কলম্বিয়া তখন গৃহ যুদ্ধ আর মাদক যুদ্ধে নিমজ্জিত। এক দিকে জঙ্গলে ফার্ক গেরিলাদের অবাধ বিচরণ, অন্যদিকে দেশের সব প্রধান শহরে কলম্বিয়ান কোকেন লর্ডদের বাড়তে থাকা উৎপাত কলম্বিয়ান সরকারকে অতিষ্ঠ করে তোলে।

শহরের ভেতরে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছিল কলম্বিয়ান ন্যশনাল পুলিশ, কিন্তু ওদিকে পাহাড়ে হিমশিম খেতে হচ্ছিল কলম্বিয়ান সেনাবাহিনীকে। ষাটের দশক থেকেই কলম্বিয়ান সেনাবাহিনী ফার্ক গেরিলাদের সাথে যুদ্ধ করে আসছিল। কিন্তু কলম্বিয়ান সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণের সল্পতা ও পাহাড়ি অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়।

ফার্ক গেরিলা বাহিনীর পুরো নাম “Fuerzas Armadas Revolucionarias de Colombia—Ejército del Pueblo” যার মানে হচ্ছে “কলম্বিয়ার বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী — পিপলস আর্মি”। এরা মুলত একটি লেনিনিস্ট, বাম পন্থী সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী, যাদের আয়ের উৎস ছিল অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা, অবৈধ খনন ও চাঁদাবাজি। একে-৪৭ এবং একে-১০৩ ছিল ফার্ক ব্যবহৃত স্ট্যন্ডার্ড ইস্যু ওয়েপন, সিআইএ’র এক রিপোর্ট অনুযায়ী, এগুলো তারা যোগাড় করেছিল রাশিয়ান মাফিয়াদের মাধ্যমে এবং দক্ষিন আমেরিকার অস্ত্র চোরাচালানকারীদের থেকে, যা তারা আাজ ও ব্যবহার করে থাকে।

ফার্ক গেরিলাদের পতাকা

পরিস্থিতি সামাল দিতে ষাটের দশকের শুরুর দিকে কলম্বিয়ান সরকার তাদের কিছু সেনা অফিসারকে পাঠায় ফোর্ট বেনিং, জর্জিয়াতে আমেরিকান আার্মি রেঞ্জার কোর্স করার জন্য। এখান থেকেই যাত্রা শুরু কলম্বিয়ান আার্মি ল্যান্সেরোস কোর্সের। আমেরিকা থেকে ট্রেনিং শেষ করে অফিসাররা সেই ট্রেনিং দেয় নিজেদের সেনাবাহিনীর বাছাই করা কিছু সেনা সদস্য ও কর্মকর্তাদের।

তারা নিজেদের মত করে, রেঞ্জার কোর্স থেকে শেখা ট্যাকটিক্স, কলম্বিয়ার ভূপ্রকৃতি ও আবহাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে গঠন করে” কলম্বিয়ান আার্মি ল্যান্সেরোস কোর্স”। এই নতুন কোর্সে অংশগ্রহণ করে কলম্বিয়ান সেনা সদস্য এবং কিছু সংখ্যক কলম্বিয়ান নৌ-পদাতিক অফিসার।

ফোর্ট বেনিংটন, জর্জিয়া তে সফররত একজন কলম্বিয়ান সেনাকর্মকর্তা

১৯৫৯ সালে ক্যাপ্টেন হারনান্ডো বার্নাল ডুরানের হাতে ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম ল্যান্সেরোস কম্পানি। কলম্বিয়ান সেনাবাহিনীর সব সাধারণ সদস্যদের চেয়ে বেশি দ্রুত, ক্ষিপ্র ও আক্রমনাত্মক ছিল তারা। ফার্ক গেরিলা তৎপরতা যেখানে বেশি ছিল সেখানে ল্যান্সেরোদের কে ইউনিট গুলোর সাপোর্ট ইলিমেন্ট হিসেবে রাখা হত।

“ল্যান্সেরোস” নামের উৎপত্তি ইংলিশ শব্দ “ল্যান্স” থেকে, যার অর্থ “বল্লম”। যা ব্যবহার করেছিল সাইমন বলিভারের স্পেন বিরোধী সেনাবাহিনীর ” ল্যান্সার” ইউনিট গুলো। সাইমন বলিভারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থেই এর নাম দেয়া হয় “ল্যান্সেরোস”।

এই ল্যান্সেরোস কোর্স সাধারণত হয় কলম্বিয়ার রাজধানী বগতা/ সান্তা ফে দে বগতা থেকে দেড়শ মাইল দূরে টোলেমাইডা নামক স্থানে। এই কোর্স ৭৩ দিনের হয়ে থাকে এবং আমেরিকারন ইন্সট্রাক্টর ও কলম্বিয়ান ইন্সট্রাক্টরদের তত্যাবধানে সম্পন্ন করা হয়।

ল্যান্সেরোস স্কুল, টোলেমাইডা

চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতা ও সফলতার জন্য এই কোর্স আমেরিকা এবং ইউরোপের সেনাবাহিনী গুলোর মধ্যে সুখ্যাতি লাভ করে। ল্যান্সেরো স্কুল থেকে প্রতি বছর আমেরিকা, ফ্রান্স, পানামা, ইকুয়েডর ও বলিভিয়ান সেনাবাহিনীর সেনাসদস্য ও কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ লাভ করে থাকে।

ল্যান্সেরোস কোর্স সমাপনী অনুষ্ঠানে আমেরিকান স্পেশাল ফোর্স সদস্য

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: