দেশে আন্দাজি শ্রেণির লোক খুব কম না। আমাদের অনেকেই খুব ছোটকাল থেকে শুনে আসতেছি বাংলাদেশ বিদেশের টাকায় চলে। এই দেশ একটা সুই ও বানাতে পারেনা। বিদেশিরা যদি সাহায্য বন্ধ করে দেয় তবে দেশের মানুষ না খেয়ে মরবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পার করে আশা অনেকের মাঝে এখনো এরকম ধারনা বিদ্যমান। কিন্তু এরকম ধারনার কারণ কি হতে পারে সেটা বিশ্লেষণ জরুরি।

এর আগে আমাদের প্রতিবেশি দেশ গুলির সাথে একটু তুলনা করে আসা যাক। তুলনা করবার কারন হল, প্রতিবেশি দেশ গুলির মানুষ আমাদেরকে প্রায় কটাক্ষ করে বলে যে আমরা দানের টাকায় বেচে আছি। সেই সাথে এদেশের কিছু অতি জ্ঞানী ব্যাক্তি নিজেরাই নিজেদের নিয়ে এধরনের ধারনা প্রচার করে বেড়ায়।আসুন জেনে নেয়া যাকঋনের বোঝা কার কতটুকু? । আর আগেই বলে নিচ্ছি, তথ্যগুলি ইউরোমানি ইন্সটিটিউশনাল ইনভেস্টর কোম্পানি এবং সি আই এ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক থেকে সংগৃহীত। এবং এখানে মুলত এক্সটার্নাল ঋনের (নিজ দেশ ব্যতীত বাইরের কোন উৎস থেকে ঋন) হিসাব করা হয়েছে।

ভারত:

বিশাল অর্থনীতির এই দেশটির মোট এক্সটার্নাল ঋনের পরিমাণ $৪৭১.৮৫২ বিলিয়ন ডলার। হিসাবটি ৩১ মার্চ ২০১৭ পর্যন্ত। আর এই ঋন দেশটির মোট জিডিপির ২০%। ভারতের মাথা পিছু এক্সটার্নাল ঋনের পরিমাণ প্রায় $৩৪০ ডলার। বিগত বছরগুলিতে ভারত বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া ঋন শোধ করার ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। ২০১৬ সালে ইন্ডিয়ার মাথা পিছু আয় ছিল $১৬৭০ ডলার। ২০১৭-১৮ তে আয়ের প্রবৃদ্ধি কম হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চলতি বছরে এটা হতে পারে ১,১১,৭৮২ রুপি যেটা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১,৪৩,০৮০ টাকার মত (১ রুপি = ১.২৮ টাকা হিসাবে)। আর তাদের ঋন ১ ডলার = ৬৪.৮৪ রুপি হিসাবে প্রায় ২২,০৪৫ রুপি যেটা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৮,২১৮ টাকার মত।

পাকিস্তান:

জুন ২০১৭ পর্যন্ত বাংলাদেশের ৫ গুন বড় দেশ পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক ঋনের পরিমাণ $৮২.৯৭০ বিলিয়ন ডলার যা তাদের মোট জিডিপির প্রায় ২৬%। প্রতিটা পাকিস্তানির মাথা পিছু বৈদেশিক ঋন হিসাবে আছে প্রায় $৩৮০ ডলার বা ৪৩,৯৭৩ পাকিস্তানি রুপি। বাংলাদেশি টাকা হিসাবে সেটা প্রায় ৩১,৬৬০ টাকা। পাকিস্তানের মাথা পিছু আয় $১৬২৯ ডলার।

বাংলাদেশ:

বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋন প্রায় $২৫.৯৬ বিলিয়ন ডলার যা জিডিপির ১২%। মাথা পিছু ঋন মাত্র $১৬০ ডলার। যা ইন্ডিয়া বা পাকিস্তানের অর্ধেকের কম। আর আমাদের মাথাপিছু আয় ২০১৭ সালে ছিল $১৬১০ ডলার বা প্রায় ১৩৩০০০ টাকার মত। এর বিপরীতে ঋন আছে মাত্র ১৩,২০০ টাকার মত। বিশ্বের ভেতর বাংলাদেশের মাথাপিছু ঋনের পরিমান সবচেয়ে কম দেশগুলির একটি।

এরপর যদি বলা হয় উক্ত দেশ তিনটির ভেতর বাংলাদেশ বিদেশিদের টাকায় চলে এবং সেটা যদি ভারত বা পাকিস্তানিরা বলে তাহলে সেটিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায় আমার জানা নেই।

তবে এত খুশি হবার কিছু নেই। বাংলাদেশকে এই অবস্থানে আসতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বর্তমানে বাজেটের ব্যায়ের বিশাল অংশ যায় এই বৈদেশিক ঋন পরিশোধে। কিভাবে সেটা হয়েছে সেটা একটু ব্যাখ্যা করি।

১৯৭৩ সালে ঋন ছিল জিডিপির মাত্র ৬.১৪%। সেই থেকে শুরু উর্ধগতি। ১৯৭৪ সালে সেটি বেড়ে হয় ১০.০৪%, ১৯৭৫ সালে ছিল ৮.৬৪%। সামরিক শাষনের সময় এটি বাড়তে থাকে। ১৯৭৬-৮০ সাল পর্যন্ত গড়ে এটা ছিল প্রায় ২১.০৬%। ১৯৯০ সালে এটি বেড়ে হয় প্রায় ৩৮.১৩%।জিডিপি অনুপাতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ঋনের পরিমাণ ছিল ১৯৯৪ সালে। এই সালে বাংলাদেশের ঋন জিডিপির প্রায় ৪৪.৪৮% ছিল। ১৯৯৫ সাল থেকে সেটা কমতে থাকে। ২০০৭ সালেও আমাদের এই ঋনের অনুপাত ছিল ২৫.৪৭%। আর সর্বশেষ ২০১৬ তে এসে এটি এখন মাত্র ১২% এ নেমে এসেছে।

এখন থেকে বাজেটেও বিদেশি সাহায্যের পরিমাণ নিম্নগামী। উপরের এত তথ্য দেবার কারন হল, যারা ওই সময়গুলি পার করে এসেছেন তারা হয়ত এখনো ভাবছেন আমরা বিদেশিদের টাকায় চলি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেটি অকার্যকর। বাংলাদেশি হিসাবে আমাদের উচিত হবে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে জানা। না জেনে ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানিদের সাথে এক হয়ে নিজেকে ভিখারি প্রমাণ করার চেষ্টা চরম বোকামোর পরিচয়।

তবে এখানে একটা ব্যাপার না বলে পারছিনা। বাজেটের আকার বৃদ্ধি এবং সেই সাথে বিদেশি ঋন পরিশোধের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য ট্যাক্সের বোঝা চাপানো হচ্ছে জনগণের উপর। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী না এগোনোর ফলে যারা বর্তমান ট্যাক্স হোল্ডার তাদের উপর বেশি চাপ দেয়া হচ্ছে যেটা ঠিক না। শুধু ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শহরের যত শপিং মল আছে এবং এসব শপিং মলে যতগুলি দোকান আছে বাংলাদেশের ট্যাক্স হোল্ডার ততজন আছেন কিনা সন্দেহ। সুক্ষ্ম কারচুপি করে ট্যাক্স ফাকি দিচ্ছে বড় বড় ব্যবসায়ীরা। এদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেয়া গেলে বাংলাদেশ আরো দ্রুত উন্নত হবে বলে আশা রাখি।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: