Wasi Uddin Mahin
Writer/Economist

 

এখনো অনেকে জিজ্ঞাসা করেন অর্থনীতির সাথে ডিফেন্সের সম্পর্ক কি? আজ এই বিষয়টি একটু বিশ্লেষণ করব ।

অর্থনীতির সাথে ডিফেন্সের সম্পর্ক

ইন্সুরেন্স কোম্পানির সাথে ডিফেন্সের তুলনা আমি প্রায় দিয়ে থাকি। কখনো আমাদের ব্যাবসা, মালামাল, সম্পদ এমনকি জীবনের বিভিন্ন ঝুকি হ্রাস করতে এবং সম্ভাব্য ঝুকি মোকাবেলায় এবং নিরাপত্তাবিধান করার জন্য আমরা ইন্সুরেন্স করে থাকি। এটা মুলত একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ফল যার মাধ্যমে আমরা অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুকির কবলে সর্বস্বান্ত হওয়া থেকে রক্ষার একটা উপায় হিসাবে দেখি।

রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষেত্রে ডিফেন্স অনুরুপ ভূমিকা পালন করে। অনেকেই ডিফেন্স মানেই শুধু অস্ত্রপাতি নিয়ে পড়ে থাকেন। ডিফেন্স বলতে শুধু ট্যাংক, কামান, যুদ্ধ-বিমান আর যুদ্ধ কে বুঝেন। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের মৌলিক অংশের ভেতর ডিফেন্স কে রাখা হয়েছে কেন? কিসের বিপরীতে ডিফেন্স? কার জন্য বা কিসের জন্য এই নিরাপত্তা? কেন এর পেছনে হাজার কোটি টাকা ব্যয়? ( মাফ চাই দোয়াও চাই, আমাকে ইন্সুরেন্স নামক এদেশের দুষ্টু কোম্পানির এজেন্ট ভাববেন না)

ইন্সুরেন্স যেমন সম্পদ, ব্যাবসা, জীবনের জন্য সম্ভাব্য ঝুকি হিসাবে অগ্নিবীমা, জীবন বীমা করে, রাষ্ট্রযন্ত্র ঠিক তেমনি কোন দেশের সম্পদের নিরাপত্তা দেবার জন্য, বহি শত্রু থেকে দেশের জনগণের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য, ভবিষ্যৎ যুদ্ধ বিগ্রহ বা সংকটময় সময়ের ঝুকি মোকাবেলার জন্য সামরিক খাতে ব্যয় করে থাকে। অর্থাৎ সামরিক ব্যায়ের মুল উদ্দেশ্য দেশের জনগণ, সম্পদ, সার্বভৌমত্ব এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এক্ষেত্রে একটি দেশের সামগ্রিক উন্নতির নিশ্চয়তা এই ডিফেন্স। এই খাতে যারা অতিরিক্ত ব্যয় করেন নিজ দেশের সম্পদ, জনগণের ভাল থাকা থোড়াই কেয়ার করে, তারাও বোকা, ঠিক তেমনি যারা শুধু সম্পদ এর উপর সম্পদ গড়ে তুলেছেন কিন্তু এর নিরাপত্তার জন্য খরচ করেন নি বেশি তারাও বোকা। কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।

উত্তর কোরিয়া, বার্মা, পাকিস্তান, দেশগুলি নিজ দেশের ব্যাবসা, বানিজ্যকে উপেক্ষা করে, জনগণ কে না খাইয়ে অস্ত্র বৃদ্ধি করেছে। যেই সম্পদ এর নিরাপত্তা দেবার জন্য ডিফেন্স সেই সম্পদ বিক্রি করে বার্মা অস্ত্র বানিয়েছে। তাদের গ্যাস, মূলবান পাথর অন্য দেশ নিয়ে যাচ্ছে বিনিময়ে তাদেরকে দিচ্ছে অস্ত্র গোলাবারুদ। অন্য দিকে একি সাথে দক্ষিণ কোরিয়া নিজ দেশের জনগণের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। অর্থনীতির আকার বড় করেছে। সেই সাথে ব্যালান্সড সামরিক বিনিয়োগ ও করেছে। এখন দক্ষিন কোরিয়ার মাথা পিছু আয় উত্তর কোরিয়ার ৫০ গুন বেশি।

মেগাপ্রজেক্টের সুরক্ষায় সামরিক পরিকল্পনা

এবার আসি মূল আলোচনায়। অর্থনীতি হচ্ছে একটি দেশের জন্য ফুয়েল। মানে একটি দেশকে টিকিয়ে রাখার প্রধান নিয়ামক অর্থনীতি, ডিফেন্স নয়। যেসব দেশ ক্ষুধা, দারিদ্রতাকে সুন্দরভাবে মোকাবেলা করতে পেরেছে সেসব দেশ টিকে গেছে। আর যেসব দেশ অস্ত্র প্রয়োগ করে পেশি শক্তি প্রদর্শন করতে গেছে তারাই হেরেছে। এভাবেই পাকিস্তান হেরেছে, যুগস্লোভিয়ার মত শক্তিশালী দেশ ভেংগে গেছে। বিশ্বের পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন এই অর্থনীতির কারনেই ভেঙ্গে গেছে। সামরিক বল প্রয়োগ করে সুফল আসেনি। আসাটাও অবাস্তব।

কোন দেশের সামরিক উন্নয়ন করতে গেলে সব থেকে বেশি জরুরি হল অর্থনীতির উন্নয়ন। ধরুন আপনার কাছে ৫০ লাখ টাকা এবং এক খন্ড জমি আছে। আপনি জমিটা সুরক্ষার জন্য ১৫ লক্ষ টাকা দিয়ে চীনের মহাপ্রাচীর এর মত দেয়াল বানালেন। বাকি টাকা দিয়ে আপনি বাড়ি করতে পারছেন তবে এক তলা। তাও ভেতরের ফিটিংস এর কাজ বাকি কারন বাড়ির প্রধান ফটকে হাই সিকিউরিটি গেইট, স্ক্যানার লাগিয়েছেন। নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় আপনার ভবিষ্যৎ কে কি নিশ্চিত করল নাকি অনিশ্চিত? একি টাকা দিয়ে আরেক ব্যাক্তি কোন মতে দুই তলা একটা বাড়ি করলেন, বাড়ির নীচ তলায় ৪ টি দোকান করে ভাড়া দিলেন। এতে বাড়ি ভাড়া এবং দোকান ভাড়া বাবদ তার মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় হতে থাকল। এরপর সে তার বাড়ির নিরাপত্থার জন্য এবং দোকান গুলির নিরাপত্তার জন্য উক্ত আয় থেকে দেয়াল নির্মানের কাজে হাত দিলেন। এই দুই ব্যাক্তির পার্থক্য হল একজনের আয়ের উৎস এবং সম্ভাবনা সীমিত হল, অন্য জনের ক্ষেত্রে প্রতি মাসেই তার একটা নিশ্চিত আয় হল যেটা দিয়েই সে দেয়ালের কাজ করে ফেলতে পারল। মূল ৫০ লক্ষ টাকার একটি টাকাও তার অনুৎপাদনশীল খাতে গেল না।

অর্থনীতি হল ডিফেন্সে যে ব্যয় করা হয় সেই টাকার উৎস। তাই এই উৎসকে অবজ্ঞা করে কোন ভাবেই শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী দেশ হওয়া সম্ভব না। চীন অস্ত্রে আমেরিকা থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে আছে। কিন্তু শক্তিশালী অর্থনীতি চীনকে আমেরিকার উপর খবরদারি করার সুযোগ দিয়েছে। যেটা রাশিয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য পারছে না। তাই ব্যয় বাড়াতে গেলে আগে আয় বাড়াতে হবে। একারনেই কেউ যদি বলে অর্থনীতি বাদে শুধু ডিফেন্স ই সব, তাহলে নিশ্চিত বুঝতে হবে সে ডিফেন্স জিনিসটা বুঝে না। একটি দেশের নিরাপত্তায় শুধু অস্ত্রশস্ত্রের ভুমিকা রয়েছে তা নয়, মূল ভূমিকা অর্থনীতির। অর্থনীতি ছাড়া ডিফেন্স কখনোই পরিপূর্ণতা পাবে না। আমরা ডিফেন্স রিসার্চ ফোরাম এটাতেই বিশ্বাস করি। যার জন্য আমরা দুটি বিষয়কেই আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশঃ
আমাদের ২০০৫ সালেও ডিফেন্স বাজেট ছিল ৪৬০০ কোটির মত। তাহলে ২০১৮ তে এসে সেটি ২৯০০০ কোটি কেন ছাড়ালো? (যদিও সংশোধিত বাজেটে এই খরচ ৩২-৩৩ হাজার কোটি হয়ে যাবে)।

এর কিছু কারন গুলির ভেতর অন্যতম হল মেগাপ্রজেক্ট গুলি হাতে নেয়া। কিছু বিষয় খেয়াল করে থাকবেন।

১. দেশের প্রথম মেগাপ্রজেক্ট যমুনা সেতু করার সাথে সাথে সেতু নিরাপত্তার জন্য উভয় পাশেই ক্যান্টনমেন্ট করা হয়েছে। সেতুর নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র কেনা লেগেছে।

২. পোস্তাগোলা ক্যান্টনমেন্ট করা হয়েছে শুধু পোস্তাগোলা ব্রিজ নির্মাণের জন্য এবং এটির নিরাপত্তার জন্য।

৩. পদ্মা সেতুর জন্য সেনাবাহিনীর আলাদা কম্পজিট ব্রিগেড করা হয়েছে। এর অধীনে রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটেলিয়ন দাড় করানো হচ্ছে। সেই সাথে কোস্টগার্ড এর আলাদা ইউনিট। থাকছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা।

৪. রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য আরেকটি ক্যান্টনমেন্ট করা হতে পারে। থাকবে সারফেস টু এয়ার মিসাইল। এই অবকাঠামো প্রতিরক্ষায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বিধান করা হবে।

৫. দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কখনো কোন ক্যান্টনমেন্ট ছিল? লেবুখালিতে ক্যান্টনমেন্ট করা হয়েছে মূলত পায়রা বন্দর, বন্দর ঘিরে ১০০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের হাব, জাহাজ নির্মাণ শীল্পের নিরাপত্তা দেবার জন্য। সাবমেরিন ঘাটিও করা হচ্ছে একি উদ্দেশ্যে।

৬. মাতারবাড়িতে জাপানের বিনিয়োগ সুরক্ষায় জাপান নিজেই তাদের পেট্রল ক্রাফট দিবে বাংলাদেশকে। সেই সাথে নৌবাহিনীর ঘাটি করা হচ্ছে। খুব সম্ভভত মাতারবাড়ির সুরক্ষ্যায় ইউরোপ থেকে স্যাম সিস্টেম আসতে পারে জাপানি অর্থায়নে।

৭. ঢাকা মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তা এবং ধলেশ্বরী সেতুর নিরাপত্তার জন্য এখানে ধলেশ্বরী সেনা ক্যাম্প করা হয়েছে।

৮. সাবমেরিন কেনা হয়েছে এবং হবে ভবিষ্যৎ নেভাল ব্লকেডের মত পরিস্থিতি মাথায় রেখেই। সেই সাথে কোস্টাল ডিফেন্স সিস্টেম কেনা হচ্ছে মূলত কোস্টাল লাইন ধরে গড়ে উঠা বিভিন্ন মেগাপ্রজেক্ট এর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই।

৯. রামু ক্যান্টনমেন্ট করার পেছনে কি শুধুমাত্র বার্মার কথায় মাথায় ছিল? না। মাতারবাড়ি, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ঘিরে অই অঞ্চলে এলএনজির বিশাল হাব নির্মাণ হচ্ছে। এসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ।

এরকম আরো অনেক উদাহরন দেয়া যাবে। ব্যাবসায়িক সম্পর্ক পারস্পারিক স্বার্থ সৃষ্টি করে। জার্মানির সিমেন্স ৭ বিলিয়ম ইউরো বিনিয়োগ করে ৮০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাচ্ছে। তাদের ও নিরাপত্তার বিষয় বিনিয়োগের আগেই মাথায় থাকে। সেই প্রেক্ষিতে জার্মানির মত দেশ ভবিষ্যতে তাদের স্বার্থ সুরক্ষা করতে এদেশে তাদের অস্ত্রের বাজার প্রশারিত করলেও অবাক হব না। একি কথা ইউরোপীয় অনেক দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোয্য।

আমাদের কিন্তু বাড়তি কিছু করা লাগছে। একেকটি মেগা প্রজেক্টের সাথে অটোমেটিক্যালি আমাদের সামরিক উন্নতিও হতে থাকবে। এরকম আরো অনেক কিছুই হবে মিরসরাই তে অর্থনৈতিক জোন সুরক্ষায়, কর্ণফুলী টানেল সুরক্ষায়, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, যমুনা মাল্টি মডাল টানেল সুরক্ষায় থাকবে সেনাবাহিনী। এটাই ইন্সুরেন্স। সম্পদের সুরক্ষায়। সেই সাথে সমুদ্রে দাপিয়ে বেড়ানোর জন্য নৌবাহিনী কম এগোয়নি সেটা হয়ত আপনাদের বলে দিতে হবে না।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: