সাবমেরিনের বিভিন্ন স্পর্শকাতর প্রযুক্তি বিদেশিদের হাতে পড়বে এই আশঙ্কায়)সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।দুর্ঘটনাটা এমন ভাবে ঘটে যে বেরুবার সমস্ত হ্যাচ চিরতরে বন্ধ হয়ে পড়ে এবং ক্রুদের বেরুবার বা বাঁচার কোন সম্ভাবনাই ছিলনা।

অনেক চিন্তাভাবনা করে এটার ভিতরের গোপনীয়তা যথা নিউক্লিয়ার সরন্জাম, টর্পেডো, এটা তৈরীর কৌশল ইত্যাদি রক্ষার জন্য অর্থাৎ যাতে বাইরের কেউ ওটা উদ্ধার করে না জেনে ফেলে সেজন্য রাশিয়া এটাকে উদ্ধারের পরিকল্পনা নেয়।তবে সেরকম কারিগরি দক্ষতা রাশিয়ার নিজের না থাকায় তারা হলান্ডের একটা কোম্পানীর সঙ্গে চুক্তি করে। হল্যান্ডের দুটো কোম্পানী একসাথে এটার জন্য কাজ করে:
১) ম্যামোয়েট ট্রান্সপোর্ট বিভি
২) স্মিট লিঃ

➡উদ্ধার কার্যক্রম:
২০০১ সালের ৭ ই অক্টোবর, দুর্ঘটনার প্রায় ১৪ মাস পরে হলান্ডের কোম্পানী দুটো তাদের উদ্ধার অপারেশন শুরু করে। উল্লেখ্য এধরনের কাজে তারাই ছিল পৃথিবীর অন্যতম সেরা ।
আঠার হাজার টনের একটা সাবমেরিন পানির নীচ থেকে টেনে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়। তার উপর আবার এটাতে প্রচুর টর্পেডো আর নিউক্লিয়ার মিসাইল ছিল। কাদায় জুতা আটকে গেলে ওজন অনেক বেশি হয়ে যায়, এটাও সেরকম হয়েছিল, ওজন হয়ে গেছিল প্রায় ৩৫০০০ টন। ছবিতে দেখলেন সামনের অংশ ভাংগা, সুতরাং পেচিয়ে টেনে তোলা ছিল বিপদজনক, সামনের অংশ ভেংগে পড়ে গেলে ভারসাম্য হারিয়ে একটা মারাত্মক দুর্ঘটনার সম্ভবনা থেকে যায়।

উদ্ধারকারী সাবমার্সিবল

ডাচ কোম্পানী এটার খোলে পানীর জেট দিয়ে ২৬ টা ফুটো করে সেখানে লোহার লকিং পিন ঢুকিয়ে #২৬ টা স্টীলের তারের সাহায্যে উপরে থেকে টেনে উদ্ধার করে।
প্রতিটা ফুটো প্রায় ১ মিটার ব্যাসার্ধের ছিল।
সাবমেরিনের গায়ে ফুটো করার জেটের পানির চাপ ছিল প্রায় ৯০০০ পিএসআই থেকে ২২৫০০ পিএসআই!!
মানে আপনার হাতের একটা আঙুলের উপর আস্ত হাতি দাঁড়ালে যেমন অবস্থা হবে অনেকটা তেমনি।

ব্যারেন্টস সী এর প্রচন্ড ঢেউ আর স্রোত, ঠান্ডা আবহাওয়া ইত্যাদি এসব অনেক বাধা ছিল।
এর পর এটাকে পানির নীচে রেখেই বার্জের সাহায্যে টেনে ১১২ মাইল দুরে রাশিয়ার মামোয়ের্স্ক নামক একটা বন্দরে নিয়ে রাখে। সেখানে এটাকে পুরোপুরি খুলে ফেলা হয়। একেকটা দড়ির ৪০০০ টন থেকে ৬০০০ টন পর্যন্ত টেনে তুলবার ক্ষমতা বা লিফটিং ক্যাপাসিটি ছিল।বার্জটাকে পানির উপরে স্হির রাখাও এক জটিল কাজ ছিল।

পৃথিবীর ইতিহাসে ওটাই ছিল প্রথম ঐ ধরনের অতো বড় অপারেশন। অবশ্য এর পরে আর অতো বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি সুতরাং অপারেশনের আর দরকার পড়েনি।কুরস্ক দুর্ঘটনার কারন হিসেবে বলা হয় Faulty weld on a 65–76 “Kit” practice torpedo , leading to an explosion of high-test peroxide and detonation of 5 to 7 torpedo warheads।
প্রথমে পারক্সাইড লিকের ফলে টর্পেডো রুমে আগুন ধরে যায়, ফলে আরো কয়েকটা টর্পেডো বার্স্ট করে।টর্পেডো জিনিসটা বানানোই হয়েছে এক শটে একটা শিপ বা সাবকে ধ্বংস করার জন্য, আর সেখানে চার পাঁচটা একসাথে ফাটলে আর কারোরই কিছু করার থাকে না। কুরস্ক সারফেস থেকে মাত্র একশ মিটার নিচে ছিল, যেহেতু এটা ছিল একটা মিলিটারি এক্সারসাইজ, তাই সাবমেরিন ক্রুরা ভেবেছিলেন এক দুঘন্টার মধ্যেই কোন জাহাজ তাদের উদ্ধার করবে।কিন্তু তা না হওয়ায় ১১৮ জন নাবিকের সবাই মারা যান।
উল্লেখ্য, এ ঘটনার পর রাশিয়া রেসকিউ ট্রেনিং অপারেশন বছরে প্রায় দ্বিগুন করে দেয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে এ ঘটনা সামলানো যায়।

➡একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব:
প্রথমে রুশ কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার কারণ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি কিংবা বলেনি। তারা এক এক বার এক এক তত্ব হাজির করছিল, যার মধ্যে অতি হাস্যকর কিছু কারণও ছিল। যেমন একটা তত্ব ছিল, সেই নিহ ১১৮ জন অফিসারের মধ্যে দু’জন মুসলিম, তাদের একজন আবার দাগেস্তানি, যেখানে এন্টিরুশ মিলিটান্টদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি, ইত্যাদি। কিন্তু তার সহকর্মীদের নিন্দা এবং প্রতিবাদের মুখে উড়ে যায় সেসব তত্ব। কিন্তু আসল ঘটোনা রুশ কর্তৃপক্ষ কখনও প্রকাশ করেনি।

তাহলে প্রশ্ন হল, আসলে কী ঘটেছিল সেখানে? কেন এই দুর্ঘটনা। কেনই বা রুশরা সত্য গোপন করেছে?

পর্দার পেছনের ঘটনা আরও জটিল।
এই নৌ মহড়া ছিল নতুন রাশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বড় সামরিক মহড়া। মহড়ার ব্যাপ্তী, আকার; ইত্যাদি বাইরের বিশ্বের কাছে কঠোর ভাবে গোপন রেখেছিল রাশিয়া। কিন্তু আমেরিকানরা মহড়ার খবর আগেভাগেই জেনে গিয়েছিল! তারা আগে থেকেই ব্যারেন্ট সাগরে দুটি ছোট আকারের গোয়েন্দা সাবমেরিন (ইউএসএস মেম্ফসিস), (ইউএসএস টলিডো) পাঠিয়েছিলো!

ঘটনার দিন(১২ই আগস্ট) তারা খুব কুর্সকের কাছে থেকে সতর্কভাবে গতিবিধি পর্যবেক্ষন করছিল। তাদের মিশন ছিল ইউএসএস মেম্ফসিস নজরদারী করবে সামুদ্রিক জায়ান্ট কুর্সকের, আর শ্যাডো সাপোর্টিং হিসেবে থাকবে ইউএসএস টোলিডো, যে ম্যাগনেটিক সিগনালের মাধ্যমে দুই আমেরিকান সাবমেরিনের অবস্থান ধরতে বিভ্রান্ত করবে রাশিয়ান জায়ান্ট সাবমেরিনকে, কারন যৌথ মহড়ায় চায়না সাবমেরিনও অংশ নিয়েছিল। স্বল্প দূরত্বে এরকম রণকৌশল সবসময়ই খুব বিপজ্জনক। এরকমই এক অসতর্ক ঘূর্ণনের সময় এক পর্যায়ে টোলিডো খুব নিকটে চলে আসে এবং একটা কুরস্কের সম্মুখভাগের সাথে একটা সংঘর্ষ হয়।

১৫৪ মিটার বিশাল রাশিয়ান সাবমেরিন কুর্সকের সাথে সংঘর্ষে ছোট ইউএস টোলিডো দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সংঘর্ষের পর পরই কুর্সকের ক্রু-রা বাইরে বিদেশী সাবমেরিনের অস্তিত্ব টের পেয়ে যায়। একই সাথে উপরে থাকা জাহাজ পিটার দা গ্রেট এই কোলিশন রেকর্ড করে। তক্ষনাত বাকি সাবমেরিনকে দ্রুত কুর্সকের নিকটে যাবার নির্দেশ প্রদান করে। কাছাকাছি এয়ার বেস থেকে উপরিভাগে ফাইটার জেটও পাঠানো হয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষনের জন্য।

সংঘর্ষের পর পরই টোলিডো স্থান ত্যাগ করে, তাকে কভার করে মেম্ফসিস। এদিকে কুর্সকের ক্রুরা শত্রু সাবমেরিনের উপস্থিতি টের পেয়ে তাদের শাকভাল ভিএ-১১১ টর্পেডো ছোড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কুর্সকের টর্পেডো লঞ্চিং ইউনিট একটিভেটেড করার প্রক্রিয়া শুরু হলে ইউএস মেম্ফসিসের ক্রু-রা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কেননা অতি দ্রুত গতির শাকভাল তাদের টর্পেডোর চাইতে দশ গুন বেশী গতিসম্পন্ন এবং সর্বাধিক ধ্বংসাত্বক টর্পেডো। আর শাকভাল লঞ্চ করে ফেললে তারা যে দুরত্বে ছিল, তাতে ডাইভ দেওয়া বা স্থান ত্যাগ করার কোনও সুযোগ ছিলনা। সুতরাং খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মেম্ফসিসের কমান্ডার কুর্সকের টর্পেডো লঞ্চিং ইউনিট একটিভেটেড হওয়াতে পাল্টা টর্পেডো ফায়ার করার সিদ্ধান্ত নিলেন!

দ্বিতীয়বার না ভেবেই মেম্ফসিস ফায়ার করে বসে কুর্সক লক্ষ্য করে। আমেরিকান মার্ক-৪৮ টর্পেডোর প্রথম আঘাতে কুর্সকের সামনের ভাগে টর্পেডো ইউনিটে থাকা অন্যান্য ডেটনেটর বিষ্ফোরিত হয়, দ্বিতীয় টর্পেডো কুর্সকের মাঝ বরাবর সরাসরি আঘাত করে। বিষ্ফোরন এততাই ভয়াবহ ছিল যে শক ওয়েভে আক্রমনকারী মেম্ফসিসও ভারসাম্য হা্রিয়ে ফেলে।
তলিয়ে যেতে থাকে রুশদের অহঙ্কার সমুদ্র জায়ান্ট বিশাল কুর্সক।

এই ঘটনার খবর শুরুতেই জেনে যায় রুশ নৌবাহিনী এবং প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, কিন্তু কৌশলগত কারণে তা গোপন রাখা হয়, কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে শুধু বলাহয় একটা অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা। নিউইয়র্ক টাইমস পরবর্তীতে আমেরিকান সাবমেরিনের গোয়েন্দাগিরির তথ্য ফাস করে দেয়।
রাশিয়ানরা ইউএসএস মেম্ফসিসের পালানোর সময় তার গতিবিধি লোকেট করতে সক্ষম হয়। প্রায় সাত দিন পর এটা রুশ সমুদ্রসীমা অতিক্রম করে নরওয়ের সমুদ্রসীমায় পৌঁছে। আর এর ফাঁকে ক্ষতিগ্রস্থ ইউএসএস টোলিডো অতি গোপনে সরাসরি আটলান্টিক হয়ে আমেরিকায় পৌছে।

এই ঘটনা রাশিয়ানদের উপর বিরাট প্রভাব ফেলে। রুশ নৌবাহিনী এর প্রতিশোধ নেবার জন্য উন্মুখ হয়ে যায়। প্রেসিডেন্টের উপর যুদ্ধ ঘোষণার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। পরবরতী ঘটনাপ্রবাহের ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন জরুরি কিছু পদক্ষেপ নেন, যে কোনওভাবে সম্ভাব্য যুদ্দ পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য। তিনি সিআইএ-র প্রধানকে জরুরি ভিত্তিতে এক গোপন সফরে মস্কো পাঠান, যা ছিল এক নজিরবিহীন ঘটনা। দুঃখপ্রকাশ করে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে ফোনালাপ করেন। রাশিয়ার সমস্ত ঋণ মওকুফ করে দেন। উলটো আরও সাড়ে দশ বিলিয়ন আমেরিকান ডলারের ছাড় করেন।

এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন পড়েন উভয়মুখি সংকটে। একদিকে এর জবাব দেবার জন্য ভেতরের চাপ, আরেকদিকে যুদ্ধ এড়ানোর জন্য বাইরের চাপ। কিন্তু শেষমেশ তিনি আমেরিকানদের সাথে সরাসরি সংঘাতে না যাবার সিদ্ধান্ত নেন। বরখাস্ত করেন শীর্ষ এডমিরালদের।

কিন্তু কেন আপোষ করলেন?
একদিকে ভঙ্গুর অর্থনীতির রাশিয়ার জন্য মাত্র সাড়ে দশ বিলিয়ন ডলার তখন ছিল আদতেই ‘বিরাট কিছু’, সাথে সব ঋন মওকুফ।আরেকদিকে পুতিন বুঝে গেছিলেন, খর্ব শক্তির রুশ শক্তি আমেরিকানদের সাথে পেরে উঠবে না। সুতরাং যুদ্ধে যাবার সিদ্ধান্ত নিতান্ত্বই আত্মঘাতী।

➡ডকুমেন্টারি সাজেশন:
এ সংক্রান্ত বেশ কিছু ভিডিও ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম।আপনারদের কে কয়েকটি ভিডিও সাজেস্ট করলাম।পোস্ট টা পড়ে যদি আপনার ভালো লাগে এবং এই দুর্ঘটনা সম্পর্কে আরো যদি জানতে চান,তবে নিচের ভিডিওগুলো দেখুন…😊
১- https://m.youtube.com/watch?v=vihv_cQBawo

২- https://m.youtube.com/watch?v=c93EUzwcLzU

৩- https://m.youtube.com/watch?v=wAIbxkm4rr4

#এম_আর_নাইন

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: