লেখকঃ মেজর জেনারেল আবদুল মতিন

 

………..সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কখন যে দ্বাদশ শ্রেণীতে
উত্তীর্ণ হয়েছি, টেরই পাইনি। এইচএসসি পরীক্ষার
প্রস্তুতিমূলক ক্লাস চলছে। ইতিমধ্যে ১ম বিএমএ দীর্ঘ
মেয়াদী কোর্সে যোগদানের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন
প্রকাশিত হয়েছে। আমার আর এনশাদের সেনাবাহিনীতে
যোগদানের ব্যাপারে তেমন কোন আগ্রহই নেই। আমার
ইচ্ছে প্রকৌশলী হবো আর ও ডাক্তার। কিন্তু ক্যাডেট
কলেজের তৎকালীন এডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন কামাল শাহেদ
আমাদেরকে রাজী করালেন যেন অন্ততঃ পরীক্ষাটা দেই।
রাজী হলাম। একটার পর একটা পরীক্ষা দিতে দিতে কী করে
যেন সবগুলি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গেলাম। কিন্তু
ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার হওয়ার সিদ্ধান্তে আমরা তখনও অটল।
কিন্তু আমার বাবার আকস্মিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কারণে ঢাকায়
এসে বুয়েটে ভর্তি হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সাধ কিছুটা ফিকে হয়ে
গেল। সে সময়কার আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে আমি ভর্তি হয়ে
গেলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ওদিকে
এনশাদ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ
হয়েছে। সে বছর ভর্তির সুযোগ পাওয়া খুব কঠিন হয়ে
পড়েছিল। সেশন জট কমানোর উদ্দেশ্যে এইচএসসি’র দুই
ব্যাচকে এক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমরা আবার ছিলাম
পরের ব্যাচের ছাত্র।

 

জানা গেল, এনশাদের ক্লাস শুরু হতে দেরি হবে। ওদিকে আমার
ক্লাস ততদিনে শুরু হয়ে গেছে। প্রতিদিন রিক্সা, ট্রেন আর
বাসযোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই আর একইভাবে
বিকেলে বাসায় ফিরি। কিন্তু এনশাদের সাথে আগের মতই সকল
যোগাযোগ, সাক্ষাৎ আড্ডা প্রতিদিনই হয়। মাঝে মাঝে নিজের
মধ্যেই ক্ষোভ জন্মে এ ভেবে যে, এনশাদ মেডিকেল
কলেজে পড়তে ঢাকায় যাবে আর আমি চট্টগ্রামে থাকব, ওর
সাথে দেখা সাক্ষাৎ আড্ডা বন্ধ হয়ে যাবে।

ইতিমধ্যে সেনাসদর, ঢাকা থেকে চিঠি এসেছে বাংলাদেশ মিলিটারি
একাডেমিতে যোগদানের জন্য। যোগদানের তারিখ ২০ জানুয়ারি
১৯৭৭। আমার আর এনশাদের সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া ছিল
যোগদান না করার। কাজেই সেনাসদরের এ চিঠি আমাদের
সিদ্ধান্তে তেমন কোন প্রভাব তখন পর্যন্ত ফেলতে পারেনি।
১২ জানুয়ারি ১৯৭৭। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পিরিয়ড শেষ করে ক্লাব
থেকে বের হয়ে ক্যান্টিনে যাব। পথে আমাদের ক্যাডেট
কলেজের ১৬তম ব্যাচের ক্যাডেট নকীব ভাইর সাথে দেখা।
তিনি বিএমএ তে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ৬ষ্ঠ শর্ট কোর্সের
ক্যাডেট। আমার মেজ ভাইয়ের বন্ধু। তিনিই আলাপচারিতার এক
পর্যায়ে আমাকে বললেন, ‘তুমি আর এনশাদ নাকি আর্মিতে চান্স
পেয়েও যাচ্ছ না?’ আমি উত্তর দিলাম ‘হ্যাঁ’। এবং আর্মিতে যোগ না
দেয়ার কারণও ব্যাখ্যা করলাম। প্রধান কারণ, অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ
জীবন এবং কায়িক ও মানসিক শ্রম, যা আমাদের পক্ষে করা কঠিন।
তিনি উত্তরে বললেন, ‘ক্যাডেট কলেজ এবং বিএমএর
জীবনের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই।” তিনি আরও বললেন,
বিএমএর জীবন মোটেই কষ্টকর নয় বরং রোমাঞ্চকর এবং ইচ্ছা
করলেই যে কেউ বিএমএর জীবন উপভোগ করতে পারে।
হঠাৎ করেই যেন নকীব ভাই আমার মনে একটা দ্বিধা দ্বন্দ্বের
বীজ বাপন করে দিলেন।

ঐ দিন আমি অন্যদিনের তুলনায় তাড়াতাড়িই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাসায়
ফিরলাম। খাওয়া-দাওয়া সেরে এনশাদের বাসায় গেলাম। বিএমএ’তে
যাবো কি যাবো না এ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করলাম, কিন্তু
কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। তবে মনে মনে ভাবছিলাম,
নকীব ভাই সত্যিকার অর্থেই আমার মনে একটি সিদ্ধান্তহীনতার
বীজ বপন করেছেন যা আমি এরই মধ্যে এনশাদের মাথায়
প্রবেশ করিয়েছি। শেষে হঠাৎ করে এনশাদকে বললাম, ‘যারা এ
এমসি কোরের অফিসার তারা তো ডাক্তারি পাশ করেই
সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। তাহলে ডাক্তারী পেশার
চেয়ে সেনাবাহিনীর পেশা সম্ভবতঃ আরও মর্যাদার এবং
সম্মানের। এ কথা বলার পর এনশাদ বলে বসল, ‘চলো
সেনাবাহিনীতে যাই’। ব্যাস, সিদ্ধান্ত হয়ে গেল; কিন্তু সমস্যা
রয়ে গেল আমার মা আর খালাম্মা (এনশাদের মা)।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার বড় মামাকে কাজে লাগাব আমার মাকে
রাজী করানোর জন্য। আর এনশাদের ক্ষেত্রে আমি এবং
এনশাদ দু’জনে মিলে খালাম্মাকে রাজী করাব। খাল্লামাকে যখন
আমাদের সিদ্ধান্তটা জানালাম, তিনি রসিকতার সুরে বলে উঠলেন,
‘সেনাবাহিনীতে কি অফিসারের দুর্ভিক্ষ চলছে যে
তোমাদেরকে বরণ করার জন্যে সেনাবাহিনী প্রধান ফুলের
মালা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে?” তোমাদের সেনাবাহিনীতে যাওয়ার
দরকার নেই। যে সিদ্ধান্ত আগে নিয়েছ সেই সিদ্ধান্তই বহাল
থাক।” একই অবস্থা আমার বাসায়ও।

এদিকে বিএমএ’তে যোগদান করার সময় ঘনিয়ে এসেছে।
শেষমেষ আমাদের অনেক কাকুতি মিনতির পর দুই মায়ের কাছ
থেকেই সম্মতি পাওয়া গেল। দিনটা ছিল ১৬ জানুয়ারি ১৯৭৮। উঠে
পড়ে লেগে গেলাম বিএমএ’তে যোগদান করার প্রস্তুতিতে।
অনেক কাজ। জিনিসপত্র জোগাড় করতে হবে। কাপড় চোপড়
কিনতে হবে। সব প্রস্তুতি চলছে টিকই। এরমধ্যেই এনশাদ
একদিন বলে বসল, ‘চল আগের সিদ্ধান্তেই ফিরে যাই।” আমিও
সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম। আবার পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত বদল।
এমনি করতে করতেই ২০ জানুয়ারি ১৯৭৮ এসে গেল। সব কিছু তৈরি।
দু’জনে মিলে ঠিক করলাম, একটু দেরি করেই বিএমএ’তে যাব
যাতে সিনিয়রদের কাছ থেকে শাস্তি কম পেতে হয়। দুজনে
এক সাথে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সাথে বড় ট্রাংক। বিকেল
সাড়ে চারটার সময় আমি একটি স্কুটারে করে বিএমএ গেটে
পৌঁছলাম। স্কুটারে ট্রাংক রেখে আমি নেমে বিএমএ গেটের
কাছে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম এনশাদ এসেছে কিনা।
দেখলাম অনেক নতুন ক্যাডেট নানা ধরনের কসরত করছে।
কেউ ডিগবাজি দিচ্ছে। কেউ ইট হাতে নিয়ে উঠবস করছে।
কেউ ‘ফ্রন্ট রোল’ দিচ্ছে। আবার কেউবা ড্রেনের নোংরা
পানিতে সিনিয়রদের ভাষায় “পবিত্র গোসল করছে।” আমি তখন
এনশাদকে খোঁজার চেষ্টা করছি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এনশাদ
বিএমএতে না এলে আমিও বাসায় ফিরে যাব।

না, এনশাদ আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। দেখলাম, ট্রাংক মাথায়
এনশাদ সিনিয়ারদের হুকুম তামিল করতে গিয়ে এদিক ওদিক দৌঁড়াচ্ছে।
ওকে দেখার সাথে সাথে আমার মনোবল বেড়ে গেল। আমি
মাথায় ট্রাংক নিয়ে বিএমএ গেট দিয়ে ঢুকে ওদের দলেই যোগ
দিলাম। এর মধ্যে আমাদেরকে কোম্পানী এবং প্লাটুন এ ভাগ
করা হল। আমি পড়লাম বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফ
কোম্পানীর ১০ নং প্লাটুনে। এনশাদ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান
কোম্পানীর ১১ নং প্লাটুন।

শুরু হল বিএমএ’র কঠোর প্রশিক্ষণ। মাঝে মধ্যে আমাদের
দেখা হয়। বিএমএ’র কঠিন কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনে নিজ সময়
বের করে কারো সাথে কথা বলা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়েই
পড়ে। ধীরে ধীরে বিএমএ’র জীবনধারার সাথে নিজেকে
মানিয়ে নিলাম। সবার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে আমরা দুজন
একাডেমির প্রথম সারির ক্যাডেটদের মধ্যে জায়গা করে নিলাম।
এর মধ্যে এক বৎসর অর্থাৎ দুই টার্ম পার হয়ে গেল। এবার আমরা
দুজন বদলী হয়ে একই কোম্পানীতে অর্থাৎ বীরশ্রেষ্ঠ
ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কোম্পানীর ১ নং প্লাটুনে
যোগ দিলাম। তাও আবার পদোন্নতি নিয়ে সেই টার্মের
সর্বোচ্চ পদবী সার্জেন্ট হিসেবে। এনশাদ কোম্পানী
সার্জেন্ট। আর আমি গেমস সার্জেন্ট। দুজনে কোম্পানীর
নিজ নিজ কাজ ভাগ করে নিয়ে কোম্পানীকে বিভিন্ন
প্রতিযোগিতায় ভাল ফলাফল করানোর জন্য নিরলস প্রচেষ্টা শুরু
করলাম। প্রায় সর্বক্ষেত্রেই সাফল্যও মিলল।
আমরা প্রায় ২২ জন থাকি এক রুমে। আমি আর এনশাদ থাকি পাশাপাশি।
কোন সিনিয়র ক্যাডেট নেই। বেশ আনন্দেই কাটছে বিএমএ-র
জীবন। এনশাদ আবার বেশ ঘুমের পাগল। সুযোগ পেলেই
ঘুমিয়ে নেয়। এমনকি পাঁচ মিনিটের বিরতিতেও সে গভীর ঘুমে
চলে যেতে পারত। কিন্তু এই ঘুমের জন্য তার কর্তব্যে
অদক্ষতা কিংবা দায়িত্ব পালনে কোন অবহেলার ছাপ পড়তে দেখিনি
কখনও। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেও আমাকে বলত, সকালে
যেন ওকে ঠিক সময়ে ডেকে দিই। অথচ প্রত্যেক দিন খুব
ভোরে সেই আমাদের সকলকে ডেকে দিত এই বলে
”Gentleman Please get up It’s parade time” “আমরা ঘুম
থেকে উঠে দেখতাম এনশাদ এরইমধ্যে প্রাতঃকৃত্য সেরে
ইউনিফর্ম পরে আরেক পর্ব ঘুমের আয়োজন করছে। কী
আশ্চর্য রকমের দায়িত্ববোধ। এই কাজের জন্য ওর নাম হয়ে
গেল ‘কোম্পানী সেন্ট্রি’।

ফাইনাল টার্মে আমাদের আরও একটি পদোন্নতি হলো। এনশাদ
বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর কোম্পানীর সিনিয়র আন্ডার অফিসার
আর আমি জুনিয়র আন্ডার অফিসার, যাকে বলে ‘ক্রস বেল্ট
হোল্ডার।” সম্মানের পদবী হিসেবে আমাদের জন্য আলাদা
রুম বরাদ্দ হল। সাথে আরও একজন আমাদের ক্যাডেট
কলেজের ক্লাসমেট কামাল। তিনজন একরুমে থাকি। বেশ
ভালোই কাটছিল আমাদের। সামনে ডিগ্রী পরীক্ষা এবং
তারপরেই কাঙিক্ষত পাসিং আউট প্যারেড। অত্যন্ত ব্যস্ত সময়।
একবার বিছানায় পিঠ লাগলে কথাই নেই। সাথে সাথেই ঘুম।
এর মধ্যে এনশাদ আনন্দ পাওয়ার এক অভিনব পন্থা বের করল।
রাতে এক ঘন্টা পর পর এলার্ম, কোত্থেকে বিকট শব্দ করা
এলার্ম ঘড়ি সে যোগাড় করেছে তা সেই জানত। রাতে আমার
আরামদায়ক ঘুম হারাম হয়ে গেল। এক ঘন্টা পর এলার্মের শব্দে
ঘুম ভাঙলে এনশাদ আবার পরবর্তী এক ঘন্টার এলার্মে সেট
করে। সারা রাত এই করতে করতে পার করলাম। সকালে এনশাদকে
এই অভিনব বিরক্তিকর কর্মকান্ডের কারণ জানতে চাইলাম। উত্তরে
যা বলল তা শুনে আমার ভিমরি খাওয়ার অবস্থা। ওর ভাষ্যমতে, রাতে
ঘুমাতে যাওয়ার পর যদি এক ঘন্টা পর পর ঘুম ভাঙে এবং ঘড়ি দেখে
জানা যায় যে আরও কয়েক ঘন্টা ঘুমানো যাবে তাহলে
বিএমএ’তে এর চেয়ে আনন্দের আর কী থাকতে পারে?
যেমন রাত দুইটায় যদি ঘুম ভেঙে দেখা যায় যে, ভোর পাঁচটা
হওয়ার আরও তিন ঘন্টা বাকি আছে এর চেয়ে আনন্দদায়ক বিষয়
বিএমএ কেন, পৃথিবীতে আর কিছুই হতে পারে না। কাজেই এই
বিমল আনন্দ পাওয়ার জন্য এনশাদ এই অভিনব পন্থা আবিষ্কার
করেছে। কিন্তু এনশাদকে আমরা কী করে বোঝাই,
আমাদের ঘুম ভাঙলে ওর মত অতি দ্রুত আবার ঘুমের রাজ্যে
ফিরে যেতে পারি না। অন্যদিকে এনশাদকে এই আনন্দ থেকে
আমরা বঞ্চিতও করতে পারি না।অগত্যা এনশাদের এই যন্ত্রণা আমরা
কুইনাইন খাওয়ার মতই একরকম মেনে নিলাম।
বিএমএতে এনশাদকে খুব কম জেসিও/এনসিও প্রশিক্ষকই সঠিক
নামে ডাকত। এরশাদ, আরশাদ, ইনসান ইত্যাদি কত নাম। যখন তার পুরো
নাম ‘এনশাদ ইবনে আমিন’ বলতে হতো, তখন অনেক জেসিও/
এনসিও প্রশিক্ষকই বলত, “আপনি কি সৌদি ক্যাডেট? নামের সাথে
ইবনে কেন? এরকম কত আনন্দ আর কষ্টময় স্মৃতি নিয়ে
ধীরে ধীরে সেই কাঙিক্ষত পাসিং আউট প্যারেডের দিকে
আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম।

অবশেষে ১৯৭৯ সালের ২২ ডিসেম্বর ১ম বিএমএ দীর্ঘ
মেয়াদী কোর্সের ক্যাডেট হিসেবে পাসিং আউট শেষে
কমিশন পেয়ে গেলাম। এনশাদ কোর্সে অত্যন্ত ভাল ফলাফল
করল। মেধা তালিকায় ৩য়। অল্পের জন্য সোর্ড/ কেইন পেল
না। আমার পায়ের গোড়ালীতে ফ্র্যাকচার হওয়ার কারণে বেশ
কিছু ক্লাস করতে পারিনি। ফলে আমার স্থান আরও একটু পরে।
তবে এইটুকু বুঝতে পারি বিএমএ এবং এর পরবর্তী পর্যায়ে
আমাদের যা কিছু অর্জন তার পেছনে আমাদের প্রিয় ফৌজদার হাট
ক্যাডেট কলেজ এবং শিক্ষক মন্ডলীর অবদান অনস্বীকার্য।
আমরা দুজনে আর্টিলারী অথবা ইঞ্জিনিয়ার্সে যেতে
চেয়েছিলাম। এনশাদ আর্টিলারীতে ঠিকই গেল কিন্তু আমি এলাম
এএমই কোরে।

দুজনেরই পোস্টিং ঢাকায়। মাঝে মধ্যে দেখা হয়। আমি বুয়েটে
ভর্তি হয়ে গেলাম। এনশাদ বেসিক কোর্স করার জন্য আর্টিলারি
সেন্টার ও স্কুলে চলে গেল। ঢাকায় আসলে মাঝে মধ্যে
আমার রুমে উঠতো। এর মধ্যে কখন সে প্রেমে পড়ল,
আমার জানা নেই। যখন জানলাম, তখন ওর ওপর আমার একটু অভিমানই
হল। কারণ সবসময় আমার সাথে সব কিছুই শেয়ার করত। কিন্তু
এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো। বললাম, “এখনই আমাকে অবজ্ঞা
করতে শুরু করেছো। ওই মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী
করলে আমার সাথে তো আর সম্পর্কই রাখবে না।
না, এনশাদ সব সময়ই সম্পর্ক রেখেছে। বরং আমি হয়তো
কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছি। তখনও সেনাসদরের
এমএস ব্রাঞ্চে, আর আমি বেস ওয়ার্কশপে। সময়টা ১৯৯০-১৯৯১
সাল হবে। স্টাফ কলেজ প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
এনশাদ থাকে সপরিবারের স্টাফ রোডে, আমি কচুক্ষেত এলাকায়।
মাঝে মধ্যে দেখা হয়, ফোনে কথা হয়। যারা পরীক্ষা দিচ্ছে
তাদের সবাই পড়ালেখা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। ব্যতিক্রম শুধু এনশাদ।
সে দিনরাত অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তখন এম এস ব্রাঞ্চে
কম্পিউটারায়ন শুরু হয়েছে। ও সেই প্রকল্পের সাথে জড়িত।
পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার সময় কোথায় ওর? আমি একাধিকবার
ওকে বলেছি, “একটু পড়ালেখা করো, না হলে স্টাফ
কলেজে কিন্তু চান্স পাবে না।” কিন্তু ওর উত্তর একটাই,
“অফিসের কাজ তো আর ফেলে রাখা যায় না।” কর্তব্যনিষ্ঠার
কী অপূর্ব উদাহরণ! এভাবেই এনশাদ সবসময় সরকারি কর্তব্যকে
নিজ স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখেছে। ফলে যা হওয়ার তাই হলো।
আমি স্টাফ কলেজে সুযোগ পেলাম, ও পেল না। অথচ একটু
চেষ্টা করলেই স্টাফ কোর্স করার সুযোগটা অতি সহজেই ওর
হাতে ধরা দিত। এনশাদের কর্তব্যনিষ্ঠার কথা সবারই জানা ছিল।
এজন্যই মেজর জেনারেল শাকিল যখন বিডিআর-এর মহাপরিচালক
হিসেবে নিয়োগ পান, তখন তিনি এনশাদকে বিডিআর-এ নিয়ে যান
এবং লেঃ কর্ণেল পদবীতে বিডিআর-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
পদ ‘গোয়েন্দা সংস্থার অধিনায়ক’ হিসেবে নিয়োগ দেন।
ইতিমধ্যে আমি গাজীপুরে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানার
কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি। একদিন আমি
এনশাদসহ বেশ কিছু কোর্সমেটকে দাওয়াত দিলাম। ও জানাল, ওর
ছেলে রাহীনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা। ওর
পরীক্ষা শেষ হলে সে রওয়ানা দেবে। তাই ওর পৌঁছতে দেরি
হবে। সপরিবারে সেদিন সে এসেছিল একটু দেরিতেই। সবাই
খাওয়া-দাওয়া শুরু করলেও আমি আর আমার স্ত্রী ওর জন্য
অপেক্ষা করছিলাম।

এরমধ্যে সেনাবাহিনীতে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যারা অযৌক্তিক
কারণে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছে তাদের
বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা হবে। পদোন্নতি সংক্রান্ত মিটিং এ
যোগদানের জন্য আমি গাজীপুর থেকে ঢাকায় আসছিলাম।
টঙ্গীতে আসার পর গাড়ীতে বসে এনশাদকে ফোন
করলাম। তার পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করব কি না জানার জন্য। অন্য
কেউ হলে নির্দ্ধিধায় ইতিবাচক উত্তর দিত। কিন্তু এনশাদ বিনয়ের
সাথে বলল, “এই মুহূর্তে আমি পদোন্নতির কথা চিন্তা করছি না।
আমি এখন সামনে রিটায়ার্ড লাইফের টেনশনলেস সময়ের কথা
ভাবছি।” আমি ওকে ভাল করে ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে বললাম।
কিন্তু সে তার সিদ্ধান্ত অনড়। ওর অনুরোধেই এ ব্যাপারে আমি
আর চেষ্টা করিনি।

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। এদিন ওর সাথে শেষ দেখা হয়। বিডিআর-এর
বাৎসরিক সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আসবেন। দাওয়াত
পেয়েছি। সকাল আটটার মধ্যে প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত
থাকতে হবে। তাই ভোর সাড়ে পাঁচটায় গাজীপুর থেকে
সস্ত্রীক রওয়ানা দিলাম। ঢাকা সেনানিবাসের সেনাসদর অফিসার্স
মেসের গেস্ট রুমে মিনিট পনের বিশ্রাম নিয়ে পিলখানার পথে
আবার যাত্রা শুরু। ধানমন্ডির সকালের যানজট অতিক্রম করে বিডিআর-
এর প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছলাম নির্ধারিত সময়ের আগেই।
অনেকের সাথে এনশাদ এবং ভাবী আমাদের দুজনকে
অভ্যর্থনা জানাল। উপস্থিত সবার সাথে কুশলাদি শেষে এনশাদই
আমাদেরকে নির্ধারিত স্থানে বসাল। এক সপ্তাহ পর এনশাদ তার
টেনশনলেস লাইফে ফেরত যাবে এ কথাটা এক ফাঁকে আবার
আমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে ভুললো না।


কে জানত ওটাই ওর সাথে আমার শেষ কথা হবে ! ও আমাদের
সবাইকে টেনশনে রেখে এভাবে চলে যাবে টেনশনলেস
লাইফে, তখন কেউই ভাবিনি। পরদিন ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। অকস্মাৎ
কী যেন ঘটে গেল! ওইদিন পিলখানায় এক নারকীয়
হত্যাকাণ্ডে অনেকের সাথে এনশাদও হারিয়ে গেল । এনশাদ
এর মত একজন অত্যন্ত ভদ্র অফিসার যে কখনও কারও সাথে
উচ্চৈস্বরে কথা বলেনি, তাকেও খুনীরা নির্মম, নিষ্ঠুর ও
নির্দয়ভাবে খুন করল! যখন ওর গায়ে খুনীরা হাত তুলছিল, বন্দুক
তাক করেছিল, তখনও সে তার আজীবন লালিত ভদ্রতাকে
বিসর্জন দেয়নি। সে শুধু প্রশ্ন করেছিল, “এই! তোমরা কী
করছ?” প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই খুনীদের অস্ত্রের
গুলীর শব্দ তার কক্তস্বরকে নিস্তব্ধ করে দিয়েছিল।
মাঝে মাঝে আমার মনে হয় না এনশাদ আমাদের ছেড়ে চলে
গেছে। আমার মোবাইলে এখনও এনশাদের নম্বরটা রক্ষিত
আছে। ভাবি, এই বুঝি মোবাইলটা বেজে উঠবে, আর ওপ্রান্ত
থেকে এনশাদের কক্ত শোনা যাবে। জিজ্ঞাসা করবে, আমি
দেশে আছি না বিদেশে। দেশে থাকলে বিদেশে কবে
যাবো।

এনশাদের বিএমএ-এর সেই ঘড়িটা এখন কোথায় জানি না। যেটাতে
এলার্ম দিয়ে ও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তো। এলার্ম ঘড়িটা কি বন্ধ
হয়ে গেছে? না হলে এনশাদের ঘুম ভাঙছে না কেন?
বিএম-তে যেভাবে আমাদের ঘুম ভাঙতো, আজ ওর কথার
প্রতিধ্বনি করি, ইচ্ছে হয় সেভাবেই বলি,

” Gentleman Please
get up It’s parade time”

 

Facebook Comments

1 Comment

Al Jaim Pappu · February 27, 2018 at 3:27 pm

:'(

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: