কর্নেল আবু তাহের আবু তাহের ১৯৩৮ সালের ১৪ ই নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের আসামের বদরপুরে জন্মগ্রহন করেন। তার পৈতৃক নিবাস নেত্রকোনা জেলায়। তার বাল্যকাল কেটেছে আসামে। শৈশব হতেই তিনি ছিলেন ডানপিটে ও অসীম সাহসী। তার বয়স যখন মাত্র ১৪ অর্থাৎ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে তিনি তার কয়েকজন সহপাঠী নিয়ে ক্ষোভের বশে নুরুল আমিনকে বহনকারি ট্রেনেই হামলা করে বসেন ও পাথর ছুড়েন কামরা লক্ষ করে আরেকবার ডাকাতের পথরোধ করেন। এছাড়াও আরো সাহসী ঘটনা আছে তার বাল্যকালের।

বিএ পাশ করে দ্বিতীয় বারের চেস্টায় তিনি ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অফিসার হিসেবে যোগদান করেন ও ১৯৬২ তে কমিশন লাভ করেন। উনি পাকিস্তানী স্পেশাল ফোর্স এসএসজির সবচেয়ে সেরা কমান্ডো ছিলেন তার সময়ে যা আজ ও অনুকরনীয়। “হেল কমান্ডো” বইতে মেজর আনোয়ার হোসেন তার সাথে কমান্ডো কর্নেল তাহের এর কিছু স্মৃতি উল্লেখ করেছেন। তিনি ব্যাপক এডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ ছিলেন ও এডভেঞ্চার এই আনন্দ খুজে পেতেন। বিদেশী বহু ইন্সটিটিউট হতে তিনি কমান্ডো ট্রেনিং ও সম্মাননা পেয়েছিলেন। আমেরিকান এক ইন্সটিটিউট তাকে সার্টিফিকেট প্রদান করে এই মর্মে যে,”যেকোনো জায়গায়, যেকোনো আর্মির সাথে, যেকোনো পরিস্থিতিতে তিনি যুদ্ধ করতে সক্ষম ও বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম “। ১৯৬৫ সালের ভারত – পাকিস্তান যুদ্ধে কাশ্মীর আর শিয়ালকোট সেক্টরে যুদ্ধ করেন ও একমাত্র বাঙালি অফিসার হিসেবে ‘মেরুন প্যারাস্যুট উইং’ সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৭১ এ পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধের মাঝ সময়ে তিনি কয়েকজন বাঙালি সেনাসহ এদেশে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। মুক্তিযুদ্ধে একটি পা হারিয়ে এ অন্যতম সেরা কমান্ডো পঙ্গুত্ব বরন করেন।

১৪ নভেম্বর ১৯৭১সালে তাহেরের ৩৩তম জন্মদিনে কামালপুর শত্রু-ঘাঁটি দখলের জন্য স্থির করেন। যথাসময়ে পরিকল্পিত মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে পাকসেনাদের একজন মেজরসহ দুটি কোম্পানি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় । ভোরের দিকে যখন শত্রু-ঘাটির পতন আসন্ন তখন অগ্রবর্তী একটি কোম্পানির অধিনায়ক লে: মিজানের কোন খবর পাওয়া যাচ্ছিল না । কর্নেল তাহের সহযোদ্ধার খোঁজে নেমে পড়েন রণক্ষেত্রে এবং ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। হঠাৎ শত্রুপক্ষের ছুড়ে দেয়া গোলার আঘাতে হাঁটুর উপর থেকে বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । এভাবে পঙ্গুত্ব বরন করেন কর্নেল তাহের।

মুক্তিযুদ্ধে অসাধারন অবদান রাখার জন্য তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন। তিনি সেনাবাহিনীর কর্নেল পদ হতে পদত্যাগ করেন মনোমালিন্যের কারনে। উনি বামপন্থী রাজনীতির অনুসারী হওয়ার কারনে তিনি এক অন্যরকম বিপ্লবের প্রত্যাশী ছিলেন যেটার নাম তিনি দিয়েছিলেন সিপাহী জনতার বিপ্লব। ব্যাপার টা অনেক টা এরকম যে তৎকালীন চীনা গনবাহিনীর মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও কোন অফিসার থাকবে না,সব সৈনিক ও সর্বোচ্চ পদ হবে সুবেদার। বস্তুত তা কোন বাস্তবসম্মত পরীকল্পনা ছিল না। কর্নেল তাহের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ও বিদ্বেষী ছিলেন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষত তার সেই বিপ্লবের প্রস্তুতি ও সেই স্বপ্ন দেখার সময়। তার এই বিপ্লবের স্লোগান ছিল,”সিপাহী জনতা ভাই ভাই, অফিসার দের কল্লা চাই”

১৯৭৫ এর ৩ ই নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ যে ক্যু করেছিলেন তার ই পালটা ক্যু হিসেবে ৭ ই নভেম্বর ক্যু করে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ কে অপসারন করেন ও বন্দী সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান কে মুক্ত করেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে জিয়াউর রহমান তাকে রেহাই দেন নি। ১৯৭৬ এর ১৭ জুলাই প্রহসন মূলক গোপন সামরিক বিচারের মাধ্যমে কর্নেল তাহেরকে হত্যার উদ্দেশ্যে ফাঁসির রায় দেয়া হয়। ১৭ জুলাই বিকেলবেলা মামলার রায় হয় আর ২১ জুলাই তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ডেথ ওয়ারেন্ট ইস্যু করার মাত্র ৩ দিনের মাথায় ফাঁসি কার্যকর করা হয়। অথচ জেল কোড অনুযায়ী ডেথ ওয়ারেন্ট ইস্যুর ২১ দিন এর আগে বা ২৮ দিন এর পরে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার বিধান নাই। ২০১১ সালের আদালতের এক রায়ে সে বিচার কে অবৈধ ঘোষনা করা হয়।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: