দুটি বিশ্বযুদ্ধ অনেক কিছুর মতো স্মরণীয় হয়ে আছে জার্মানদের বিস্ময়কর আবিষ্কারের জন্য। যদিও দুটি বিশ্বযুদ্ধেই জার্মানি শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু তাদের উদ্ভাবিত অস্ত্রশস্ত্র আজও অধিকাংশ অস্ত্র ও প্রযুক্তির পথিকৃৎ হিসেবে কাজ করছে। এর মধ্যে নৌযুদ্ধে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য সংযোজন ছিল ডুবোজাহাজ বা ইউবোট। একে সাবমেরিনও বলা হয়। ইউবোটের মূল জার্মান শব্দ ‘‘আন্ডার সী বোট ওয়াভি।’’ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই জার্মান-এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু করে দেয়। বৃটেন জার্মানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার দুইদিন পর ১৯১৪ সালের ৬ আগস্ট উত্তর সাগরে বৃটিশ রয়াল নেভির উপর হামলা চালাতে ১০টি জার্মান ইউবোট হেলিগোল্যান্ডে তাদের ঘাঁটি ত্যাগ করে। ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম সাবমেরিন টহল। ইউ-১৫ নামের ইউবোটটি প্রথম বৃটিশ জাহাজে টর্পেডো নিক্ষেপ করে। কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। অবশেষে ৫ সেপ্টেম্বর ইউবোট সাফল্য লাভ করে। সেদিন লেঃ অটো হাসি চালিত ইউ-২১ বৃটিশ হালকা ক্রুজার পাথফাইন্ডার-এ টর্পেডো হামলা চালায়। মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই এটি ডুবে যায় এবং ২৫৯ জন ক্রুর সবাই মারা যায়। এটি ছিল যুদ্ধে সাবমেরিনের প্রথম বিজয়। ২২ সেপ্টেম্বর জার্মান ইউবোট আরো বেশি সফল হয়। সেদিন খুব ভোরে ইউ-৯-এর কমান্ডার লেঃ অটো ওয়েডিগেন তিনটি বৃটিশ যুদ্ধাজাহাজ আবুকির হ্যাও ক্রেসিকে আক্রমণ করেন। এক ঘণ্টার কম সময়ে তিনটি ক্রুজার নিমজ্জিত হলে ১ হাজার ৪৬০ জন নাবিক মারা যায়। তিন সপ্তাহ পর ওয়েডিগেন ক্রুজার হকি ডুুবিয়ে দেন। এরফলে তিনি জার্মানির জাতীয় বীরে পরিণত হন। তাকে প্রথম শ্রেণীর আয়রণ ক্রস দেয়া হয়।

ইউবোটের এই সাফল্য বিশ্বের বৃহত্তম নৌ-শক্তিকে মূল ঘাঁটি থেকে সরে যেতে বাধ্য করে। বৃটিশ নৌ-বহর আয়ারল্যান্ডে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ১৯১৫ সালের শুরুতে উভয়পক্ষ বুঝতে পারে শিগগির যুদ্ধ শেষ হচ্ছে না। যুদ্ধের সূচনায় বৃটেন জার্মানির উপর নৌ-অবরোধ আরোপ করে। জার্মানি-এ চেষ্টাকে অনাহারে ঠেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করানোর একটি কৌশল হিসেবে। এ ধরনের ধারণা থেকে তারা একই ধরনের জবাব দিতে চেয়েছে। যুদ্ধ জাহাজের শক্তিতে বৃটেনের সঙ্গে জার্মানির কোনো তুলনাই হতো না। ভারসাম্যহীনতা অতিক্রমে ইউবোটেই ছিল একমাত্র বিকল্প। ১৯১৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কাইজার (জার্মানির সম্রাট) দ্বিতীয় উইলহেম বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশের সাগরকে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা দেন। এই ঘোষণা দেয়ার আগ পর্যন্ত ইউবোটগুলো মোট ৪৩ হাজার ৫৫০ টন ওজনের জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। ঐ বছরের আগস্ট নাগাদ তা ১ লাখ ৬৮ হাজার টনে গিয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে ১৯১৪ সালের শেষ ও ১৯১৫ সালের গোড়ার দিকে ইউবোট হামলায় ক্রমাগত বৃটিশ জাহাজ খোয়া যেতে থাকায় বৃটিশ নেভি পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণে মরিয়া হয়ে উঠে। এ উদ্দেশ্যে তারা নকল বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। এ পরিকল্পনা মোতাবেক নকল বাণিজ্যিক জাহাজে অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন করা হয়। এই ধরনের জাহাজ টোপ দিয়ে ইউবোটকে কাছাকাছি নিয়ে এসে ধ্বংস করবে। এদেরকে কিউশীপ নামে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯১৫ সালের ১৯ আগস্ট কিউশীপের কারসাজি ফাঁস হয়ে যায়।

সেদিনই বারালং নামে একটি জাহাজকে পাকড়াও করার মধ্য দিয়ে কিউশীপের রহস্য উদঘাটিত হয়। অন্যদিকে ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বরে সাবমেরিনের তৎপরতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে ইউবোটগুলো কী কাজে লাগানো যায় এ নিয়ে জার্মান সরকারে বিতর্ক দেখা দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত ১৯১৬ সালের গোড়ার দিকে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলার মধ্য দিয়ে আবার বৃটেনের বিরুদ্ধে সামরিক অবরোধ কার্যকর করা হয়। নিরপেক্ষ দেশগুলো বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র তীব্র প্রতিবাদ করায় দুই মাস পর এ তৎপরতা স্থগিত রাখা হয়। আবার তা চালু হলে এর লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়ায় সশস্ত্র নৌ-যান। এ সময় জার্মানির হাতে ছিল ১৩৪টি সাবমেরিন । ইউ-৯ এর উত্তরসূরি ইউবোটগুলো ছিল আরো উন্নতমানের। তাতে সামনে ছিল ৪টি এবং পিছনে দুটি টর্পেডো টিউব। আরো ছিল ৮৬ মিলিমিটারের একটি অথবা দুটি কামান অথবা ১০৫ মিলিমিটারের একটি কামান। এদের সাফল্যও ছিল বিস্ময়কর। ১৯১৬ সালের শেষ নাগাদ ইউবোট ১৫৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। ১৯১৭ সালের মধ্যে এরা সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছে যায়। ফেব্রুয়ারিতে মিত্রপক্ষের ৮৬টি, মার্চে ১০৩টি এবং এপ্রিলে ১৫৫টি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। সাফল্যের এই ধারা যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

তাই বৃটিশ ফ্লিট এর কমান্ডার এডমিরাল স্যারজন জেলিকোয়ি জার্মান ইউবোটের আশ্চর্য সাফল্য দেখে মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘পরিস্থিতির অনুরূপ অবনতি অব্যাহত থাকলে বৃটেনকে ১৯১৭ সালের গ্রীষ্ম নাগাদ শান্তি চুক্তির জন্য অনুরোধ জানাতে হবে।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: