শহীদ কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ ১৯৬৪ সালের ২১ মার্চ ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় জন্মগ্রহন করেন। কৃতিত্বপূর্ণ শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৮৩ সালের ২৩ ই ডিসেম্বর তিনি ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টে এ কমিশন লাভ করেন। কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ কে তার কর্মজীবনে সেনাবাহিনী,বিডিআর ও র‍্যাবের বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন।তিনি কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘ অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা মিশনে সামরিক পর্যবেক্ষক এবং সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘ সহায়তা মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি খুবই সাধাসিধে জীবনযাপন করতেন।
.
২০০৫ এ যখন র‍্যাবের “ইন্টেলিজেন্স উইং” গঠিত হয়, তাকে ইন্টেলিজেন্স উইং এর চিফ এর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৫ ছিল বাংলাদেশের সেই কলংকময় অধ্যায়,যখন জঙ্গিবাদের দৌরাত্বে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।
.
বাংলাদেশ যখন হুমকির সম্মুখীন ঠিক সেই মুহুর্তেই যেন জঙ্গীদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিতে আবির্ভাব হয় কর্ণেল গুলজারের। ২০০৫ সালের ‘সেই ১৭ আগস্ট’ সারাদেশে প্রকাশ্যে জঙ্গীদের বোমা হামলার ঘটনা ঘটলে তাঁর নেতৃত্বে জঙ্গীদের বিরুদ্ধে পাল্টা গ্রেফতার অভিযান শুরু হয়। তাঁর হাতেই ধরা পড়ে শায়খ আব্দুর রহমান সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই,আতাউর রহমান সানী হাফেজ মাহমুদ,সালাউদ্দিনসহ প্রায় শীর্ষ সব জঙ্গী নেতা। তার পরিচালিত “অপারেশন সূর্য দীঘল বাড়ি” আজও সারা বিশ্বের ফোর্সগুলোর কাছে এক অনুকরনীয় অপারেশন।
.
২০০৭ এর শুরুর দিকে তাঁকে র‍্যাব হতে
বিডিআরে বদলি করা হয়।বিডিআরেও
সফলভাবে দায়িত্ব পালনের পর তাকে পরে আবারো র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদে নিযুক্ত করা হয়।২০০৮ এর নভেম্বরের দিকে তার নেতৃত্বে প্রচুর পরিমাণ জেএমবির গ্রেনেড,বিস্ফোরক ও নাইট্রিক এসিড ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র সহ জঙ্গিরা ধরা পড়ে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার বীরত্বপূর্ন ভুমিকার জন্য জনগনের মাঝে তিনি জাতীয় বীর হিসেবে পরিচিতি পান।
.
জঙ্গীবাদ দমনে তাঁর যোগ্যতা প্রমাণের
স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তাঁকে র‍্যাব থেকে পুনরায় বিডিআরে বদলি করা হয়।১২ ফেব্রুয়ারী তিনি সিলেটের বিডিআর সেক্টর কমান্ডার হিসাবে যোগ দেন। সিলেটে বিডিআরে যোগ দিলেও তাঁর পরিবার থেকে যায় ঢাকা সেনানিবাস কোয়ার্টারে।
.
ফেব্রুয়ারির ১৫/১৬ তারিখে ফাতেমা (কর্নেল গুলজারের স্ত্রী) তাকে (কর্নেল গুলজার) বললেন, “শুনেছি সিলেটে জেএমবির সক্রিয়তা বেশি, আর বিডিআরে তোমার নতুন পোস্টিংয়ের কারণে সেখানে তোমাকে প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে হবে, যদি কিছু হয়…?” কর্নেল গুলজার শুধু বললেন, ”আমি শাহাদাতকে গ্রহণ করবো।”
.
রাইফেলস সপ্তাহে যোগ দিতে তিনি সোমবার রাতেই ঢাকা পৌঁছান।আর এটায় সবকিছু শেষ করে দেয়।
.
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী কতিপয় বিডিআর সদস্যের ষড়যন্ত্রের কোপে লাশ হতে হয় তাঁকে। সেই লাশে নির্যাতনের চিহ্ন এতটায় ভয়াবহ ছিল যে প্রথমে এত লাশের ভীড়ে গুলজারের লাশটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা। তবে যখন তা পাওয়া যায় তা ছিল কল্পনাতীতভাবে বিকৃত অবস্থায়। অনেক খোজাখুজির পর মার্চের প্রথম সপ্তাহে ৫টি পরিচয়হীন লাশ পাওয়া যায়। সেসকল দেহে এতটায় নিষ্ঠুরতার চিহ্ন ছিল যে ডিএনএ পরীক্ষা করা ব্যতীত লাশের পরিচয় বের করা অসম্ভব ছিল। অন্য একটি পরিবার ভূলবশত গুলজারের লাশ চিহ্নিত করলে লাশটি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে আনা হয়।তাই এখনও জানা সম্ভব হয়নি তাঁর লাশ কি নর্দমা থেকে না ঘটনার পর দেওয়া গনকবর থেকে উদ্ধার হয়েছিল। শেষমেশ উপায় না দেখে গুলজার কন্যা চতুর্দশী জাহিন তাসনিয়াকে জেনেটিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হলে তাঁর লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়।আর তাঁর পচনধরা ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখে পরিবার পরিজনরা আতঙ্কে আৎকে ওঠে। পরিবারের একজন সদস্য বলেন, “তাঁর চেহারা চেনা খুব কষ্টসাধ্য ছিল আমাদের জন্য।”কেননা লাশের চোখজোড়া উপড়ে ফেলা হয়েছিল।তাঁর মেরুদন্ড ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল।আর বাকী লাশে ছিল ভয়ানক নির্যাতনের চিহ্ন।
.
এইভাবে মর্মান্তিক ভাবে শহীদ হন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বীর সেনানি ও অন্যতম চৌকস সদস্য,কর্নেল গুলজার উদ্দীন আহমেদ।অথচ আজ তরুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছে নিজ দেশের বীরদের বীরগাথা। কথায় আছে,যে জাতি বীরকে সম্মান দিতে
জানে না, সে জাতিতে বীর জন্মায় না !!
.
দু:খিত স্যার,স্যালুট আপনাকে 🙂 ?

Facebook Comments

2 Comments

palash · December 9, 2017 at 1:13 pm

oh

Al Jaim Pappu · December 9, 2017 at 3:11 pm

:'(

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: