প্রশ্ন : জেনারেল ওসমানীর কাছে কেন পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করল না ? ভারতের কাছে কেন ?
.
=> দুঃখিত জনাব আপনার ধারনা ভুল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী কখনোই ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। তারা আত্মসমর্পণ করেছিল যৌথবাহিনীর কাছে। একটা ব্যাপার বুঝে নেওয়া জরুরি যে যৌথবাহিনীতে আমরাও ছিলাম।
.
এমনিতে প্রশ্ন হয় ওসমানী কেনো আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। মূল কারণটা হচ্ছে আর্মি প্রটোকল। তাজউদ্দিন আহমেদ যদি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিযোগ না দিতেন তাহলে সিনিয়ারিটি অনুযায়ী বাই ডিফল্ট পদটা পেতেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার, কারণ তিনিই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র অফিসার এবং একই সঙ্গে উপ-সেনাপ্রধান। অন্যদিকে ওসমানী তখনও কর্ণেল এবং তাকে জেনারেল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় ১৬ ডিসেম্বরের পর। যাহোক তারপরও তিনি আমাদের প্রধান সেনাপতি এবং ভারতীয় বাহিনীর প্রধান স্যাম মানেকশর সমানই তার মর্যাদা ছিলো তখন। অন্যদিকে অরোরা একজন আঞ্চলিক প্রধান। পূর্ব ফ্রন্টের অধিনায়ক। যেমন লে.জেনারেল নিয়াজীও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ব ফ্রন্টের অধিনায়ক। পূর্ব ফ্রন্টের জন্য গঠিত মিত্রবাহিনী তাই অরোরার কমান্ডেই হবে সেটাই স্বাভাবিক। ওসমানী কেনো সই করবেন? পাকিস্তানের পক্ষে কি তাদের সেনা প্রধান সই করেছিলো? আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে কি স্যাম মানেকশ ছিলেন? তাহলে ওসমানী কেনো যাবেন?
.
চলুন এ ব্যাপারে ওসমানী নিজে কি বলেছেন শুনে নেওয়া যাক :
.
১৮ ডিসেম্বর সদর দপ্তরে ফিরে তাকে নিয়ে এসব গুজব শুনে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন ওসমানী। তার মন্তব্য ছিলো:

দেখুন আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখ হলো স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে কোনো চেতনা এখনও জন্ম হয়নি। আমাকে নিয়ে রিউমার ছড়ানোর সুযোগটা কোথায়? কোনো সুযোগ নেই। তার অনেক কারণ রয়েছে। নাম্বার ওয়ান- পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কবে আত্মসমর্পণ করবে আমি জানতাম না। আমি কলকাতা ছেড়ে চলে. যাওয়ার পর তাদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাব এসেছে।নাম্বার টু- ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমার যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ এই সশস্ত্র যুদ্ধ ভারত-বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডের অধীনে হলেও যুদ্ধের অপারেটিং পার্টের পুরো কমান্ডে ছিলেন ভারতীয় সেনাপ্রধান লেফট্যানেন্ট জেনারেল স্যাম মানেকশ। সত্যি কথা হচ্ছে আমি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো নিয়মিত সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধানও নই। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। কারণ বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী কোনো দেশ নয়।আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল মানেকশকে রিপ্রেজেন্ট করবেন লে.জে অরোরা। জেনারেল মানেকশ গেলে তার সঙ্গে যাওয়ার প্রশ্ন উঠতো। সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে আমার অবস্থান জেনারেল মানেকশর সমান। সেখানে তার অধীনস্থ আঞ্চলিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার সফরসঙ্গী আমি হতে পারি না। এটা. দেমাগের কথা নয়। এটা প্রটোকলের ব্যাপার।আমি দুঃখিত, আমাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধের বড় অভাব।।ঢাকায় ভারতীয় বাহিনী আমার কমান্ডে নয়। জেনারেল মানেকশর পক্ষে জেনারেল অরোরার কমান্ডের অধীন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে যৌথ কমান্ডের ভারতীয় বাহিনীর কাছে। আমি সেখানে (ঢাকায়) যাবো কি জেনারেল অরোরার পাশে দাড়িয়ে তামাশা দেখার জন্য? হাও ক্যান আই! আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করবেন জেনারেল মানেকশর পক্ষে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আর পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষে জেনারেল নিয়াজী। এখানে আমার ভূমিকা কি? খামোখা আমাকে নিয়ে টানা হ্যাচড়া করা হচ্ছে।
.
আর তার হেলিকপ্টারে গুলি লেগেছিল বলে তিনি ঢাকায় আসতে পারেননি,গল্পটা যে ভুয়া তাতো নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন তার কথায়। ওসমানীর উদ্দেশ্য কখনোই ঢাকা ছিল না,তিনি যাচ্ছিলেন হবিগন্জে। এবং গুলি হওয়া সত্যেও তিনি নিরাপদেই হবিগন্জ পৌছান। আপনাদের এ প্রপাগান্ডা মাঠে মারা গেল।

                            হবিগঞ্জে পৌছানোর পর এম এ জি ওসমানী

পরিশেষে একটাই কথা,যাচাই বাছাই ছাড়া কোন প্রপাগান্ডায় কান দিবেন না।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: